সপ্তাহ ৩৬ । গর্ভধারনের প্রত্যেকটি সপ্তাহ

আপনার গর্ভাবস্থায় আরও এক মাস বাকি থাকতেই শিশুটির ওজন হবে প্রায় ৬ পাউন্ডের মতো (একটা বড়সড় হানিডিউ ফলের কথা ভাবুন!) এবং এখন থেকে প্রতিদিনই সে এক আউন্স করে বাড়বে ।

ভারনিক্স (Vernix, শিশুটির ত্বককে আবৃত করে রাখা সাদা , তৈলাক্ত পদার্থ ) এবং লানুগো (lanugo, শিশুটির ত্বকের উপর নরম লোমের স্তর) ইতিমধ্যে মিলিয়ে যেতে শুরু করবে। তার রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ( circulatory system) এবং রোগ প্রতিরোধ প্রক্রিয়া (immune system) ইতিমধ্যে কাজ শুরু করবে। তবে তার বৃক্ক (kidney) এবং যকৃত (liver) এখনো বহিঃ জগতে কাজ করার উপযোগী হয়ে উঠবে না ।

তার অন্ত্র (intestine) এখন মেকোনিয়াম (meconium) নামে কালচে সবুজ আঠালো পদার্থ তৈরি করবে। জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন সে মল হিসেবে এই পদার্থ ত্যাগ করবে । যখন শিশুটি পেটে থাকা অবস্থায় অ্যামনিওটিক তরল গিলে তখনই এই পদার্থ আস্তে আস্তে তৈরি হতে থাকে । প্রসব বেদনার সময় মায়ের যদি সমস্যা হয় তাহলে শিশুটি এই মেকোনিয়াম জরায়ুর ভেতরেই বের করা শুরু করে দিতে পারে। যা অবশ্যই খারাপ লক্ষন। যদি আপনার পানি ভেঙে যায় এবং আপনি দেখেন যে পানির মধ্যে সবজেটে ভাব রয়েছে , তাহলে সাথে সাথে ডাক্তারকে জানাতে হবে।

এই সপ্তাহে শিশুটির জন্ম হয়ে গেলে আপনি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই পারেন। কারন এখন শিশুটি ভূমিষ্ঠ হলে তার আলাদা কোনো মেডিকেল সাপোর্ট লাগবেনা বললেই চলে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

গর্ভাবস্থায় শরীরের স্বাভাবিক সব প্রক্রিয়ার একটি বিরাট পরিবর্তন ঘটে। যার প্রভাবে স্তনবৃন্ত বা নিপল আকারে বড়, সংবেদনশীল এবং গাঢ় রং ধারণ করে। নিপলের চারদিকের কালো অংশ অর্থাৎ এরিওলাও এ সময় তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে যায়। গর্ভাবস্থায় এরিওলার সেবাসিয়াস গ্রন্থিগুলো বেশি সক্রিয় হবার ফলে সেখানে ১৫/২০টি বড় বড় দানা দেখা যায়, যাকে ডাক্তারি ভাষায় মন্টগোমেরী’স টিউবারকল বলে। পেটের ঠিক মাঝখানে একটি লম্বা বাদামী রংয়ের দাগও অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘লিনিয়া নাইগ্রা’। গর্ভাবস্থায় সন্তান প্রসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসে মায়ের শরীরের ওজন ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময় শরীরের বিশেষ বিশেষ কিছু অংশ (যেমনঃ স্তন, পেট ইত্যাদি) আকার আয়তনে তুলনামূলকভাবে অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে এ সমস্ত স্থানের ত্বকের নিচের টিসুগুলোর পরিবর্তন হয়ে দ্রুত এবং বেশি সম্প্রসারণের কারণ ত্বকের দ্বিতীয় স্তর ডার্মিসে থাকা ইলাস্টিক ফাইবার ছিড়ে গিয়ে আড়াআড়ি ফাটা ফাঁকা চিকন সাদাটে বা গোলাপী রংয়ের দাগের সৃষ্টি করে। এ স্থানের ত্বক কিছুটা কুচকানো থাকে। ডাক্তারি ভাষায় ত্বকের এ পরিবর্তনকে ‘স্টায়া’ বলে। যেহেতু এটি গর্ভাবস্থায় হচ্ছে, সেহেতু এক্ষেত্রে এর নাম ‘স্ট্রায়া গ্রাভিডেরাম’ বা ‘প্রেগনেন্সি স্ট্রেচ মার্ক’। দেখা গেছে, তুলনামূলকভাবে এই দাগ ফর্সা, মোটা এবং প্রথম সন্তান প্রসবকারী মায়েদেরই বেশি চোখে পড়ে। সাধারণত এই দাগ হওয়া শুরু হয় গর্ভাবস্থার পঞ্চম মাস থেকেই। তারপর গর্ভাবস্থায় সন্তান প্রসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসে মায়ের শরীরের ওজন ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে, আর এ পরিবর্তনও বাড়তে থাকে।

পেটের ভেতর প্রচণ্ড চাপের কারনে খাওয়াদাওয়া করাটাই হয়তো আপনার জন্য কঠিন হয়ে যাবে । অল্প অল্প করে একাধিকবার খান।

এখন ঘুমানটাও হয়তো অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। কাত হয়ে শোন আর সব দিকেই বালিশ আর কুশন দিয়ে সাপোর্ট দিয়ে নিন। প্রসবের প্রস্ততি হিসেব এখন থেকেই আপনার শ্রোণীচক্রের সংযুক্তি (pelvic joint) আর পেশিগুলো শিথিল হতে শুরু করবে যার কারনে নিতম্ব আর পায়ের গোড়ালিতে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে।

এসময় Braxton Hicks contraction এর মাত্রা বাড়বে কিন্তু সেটা আসল প্রসব যন্ত্রণার মহড়া মাত্র। এই Braxton Hicks Contraction এবং আসল প্রসব যন্ত্রণার মধ্যে পার্থক্যটা বুঝতে হবে আপনাকে। যদি আপনার যোনিপথ দিয়ে রক্তস্রাব শুরু হয় কিংবা বাচ্চার নাড়াচাড়া থেমে গেছে বলে মনে হয় সাথে সাথে ডাক্তারকে জানাতে হবে।

গর্ভবতী মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন সমস্যা পায়ে পানি আসা। একনাগারে একই জায়গায় অনেকক্ষন বসে থাকলে বা পা ঝুলিয়ে বসলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই কিছুক্ষন পরপর বসার ধাঁচ পরিবর্তন করুন কিন্তু খেয়াল রাখবেন কোনভাবেই যেন তা পেটের উপর প্রভাব না ফেলে।

অনেক নারীর প্রসবের সময় পানি ভাঙ্গে, তবে প্রসবের পূর্বেও অনেকের পানি ভাঙতে পারে। মায়ের জরায়ুর ভেতর ‘এ্যামনিওটিক স্যাক’ নামে একটি থলেতে বাচ্চা বড় হতে থাকে। বাচ্চা প্রসবের পূর্ব মুহুর্তে এই থলেটি ভেঙ্গে যায় আর এর মধ্যের এ্যমনিওটিক পানি বের হয়ে আসে। একেই সোজা বাংলায় ‘পানিভাঙ্গা’ বলে।পানি ভাঙলে তা চুইয়েও পড়তে পারে বা হঠাৎ অনেক পানি বের হতে পারে।যেটাই হোক তখন সাথে সাথে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।অধিকাংশ মায়েদের পানি ভাঙ্গার আগেই প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রসব ব্যথার আগেই পানি ভেঙ্গে যেতে পারে। তবে পানি আগে ভেঙ্গে গেলেও তার একটু পরেই মায়ের ব্যথা উঠে যায়। তবে পানি ভাঙ্গার পর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যথা না উঠলে, তাহলে ব্যথা ডাক্তার কৃত্রিম উপায়ে লেবার পেইন তুলে দিবেন(Induced Labor)। এটার কারণ থলিটার সুরক্ষা ছাড়া শিশু খুব অল্প সময়ের মধ্যে জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহের কিছু টিপস

ভাবতে শুরু করুন আপনার বাচ্চার জন্য আপনি কি কি করতে চান। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করুনআপনার আরও সন্তান থাকলে তাদের সঙ্গে সময় কাটান। একই রক্তের গ্রুপসম্পন্ন বন্ধু বা আত্মীয় ঠিক রাখুন যিনি প্রয়োজনে রক্ত দিতে পারবেন।

যদি হাসপাতালে বাচ্চা প্রসব করান তবে আগে থেকেই কাপড়-চোপড়, টাকা-পয়সা, সেবাদানকারীর ব্যবস্থা করে রাখুন। প্রসবব্যথা ওঠার আগে প্রয়োজনীয় টেলিফোন নম্বর সংগ্রহে রাখুন। গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ মনে হয়। তাই এ সময় এমন কিছু করুন যেন একঘেয়েমি না লাগে।

নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। মা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও থাকা প্রয়োজন। সন্তান জন্মের পর মায়ের করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখুন গর্ভাবস্থায়ই। প্রসবের পরেও মায়ের পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের প্রয়োজন। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানকে মায়ের দুধ দিতে হবে। এ ছাড়া সন্তানের চোখের যত্ন, টিকা দেওয়ার নিয়ম এবং প্রসবের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিন।

গর্ভবতী মায়ের যেন ভালো ঘুম হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে৷ গর্ভবতীকে দৈনিক নয় থেকে দশ ঘন ঘণ্টা ঘুমোতে হবে৷ দিনে দুঘণ্টা এবং রাতে আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে৷ যদি কারো ঘুমের অসুবিধা থাকে, তা হলে তাকে অবশ্যই চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিতে হবে, গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ বৃদ্ধি পেলে চিকিত্‌সকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে হবে৷ দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে অথবা বসে (৪/৫ ঘণ্টার বেশি) কাজ করা উচিত নয়৷

গর্ভাবস্থায় যাতে পেটের ওপর চাপ কম পড়ে এবং চলাফেরায় আরাম পাওয়া যায় সেজন্য ঢিলেঢালা পোশাক পরা উচিত৷ অন্তর্বাস প্রয়োজনানুপাতে ঢিলা থাকতে হবে৷ এ সময় সিনথেটিক ব্যবহার না করে সুতির পোশাক পরাই ভালো৷

সহবাস সাধারণভাবে বলা যায়, গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস সহবাস থেকে বিরত থাকাই ভালো৷ দ্বিতীয় তিনমাসে দম্পতির ইচ্ছেমতো সহবাস করা যায়৷ তবে তাও নির্ভর করে গর্ভবতীর শারীরিক অবস্থার ওপর৷ প্রয়োজনে নিয়মিত চেকআপকারী ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ভালো৷ শেষ তিন মাস গর্ভবতীর শারীরিক অবস্থার জন্য সহবাসে অসুবিধা হতে পারে৷ তা ছাড়া সহবাসের ফলে জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে৷ তাই শেষ তিন মাসও সহবাস না করাই ভালো৷

মায়ের খাবার যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নজর রাখতে হবে।এছাড়া মায়ের সারাদিনের খাবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে এসিডিটির ভয় থাকবেনা।

এই সময় একবারে বেশি করে না খেয়ে অল্প অল্প করে একটু পর পর খেলে তা গর্ভবতী মায়ের জন্য বেশী উপকারী । এতে মায়ের বিপাক প্রক্রিয়ার উপর বেশী চাপ না পড়ায় তার অভ্যন্তরীন পরিপাক ক্রিয়া সহজেই কাজ করতে পারে । কিন্তু যদি একবারে বেশী পরিমানে খাওয়া হয় তবে তার বিপাক ক্রিয়াকে অনেক চাপ প্রয়োগ করে কাজ করতে হয় এবং এতে শরীরে অধিক পরিমানে তাপ উৎপাদিত হয় । তাই স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য এক সাথে অধিক পরিমানে খাওয়া থেকে বিরত থাকলে তা উপকারী হবে ।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৫
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৭>>

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/wp/1901/
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment