সপ্তাহ ২২ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

আপনার গর্ভাবস্থা এর  ২য় তিন মাস প্রায় শেষ হওয়ার পথে। গর্ভধারণ এর এই সময় আপনি নতুন বাচ্চার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরূ করতে পারেন। এই সপ্তাহে বাচ্চা ২০ সে. মি. লম্বা হয় ও ওজন ৪২৫-৫০০ গ্রামের মত হয়।আপনার ওজন এখন থেকে দ্রুত বাড়তে থাকবে। এই সময় বাচ্চার ঠোঁটের গঠন সর্ম্পূণ হয়।

জন্মের সময় শিশুটি দেখতে কেমন হবে তা এ সপ্তাহ নাগাদই স্পষ্ট হয়ে যাবে, যদিও এখনো তার আকার যথেষ্ট ছোটো। অনেকটা মাঝারি আকারের পেঁপের সমান। তার ঠোঁট, ভ্রু আর চোখের পাতার লোম বিকশিত হতে থাকবে। ইতিমধ্যে তার চোখের বিকাশ হয়ে গেলেও তাতে এখনো এখনো তার চোখের বর্ণ বোঝা যাবে না। আর কয়েকদিন পর তার আইরিস ( Iris, চোখের মণি) বর্ণ ধারণ করতে শুরু করবে। মাড়ির ভেতর শিশুটির দাঁতের বিকাশ এখন থেকে শুরু হবে।

তার হাত ও পায়ের নখ এখন প্রায় সম্পূর্ণ আকার ধারণ করেছে এবং তার দৈহিক গঠনতন্ত্র অনেক বেশি কার্যকরী এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ সপ্তাহ শেষ হতে হতেই শিশুটির পুরো দেহ লানুগো (Lanugo) নামক নরম লোমের স্তরে আচ্ছাদিত হয়ে যাবে। জন্মের আগে আগেই এই লোমশ আবরণ মিলিয়ে যাবে। জন্মের পরও সামান্য কিছু অংশে এই আবরণ থাকবে, আবার ক’দিনের মধ্যে সেটাও মিলিয়ে যাবে। লানুগো নামক এই লোমশ আবরণ শিশুর দেহের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে। শিশুটির চামড়ায় এখন অনেক ভাঁজ থাকবে। তবে, আস্তে আস্তে চর্বি জমে এই ভাঁজগুলো শিথিল হয়ে যাবে। শিশুটি এসময় অনেক বেশী নড়াচড়া করবে এবং শব্দ শুনলে প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করতে পারে।

 গর্ভধারণের এ সময়ে আপনি

এখন আপনার ‘গর্ভবতী পেট’ বেশ ভালোভাবেই দৃশ্যমান হবে। তবে, এটাও মনে রাখতে হবে কারো কারো পেট যেমন অনেক বড় হয়, তেমনি কারো কারো পেট আবার খুব বড় হয় না। সুতরাং, পরিচিত অন্য গর্ভবতী মায়েদের চাইতে আপনার পেট বড় বা ছোট হলো কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এখন থেকে প্রতি সপ্তাহেই আপনার ওজন আধা পাউন্ড করে বাড়তে থাকবে। ভালো খাবার অবশ্যই খাবেন, কিন্তু এটাও সতর্ক থাকতে হবে যে খুব বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার যাতে খাওয়া না হয়। আপনার ক্যালরি মাপুন এবং এ সময় মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি তীব্র ক্ষুধাকে কীভাবে দমন করবেন সে সম্পর্কে জানুন।

বর্ধিষ্ণু শিশুটিকে জায়গা করে দিতে পেট বাড়ছে, চামড়াতেও টান পড়ছে। ফলে এখন থেকে চামড়ায় স্ট্রেচ মার্কও (Stretch mark) পড়তে শুরু করবে। আপনার পেট, স্তন এবং উরুতে এই দাগ বেশি দেখা যাবে। প্রথম প্রথম এই দাগগুলো লাল রেখার মতো থাকবে, তারপর আস্তে আস্তে রূপালী ছাই বর্ণ ধারণ করবে। অবশ্য এটা আপনার ত্বকের রঙের ওপরও নির্ভর করবে। যদিও অ্যান্টি-স্ট্রেচ মার্ক লোশন বা তেল পুরোপুরিভাবে কাজ করে এমন প্রমাণ নেই, তারপরও অনেকটা হলেও দাগ দূর হয় এবং চুলকানি থেকে আরাম পাওয়া যায়।

Nipple এর আকৃতি বাড়তে পারে এবং গাঁড় বর্ণ ধারন করতে পারে। nipple এর আশেপাশে (areola) ছোট ছোট ব্রন হতে পারে। এগুলো Montgomery’s Tubercles নামে পরিচিত এবং স্তনকে breast feeding এর জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। এগুলোকে চাপবেন না বা দূর করার চেষ্টা করবেন না। মুখের ব্রন এর মত এগুলো অপ্রয়োজনীয় নয়।

তাছাড়াও গর্ভাবস্থায় দেহের যেসব পরিবর্তন আপনাকে চমকে দিতে পারে –

  • চুলের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া
  • শরীরের বিভিন্ন অংশে লোমের প্রাচুর্য
  • ত্বকের বর্ণ পরিবর্তন হওয়া এবং ব্রণ
  • স্তনের ফোলা ভাব বা স্তন বড় হয়ে যাওয়া
  • পা বড় হয়ে যাওয়া

গর্ভকালীন হরমোন আরো অনেক ভাবেই আপনাকে সমস্যায় ফেলতে পারে। অনেক মহিলাই কষ্টকর মাথাব্যথা এবং পিঠের সমস্যায় ভোগেন ।

এ সপ্তাহ থেকে আপনার সঙ্গীর প্রতি আপনার আকর্ষণ আরও তীব্র হবে। এখন আপনি আরও সতেজ বোধ করবেন । অনেক নারীর কাছেই শোনা গেছে যে এ সময় যৌন আকাঙ্ক্ষা (Libido) বেড়ে যায় এবং গর্ভাবস্থার এই পর্যায়েই তারা যৌন মিলন সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছেন। ইস্ট্রোজেন (Estrogen) হরমোনের নিঃসরণ এবং আপনার প্রজননতন্ত্রে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালনের কারণে এমনটা হয়। ডাক্তার যদি কোনো কারণে নিষেধ করে না থাকেন তাহলে এ সময় যৌন মিলন করতে কোনো সমস্যা নেই। গর্ভাবস্থায় যৌন মিলন শিশুর কোন ক্ষতি করে না। ভালবাসা পূর্ণ শারীরিক সম্পর্ক গর্ভাবস্থায় একজন নারীর সুস্থতার জন্যও প্রয়োজন। যৌন মিলন গর্ভবতি মায়ের স্বাস্থ্যকে প্রসবের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অনুভূতি হচ্ছে? গর্ভাবস্থায় দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অনুভূতি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আপনার ক্রমশ স্ফীত হতে থাকা পেট ডায়াফ্রামকে ( পেট ও বুকের মাঝখানের পর্দা) চাপ দেয় বলেই এমন হয়।

গর্ভধারণ এর এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থায় দাঁতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দঁাত পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দঁাত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দঁাত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিন৷

হালকা ব্যায়াম করতে হবে কিন্তু ভারি কাজ করা যাবে না । ঝুকে বা নুয়ে কাজ না করাই উচিত । হাঁটা চলায় সাবধান হতে হবে । এগুলো আমরা সবাই জানি কিন্তু ঠিক মত পালন করিনা। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সচেতন থাকতে হবে ।

অন্যদিকে পায়ে ব্যথা থাকলে এসময় একটি বিশেষ ধরনের জুতা আছে, যা ব্যাথা কমাতে কার্যকর। দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজের ফাঁকে পায়ের বিশ্রাম দিন। কিছুক্ষন পর পর পায়ের উপর চাপ কমাতে, পা ঝুলিয়ে বসুন। তবে কখনোই খুব বেশী শুয়ে বা বসে থাকা যাবে না, এতে করে পায়ে পানি চলে আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী কার্যকর সুখাসনে বসা। সন্তান ধারনের আগে থেকেই যদি এই যোগাসন নিয়মিত অনুশীলন করা হয় তবে উল্লেখিত কোনও ব্যাথাই আপনার শরীরে বাসা বাঁধতে পারবে না।

শিশুটির আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে আপনার শরীরের ভর কেন্দ্রেও পরিবর্তন আসবে এবং আপনার বর্ধিত ওজনের ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হবে। সমান তলা বিশিষ্ট জুতা পরার চেষ্টা করুন এবং যখনই মনে হবে কোনোভাবে দাঁড়ালে বা বসলে আপনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে পারেন, তাহলে সেটা না করুন।চেয়ারে বসা অবস্থা থেকে আপনি যদি খুব দ্রুত উঠে দাঁড়াতে যান, কিংবা যখন আপনি গোসল করে বের হন তার পর পর আপনার জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হতে পারে। চেয়ার থেকে আস্তে ধীরে উঠুন। আর যদি কখনো জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হয় তাহলে হাতের কাছে যা আছে তা শক্ত করে ধরুন এবং আস্তে আস্তে হাঁটুন। জেনে নিন কি কি কারণে এসময় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হতে পারে।

আপনার যদি আরেকটি সন্তান থাকে, তাহলে নতুন অতিথির জন্য তাকে এখন থেকেই মানসিকভাবে তৈরি করতে শুরু করুন। অনেক বাচ্চাই সহজে তাদের নতুন ভাই/বোনের সাথে তাদের ঘর, খেলনা, কাপড়চোপড়, সর্বোপরি মা-বাবাকেও শেয়ার করতে চায় না। কীভাবে প্রথম সন্তানকে নতুন শিশুটির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করবেন সে ব্যাপারে আরো জানুন।

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফলিক এসিড ও অয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। আপনার উদরে বেড়ে উঠা শিশুর বৃদ্ধির জন্য এই উপাদানগুলো অনেক বেশি প্রয়োজন। প্রচুর পরিমানে ভিটামিন- সি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতে Fairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

ডাক্তারের কাছে যাবার সময় আপনার সঙ্গীকেও সম্ভব হলে সঙ্গে নিয়ে যান। তাহলে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয় সম্পর্কে দু’জনে একসাথেই জানতে পারবেন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২১  

 গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৩>>

তথ্যসূত্রঃ

maya.com.bd/content/web/language/bn/1841/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment