সপ্তাহ ২১ | গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনার ২৭ সেমি দীর্ঘ আর ৩৪০ গ্রাম ওজনের শিশুটির আকার তুলনা করা যেতে পারে ডালিমের সাথে। এতদিনে তার ভ্রু ও চোখের পাতার লোমের ( Eyelash) বিকাশ সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। শিশুটি মেয়ে হলে এখন থেকে তার যোনিপথ ( Vagina) বিকশিত হতে শুরু করবে।

শিশুর স্বাদ গ্রহন করার ক্ষমতা এখন পুরোপুরি বিকশিত। এখন সে প্রতিদিন কিছু কিছু এমনিয়টিক ফ্লুইড গ্রহন করে। এটা শুধু সে পুষ্টির জন্যই করেনা বরং খাদ্য গ্রহন ও পরিপাক এর কাজটা এখন থেকেই অভ্যস্ত হওয়ার জন্য করে। এমনিয়টিক ফ্লুইড এর স্বাদ আপনি যা খাবেন তার উপর ই নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভাবস্থায় আপনি যে খাবার বেশী খাবেন জন্মের পর শিশু সে স্বাদের খাবারের প্রতি বেশী আকৃষ্ট হবে। তাই এখন থেকেই সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।

গর্ভধারণের এ সময়ে শিশুর মস্তিষ্ক এখন তার পেশীগুলোকে নিয়ন্ত্রন করতে শুরু করবে। তাই শিশুর নড়াচড়া এখন অনেক বেশী শক্তিশালী মনে হবে। শিশুটি লাথি ও ঘুষি মারলে আপনি এখন অনেক জোরালোভাবেই তা টের পাবেন। এতদিন সেই নড়াচড়া আপনার কাছে সুড়সুড়ির মতো মনে হয়েছে সেটাই এখন মাঝে মাঝে ক্যারাটে সেশনও মনে হতে পারে। তার নড়াচড়ার একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নও এখন তৈরি হয়ে যাবে। আপনি নিজেই বুঝতে পরবেন কখন সে জাগ্রত আর কখন সে বিশ্রাম নিচ্ছে।

২১তম সপ্তাহে শিশু আরও অনেক বেশী কর্মক্ষম হয়ে ওঠে এবং ঢোক গিলতে সক্ষম হয় । এই সময়ের মধ্যেই শিশুর ঘুমানো এবং জেগে ওঠার একটি প্রবনতা তৈরী হয় । শিশুর এই জেগে ওঠা বা ঘুমানো মায়ের জেগে থাকা বা ঘুমানোর মত হয় না । এমন হতে পারে, মা যখন রাতে ঘুমাচ্ছে তখন শিশু জেগে আছে এবং নড়াচড়া করছে । যদিও এখনও শিশুর ফুসফুস ঠিকমত কাজ করতে পারে না কিন্তু শিশু শ্বাস প্রশ্বাস এর চর্চা করতে থাকে যেন জরায়ুর বাইরে সে বেঁচে থাকতে পারে । এই সময়ে শিশু মায়ের কাছে থেকে অক্সিজেন গ্রহন করতে থাকে নাড়ির মাধ্যমে এবং জন্মের আগে পর্যন্ত সে এভাবেই মায়ের কাছে থেকে অক্সিজেন গ্রহন করতে থাকবে ।

গর্ভধারণের এ সময়ে আপনি

আপনার বড় হয়ে ওঠা পেটের কারণেই এখন আপনাকে দেখলেই বোঝা যাবে আপনি গর্ভবতী। তবে এ সময়টাই গর্ভাবস্থার সবচেয়ে আরামদায়ক সময় কারণ প্রথম ত্রৈমাসিক পর্যায়ের বমি বমি ভাব আর সকালবেলার অসুস্থতা এখন আর থাকবে না বললেই চলে। এ সময়টুকু উপভোগ করে নিন, কারণ শেষ ত্রৈমাসিক পর্যায় আরও নতুন নতুন সমস্যা নিয়ে আসতে পারে।

এখনো আপনার ছোটোখাটো কিছু সমস্যা থাকতে পারে। যেমন, হরমোনের পরিবর্তনের কারণে আপনার ত্বক আগের চাইতে তৈলাক্ত হয়ে যাবে এবং তার ফলে মুখে ব্রণ উঠতে পারে।

এ সময় দুটো জিনিস নিয়ে ভাববার আছে। সেগুলো হলো স্পাইডার ভেইন ( Spider Vein) এবং ভেরিকোজ ভেইন (Varicose Vein) । এই দুটোই রক্তনালীর প্যাঁচ সংক্রান্ত সমস্যা যেগুলো এমনিতে তেমন জটিল নয়।

স্পাইডার ভেইন ত্বকের ওপর দেখতে বেশ প্রকট লাগে, তবে সাধারণত এতে কোনো ব্যথা থাকে না। সন্তান প্রসবের পর পর এটা মিলিয়ে যায়। গোড়ালি, পা, এমনকি মুখের ত্বকের একদম নিচের শিরাগুলো এমনভাবে পেঁচিয়ে যায় যে দেখতে একটা মাকড়সার মতো মনে হয়।

ভেরিকোজ ভেইন -এর ক্ষেত্রে পায়ের ও যোনিদ্বারের( vulva) ত্বকের একদম নিচের রক্তপ্রবাহী শিরাগুলো ফুলে যায় এবং সেগুলো নীল বা বেগুনি রেখার মতো দেখায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বিশ্রীভাবে শিরাগুলো ফুলে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হয় না। তবে, কখনো কখনো সামান্য ব্যথা আর চুলকানি হতে পারে, পা ভারী লাগতে পারে, এমনকি মনে হতে পারে যে শিরাগুলো ভেতরে কাঁপছে। যদি কেউ এ অবস্থায় সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে সন্ধ্যা নাগাদ শিরাগুলোর ফোলাভাব প্রকট চেহারা ধারণ করতে পারে। এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাবার জন্য যতটুকু সম্ভব পা উঁচিয়ে বসুন বা পা- কে বিশ্রাম দিন, বাম কাতে শোন এবং টাইট স্টকিং পরুন।

গর্ভধারণের এ সময়ে করনীয়

ভালো সাবান বা ফেস ওয়াশ দিয়ে অবশ্যই প্রতিদিন অন্তত দুইবার মুখ ধুতে হবে। তাছাড়াও, এমন মেক-আপ বা ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করা ঠিক হবে না যার কারণে আপনার মুখে ব্রণ উঠতে পারে। অয়েল ফ্রি পণ্য ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। ত্বক বিশেষজ্ঞের ( Dermatologist) পরামর্শ ছাড়া ব্রণের জন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ( সেটা মুখে গিলে খাবারই হোক (Oral antibiotic) , আর সরাসরি মুখে লাগানোর ক্রিমই হোক(topical antibiotic)) ব্যবহার এর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ কোনো কোনো অ্যান্টিবায়োটিক গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ব্রণের জন্য যদি কোনো পেসক্রিপশন নিতেই হয়, তাহলে ত্বক বিশেষজ্ঞকে আগেই জানিয়ে রাখুন যে আপনি গর্ভবতী।

গর্ভাবস্থায় উঁচু হিলের জুতা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা ভালো ।কারণ এসময়ে শরীরের ওজন প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে তাই ভারসাম্য রক্ষার জন্য হিল জুতার পরিবর্তে আরামদায়ক ফ্ল্যাট জুতা ব্যবহার করা ভালো।

বর্তমানে অনেক মহিলাই কর্মজীবী৷ কর্মজীবী মহিলাদের একেবারে ঘরে বসে থাকা চলে না৷ কাজের জন্য বাইরে যেতেই হয়৷ তবে ভ্রমণ বলতে আমরা বুঝি দূরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া৷ দূরে কোথাও বেড়াতে হলে সাবধানে যাতায়াত করতে হবে৷ যে ভ্রমণে বেশি ঝাঁকুনি লাগে (যেমন খারাপ রাস্তায় রিকশা, স্কুটার বা বাসে চলা) ও বেশি পরিশ্রম বোধ হয়, তা না করাই ভালো৷ লম্বা, ক্লান্তিকর ভ্রমণ (প্রথম ৩ মাস এবং শেষ দেড় মাস) এড়িয়ে চলুন৷ একান্ত যদি ভ্রমণ করতে হয় তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত৷

গর্ভাবস্থায় ভ্রমণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। 

গর্ভাবস্থায় যোনির নিঃসরণ বেড়ে যায়৷ কিন্তু অতিরিক্ত যোনি নিঃসরণ, দুর্গন্ধযুক্ত বা সঙ্গে চুলকানি থাকলে অথবা অন্য কোনও রোগ থাকলে তা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রসবের আগেই সম্পূর্ণ সারিয়ে ফেলতে হবে৷ তা না হলে প্রসবের সময় যোনিপথের রোগ শিশুর চোখে, নাভিতে বা শরীরের অন্য কোনও জায়গায় আক্রমণ করতে পারে৷ যেমন – গনোরিয়া রোগ যোনিপথ থেকে শিশুর চোখে সহজেই সংক্রমিত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে শিশুর চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দাঁত পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দাঁত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন৷ দাঁত খারাপ থাকলে ক্যালশিয়ামযুক্ত খাবার যেমন – দুধ, ঘি, মাখন, ছোট মাছ (কাটামাছ) ইত্যাদি খেলে ক্যালশিয়ামের অভাব পূরণ হয়৷ প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালশিয়াম ট্যাবলেট ব্যবহার করা যায়৷ মাড়ি থেকে রক্তপাত হলে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়৷

হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়ামের অভ্যাস গর্ভকালীন সময় আপনার শরীরকে সুস্থ রাখবে। যেমন- হাঁটা। প্রতিদিন একটু হাঁটাহাঁটি আপনার শরীরের জয়েন্ট, পেশী, হার্ট, রক্ত সঞ্চালন এবং ফুসফুসের উপর বাড়তি চাহিদার সাথে মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

গর্ভাবস্থায় নিজের ওজন সঠিকভাবে বাড়ছে কিনা সে বিষয়ে নিয়মিত ডাক্তারের সাথে আলোচনা করুন ও পরামর্শ মেনে চলুন। এ ব্যাপারে আমাদের Pregnancy Weight Gain Calculator এর সাহায্য নিতে পারেন।

শিশু তার যাবতীয় পুষ্টি গ্রহণ করে মায়ের কাছ থেকে। তাই সন্তানের সাথে সাথে নিজের যত্নও নিতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, শারীরিক কাজ, সঠিক সময়ে খাবার খাওয়া এগুলোর দিকে খেয়াল রাখুন।

 

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২০   

গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২২>>

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/language/bn/1849/
babycenter.com

 

Related posts

Leave a Comment