সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা । সপ্তাহ – ২

Updated on

গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় সপ্তাহের উল্লেখযোগ্য বিষয়:

  • এই সময়ে ডিম্বস্ফুটন (Ovulation) হতে পারে। তাই যৌনমিলনের উপযুক্ত সময়।
  • ওভুলেশন টেস্টের মাধ্যমে ফারটাইল উইন্ডো (Fertile Window) তথা যৌনমিলনের উপযুক্ত সময় বের করা সম্ভব।
  • গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে প্রচুর পরিমাণ ফলিক এসিড খাওয়া জরুরি।

এই সপ্তাহে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি

শরীরের প্রস্তুতি

বিগত কিছু দিনে, শরীরে এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরোনের বৃদ্ধির কারণে জরায়ুর আবরণী নিষিক্ত ডিম্বকগুলোকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট পুরু হয়ে ওঠেছে। একই সময়ে, আপনার ডিম্বাশয়ে তরলভর্তি থলিতে, যেগুলো ফলিকল (follicles) নামে পরিচিত, তাতে ডিম্বাণুগুলো পরিণত হয়ে উঠছিল।

ডিম্বস্ফুটন বা ওভুলেশন

যখন ডিম্বস্ফুটন (Ovulation) হয়, তখন ডিম্বাশয় থেকে একটি ডিম বেরিয়ে যায় এবং নিষিক্তের জন্যে ফেলোপিয়ান টিউবে চলে আসে। ডিম্বস্ফুটন যে মাসিক চক্রের একদম মাঝামাঝি সময়ে হবে তেমন কোন কথা নেই। যেমন ২৮ দিনে চক্র সম্পন্ন হয় এমন নারীদের ৯ থেকে ২১ দিনের মধ্যে যে কোন সময়েই ডিম্বস্ফুটন বা ওভুলেশন হতে পারে।

শুক্রাণুর প্রবেশ

ডিম্বস্ফুটনের পরবর্তী ২৪ ঘন্টায়, যোনির ভেতর প্রবেশ করা ২৫০ মিলিয়ন শুক্রাণুর মধ্যে কোন শুক্রাণু যদি ফেলোপিয়ান টিউবে থাকা ডিম্বাণুর বাহ্যিক মেমব্রেন ভেদ করে প্রবেশ করে, তবেই ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়। যোনি থেকে ফেলোপিয়ান টিউব পর্যন্ত যেতে শুক্রাণুগুলো সারভিক্স (Cervix) এবং জরায়ু অতিক্রম করে। ডিম্বাণু পর্যন্ত যেতে এই ১০ ঘন্টার যাত্রায় শেষ পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৪০০ টির মত শুক্রাণু বেঁচে থাকে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবলমাত্র একটি শুক্রাণুই ডিম্বানুর আবরণী ভেদ করতে পারে।

জিনের মিলিত হওয়া

পরবর্তী ১০ থেকে ৩০ ঘন্টায়, শুক্রাণুর নিউক্লিয়াস ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে মিলিত হয় এবং তারা একসাথে মিলে ভ্রূণের জেনেটিক উপাদান গঠন করে। শুক্রাণু যদি Y ক্রোমোজমধারী হয়, তাহলে শিশু ছেলে হয়। আবার ক্রোমোজম যদি X হয়, তাহলে মেয়ে শিশু হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণুকে যাইগোট (zygote) বলা হয়।

ইমপ্ল্যান্টেশন

পরবর্তী তিন থেকে চার দিন সময়ে, ডিম্বাণুটি ১০০ কিংবা তার অধিক অভিন্ন কোষে বিভক্ত হয়ে ফেলোপিয়ান টিউব থেকে জরায়ুতে চলে আসে। ডিম্বাণু জরায়ুতে প্রবেশ করার পর একে ব্লাস্টোসিস্ট (Blastocyst) বলা হয়। এর দু একদিন পর, ব্লাস্টোসিস্ট জরায়ুর গাত্রে বাস করা শুরু করে এবং ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে।

[youtube https://www.youtube.com/watch?v=hqp3B_bDIjQ&feature=youtu.be ]

দ্বিতীয় সপ্তাহে গর্ভাবস্থার লক্ষণসমূহ

ডিম্বস্ফুটনের লক্ষণ

আপনি এখনো গর্ভবতী হননি, কিন্তু আপনি ডিম্বস্ফুটনের কিছু কিছু লক্ষণ খেয়াল করে থাকবেন। ডিম্বস্ফুটনের লক্ষণগুলো ঠিকঠাক নিরূপণ করতে পারলে গর্ভবতী হওয়ার জন্যে কখন যৌনমিলন করবেন সেটা পরিকল্পনা করা আপনার জন্যে সহজ হয়ে যাবে৷ তাই আপনার মধ্যে ডিম্বস্ফুটনের লক্ষণগুলো কখন দেখা দিচ্ছে সেটা খেয়াল করুন।

পিচ্ছিল সার্ভিকাল শ্লেষ্মা (Slippery cervical mucus)

সার্ভিকাল শ্লেষ্মা এক ধরণের স্রাব যা মাঝে মাঝেই অন্তর্বাসে দেখা যায়। ডিম্বস্ফুটনের কাছাকাছি সময়ে এই স্রাব অনেকটা পরিষ্কার, পিচ্ছিল এবং আঠালো (অনেকটা ডিমের সাদা অংশের মত) হবে।

মৃদু ক্র‍্যাম্প বা ব্যাথা হতে পারে

ডিম্বস্ফুটনের সময় অনেক নারীরাই পেটে ক্র‍্যাম্প অথবা ক্ষণস্থায়ী তীব্র ব্যাথা অনুভব করেন। আবার কোমড়ের পেছনে কোন এক পাশেও ব্যাথা হতে পারে। এ জাতীয় ব্যাথা মিতেলশমার্জ (Mittelschmerz) নামে পরিচিত। এটি একটু জার্মান শব্দ, যার ইংরেজি অর্থ Middle Pain। পিরিয়ড চক্রের মাঝামাঝি সময়ে ডিম্বস্ফুটনের এই ব্যাথা হয় বলে এর এমন নামকরণ।

যৌন মিলনের তীব্র ইচ্ছা

এই সময়ে আপনার যৌন মিলনের ইচ্ছা প্রবল হয়ে যেতে পারে এবং আপনার শরীরের ঘ্রাণ বেশ তীব্র হতে পারে যা আপনাকে আপনার সঙ্গীর নিকট আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে সক্ষম।

কড়া ঘ্রাণ

আপনার যদি আপনার সঙ্গীর গায়ের ঘ্রাণ খুব তীব্র মনে হয়, তাহলে বুঝতে হবে আপনার শরীর বিপরীত লিঙ্গের সাথে মিলিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ করছে।

স্তনে ব্যাথা

ডিম্বস্ফুটনের সময় শরীরের হরমোনের পরিবর্তনের কারণে স্তনে ব্যাথা হতে পারে, ফুলে যেতে পারে কিংবা কালশিটে দাগ হতে পারে।

জরায়ুমুখে পরিবর্তন

ডিম্বস্ফুটনের সময় জরায়ুমুখ বেশ কোমল, ভেজা এবং অনেক বেশী খোলা থাকবে। যোনীর ভেতর আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে জরায়ুমুখের এই পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা যায়। যদিও পরিবর্তনটা খেয়াল করতে হলে প্রতিদিনই পরীক্ষা করতে হবে।

ব্যাসেল বডি টেম্পারেচার (BBT) বা শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি

বিশেষ থার্মোমিটারের মাধ্যমে প্রতিদিন সকালে ব্যাসেল বডি টেম্পারেচার (BBT) নির্ণয় করতে পারেন। ডিম্বস্ফুটন হলে, BBT কিছুটা বেড়ে যায় এবং পরবর্তী পিরিয়ড হওয়ার আগ পর্যন্ত সেটা বাড়তিই থাকে।

দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয়সমূহ

ভিটামিন খান

এখন থেকেই প্রিন্যাটাল ভিটামিন খাওয়া শুরু করে দিতে পারেন। ভিটামিন খাওয়ার আগে নিশ্চিত হোন সেখানে কমপক্ষে ৪০০ মিলিগ্রাম ফলিক এসিড আছে কিনা যা শিশুকে বিভিন্ন জন্মত্রুটি হওয়ার ঝুঁকি থেকে নিরাপদে রাখতে পারবে।

ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন

গর্ভবতী হওয়ার পূর্বেই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন এবং যদি সম্ভব হয় প্রিকনসেপশন চেকআপ করিয়ে ফেলুন যার মাধ্যমে আপনার শরীর এখনই হওয়ার জন্যে প্রস্তুত আছে কি না তা জেনে নিতে পারবেন।

এমন কিছু কিছু ঔষধ আছে যেগুলো গর্ভাবস্থা শুরু করলে আর খাওয়া যায় না- অথচ আপনি এটা নিয়মিতই খেয়ে এসেছেন। এখন গর্ভাকালীন সময় শুরু হওয়ার পূর্বেই ডাক্তারের পরামর্শে সেগুলো বন্ধ কিংবা বিকল্প ঔষধের ব্যাবস্থা করে ফেলতে হবে।

আপনার কি ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা বেশির মতো প্রকট কোনো শারীরিক সমস্যা আছে? যদি থাকে এবং সেটা নিয়ন্ত্রণে না রাখা হয় তাহলে আপনার অনাগত শিশুর জন্য সেটা ক্ষতিকর হতে পারে। সুতরাং একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন।

রক্তপরীক্ষা করাতে পারেন

আপনার এবং আপনার সঙ্গীর শরীরে জিনগত রোগ যেমন থ্যালাসেমিয়া, সিস্টিক ফিব্রোসিস প্রভৃতি রয়েছে কিনা তা জানতে গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে দুজনেরই রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিন। জিনগত রোগগুলো খুবই ভয়ানক হতে পারে তাই শিশুর যাতে এগুলো হওয়ার ঝুঁকি না থাকে সেজন্যে রক্ত পরীক্ষা করানো খুবই জরুরি।

একে অপরের জন্যে বেশী সময় রাখুন

ডিম্বস্ফুটনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডিম্বাণু যদি শুক্রাণুর সহচর্য পায়, তবেই গর্ভধারণ সম্ভব তাই গর্ভধারণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে একদিন পর পর যৌনমিলন করা জরুরি। তাই এই সময়ে আপনি এবং আপনার সঙ্গী একে অপরের জন্যে অনেক বেশি সময় বরাদ্দ রাখুন। ‘পরিবারে নতুন সদস্য আসছে’ এটা ঘোষণা করার পূর্বে বেশিরভাগ স্বামী-স্ত্রীরই বেশ কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়।

[ আরও পড়ুনঃ গর্ভবতী হওয়ার উপায় : শারীরিক মিলন ]

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন

আপনার এখন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম দরকার এবং মানসিক চাপ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা জরুরি। আপনার শিশুটি এখনো জরায়ুতে খুব শক্ত ভাবে আটকায়নি, সুতরাং খুব ভারী কাজ করা যাবে না। অল্প জগিং, সাঁতার কিংবা ইয়োগা’র মতো হাল্কা ব্যায়াম করা যেতে পারে, কিন্তু রিকশা’র ঝাঁকুনি থেকে সাবধান থাকতে হবে !

সবার জন্য শুভকামনা।

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ১
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৩ >>

তথ্যসূত্রঃ
babycenter.com

Related posts