সি-সেকশন বা সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তান প্রসব

Updated on

সি- সেকশন বা সিজারিয়ান সেকশন কি?

সি-সেকশন বা সিজারিয়ান  অপারেশন হল এমন এক ধরনের অপারেশন যার মাধ্যমে মায়ের তলপেট এবং জরায়ু কেটে সন্তান প্রসব করানো হয় । কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে সন্তান জন্ম নেয়ার সময় ঘনিয়ে আসার আগেই গর্ভের শিশুকে এভাবে প্রসব করানো হয়।

এছাড়া অন্যান্য সময় যখন গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্য জনিত জটিলতা খুঁজে বের করে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হয়ে উঠে না তখনও এভাবেই যথা সময়ের আগেই সিজার করা হয়। অর্থাৎ, যখন আপনার গর্ভের শিশুর অবস্থা জটিল থেকে জটিল আকার ধারণ করা শুরু করে তখন আপনাকে জরুরী অবস্থায় অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতি হলে এটাকে পূর্ব পরিকল্পিত বা প্ল্যানড সিজারিয়ান অপারেশনও বলা হয়ে থাকে।  

আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতে ২০১৫ সালে যে সংখ্যক নারী সন্তান জন্ম দিয়েছেন তাদের মধ্যে শতকরা ৩২ শতাংশ নারীরই সিজার অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম হয়েছে।

কি কারণে আপনার পূর্ব পরিকল্পিত সিজারিয়ান বা সি-সেকশনের প্রয়োজন হতে পারে?

কোন কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে ডাক্তার আপনাকে স্বাভাবিক ভাবে সন্তান প্রসব না করে বরং সিজারের মাধ্যমে অপারেশন করে সন্তান জন্ম দেয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। উদাহরণ স্বরূপ নিম্ন বর্ণীত কারণগুলোর কথা বলা যায় যেখানে আপনাকে সিজারের অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে হতে পারেঃ

ইতোপূর্বে যদি আপনার ক্লাসিক্যাল সিজার অপারেশন হয়ে থাকে অর্থাৎ লম্বালম্বি করে আপনার জরায়ু যদি কাটা হয়ে থাকে (যদিও এভাবে অপারেশন তেমন একটা দেখা যায় না) অথবা ইতোপূর্বে আপনার যদি একের অধিক সিজারে অপারেশন হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় আপনাকে সিজারে অপারেশন করার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে কেননা, এমন সময়ে স্বাভাবিক ভাবে সন্তান প্রসব করতে গেলে আপনার জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়ার তীব্র সম্ভাবনা থেকে যায়।

সি-সেকশন বা সিজারিয়ানের কাটার ধরণ
সি-সেকশন বা সিজারিয়ানের কাটার ধরণ

এক্ষেত্রে একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, ইতোপূর্বে যদি আপনার শুধুমাত্র একবার সিজার অপারেশন হয়ে থাকে এবং সেখানে আপনার জরায়ু সমান্তরাল ভাবে কাটা হয়ে থাকে তাহলে পরবর্তীতে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা যেতে পারে (খেয়াল রাখবেন যে আপনার পেটের উপরের কাঁটা চিহ্নের সাথে আপনার জরায়ুর কাটা চিহ্ন নাও মিলতে পারে, তাই অবশ্যই জেনে নিবেন যে আপনার জরায়ু কি লম্বালম্বি ভাবে কাটা হয়েছিল না কি সমান্তরাল ভাবে)। অথবা আপনি ইচ্ছে করলে আবারও সিজারের মাধ্যমে অপারেশন করাতে পারেন।

ইতোপূর্বে যদি আপনার কোন গুরুত্বপূর্ণ জরায়ুর অপারেশন হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে আপনার যদি আগে myomectomy ধরনের অপারেশন হয়ে থাকে (এই ধরনের অপারেশনে জরায়ুর মধ্যে বেড়ে যাওয়া ফিব্রয়েড কেটে সরানো হয়ে থাকে)। এই ধরনের অপারেশন আগে হয়ে থাকলে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের সময় আপনার জরায়ু ফেটে অথবা ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

আপনি যদি গর্ভে একের অধিক শিশু ধারণ করেন, তবে এমতাবস্থায় আপনি কি স্বাভাবিক ভাবে প্রসবের জন্য প্রস্তুত নাকি আপনাকে সিজার করতে হবে, সেটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রসবের সময় গর্ভের শিশুরা ঠিক কি অবস্থানে আছে তার উপর। আপনার গর্ভে যত বেশি সন্তান থাকবে আপনার সিজারের মাধ্যমে অপারেশনের সম্ভাবনা ততই বাড়বে।

আপনার গর্ভের শিশু যদি আকারে বেশ বড় হয়ে থাকে (এই ধরনের অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় macrosomia বলা হয়ে থাকে)। এমতাবস্থায় সাধারণত ডাক্তার আপনাকে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্য দেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। যদি আপনার ডায়াবেটিস থেকে থাকে অথবা ইতোপূর্বে স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশু কোন ধরনের আঘাত পেয়ে থাকে সেক্ষেত্রেও সিজারের পরামর্শই দেয়া হবে।

সন্তান প্রসবের সময় গর্ভের শিশু যদি ব্রীচ বা ট্রান্সভার্স লাই অবস্থানে থাকে তাহলে আপনাকে সিজার অপারেশনের জন্য পরামর্শ দেয়া হতে পারে ( তবে কখনো দেখা যায় যে গর্ভে দুই সন্তান থাকা অবস্থায় প্রথম সন্তান স্বাভাবিক অবস্থানে থাকে এবং দ্বিতীয় জন ব্রীচ পজিশনে থাকে, এমতাবস্থায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রসব করানো হতে পারে)।

যখন আপনার placenta previa সমস্যা হয়ে থাকে (এমতাবস্থায় প্লাসেন্টা অর্থাৎ গর্ভফুল এতই নিচে থাকে যে আপনার সার্ভিক্স ঢেকে দেয়)। এমন হয়ে থাকলে আপনাকে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে।

স্বাভাবিক প্রসবে যদি কোন ধরনের বাঁধা সৃষ্টি হয়, যেমন যদি জরায়ুতে কোন বড় ফিব্রয়েড থাকে যার কারণে স্বাভাবিক ভাবে প্রসবে বাঁধা সৃষ্টি হয় তাহলে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে।

গর্ভের শিশুর মধ্যে যদি এমন কোন অস্বাভাবিকতা থেকে থাকে যার কারণে স্বাভাবিক ভাবে সন্তান প্রসবে ঝুঁকি বৃদ্ধি হয়, যেমন বাচ্চার  open neural tube defects থাকলে সিজার অপারেশন করতে বলা হয়ে থাকে।

আপনার যদি HIV-positive হয়ে থাকে এবং গর্ভকালীন সময়ের শেষের দিকে রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায় যে আপনার রক্তে এই ধরনের প্রচুর ভাইরাস আছে তাহলে সিজারের মাধ্যমে অপারেশন করা হয়।

মনে রাখবেন গর্ভের শিশুর সুস্থ অবস্থায় জন্ম গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য আপনার ডাক্তার কখনই ৩৯ সপ্তাহ পার হওয়ার আগে সিজার অপারেশনে তারিখ নির্ধারণ করবেন না (তবে যদি কোন ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা থেকে থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে করা হতে পারে)। 

অপরিকল্পিত সি-সেকশন কেন করতে হতে পারে?

প্রসব করার জন্য যখন প্রস্তুত হবেন অথবা আপনার ওয়াটার ব্রেক হবে তখন আপনার হয়ত genital harpes (এক ধরনের ভাইরাস ইনফেকশন) হতে পারে। তখন সিজারের মাধ্যমে গর্ভের শিশুকে জন্ম দেয়া হয় যাতে করে শিশুও এই ইনফেকশনে আক্রান্ত না হয়ে পরে।

আপনার সার্ভিক্স বিস্তৃত নাও হতে পারে অথবা প্রসবের জন্য শিশুর নিচের দিকে অর্থাৎ জন্মনালির দিকে আসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমতাবস্থায় অন্যান্য পন্থা অবলম্বন করে সুফল না পাওয়া গেলে তাৎক্ষনিক অবস্থায় সিজার করা জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।

জরুরী অবস্থায় সিজার অপারেশন কেন করা হতে পারে?

যদি কোন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং গর্ভের শিশুর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে তাৎক্ষনিক মুহূর্তে জরুরী অবস্থায় সিজার অপারেশন করতে হবে। যে ধরনের জটিলতার কারণে সিজার অপারেশন করার মত জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হয় তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য কিছু নিম্নে বর্ণীত হলঃ

যদি আপনার গর্ভের শিশুর হৃদ স্পন্দনের অবস্থা ডাক্তারের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি মনে করেন এই অবস্থায় গর্ভের শিশু স্বাভাবিক প্রসব এবং ইনডিউসিং লেবর পদ্ধতির ধকল সহ্য করতে পারবে না তাহলে তিনি জরুরী ভাবে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে শিশু প্রসব করতে পরামর্শ দিবেন।

যদি আম্বিলিকার কর্ড আপনার সার্ভিক্স দিয়ে কিছুটা বের হয়ে যায় তাহলে তাৎক্ষনিক অবস্থায় সিজারের মাধ্যমে অপারেশন করতে হবে। কেননা এতে করে শিশুর শরীরে অক্সিজেন যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় prolapsed cord বলা হয়ে থাকে।

আপনার প্লাসেন্টা অর্থাৎ গর্ভ-ফুল যদি জরায়ু থেকে আলাদা হয়ে যেতে থাকে (প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন), কেননা এর ফলেও আপনার শিশুর শরীরে অক্সিজেন যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তাৎক্ষনিক ভাবে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে শিশুকে পৃথিবীর আলোতে নিয়ে আসা জরুরী।

আগে যদি আপনার সিজার অপারেশন হয়ে থাকে এবং এবার স্বাভাবিক ভাবে সন্তান প্রসব করতে গেলে জরায়ু ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয় তাহলে তাৎক্ষনিক ভাবে সিজার অপারেশনের মাধ্যমে শিশু জন্ম দেয়া জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।

সিজার অপারেশনের পূর্বে আদতে কি হয়ে থাকে?

প্রথমত ডাক্তার আপনাকে বুঝিয়ে বলবেন যে ঠিক কি কারণে এখন আপনাকে সিজার অপারেশন করাতে হবে এবং তারপর তিনি আপনাকে একটি চুক্তিনামা সই করতে বলবেন। সাধারণত প্রায় সকল ধরনের অপারেশনের পূর্বেই এই ধরনের চুক্তিনামা সই করানো হয়ে থাকে। আর আপনার ডাক্তার যদি অপারেশন করতে না পারেন অর্থাৎ সাধারণ ধাত্রী হয়ে থাকেন তাহলে একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হবে এবং সেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারই আপনার অনুমতিক্রমে অপারেশন করবেন।

সাধারণত আপনার সঙ্গী অথবা স্বামী সকল ধরনের প্রস্তুতির সময় আপনার সাথে থাকতে পারবেন। তবে পুরোপুরি অজ্ঞান করে অপারেশন করা হলে আপনার সঙ্গীকে সেই মুহূর্তে অপারেশনের সময় আপনার সাথে থাকার অনুমতি দেয়া হবে না। আমাদের দেশে অবশ্য কখনোই এমন অনুমতি দেয়া হয়না।

এরপর একজন এন্সথেসিয়া বিশেষজ্ঞ আপনার ব্যথা কমানর বিভিন্ন পন্থাগুলো সম্পর্কে পুনরালোচনা করবেন। বর্তমান সময়ে একদম অজ্ঞান করে সিজার অপারেশন সাধারণত করা হয় না তবে স্বাস্থ্যগত কোন জটিলতা যদি থেকে থাকে যার কারণে অজ্ঞান করেই করতে হবে অথবা আপনাকে যদি কোন কারণে অন্য উপায়ে (এপিডিউরাল অথবা স্পাইনাল ব্লক পদ্ধতিতে) অবশ করা সম্ভব না হয় তাহলেই পুরোপুরি অজ্ঞান করে সিজার অপারেশন করা হয়ে থাকে।  

সাধারণ ক্ষেত্রে এপিডিউরাল অথবা অথবা স্পাইনাল ব্লক ব্যবহার করা হবে, যার মাধ্যমে আপনার নিম্নাঙ্গ অবশ করা হবে। তবে সন্তান প্রসবের জন্য আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে সজাগ রাখা হবে।

যদি ব্যথা কমানোর জন্য ইতোমধ্যেই আপনি এপিডিউরাল পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকেন তাহলে সেই একই পদ্ধতিই আপনার সিজার অপারেশনের জন্য ব্যবহার করা হবে। অপারেশনের আগে আপনাকে আরো কিছু ওষুধ দেয়া হবে যাতে করে আপনার নিম্নাঙ্গ পুরোপুরি অবশ থাকে। (এমতাবস্থায় অপারেশনের সময় আপনি হয়ত হালকা ধাক্কা অথবা প্রেশার অনুভব করতে পারেন)।

অপারেশনের সময় আপনার মুত্রথলিতে একটা ক্যাথেটার দেয়া হবে এবং যদি ইতোমধ্যে শুরু করা না হয় তাহলে তরল এবং ওষুধ দেয়ার জন্য IV প্রবেশ করানো হবে। আপনার নিম্নাঙ্গের উপরের দিকের লোম শেভ করা হবে এবং আপনাকে অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশ করানো হবে।

সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য অপারেশনের পূর্বে আপনাকে এন্টাসিড তরল পান করানো হবে। অপারেশনের সময় যদি কোন জরুরী অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহলে তাহলে জেনারেল অ্যান্যাসথেশিয়া দেয়া হতে পারে। এর ফলে অচেতন অবস্থাতেই বমি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং পেটে থাকা পদার্থগুলো নিশ্বাসের সাথে ফুসফুসে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আর এজন্যই এন্টাসিড দেয়া হয়ে থাকে যাতে করে আপনার খাদ্য-থলির এসিডগুলো প্রশমিত হয় এবং দুর্ঘটনা বশত বমি করলে সেগুলো যদি ফুসফুসে চলেও যায় তাহলেও সেটা আপনার ফুসফুসের কোন ক্ষতি সাধন করতে পারে না।

অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশন প্রতিরোধে IV এর মাধ্যমে আপনাকে হয়ত এন্টিবায়োটিক প্রদান করা হবে। (কোন ডাক্তার আবার অপারেশনের পরে এন্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন, তবে বর্তমানে পরামর্শ হল এই ধরনের এন্টি বায়োটিক অপারেশন শুরু হওয়ার আগেই দিয়ে দেয়া ভালো)।

এরপর এনেস্থেশিয়া অর্থাৎ অবশ করার জন্য ওষুধ প্রদান করা হবে এবং আপনার কোমরের উপরে একটা বড় পর্দা দিয়ে দেয়া হবে যাতে করে এই কাটাছেঁড়া আপনাকে দেখতে না হয়। (যদি শিশুর জন্ম নেয়ার সময়টা আপনি দেখতে চান তাহলে নার্সকে বলে রাখুন, তিনি শিশু জন্ম নেয়ার সময় পর্দাটা সামান্য একটু উঁচু করে দিবেন যাতে করে আপনি শুধুমাত্র শিশুর বের হয়ে আসাটা নিজ চোখে দেখতে পারেন)। আপনার সঙ্গী চাইলে এই সময়ে অপারেশন রুমে ব্যবহার করা হয় এমন পরিষ্কার কাপড় পরে আপনার মাথার কাছে বসতে পারেন। 

কীভাবে সিজার অপারেশন করা হয়ে থাকে?

এন্সথেসিয়া অর্থাৎ অবশ করার ওষুধ কাজ করা শুরু করলে ডাক্তার এন্টিস্পেটিক দিয়ে আপনার তলপেট পরিষ্কার করে নিবেন। এরপর তিনি আপনার পিউবিক বোনের ঠিক উপরের দিকে সমান্তরাল ভাবে কাটবেন। (এই ধরনের কাটাকে অনেক সময় বিকিনি কাটও বলা হয়ে থাকে)।

ডাক্তার ধীরে ধীরে কাটতে কাটতে জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছে যাবেন। তিনি যখন আপনার তলপেটের পেশী পর্যন্ত পৌঁছবেন তিনি সেগুলোকে আলাদা করে নিবেন (সাধারণত না কেটে এমনিতেই সরিয়ে দেয়া হয়ে থাকে) এবং পেশী এমনভাবে সরিয়ে দেয়া হবে যাতে করে এর নিচে অবস্থিত জরায়ু দেখা যায়।

ডাক্তার যখন আপনার জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছবেন তখন তিনি জরায়ুর নিচের দিকে সমান্তরাল ভাবে কাটবেন। এই ধরনের কাটাকে ডাক্তারি ভাষায় low-transverse uterine incision বলা হয়ে থাকে।

যদিও এমনটা খুব কম হয়ে থাকে তবু মাঝেমধ্যে ডাক্তার সমান্তরাল ভাবে না কেটে বরং লম্বালম্বি ভাবে কাটেন। এমনটা করা হয় যদি আপনার গর্ভের শিশু খুবই প্রিম্যাচিউর অবস্থায় থাকে এবং আপনার জরায়ুর নীচের অংশ যদি কাটার জন্য অতটা পাতলা না থাকে। (যদি আপনার একবার লম্বালম্বি ভাবে কাটা হয়ে থাকে, তবে পরবর্তীতে সাধারণত স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা না করে সরাসরি সিজার অপারেশন করা হয়ে থাকে)।

এরপর ডাক্তার আপনার শিশুকে বের করে নিয়ে আসবেন। এরপর যখন আম্বিলিকাল কর্ড কাটা হয়ে যাবে তখন শিশুকে অন্য শিশু বিশেষজ্ঞ অথবা নার্সের কাছে হস্তান্তর করার আগে অল্প সময়ের জন্য আপনি শিশুকে দেখতে পাবেন। যখন আপনার শিশুকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতে থাকবে তখন ডাক্তার আপনার প্লাসেন্টা অর্থাৎ গর্ভ-ফুল প্রসব করিয়ে নিবেন এবং সবকিছু আবার পুনরায় সেলাই করে দেয়ার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করবেন।

পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর শিশুকে হয়ত আপনার সঙ্গীর কাছে দেয়া হবে, যাতে করে তিনি আপনার পাশে বসে শিশুকে কোলে নিতে পারেন। সেই সময়ে যখন আপনার জরায়ু এবং তলপেট সেলাই করা হতে থাকবে তখন আপনি শিশুকে একটা চুমু দিতে পারেন অথবা তার হাত ধরে রাখতে পারেন।

সিজার অপারেশনের পর তাৎক্ষনিক অবস্থায় যা হয়ে থাকে

আপনার জরায়ুর কাটা বন্ধ করার জন্য যে সেলাইগুলো দেয়া হয় সেগুলো এমনিতেই মিলিয়ে যাবে। তবে একদম উপরের অংশ অর্থাৎ চামড়ার উপরে কাটা বন্ধ করার জন্য সেলাই এবং স্টেপল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এগুলো সাধারণত তিনদিন থেকে এক সপ্তাহ পর খুলে ফেলা হয় (অথবা আপনার ডাক্তার চাইলে এমন সেলাই ব্যবহার করতে পারেন যেগুলো খুলে নেয়ার প্রয়োজন পরে না বরং এমনিতেই মিলিয়ে যায়)।

অপারেশনের দ্বিতীয় অংশে অর্থাৎ সেলাই করতে তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি সময়ই লেগে যায়। সবকিছু সেলাই করতে করতে প্রায় ৩০ মিনিটের মত সময় প্রয়োজন পড়তে পারে।

আপনার অপারেশন পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পর আপনাকে অন্য রুমে নিয়ে যাওয়া হবে যেখানে বেশ কয়েক ঘণ্টা যাবত আপনাকে পূর্ণ মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

আপনার শিশুর শারীরিক অবস্থা যদি একদম ভালো থাকে তাহলে তাকে আপনার সাথে সেই রুমে থাকতে দেয়া হবে এবং অবশেষে বহুল প্রতীক্ষার পর আপনি তাকে কোলে নিতে পারবেন। আপনাকে IV এর মাধ্যমে তরল দেয়া হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি খাবার খাওয়ার উপযুক্ত হবেন।

আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে চান তাহলে এখনই একটু চেষ্টা করে নিন। এমন চেষ্টা বেশ খানিকটা সহজ হয়ে যাবে যদি আপনি এবং আপনার নবজাতক পাশাপাশি একে অপরের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকেন।

আপনাকে অন্তত তিনদিন হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। এই সময়ে আপনার ডাক্তার ব্যথানাশক ওষুধ নিয়ে আপনার সাথে আলোচনা করবেন। বেশীরভাগ ডাক্তারই রোগীর নিয়ন্ত্রণে থাকে এমন ব্যথানাশক ওষুধ IV এর মাধ্যমে দিয়ে থাকেন, পরবর্তীতে আপনি যখন খাওয়া দাওয়া করতে সক্ষম হবেন তখন আপনাকে ব্যথানাশক ট্যাবলেট দেয়া হবে।

সিজার অপারেশনের সময় আপনি চাইলে যে সুযোগ সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে পারেন

কিছু কিছু হাসপাতালে বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা আপনাকে দেয়া হতে পারে, এই ধরনের সুবিধা দিয়ে অপারেশন করাকে তারা gentle c-section অথবা family-centered সিজার অপারেশন বলে থাকে।

তারা আপনার অপারেশনের প্রক্রিয়ার মধ্যে আপনি চাইলে সামান্য কিছু পরিবর্তন করে থাকেন। যেমন নবজাতক শিশুকে প্রসবের পর আপনার বুকের উপর রেখে দেয়া হবে কিছুক্ষণের জন্য, যাতে করে জন্মের পরপরই শিশুর সাথে আপনার ও সঙ্গীর সম্পৃক্ততা একটু বাড়ে। আপনি যদি এই ধরনের কিছু সুবিধা নিতে ইচ্ছুক হন তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন।

একই সাথে আপনি চাইলে শিশুকে যখন আপনার জরায়ু থেকে বের করে আনা হয় সেই দৃশ্যও দেখতে পারেন। আমাদের দেশে যদিও এই ধরণের সুযোগ দেয়ার প্রচলন নেই।

সি-সেকশন বা সিজার অপারেশনে কি ধরনের ঝুঁকি কাজ করে?

সিজার অপারেশনের সময় তলপেটে একটা বড় ধরনের অপারেশন করা হয়ে থাকে, তাই এটা স্বাভাবিক ভাবে প্রসবের থেকে একটু বেশিই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিসিয়ান্স এন্ড গাইনোকোলোজিস্ট নারীদের এটাই পরামর্শ দিয়ে থাকে যে যখনই সুযোগ হবে তারা যেন স্বাভাবিক প্রসবের জন্যই প্রস্তুতি নেয়।

যে সকল মায়েদের সিজার অপারেশন হয়ে থাকে তারা বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় ভুগতে পারেন তারমধ্যে অন্যতম হল ইনফেকশন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্ত জমাট বাঁধা নিয়ে জটিলতা, প্রসব পরবর্তী ব্যথা, বেশীদিন হাসপাতালে অবস্থান করা এবং শরীর ঠিক হতে অনেক বেশি সময় নেয়া।

এছাড়া মূত্র থলীতে অথবা অন্ত্রে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়, যদিও এমনটা খুবই কম সময়েই হয়ে থাকে। এছাড়া আপনাকে অবশ করার জন্য যেসব চেতনা নাশক ওষুধ দেয়া হবে সেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও আপনি ভুগতে পারেন।  

একটা গবেষণায় দেখা যায় যে সকল শিশুর গর্ভে ৩৯ সপ্তাহ পূরণ হওয়ার আগেই সিজারের মাধ্যমে জন্ম দেয়া হয়ে থাকে তাদের মধ্যে শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা দেখা যায়। যেটা স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নেয়া শিশুর মধ্যে তুলনামূলক ভাবে একটু কমই দেখা যায়।

এছাড়া আপনি যদি ভবিষ্যতে আরো সন্তান গ্রহণ করতে চান তাহলে প্রত্যেকটা সিজার অপারেশন পরবর্তী গর্ভধারণ এবং সন্তান প্রসবে জটিলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

সিজার অপারেশন কখনই একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নয় তবে এটা বলা হয়ে থাকে যে, সকল সিজার অপারেশনই বন্ধ করে দেয়া উচিৎ না। কেননা কখনো এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যেখানে মা এবং শিশুর স্বাস্থ্যগত অবস্থা ঠিক রাখার জন্য অবশ্যই সিজার অপারেশন করতে হতে পারে। তাই আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নিন যে তিনি কেন সিজার অপারেশনের জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন। এরসাথে সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সুযোগ সুবিধাগুলো সম্পর্কেও জেনে নিন।

[ আরও পড়ুনঃ কতবার সিজার করা নিরাপদ? একের অধিক সিজারিয়ান ডেলিভারির ঝুঁকি ]

 সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts