৪০ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা | ভ্রূণের বৃদ্ধি, মায়ের শরীর এবং কিছু টিপস

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

গর্ভাবস্থার ৪০ তম সপ্তাহেই হতে পারে আপনার সাথে আপনার নবজাতকের প্রথম সাক্ষাত। তবে মনে রাখতে হবে অনেক মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসব হতে ৪০ সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগতে পারে। গবেষণা বলছে প্রতি ১০০ জন মায়ের মধ্যে ৬০ জনের প্রসব ডিউ ডেইটের মধ্যেই হয়ে যায় কিন্তু বাকি ৪০ ভাগ মায়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত তারিখের পরও সপ্তাহ দুয়েক বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।

সে যাই হোক না কেন, আপনার বহুল প্রতিক্ষিত সেই মহেন্দ্রক্ষণ খুব বেশি দূরে নয়। এই ৪০ সপ্তাহ খুব দীর্ঘ এবং উত্তেজনাময় মনে হলেও আপনার আসল অ্যাডভেঞ্চার শুরু হবে সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার পরেই।

বিজ্ঞাপণ
Loading...
৪০ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা

৪০ তম সপ্তাহকে গর্ভাবস্থার তৃতীয় ট্রাইমেস্টারের তের তম সপ্তাহ হিসেবে ধরা হয় এবং এর অবস্থান গর্ভাবস্থার নবম মাসে।

গর্ভধারণের ৪০ তম সপ্তাহে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি

সব শিশুই কিছুটা লালচে বেগুনী বর্ণের ত্বক নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জন্মের কিছুদিনের মধ্যে তার ত্বক লালচে গোলাপি বর্ণ ধারণ করে কারণ জন্মের পর থেকে তার ত্বকের নীচে থাকা রক্তবাহী নালীগুলোতে রক্ত চলাচল বাড়তে থাকে। এসময় তার হাত এবং পা কিছুটা নীলচে বর্ণের থাকতে পারে। জন্মের প্রায় ৬ মাসের মধ্যে শিশুর ত্বক তার স্থায়ী বর্ণ ধারণ করে।

জন্মের সময় সব শিশুর মাথার খুলিতে দুটি নরম অংশ থাকে। এগুলোকে ফন্টানেল বলে। এই নরম অংশগুলোর কারণে প্রসবের সময় শিশুর মাথার খুলির বিভিন্ন অংশ একটি আরেকটির উপর উঠে যায় যাতে জন্মনালী দিয়ে বেরিয়ে আসা সহজ হয়।

স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ শিশুর মাথা জন্মের পর একটু কোণাকৃতির থাকতে পারে। এটি স্বাভাবিক। জন্মের কিছুদিন পরেই তার মাথার আকৃতি অনেকটা গোলাকার হয়ে আসে।

জরায়ুতে শিশুর জায়গা এখন অনেকটা কমে আসলেও সে তার স্বাভাবিক নিয়মে নড়াচড়া করবে। যদি শিশুর নড়াচড়ায় কোন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন এবং মনে হয় সে আগের মত নড়ছেনা বা নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তবে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কোনভাবেই অপেক্ষা করা যাবেনা।

প্রেগন্যান্সির ৩৯ সপ্তাহ থেকে শুরু করে ৪০ সপ্তাহ ৬ দিন পর্যন্ত ভ্রূণকে ফুল টার্ম বা পুর্নাঙ্গ শিশু হিসেবে ধরা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে এই সময়ের মধ্যে জন্ম নেয়া নবজাতকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচাইতে কম থাকে।

এসময় ভ্রূণের উচ্চতা থাকে প্রায় ২০.১৬ ইঞ্চি বা ৫১.২ সেমি এবং এর ওজন হয় আনুমানিক ৭.৬৩ পাউন্ড  বা ৩৪৬২ গ্রামের মত।

তবে মনে রাখতে হবে এই পরিমাপগুলো একটি গড় হিসেব। আপনার শিশুর ওজন ও উচ্চতা এর চাইতে কম বা বেশি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে একটি সুস্থ নবজাতকের উচ্চতা ১৭.৬ ইঞ্চি (৪৫ সেমি) থেকে ২২ ইঞ্চি (৫৫ সেমি)  পর্যন্ত হতে পারে। আবার জন্মের সময় ওজন হতে পারে ৫.৫ পাউন্ড (২৫০০ গ্রাম) থেকে ১০ পাউন্ড (৪৫০০ গ্রাম) পর্যন্ত।

৪০ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের সবধরনের বিকাশ প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেলেও এই সময় তার শারীরিক কিছু পরিবর্তন হতে থাকে, যেমনঃ

চুল

অনেক শিশুই মাথা ভর্তি চুল নিয়ে জন্মগ্রহণ করে আবার অনেক মাথায় চুল কম থাকে। ৪০ সপ্তাহের মধ্যে শিশুর মাথায় চুল গজিয়ে যায় এবং এই সময় তার চুলগুলো আরও ঘন হতে থাকে।

নখ

এই সময় শিশুর আর কোন শারীরিক বৃদ্ধি না ঘটলে তার নখ এখনো বাড়তে থাকে। অনেক শিশুই বেশ বড় নখ নিয়ে জন্ম নিতে পারে। তাই হাসপাতালের ব্যাগে শিশুর জন্য এক জোড়া হাত মোজা বা মিটেন নিতে পারেন। নখ দিয়ে সে যাতে নিজের শরীরে আঁচড় দিতে না পারে এজন্য বাচ্চার হাতে হাত মোজা পরিয়ে দিতে পারেন।

রিফ্লেক্স

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য তার যেসব দক্ষতা এবং রিফ্লেক্সের প্রয়োজন তা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে যায়। এই সব রিফ্লেক্সের কারণেই জন্মের পরে শিশুকে মায়ের বুকে দিলে মায়ের স্তনবৃন্ত খুঁজে নিতে পারে (রুটিং রিফ্লেক্স) এবং তার হাতের তালুতে আপনার আঙ্গুল রাখলে সে আঁকড়ে ধরতে পারে (পালমার গ্রাস্প রিফ্লেক্স) ।

ভ্রুণের খুলি এবং হাঁড়

গর্ভে থাকা ভ্রূণের খুলির হাঁড়গুলো এখনো শক্ত এবং পরস্পরের সাথে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত হয়ে ওঠেনি। শুধু বাচ্চার খুলিই নয়, তার পুরো শরীরের অধিংকাশ হাঁড় এবং তরুণাস্থিগুলো (cartilage) বেশ নরম অবস্থায় থাকে, ফলে ডেলিভারির সময় জন্মনালী দিয়ে বেরিয়ে আসা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রথম কয়েক বছরের মধ্যে তার হাঁড়গুলো যথেষ্ট শক্ত হয়ে উঠবে।

৪০ তম সপ্তাহে মায়ের শারীরিক পরিবর্তন  

যদি এর মধ্যে প্রসব শুরু না হয়ে থাকে তবে এই সময়ের শারীরিক পরিবর্তনগুলো পূর্ববর্তী কয়েক সপ্তাহের মতই হবে। সেই সাথে প্রসব শুরুর লক্ষণগুলোও আপনি অনুভব করতে পারেন, যেমন –

  • শিশু পেটের নিম্নভাগে চলে আসা বা লাইটেনিং
  • বারবার ব্রাক্সটন হিকস কন্ট্রাকশন হওয়া
  • সারভিক্সের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
  • পেলভিক প্রেশার বা তলপেটে চাপ
  • পেলভিস বা ভ্যাজাইনাল এরিয়াতে হঠাৎ তীক্ষ ব্যথা
  • মিউকাস প্লাগ নিঃসরণ
  • ডায়রিয়া
  • পানি ভাঙা
  • প্রসব বেদনা বা লেবার পেইন

এই লক্ষণগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এর আগের ভিডিওতে করা হয়েছে।

প্রসব শুরু হয়ে গেলে কি কি ঘটতে পারে?

প্রসবের পুরো সময়টুকুকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে-

  • প্রথম পর্যায়ে লেবার পেইন শুরু হয়ে জরায়ুমুখ ১০ সেমি পর্যন্ত খুলে যায়।
  • দ্বিতীয় পর্যায়ে সন্তান ভুমিষ্ট হয়
  • তৃতীয় পর্যায়ে মায়ের প্লাসেন্টা ডেলিভারি করানো হয়।

প্রসবের প্রথম পর্যায়

লেবারের শুরু থেকে জরায়ুমুখ বা সারভিক্সের পরিপূর্ণভাবে প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত সময়টুকু হল প্রথম পর্যায়।  প্রথমবারের মত গর্ভধারিণীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থায় এই স্টেজে সময় লাগে প্রায় ১২-১৯ ঘন্টা।  আর তিনি যদি পূর্বে সন্তান প্রসব করে থাকেন,  সেক্ষেত্রে সময় লাগে ১৪ ঘন্টার মত। 

প্রসবের প্রথম পর্যায় শুরু হয় যখন থেকে আপনি নিয়মিত কন্ট্রাকশন বা সংকোচন অনুভব করা শুরু করবেন। এই কন্ট্রাকশনগুলোর ফলে জরায়ুমুখ খুলতে থাকে এবং পাতলা হতে থাকে। জরায়ুমুখ খুলে যাওয়াকে ডাইলেশন এবং পাতলা হওয়াকে এফেসমেন্ট বলা হয়। এই পর্যায়ে ভ্রূণ পেলভিসের নীচের দিকে জন্মনালীতে নেমে আসে। জারায়ুমুখ ১০ সেমি পরিমাণ খোলা পর্যন্ত সময়কে প্রথম পর্যায় ধরা হয়।

প্রসবের প্রথম পর্যায়কে আবার তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে-

  1. আর্লি লেবার
  2. অ্যাক্টিভ লেবার
  3. ট্রাঞ্জিশন পিরিয়ড

আর্লি লেবার

আর্লি লেবারের সময় আপনি মৃদু কিন্তু নিয়মিত কন্ট্রাকশন বা প্রসব বেদনা অনুভব করা শুরু করবেন। এই কন্ট্রাকশনগুলো প্রতি ৫ থেকে ৩০ মিনিট পরপর হতে পারে এবং ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

আর্লি লেবারের সময় যে লক্ষণ গুলো দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো-

  • তলপেটে খিঁচুনী যা পিরিয়ডের সময়ের মত
  • ব্যাক পেইন
  • উরুর ভেতরের দিকে ব্যাথা যা পায়ের দিকে নামতে পারে।
  • ডায়রিয়া
  • বদহজম

এই সময় গোলাপি, লাল বা রক্তমিশ্রিত ডিসচার্জ হতে পারে যেটাকে ব্লাডি শো বলা হয়। এর মাধ্যমে মিউকাস প্লাগ বেরিয়ে আসে। এটি হচ্ছে একটি ছিপি বা পর্দা যা আপনার জরায়ু মুখকে বন্ধ রেখেছিল। মিউকাস প্লাগ একসাথে পিণ্ডের মতো বেরিয়ে আসতে পারে, অথবা ডিসচার্জের মতো ধীরে ধীরে কয়েকদিন ধরে নির্গত হতে পারে।

কখনো কখনো প্রসবের কয়েক দিন কিংবা কয়েক সপ্তাহ আগে এটা হতে পারে, আবার প্রসবের একদম আগ মুহুর্তেও হতে পারে – যেটা আপনি হয়তো আলাদা করে খেয়াল নাও করতে পারেন।

কারো কারো এসময় পানি ভাঙতে পারে। বেশিরভাগ মায়েদের সাধারণত অ্যাক্টিভ লেবারের সময় পানি ভাঙ্গে তবে ৮-১০ ভাগ মায়েদের ক্ষেত্রে এর আগেই পানি ভেঙ্গে যেতে পারে। 

সবার ক্ষেত্রে পানি ভাঙ্গার অনুভুতি একই হবেনা। প্রত্যেকটি মা ই ভিন্ন। তাই এটি বোঝা কষ্টসাধ্য। এই তরলটি একসাথে অনেকটা বের হতে পারে আবার অল্প অল্প করে চুইয়ে বের হতে পারে। প্রসবের যে কোন সময় পানি ভাঙ্গতে পারে আবার তার আগেও ভাঙ্গতে পারে।

এমনিওটিক ফ্লুইডের ৯৯ ভাগই পানি। তাই এটি দেখতে পরিষ্কার এবং গন্ধবিহীন হয়। মাঝে মাঝে তাতে হলুদ বা গোলাপি আভা থাকতে পারে। আর ভালোভাবে বোঝার জন্য পানি ভেঙ্গেছে মনে হলে আপনি ম্যাটারনিটি প্যাড ব্যাবহার করতে পারেন।

প্যাডটি ভিজে যাওয়ার পর কিছুক্ষন অপেক্ষা করুন। যদি দেখেন তরলগুলো হলুদ হয়ে গেছে তবে তা প্রস্রাব হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। আর এক্ষেত্রে প্যাড থেকে অ্যামোনিয়ার গন্ধ আসবে। এমনিওটিক ফ্লুইড হলে তা পানির মত পরিষ্কার থাকবে। তবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ থাকলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়াটাই ভালো।

যদি পানি ভেঙ্গে যায় এবং ২৪ ঘন্টা পরও আপনার সংকোচনগুলো নিয়মিত না হয় তাহলে আপনার প্রসব আবেশন (প্রসব ব্যাথা উঠানো বা ইন্ডাকশন) করার প্রয়োজন হতে পারে, কারণ তখন সংক্রমনের ঝুঁকি থাকে। আপনার ধাত্রী বা ডাক্তার এই ব্যাপারে আপনার সাথে আলাপ করবেন।

চিকিৎসকরা এই স্টেজে খাওয়া বা পান করা এবং হাল্কা পায়চারী করার উপদেশ দেন৷ নড়াচড়ার ফলে ডেলিভারির সময় আরো দ্রুত এগিয়ে আসে।  

বিজ্ঞাপণ
Loading...

এই পর্যায়টি যদি রাতে শুরু হয় তবে রিলাক্স থাকার চেষ্টা করুন এবং সম্ভব হলে ঘুমিয়ে নিন। যদি দিনের বেলা শুরু হয় তবে সোজা থাকার চেষ্টা করুন এবং অ্যাক্টিভ থাকুন। ব্রিদিং এক্সারসাইজ, মাসাজ বা হালকা গরম পানিতে গোসল এই সময় ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

অ্যাক্টিভ লেবার

মায়ের জরায়ু মুখ যখন প্রায় ৩ থেকে ৬ সেমি পর্যন্ত খুলে যায় বা ডায়ালেট হয় তখন থেকে অ্যাক্টিভ লেবার পর্যায় শুরু হয় এবং জরায়ুমুখ ১০ সে.মি. খোলা পর্যন্ত সময়কে অ্যাক্টিভ লেবার পর্যায় ধরা হয়। এই পর্যায়ে প্রতি ঘণ্টায় জরায়ুমুখ বা সারভিক্স প্রায় ১ সেমি করে খুলতে পারে।

অ্যাক্টিভ লেবারের সময়-

  • কন্ট্রাকশনগুলো নিয়মিত এবং আরও ঘনঘন অনুভূত হবে।
  • কন্ট্রাকশন আরও তীব্র, দীর্ঘ এবং বেশী ব্যথাযুক্ত হবে।
  • লেগ ক্র্যাম্প হতে পারে
  • ব্যাক পেইন তীব্র হতে পারে
  • বমি বমি ভাব হতে পারে।
  • যদি ইতোমধ্যে পানি ভেঙ্গে গিয়ে না থাকে তবে এই পর্যায়ে পানি ভাঙবে

প্রসবের এই পর্যায়ে ডাক্তাররা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অ্যাক্টিভ লেবার সাধারণত ৪-৮ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। এই সময়গুলোতে ব্রিদিং এক্সারসাইজ, মাসাজ বা হালকা গরম পানিতে গোসল ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

ট্রানজিশন পিরিয়ড

প্রসবের প্রথম পর্যায়ের এই সময়টা সবচাইতে কঠিনতম অংশ। কিন্তু এর স্থায়িত্ব অনেক কম সময়ের। এই পর্যায় সাধারণত ১৫ থেকে ৬০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। এসময় তীব্র সংকোচন ৬০-৯০ সেকেন্ড পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং ১-২ মিনিট পর পর আসে।

এসময় আপনার যেসব অনুভূতি হতে পারে-

  • নড়বড়ে লাগা
  • গরম এবং ঠান্ডা লাগা
  • বমি বমি ভাব (আপনি বমি করতেও পারেন)
  • নিয়ন্ত্রণের বাইরে মনে হতে পারে।

প্রসবের সময় কোন কোন মায়ের এসব অনুভূতি নাও হতে পারে।

প্রসবের দ্বিতীয় পর্যায়

জরায়ুমুখ বা সারভিক্সের প্রসারণ থেকে সন্তান ভুমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত সময়টি হল দ্বিতীয় পর্যায়। জরায়ুমুখ যখন ১০ সেমি পর্যন্ত খুলে যায় তখন থেকে প্রসবের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এই পর্যায় ২০ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রথম মা হতে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এবং এপিডিউরাল ব্যবহার করা হলে সময় সাধারণত বেশী লাগে।

জরায়ুমুখ যখন ১০ সেমি পর্যন্ত খুলে যায় তখন থেকে প্রসবের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এই পর্যায় ২০ মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রথম মা হতে যাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এবং এপিডিউরাল ব্যবহার করা হোয়লে সময় সাধারণত বেশী লাগে।

এই সময় শিশুর মাথা মায়ের নিম্নভাগে চাপ দিতে থাকে এবং মায়ের “পুশ” করার ইচ্ছা জাগতে পারে। তবে ঠিক কোন সময় “পুশ” করতে হবে সে বিষয়ে ডাক্তারই আপনাকে সাহায্য করবেন। প্রত্যেকবার “পুশ” করার সাথে সাথে গর্ভের শিশু জন্মনালী দিয়ে ধীরে ধীরে নীচে নামতে থাকে। এভাবে প্রথমে শিশুর মাথা বেরিয়ে আসে এবং এরপর তার পুরো শরীর বেরিয়ে এসে সন্তান ভুমিষ্ট হয়। শিশু ভুমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত সময়কে প্রসবের দ্বিতীয় পর্যায় ধরা হয়।

প্রসবের তৃতীয় পর্যায়

ফিটাসের বেরিয়ে আসার সময় থেকে শুরু করে প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) বেরিয়ে আসা পর্যন্ত সময়টুকু তৃতীয় পর্যায়। এই স্টেজে সময় লাগে ১৫ মিনিটের মত। 

প্রসবের তৃতীয় পর্যায়ে প্লাসেন্টা ডেলিভারি করা হয়।  ডেলিভারিতে যে পরিমাণ চাপ প্রয়োগ করা দরকার এখানে ততটুকু দরকার হয়না।  এই সময় হালকা কন্ট্রাকশন হতে পারে এবং আবার “পুশ” করতে বলা হবে যাতে প্লাসেন্টা বেরিয়ে আসে। এটি খুবই সহজ প্রক্রিয়া হলেও ডাক্তার/ ধাত্রীর নিশ্চিত হওয়া উচিত যে ভিতরে প্লাসেন্টার কোন অংশ রয়ে যায়নি। এই পর্যায়ে প্লাসেন্টা ডেলিভারিতে আধঘন্টার মত সময় লাগতে পারে।

প্লাসেন্টা ডেলিভারির মাধ্যমে পুরো ডেলিভারি সম্পূর্ণ হয়ে যায়৷ এক্ষেত্রে ডাক্তার/ধাত্রী পেট পরীক্ষা করে দেখেন জরায়ু সংকুচিত আছে কিনা৷  প্লাসেন্টা ছিড়ে রক্তপাত হওয়ার মত ঘটনা প্রতিরোধে এই সংকোচন জরুরী। 

সর্বশেষ ভ্যাজাইনা বা সারভিক্স  ছিড়ে গেছে কিনা পরীক্ষা করা হয়৷ যদি এরকম ক্ষত থাকে তা সেলাই করে দেয়া হয়৷  ডেলিভারিতে episiotomy করা হলে তাও সেলাই করে একটি পূর্ণাংগ ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি সুসম্পন্ন করা হয়।

৪০ সপ্তাহে যদি প্রসবের লক্ষণ দেখা না যায় তবে কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?

যদি কোন মেডিকেল কন্ডিশন না থাকে তবে ডাক্তাররাও ৪০ সপ্তাহ এমনকি কখনো কখনো ৪১ সপ্তাহ পর্যন্ত নিজ থেকে প্রসব শুরুর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। তাই ৩৯ সপ্তাহে যদি প্রসবের কোন লক্ষণ অনুভব করতে না পারেন তবে সেটি বরং শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। সাধারণত ৪১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে ডাক্তাররা কৃত্রিম উপায়ে প্রসব ত্বরান্বিত করার চেষ্টা শুরু করেন যাকে ইন্ডাকশন বলা হয়।

আবার মনে রাখতে হবে সব শিশুর ক্ষেত্রেই প্রসব শুরুর অনেক আগে থেকে লক্ষণ নাও বোঝা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে সকালে প্রসবের লক্ষণ দেখা দিয়ে বিকেলেই সন্তান ভুমিষ্ট হয়ে যায়।

প্রসবে দেরী হওয়ার কারণ কি?

ডিউ ডেইটের মধ্যে প্রসব না হওয়া বা পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সির অনেক কারণে হতে পারে। যেমন- মা যদি তার শেষ মাসিকের তারিখটি ঠিকমতো মনে না রেখে থাকেন বা তা নিয়ে কনফিউশনে থাকেন তবে ডিউ ডেইটের হিসেবে ভুল হতে পারে। যদি দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের শেষের দিকে বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে করা আলট্রা সাউন্ডের মাধ্যমে ডিউ ডেইট হিসেব করা হয় তবে তা সঠিক না হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে।

এছারাও  বেশি বয়সে যদি প্রথম মা হন, পরিবারে বা তার নিজের যদি এর আগে পোস্ট টার্ম প্রেগন্যান্সির হিস্টোরি থাকে, প্রথম বার গর্ভধারণে এবং মায়ের ওজন বেশী হলে প্রসব ব্যথা উঠতে দেরি হতে পারে।আবার কেউ কেউ মনে করেন ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রসব একটু দেরীতে হয়।

এই সপ্তাহে ডাক্তারের চেম্বারে কি কি হতে পারে?

এর মধ্যে যদি প্রসব না হয়ে থাকে তবে এই সপ্তাহে একবার ডাক্তারের কাছ থেকে চেকআপ করিয়ে নিতে হবে। এই সময় ডাক্তার আপনার রক্তচাপ পরিমাপ করবেন এবং আপনার ইউরিন টেস্টেরও পরামর্শ দেয়া হবে। এগুলো করা হয় আপনার প্রি-একলাম্পশিয়ার কোন লক্ষণ আছে কিনা তা দেখার জন্য। 

ডাক্তার ভ্রূণের হৃদস্পন্দন চেক করবেন এবং Fundal height মেপে দেখবেন। এর সাথে তিনি আপনার গর্ভধারণের সময়কাল এবং পূর্বের নেয়া মাপ মিলিয়ে দেখবেন যে ভুরনের বৃদ্ধি স্বাভাবিক আছে কিনা। যদি কোন সমস্যা মনে হয় তবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দিবেন।

আপনার যদি প্রসবের সময় পেরিয়ে যায় তাহলে ডাক্তার জরায়ুমুখ পরীক্ষা করে এর অবস্থা দেখবেন। আপনাকে বায়োফিসিকাল প্রোফাইল ও নন স্ট্রেস টেস্ট এর পরামর্শ দেয়া হতে পারে। যদি ভ্রূণের বৃদ্ধি সম্পর্কে কোন উদ্বেগ থাকে তাহলে নিয়মিত আলট্রাসাউন্ড করে দেখা হবে।এগুলো সাধারণত দু সপ্তাহ পর পর করা হয়। আর এসব পরীক্ষা নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে ডাক্তার সিদ্ধান্ত নেবেন প্রসবের জন্য অপেক্ষে করবেন নাকি কৃত্রিম উপায়ে প্রসব শুরু করবেন।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

প্রয়োজন মনে করলে ডাক্তার এই সময় আপনার সার্ভিক্স এর মধ্যে দিয়ে আঙুল প্রবেশ করিয়ে আপনার জরায়ুর নিম্ন ভাগ থেকে এমনিওটিক স্যাক আলাদা করে দিবেন। এই পদ্ধতিকে মেমব্রেন স্ট্রিপিং ( Membrane Stripping) বলা হয়। এতে করে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে প্রোস্টাগ্লান্ডিন্স  নির্গত হবে ও আপনার সার্ভিক্স  আরো পরিপক্ক হয়ে উঠবে। এতে কয়েকদিনের মধ্যে প্রসব শুরু হয়ে যেতে পারে। যদি ৪১ সপ্তাহের মধ্যেও প্রসব শুরু না হয় তবে ডাক্তার ইন্ডাকশনের সিদ্ধান্ত নেবেন।

কখন হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে?

কখন হাসপাতালে আসা উচিত সেটা একেক জনের জন্যে একেক রকম নির্দেশনা হতে পারে। যেমন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে সেটা একরকম, আবার স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার জন্যে আরেক রকম। সেই হিসেবে মায়ের বাসা হাসপাতাল থেকে কতখানি দূরে অথবা প্রথম প্রেগন্যান্সি কি না- এসব কিছুও বিবেচনায় আনা হয়।

আপনার গর্ভাবস্থা যদি অতোটা জটিল না হয়, তাহলে  নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলো হওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে:

  • প্রায় ৬০ সেকেন্ড দীর্ঘ সময় ধরে সংকোচন হওয়া
  • প্রতি ৫ মিনিট পরপর সংকোচন হওয়া
  • এভাবে প্রায় ১ ঘন্টা যাবত প্রসববেদনা হওয়া।

(সংকোচনের মধ্যবর্তী সময় হিসেব করা হয় একবার সংকোচন শুরু হওয়ার পর থেকে পরের সংকোচন শুরু হওয়ার সময় পর্যন্ত)

তারপরও যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে এখনো সময় এসেছে কিনা, তাহলে সরাসরি ডাক্তার কিংবা ধাত্রীর সাথে কথা বলে নিন।

এই সপ্তাহে করণীয়

এসময় আপনার ঘুমের সমস্যা হতে পারে। রাতে যদি ঘুম না আসে তো দিনে ঘুমাতে চেষ্টা করুন। বিছানায় ঘুমাতে সমস্যা হলে সোফায় বা ইজিচেয়ারে ঘুমাতে পারেন। প্রচুর বিশ্রাম নিন এবং মানসিকভাবে তৈরি থাকুন, কারন প্রসবের সময় প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হবে।

প্রসব ত্বরান্বিত করতে বেশ কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি সম্পর্কে হয়তো শুনে থাকবেন। কিন্তু এগুলোর কোনটিই নিশ্চিতভাবে প্রমানিত নয়। এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে কোন বাধা নেই, কিন্তু তার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিতে হবে। সবচাইতে ভালো হয় অ্যাক্টিভ থাকার চেষ্টা করলে। এই সময় হালকা হাঁটাহাঁটি প্রসব ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষবারের মতো সব ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিন। গুরুত্বপূর্ণ ফোন নাম্বারগুলো হাতের কাছে আছে কিনা, ফোনে চার্জ দেয়া আছে কি না এগুলোও চেক করে নিন। যেকোনো মুহূর্তে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন।

যখন কন্ট্রাকশন শুরু হয় তখন ব্যথা নিয়ন্ত্রণের জন্য আপনি হয়তো শরীর শক্ত করে ফেলেন। কিন্তু এতে ব্যথা আরও বেড়ে যেতে পারে। এর পরিবর্তে যখন কন্ট্রাকশন হবে তখন চোখ বন্ধ করে শরীরকে যতটা সম্ভব রিলাক্স করার চেষ্টা করুন এবং গভীরভাবে শ্বাস নিন। এগুলো আপনার প্রসবের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

শিশু ভূমিষ্ঠ হবার ঠিক পর পর কি কি বিষয় জানা দরকার তা এখন থেকে কিছুটা অনুসন্ধান করুন এবং জেনে নিন। নবজাতকের বিষয়ে সবার এক্সপিরিয়েন্স সমান হয় না। এক এক মায়ের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হয়। তাই প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয়, মায়ের যত্ন, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশান এবং নবজাতকের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জেনে নিতে পারেন ফেইরিল্যান্ডের আর্টিকেলগুলো থেকে।

সবার জন্য শুভকামনা।

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৯


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment