সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা । সপ্তাহ – ৭

লম্বায় আপনার গর্ভের সন্তান এখন প্রায় ১ সেন্টিমিটার। আপনার গর্ভের ভ্রুনটি আস্তে আস্তে ছোট্ট একজন মানুষে পরিনত হচ্ছে। এ সময়ে হাড়ের গঠন শুরু হয়। এ সপ্তাহে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ দ্রুত হতে থাকে। প্রতি মিনিটে প্রায় ১০০ নতুন কোষ এর সৃষ্টি হয়। বাচ্চার কিডনির গঠন শুর হয়েছে কিন্তু তা এখন কর্মক্ষম নয়। যৌনাঙ্গ ও আস্তে আস্তে বিকশিত হতে থাকে কিন্তু এখনই আলট্রাসাউন্ড এ তা ধরা পরবেনা।

আপনার গর্ভস্থ শিশু এখনো ভ্রুণ অবস্থায় আছে। আকারে তা একটি কালজামের সমান। তবে এখন এর আকার আগের সপ্তাহের দ্বিগুণ। এর মাথার কাছে নতুন একটি স্ফীতি দেখতে পাবেন যেখানে মিনিটে শত শত কোষ বেড়ে চলেছে যা মস্তিষ্কে পরিণত হবে। মাথার পাশে টোলের মত দেখতে ছোট গর্তমত অংশগুলোতে কান, আর পুরু স্থানগুলোতে চোখ হবে। এছাড়া শরীরের নানা স্থানে আরো যে স্ফীতি গুলো দেখতে পাচ্ছেন সেগুলো মাংশপেশী ও হাড় হয়ে বেড়ে উঠবে। এছাড়া আরো কয়েকটি ফোলা অংশ দেখা যাবে, যেগুলোকে বলা হয় মুকুলিত অঙ্গ (limb buds) – এগুলো থেকে হাত এবং পা তৈরি হবে। শরীরে অন্যান্য অঙ্গ দ্রুত বেড়ে ওঠার সাথে সাথে পেছনের লেজের মত অংশটি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকবে।

এ সপ্তাহের শারীরিক পরিবর্তন

প্রজেস্টেরন হরমোন এর অতিরিক্ত নিঃসরণের কারনে এই সময় গর্ভবতী মায়েরা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগতে পারেন।

সাধারনত দিনের শুরুতে বমি বমি ভাব অনুভব করতে পারেন। এটি গর্ভ ধারনের প্রাথমিক লক্ষন হিসেবে বলা যেতে পারে। গর্ভ ধারন কালে দিনের যে কোন সময়ে এই ধরনের অনুভূতি হতে পারে। গর্ভবতী মায়েরা এই সময়ে কিছু খেতে পারেন না। এমন কি তারা কোন খাবারের গন্ধ ও সহ্য করতে পারেন না।

গর্ভকালীন সময়ে জরায়ু আকারে বৃদ্ধি পায়। আকারে বৃদ্ধি প্রাপ্ত এই জরায়ু মুত্র থলির উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। যে কারনে মুত্র থলি পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই বার বার প্রস্রাব পেতে থাকে

গর্ভাবস্থায় হরমোন ইস্ট্রোজেন ও রক্ত সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার জন্য সাদা শ্রাব কোন কোন সময় যেতে পারে। ঢিলেঢালা পোষাক ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। সাদা শ্রাবের সাথে যদি দুর্গন্ধ থাকে বা চুলকানি হয় তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

স্তন আগের চাইতে বেশী sensitive হয়ে উঠতে পারে। এবং আকার বৃদ্ধি পেতে পারে।

প্রজেস্টেরন হরমোন এর অতিরিক্ত নিঃসরণের কারনে এই সময় অম্লতা/ বুকে জ্বালা পোড়া ভাবের সৃষ্টি হয়

হরমোনের মাত্রা এবং গর্ভকালীন উদ্বেগ বেড়ে যাবার ফলে এ সময়ে আপনি নিদ্রাহীনতায় ভুগতে পারেন এবং আপনার স্বপ্নগুলোকেও জীবন্ত মনে হতে পারে। এভাবে ঘুমের অভাব এবং বাড়তি মানসিক চাপ আপনাকে ক্লান্ত করে দিতে পারে, তবে গর্ভকালীন সময়ের প্রথম তিন মাস পেরিয়ে গেলে আপনার অবস্থার উন্নতি হবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফলিক এসিড ও অয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। আপনার উদরে বেড়ে উঠা শিশুর বৃদ্ধির জন্য এই উপাদানগুলো অনেক বেশি প্রয়োজন।

কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয় সে জন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে। দিনে অন্তত আট গ্লাস পানি পান করতে হবে। আঁশ আছে এ রকম খাবার, যেমন- শাকসবজি, ফলমূল, বিচিজাতীয় খাবার, ডাল, আটা ইত্যাদি খেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করার জন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।

এসিডিটি বা বুকজ্বলা হলেও অল্প অল্প করে ঘন ঘন খাবার খেতে হবে। তৈলাক্ত খাবার, ভাজাপোড়া ও বেশি মসলাযুক্ত খাবার কম খান। একসঙ্গে বেশি খাবার না খেলেও উপকার পাওয়া যায়। খাওয়ার সময় পানি কম খান। দুই খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে বেশি বেশি পানি পান করতে হবে। খাওয়ার পরপরই উপুড় হওয়া বা বিছানায় শোয়া উচিত নয়।

আপনার সন্তানের জন্য আগে থেকে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে কথা বলে রাখুন যাতে কোন সমস্যা হলেই তাকে ডাকলেই পাশে পেতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দঁাত পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দঁাত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দাঁত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিন৷

শরীর সুস্থ রাখা এবং সহজ প্রসবের জন্য গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম করা একান্ত প্রয়োজন৷ প্রত্যহ সকল-সন্ধায় এক ঘণ্টা করে হাঁটলে ঠিকমতো রক্ত চলাচলে সহায়তা করে এবং পেশিগুলোও সুস্থ ও সবল অবস্থায় থাকে৷

এ সপ্তাহে গর্ভপাতের সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। পরিসংখান বলে প্রতি পাঁচটি গর্ভধারণের দু’টি এ সপ্তাহে গর্ভপাত হয়ে যায়। গর্ভপাতের লক্ষণগুলোর বিষয়ে সতর্ক হোন এবং কী কী কারণে এমন হতে পারে জেনে নিন। আপনি যখন গর্ভাবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তখন এমন কিছু হলে তা ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। এসময় শারীরিক বিষয়, সমস্যা নির্ণয় ও চিকিৎসায় আপনার ডাক্তার আপনাকে সহায়তা দিতে পারবেন, কিন্তু আপনার সঙ্গীর সাথেও বিষয়টি আলোচনা করুন, কেননা এমন কিছু হলে তিনিও ভেঙ্গে পড়তে পারেন। আর অন্য মহিলাদের সাথেও এ নিয়ে আলোচনা করুন, আরো কতজনকে যে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে জেনে আপনি অবাক হবেন।

খাবারে আদার পরিমান বাড়িয়ে দেবার চেষ্টা করুন। এটা পেটের পীড়ায় আপনাকে সাহায্য করবে। ভেষজ চাও উপকারী। এর মধ্যে হয়ত ডাক্তারের সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় ঠিক করে ফেলেছেন। ডাক্তারকে কী কী প্রশ্ন করবেন তার একটি তালিকা করে ফেলুন।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৬
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৮>>

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/language/bn/1911/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment