শিশুর বেড়ে ওঠা | প্রথম মাস

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

প্রায় নয় মাসের উৎকণ্ঠা, প্রতীক্ষা আর শারীরিক ধকলের চড়াই উৎরাই পার করে একজন মা জন্ম দেন একটি  মানব শিশুর। সন্তানকে প্রথমবারের মতো এই পৃথিবীর আলোতে দেখার সেই মুহুর্ত সব বাবা মায়ের স্মৃতিতে জায়গা দখল করে নেয় আজীবনের জন্য।

কিন্তু সন্তান জন্ম নেবার পর শুরু হয় নতুন ভাবনা নতুন উৎকণ্ঠা। কিভাবে নবজাতকের যত্ন নেয়া হবে, কিভাবে ছোট এই নাজুক প্রাণটিকে পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে আর বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে সেই ভাবনায় নতুন মা বাবা প্রতি মুহুর্তে সদা সতর্ক থাকেন। আর প্রথমবার প্যারেন্টস হলে তো কথাই নেই। এই সতর্কতা অনেক সময় আতংকে পরিণত হতে পারে নবজাতকের ব্যাসিক কিছু বিষয় জানা না থাকলে। তাই আধুনিককালের সচেতন মা বাবা হিসেবে আমাদের নবজাতকের কিছু বৈশিষ্ট্য ও  মা বাবার করনীয় সম্পর্কে কিছু সাধারণ ধারণা রাখা দরকার। আর এই বিষয়ে প্রেগ্নেন্সীর শেষ কিছু সপ্তাহ থেকেই জানা শুরু করা উচিৎ।

বিজ্ঞাপণ
প্রথম মাসে শিশুর বেড়ে ওঠা। পর্ব-১

প্রথম মাসে নবজাতকের ওজন ও উচ্চতা

জন্মের সময় গড়ে নবজাতকের ওজন প্রায় ৭.৫ পাউন্ড (৩.৪ কেজি) হয় যদিও ৫.৮ – ১০ পাউন্ড (২.৬ – ৪.৫ কেজি ) পর্যন্ত ওজনকে আদর্শ ধরা হয়। নবজাতকের ওজন যদি উল্লেখিত সীমারেখার মধ্যে থাকে তবে তার উচ্চতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি তার ওজন এর চেয়ে বেশি বা কম হয় তবে আপনার চিকিৎসক নিশ্চয়ই  তার সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য কিছু পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারে।

জন্মের পর প্রথম সপ্তাহে শিশুর ওজন তার জন্ম ওজন বা বার্থ ওয়েটের প্রায় ১০ ভাগ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। নবজাতকের শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে যাওয়ার কারণেই এমন হয়। তবে পাঁচদিনের মধ্যে আবার তার ওজন বাড়তে শুরু করবে। ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নবজাতক পুনরায় তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ের ওজন ফিরে পাবে। নবজাতকের জন্মকালীন ওজন ফিরে আসার পর প্রথম ৪ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৭ আউন্স পর্যন্ত ওজন বাড়ে মানে প্রতি মাসে ১ থেকে ২ পাউন্ড।(অর্থাৎ আধা কেজি থেকে এক কেজি)

নবজাতকের ওজন পরিমাপের জন্য বাসার ওজন মেশিন ব্যবহার না করাই ভালো কারণ নবজাতকের ওজনের ক্ষেত্রে স্কেলটি আউন্সগুলোর ভগ্নাংশ পরিমাপ করার পক্ষে যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়!

যদি শিশুর বয়স ২ সপ্তাহ হওয়ার পরেও বার্থ ওয়েট ফিরে না আসে বা আশানুরূপ ওজন ফেরত আসার পরেও যদি আবার বেশ অনেকটা কমে যায় তবে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হবে।

প্রথম মাসে শিশুর খাওয়া

প্রথম মাসে শিশু প্রতি দুই বা তিন ঘণ্টা অন্তর খেতে চাইবে। বুকের দুধ খাওয়া অধিকাংশ নবজাতক ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৮-১২ বার বা তারও বেশীবার খেতে পারে।যেসব শিশু ফর্মুলা খায় তাদের ৩-৪ ঘণ্টা পর পর ২-৩ আউন্স ফর্মুলা খাওয়াকে আদর্শ ধরা হয়।

শিশু যখনই খাবার খাওয়ানোর ইঙ্গিত করে তাকে খাবার খাওয়ান। যতক্ষণ সে খেতে চায় তাকে ততক্ষন খাওয়ান। সে একটি ব্রেস্টের দুধ খাওয়া থামিয়ে দিলে, তার ঢেকুর উঠান এবং দ্বিতীয়টি থেকে খেতে দিন। এতে শিশুর বৃদ্ধির সাথে সাথে মায়ের বুকের দুধের একটি ভাল সরবরাহ থাকা নিশ্চিত থাকবে।

আপনার মনে যদি প্রশ্ন আসে যে বাচ্চাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে খাওয়াতে হবে কিনা তবে এই বিষয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেয়াই ভালো। কারণ এই বিষয়টি শিশুর সঠিক বৃদ্ধি এবং আরো  কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করতে পারে। শিশুর বৃদ্ধি যদি কম থাকে বা কোন মেডিকেল কন্ডিশনের কারণে যদি অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন পরে তবে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে খাওয়ানো গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে না জাগালেও সমস্যার কিছু নেই।

অনেক মা এটি ভেবে চিন্তিত থাকেন যে নবজাতক পরিমান মত দুধ পাচ্ছে কিনা, কারণ শিশু হয়ত কিছুক্ষন পরপরই কাঁদছে। এটি খুবই স্বাভাবিক কারণ খাওয়ার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তার খাবার হজম হয়ে যায়।

কিছু কিছু জিনিষ খেয়াল করলেই আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে নবজাতক পরিমান মত দুধ পাচ্ছে। বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের বুক নরম ও খালি বোধ হওয়া, শিশুর ত্বক উজ্জ্বল থাকা, শরীরের শরীরের কোনো অংশে চাপ দিলে তা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসা, শিশুর ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধি, দিনে ৬ থেকে ৮ বার মূত্রত্যাগ করা ইত্যাদি।

গ্রোথ স্পার্ট

গ্রোথ স্পার্ট বা দ্রুতবর্ধন হচ্ছে এমন একটি সময়কাল, যখন শিশুর বিকাশ অন্য যেকোনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি হয়। গ্রোথ স্পার্টের সময় শিশুর ওজন কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। খানিকটা লম্বাও হতে পারে, এমনকি মাথার পরিধিও কিছুটা বাড়তে পারে।

একটি শিশুর জন্মের প্রথম বছরে বেশ কয়েকবার গ্রোথ স্পার্ট হতে পারে। শুধুমাত্র প্রথম মাসেই কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ পরপর এটি হতে পারে, তবে এরপর সময়ের এই ব্যবধান বাড়তে থাকে। জন্মের পর  দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সপ্তাহে আপনি তার গ্রোথ স্পার্ট খেয়াল করতে পারেন।

গ্রোথ স্পার্ট বা দ্রুতবর্ধনের অন্যতম লক্ষণ হলো এই সময় শিশু অনেক বেশি ক্ষুধার্ত থাকে। অন্য সময় প্রতি তিন-চার ঘন্টা পরপর খেলেও এসময় তারা প্রতি দেড়-দুই ঘন্টা অন্তর অন্তরই ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ে।

আবার তার স্বাভাবিক ঘুমের রুটিনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তন হতে পারে। এসময় শিশু অন্য সময়ের তুলনায় বেশি খিটখিটে আচরণ বা অস্থিরতা প্রদর্শন করতে পারে।

গ্রোথ স্পার্ট চলাকালীন সময় শিশু ঘন ঘন মায়ের দুধ খেতে চাওয়ার ব্যাপারটি মায়েদের জন্য ক্লান্তিকর এতে  কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটি ক্ষণস্থায়ী। সাধারণত নবজাতকের ক্ষেত্রে গ্রোথ স্পার্ট কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে আসে।

তবে দিন কয়েকের মধ্যে যদি আপনার শিশু পূর্বের রুটিনে ফিরে না আসে এবং  খাওয়া, ঘুম ইত্যাদি নিয়ে যদি তখনো সমস্যা হয় তখন বিষয়টি  চিন্তার কারণ হতে পারে। পাশাপাশি লক্ষ্য রাখতে হবে শিশু জ্বর, বমি বা অন্য কোনো সমস্যায় ভুগছে কিনা। এগুলো গ্রোথ স্পার্টের সময় হওয়ার কথা নয়। তাই এসব সমস্যায় অবশ্যই ডাক্তারকে জানানো প্রয়োজন।

প্রথম মাসে শিশুর ঘুম

জন্মের প্রথম মাসে শিশু ১৬-২০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটাতে পারে। তবে বেশিরভাগ নবজাতক সাধারণত  একটানা ১-৩ ঘণ্টার বেশি ঘুমায় না।

ঘুম শিশুদের জন্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেননা এ সময় তাদের মস্তিষ্ক ও শরীর দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। শুধু রাতের ঘুমই যথেষ্ট নয়, নিয়মিত দিনে ভাঙা ভাঙা ঘুম/ন্যাপও তাদের ঘুমের অনেকটা চাহিদা পূরণ করে।

নবজাতককে চিত করে শোওয়ানো সবচাইতে নিরাপদ কারণ এতে SIDS (সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম) এর রিস্ক কমে যায়। কিন্তু সে যখন জেগে থাকে, তাকে মাঝে মাঝে  কিছুটা সময় উপুড় হয়ে থাকতে দিন। এতে ঘাড়ের মাংশপেশী শক্ত হয়।

নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ানো ইত্যাদি অভ্যাস করানোর জন্য আরো বেশ কয়েকটি মাস অপেক্ষা করুন, এই বয়সে তাকে তার নিজস্ব চাহিদামত ঘুম, খাওয়ানো এবং মায়ের সান্নিধ্যে রাখুন।

দিনের বেলায় যখন সে সজাগ ও সতেজ থাকে, তখন তার সাথে যত বেশি সম্ভব গল্প ও খেলাধুলা করুন। শিশুর রুম আলোকিত ও উজ্জ্বল রাখুন, দিনেরবেলায় গৃহস্থালির টুকিটাকি শব্দ যেমন ফোনের শব্দ, গান কিংবা থালা বাসন পরিস্কারের শব্দ কম করার ব্যপারে চিন্তিত হবেন না। আর রাতের বেলা যখন সে জেগে যায় তখন তার সাথে খেলাধুলা  করবেন না, ঘরের আলো ও শব্দ কমিয়ে রাখুন এবং তার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিন। এটি বাচ্চাকে দিন আর রাতের মাঝে পার্থক্য করতে সাহায্য করবে এবং সে বুঝতে শুরু করবে রাত হলো ঘুমানোর সময়।

শিশুকে নিজ থেকে ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগ দিন। তার মধ্যে যখন ঘুম ঘুম ভাব দেখবেন তখন তাকে তার বিছানায় রেখে দিন যাতে করে সে নিজ থেকেই ঘুমিয়ে যায়। এটি পরবর্তীতে শিশুর  স্লীপ ট্রেনিং এ সাহায্য করবে।

ঘুমানোর আগে কিছু কাজের রুটিন তৈরি করুন। এটা হতে পারে আপনার শিশুর কাপড় বদলানো, ঘুমপাড়ানি গান করা এবং রাতের বেলায় তাকে আদর করা ইত্যাদি। এবং এই রুটিনে ধারাবাহিক থাকার চেষ্টা করুন।

প্রথম মাসে শিশুর কান্না

সব নবজাতকই কান্না করে, এটাই বাস্তবতা। কান্নাই পৃথিবীতে তাদের প্রয়োজন জানান দেয়ার একমাত্র উপায়। শিশু যখন কান্না শুরু করে তখন তার কান্নার কারণ খুঁজে বের করুন, যেমন – খিদে লাগা, ক্লান্ত লাগা, ভেজা ডায়াপার বা গ্যাসের সমস্যা ইত্যাদি। কান্না করলে দ্রুত সাড়া দিন  এবং শান্ত করার চেষ্টা করুন। এতে আপনাদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় হবে। শিশুর কান্না অবহেলা করার উচিৎ নয় কারণ এতে ব্রেইনের উপর চাপ পড়ে যা পরবর্তী জীবনে তার মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

কিছু কিছু নবজাতক (প্রায় ১৫ থেকে ২০ ভাগ) অন্যদের তুলনায় অনেক বেশী কান্না করে।

বাচ্চা যদি অনেক বেশী কান্না করে, সাধারানত তিন ঘণ্টা বা তার বেশী, সপ্তাহে তিন বা চার দিনের বেশী এবং তার যদি কোন ব্যাখ্যা না থাকে, ধরে নিতে পারেন বাচ্চার হয়তো কলিক সমস্যা আছে। 

কোন কারন ছাড়া সুস্থ বাচ্চার অতিরিক্ত কান্নাকাটিকে সাধারণত কলিক বলে। 

জন্মের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কলিকের সমস্যা দেখা দিতে পারে।১৫ থেকে ২০ ভাগ নবজাতকের ক্ষেত্রে এটি দেখা যায়। কলিক কি কারনে হয় তা এখনো জানা যায়নি। তবে গ্যাসের সমস্যা, হজমের সমস্যা, reflux, বা পরিবেশগত কারনে কলিক হতে পারে মনে করা হয়।

কলিক কোনো রোগ নয় তবে কলিক শিশুদের বাবা মায়ের প্রয়োজনের অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে হয়।

প্রথম মাসে শিশুর মলমূত্র ত্যাগ

জন্মের প্রথম দিকে নবজাতকের মল ঘন ও গাঢ় সবুজ বর্ণের হয় যাকে মেকোনিয়াম বলে। জন্মের প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত শিশু মেকোনিয়াম ত্যাগ করে। দুধ খাওয়া শুরু করার পর আস্তে আস্তে মলের রঙ হলুদের দিকে যেতে থাকে। প্রথম ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বেশিরভাগ শিশু দিনে সাধারণত ২-৫ বার মলত্যাগ করতে পারে। আবার কিছু শিশু প্রতিবার খাওয়ার পরই অল্প অল্প মলত্যাগ করতে পারে।

যদি শুধুমাত্র বুকের দুধ খায় তবে শিশুর মল হলুদ বা হালকা সবুজ বর্ণের এবং নরম ও আঠালো হবে। এতে ছোট বীজের মত কণা থাকতে পারে এবং তীব্র গন্ধযুক্ত হয়না। বুকের দুধ খাওয়ানো বাচ্চার মল ক্ষেত্রবিশেষে এর থেকে কিছুটা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তবে যদি এর সাথে আর কোন উপসর্গ দেখা না যায় তবে চিন্তিত হবেন না।

ফর্মুলা খাওয়া নবজাতকের মল অনেকটা পেস্টের মত হয়, কিছুটা পিনাট বাটারের মত। এতে বাদামী বর্ণের আভা থাকে এবং বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চাদের মলের চাইতে অপেক্ষাকৃত বেশী গন্ধযুক্ত হয়।

জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন শিশু যেহেতু দুধ কম পায় তাই সে সময় তার মূত্রত্যাগের পরিমাণও কম থাকতে পারে। এরপর  থেকে যখন বুকের দুধের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং শিশু ভালোভাবে খেতে শিখে যায় তখন থেকে তার প্রস্রাবের পরিমাণও বাড়ে। ৬ দিন বয়স থেকে একটি নবজাতকের ২৪ ঘণ্টায় ৬-৮ বার মূত্রত্যাগ করাকে আদর্শ হিসবে ধরা হয়।

নবজাতকের নাভি

জন্মের এক থেকে তিন সপ্তাহের মাঝে নাভি শুকিয়ে ঝরে পড়ে। এই সময়ের মাঝে নবজাতকের নাভির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিৎ। স্বাভাবিকভাবে নাভি ঝরে পড়লে এটি শিশুর দেহে খুবই সামান্য ক্ষত সৃষ্টি করে যা অতি অল্প সময়ের মাঝেই ভাল হয়ে যায়।

মনে রাখবেন নাভি সময়ের সাথে সাথে শুকনো, বিবর্ণ দেখানোই স্বাভাবিক। নাভি পড়ে যাবার পর সে স্থানে কিছুটা রক্ত জমে থাকতে পারে অথবা জায়গাটি লাল হয়ে থাকতে পারে। এটি স্বাভাবিক এবং এর জন্য আলাদা কিছুর প্রয়োজন নেই। নাভি পড়ে যাওয়ার সময় কিছু ক্ষেত্রে  নাভির কিছুটা অংশ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আবার কিছু অংশ সুতার মত শরীরের সাথে যুক্ত থাকতে পারে। এই সময় কোন অবস্থাতেই নাভি ধরে টানা উচিৎ নয়।

আগে নবজাতকের নাভীর যত্নে অ্যান্টিসেপটিক পাউডার বা অ্যালকোহলে ভিজানো তুলা ব্যবহার করা হত। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষনায় বলা হয়েছে নাভী যত শুস্ক রাখা যাবে তত ইনফেকশন কম হবে।

শিশুকে ডায়পার পরানোর সময় খেয়াল রাখুন ডায়পার যেন নাভিকে কোন অবস্থাতেই ঢেকে না রাখে এবং নাভি যেন বেশিরভাগ সময় উন্মুক্ত থাকে।

প্রথম মাসে শিশুর গোসল

জন্মের ঠিক কতদিন পর থেকে নবজাতককে গোসল করানো যাবে সে বিষয়ে মতভেদ আছে। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে শিশু যদি ফুল টার্ম হয় এবং সুস্থ সবল থাকে তবে জন্মের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর থেকেই গোসল করানো যাবে। আবার World Health Organization এর মতে ২৪ ঘণ্টা পর থেকে নবজাতককে গোসল করানো শুরু করা যায়।

নবজাতকের নাভি পড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে টাব বা চৌবাচ্চায় অথবা গায়ে পানি ঢেলে পরিপূর্ণ গোসল দেয়ার প্রয়োজন নেই। এসময়  শিশুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত পরিস্কার ভেজা নরম কাপড় দিয়ে বা স্পঞ্জ করে মুছে দেয়া যাবে। একে স্পঞ্জ বাথ বলে।

প্রথম মাসে শিশুর স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা

জন্মের পর সাধারণত ৩-৫ দিনের মধ্যে নবজাতককে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। এই সময় ডাক্তার তার ওজন মেপে দেখবেন এবং শারিরিক বিভিন্ন পরীক্ষা করবেন। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় সবসময় জন্মের সময় থেকে শিশুর যেসব হেলথ-রিপোর্ট আছে সব ফাইল বন্দি করবেন এবং ডাক্তারকে দেখাবেন। সেই সাথে শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে আপনার মনে যা প্রশ্ন আসে তার সবই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে কখনোই অস্বস্তিবোধ করবেন না।

জন্মের পরপর শিশুর জননাঙ্গে একটু ফোলা ভাব থাকতে পারে। মায়ের শরীর থেকে বহন করা কিছু হরমোনের কারণে এটি হতে পারে । এছাড়াও আলাদা করে কোন তরল জমা হওয়ার কারণেও এমন হতে পারে। এই ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।  কিছুদিনের মধ্যেই এটা ঠিক হয়ে যায়। জন্মের প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই যদি এই অস্বাভাবিকতা ঠিক না হয় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন।

নবজাতক শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস অনিয়মিত এবং থেমে থেমে হতে পারে। শিশু যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তখন আপনি এই পিরিয়ডিক ব্রিদিং বা থেমে থেমে নিঃশ্বাস নেওয়ার বিষয়টি দেখতে পাবেন। খেয়াল করলে দেখবেন, একসময়ে সে খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নিচ্ছে, এরপর খুব গভীরভাবে নিশ্বাস নিচ্ছে। আবার কখনো মনে হবে সে যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্যে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছে।

এতে চিন্তার কিছু নেই। এটি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেরই অংশ। শিশুর বয়স বাড়তে থাকলে, এটি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। তবে যদি নিঃশ্বাস বন্ধের বিরতি ১০ সেকেন্ডের বেশী স্থায়ী হয় অথবা শ্বাস প্রশ্বাসের সময় বুকের পাঁজরের হাড় দেবে যায় তবে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে।

নবজাতকের শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় নানা ধরণের শব্দও হতে পারে। জন্মের পর পর প্রথম কয়েক মাসে শিশু শুধু নাক দিয়েই শ্বাস নেয়, যার কারণে শিশু যখন শ্বাস গ্রহন করে কিংবা ছাড়ে, নাক ডাকা, গলার ঘরঘর শব্দ কিংবা শিস বাজার মতো বিভিন্ন ধরণের শব্দ হতে পারে।

এটা নিয়ে ঘাবড়ে যাবেন না। তবে অবশ্যই সতর্ক থাকুন। একটু লক্ষ্য করে দেখবেন, আপনার শিশু কি প্রতিবার শ্বাস নেয়ার সাথেই শব্দ করছে কিনা। যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে হয়ত আপনার শিশুর শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নিকটস্থ শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অনেক নবজাতক মেয়ে শিশুর জন্মের পরেই তাদের ভ্যাজাইনা দিয়ে সাদা-হলদে স্রাব বের হয় এমনকি রক্তও বের হতে পারে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটাকে ‘pseudo-menstruation’ বা ‘ছদ্ম মাসিক’ বলা হয়। এই ছদ্ম মাসিক একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এটি সাধারণত জন্মের পর থেকে প্রথম এক মাসের মধ্যেই হয়ে থাকে।

যখন মেয়ে শিশুটি তার মায়ের গর্ভে থাকে তখন সে মায়ের শরীর থেকে বেশ কিছু হরমোনের সংস্পর্শে আসে। এসব হরমোনের কারণেই এমন ব্লীডিং হতে পারে। এই রক্তক্ষরণ শুধুমাত্র তিন থেক চার দিন পর্যন্ত হওয়া স্বাভাবিক আর তাই যদি এই সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও রক্তক্ষরণ বন্ধ না হয় তবে ডাক্তারকে জানাতে হবে। এছাড়া আপনি যদি দেখেন যে রক্তের রং একদম গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করেছে তাহলে অতি দ্রুত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন।

বিজ্ঞাপণ

এই হরমোনগুলোর কারণে অনেকসময় কিছু নবজাতকের বুকের অংশ কিছুটা ফুলে থাকতে পারে। এটি ছেলে ও মেয়ে শিশু উভয়ের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে। ব্রেস্ট এরিয়ায় ফোলা ভাব নিয়ে অনেক কুসংস্কার চালু থাকলেও এটি স্বাভাবিক এবং সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যায়। এই ব্যাপারে নিজ থেকে আলাদা কোনো  পদক্ষেপ নিতে যাবেন না।

প্রথম মাসে শিশুর টিকা

জন্মের প্রথম ১৪ দিনের মধ্যে যে টিকাটি দেয়া হয় তা হচ্ছে বিসিজি। এটি যক্ষা রোগের বিরুদ্ধে দেয়া হয়। নবজাতকের বাম হাতে চামড়ার ভিতরে এই টিকা দেয়া হয়। মনে রাখবেন, এই টিকা দিলে টিকার স্থানে সামান্য ঘা হয়ে পেকে যাবে। আর এই ঘা না হলে ধরে নিতে হবে, টিকা কার্যকর হয়নি। সেক্ষেত্রে এই টিকা আবার দিতে হবে।

টিকার দেয়ার পরে শিশুর সামান্য জ্বর আসতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। জ্বর ১০১ডিগ্রীর বেশি হলে স্বাস্থ্যকর্মী অথবা ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন। এছাড়াও জন্মের পর পর বা ১৪ দিনের মধ্যে শিশুকে পোলিও টিকার ডোজ বা ওপিভি দেয়া হয়।

সময়মত প্রয়োজনীয় সব টিকা দেবার ব্যপারে সচেতন থাকবেন।  অন্যান্য ব্যাপারে স্বাস্থ্যখাতে অনেক দুর্বলতা থাকলেও, আমাদের দেশে সরকারি হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাচ্চাদের টিকাদানের জন্য যথেষ্ট ভালো ও নির্ভরযোগ্য ব্যাবস্থা রয়েছে।

প্রথম মাসে শিশুর বৃদ্ধি ও মাইলস্টোন

প্রথম মাসে শিশুর বৃদ্ধি ও মাইলস্টোন

শিশুর জন্মের পর দেখা যায় সে সবসময় পা নিজের দিকে একটু বাঁকা করে রাখতে চায়। গর্ভকালীন সময়ে জরায়ুতে এই অবস্থাতে ছিলো বলেই হয়তো সে এমনভাবে পা বাঁকিয়ে রাখে। এমনকি তার হাতও পুরোপুরি প্রসারিত থাকেনা। এতে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। ধীরে ধীরে সে হাত পা মেলতে শুরু করবে এবং ৬ মাস বয়স হতে হতে সে পুরোপুরি সোজা হতে পারবে।

নবজাতক শিশুর মাথার হাড় খুবই নরম থাকে যার কারনে নর্মাল ডেলিভারি হলে জরায়ু পথ বা জন্মনালী দিয়ে শিশুর মাথা সহজে বেরিয়ে আসতে পারে। স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশুর মাথায় চাপ পড়তে পারে। একারণে শিশুর মাথা একটু লম্বাটে বা কোণাকৃতির হয়ে যেতে পারে। জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই এটি ঠিক হয়ে যায়।

নবজাতকের মাথায় দুটো নরম অংশ থাকে। প্রথমটির নাম হল ‘fontanelle’ যেটি মাথার সামনের একটি বড় অংশকে বলা হয়ে থাকে এবং দ্বিতীয় অংশটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং এটি মাথার ঠিক পেছনের অংশে অবস্থিত। এই অংশের নাম হল ‘posterior fontanelle’। খুলির সামনের দিকের অংশটি কিছুটা ডায়মন্ড আকৃতির এবং পেছনের অংশটি একটি ছোট ত্রিভুজ আকৃতির। জন্মের পর বেশ কয়েক মাস খুলির এ অংশগুলো খোলাই থাকে যখন শিশুর মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে পরিপক্ব হতে থাকে।

মাথার সামনের দিকের নরম অংশটি প্রায় আঠারো মাসের আগে পর্যন্ত  পুরোপুরি শক্ত হয় না। বেশিরভাগ সময় জন্মের প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে মাথার পেছনের নরম অংশ মিলিয়ে যায়। 

শ্রবণশক্তি

শিশুর শ্রবণশক্তি জন্মের প্রথম মাসে অনেকটাই সংবেদনশীল এবং সম্পূর্ণরূপে বিকশিত থাকে। জন্মের দুই তিন সপ্তাহ পর থেকে তারা শব্দের উৎসের দিকে মাথা ঘোরাতে চেষ্টা করে। ঘরের একপ্রান্ত থেকে তালি দিয়ে বা ঝুনঝুনি বাজিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করুন। দেখবেন তারা হয়তো কিছুটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠবে। আপনি তাকে নার্সারি রাইম বা গুনগুন করে কিছু গেয়ে শোনাতে পারেন। দেখবেন তারা ভিন্ন ভিন্ন শব্দে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

দৃষ্টি শক্তি

জন্মের পর পর শিশুর দৃষ্টি ঝাপসা থাকে। তারা সাধারণত ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি দূরত্বের জিনিসের অবয়ব দেখতে পায়। তাই তার মুখের কাছে মুখ আনলে সে আপনাকে দেখতে পাবে।

এ বয়সী বাচ্চা সাধারণত ভ্রু, চুল বা আপনার মুখের নড়াচড়া ভালভাবে খেয়াল করে। গবেষণায় দেখা গেছে মানুষের মুখ অন্য যে কোন কিছুর চাইতে নবজাতককে বেশী আকর্ষণ করে।তবে, জন্মের প্রথম মাসে শিশুরা চোখে চোখে তাকানো বা আই -কন্ট্যাক্ট করা শেখে না।

মাথা ঘুরিয়ে বা চোখের সাহায্যে তারা চলমান বস্তুকে অনুসরণ করে। কিন্তু যখনই তা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায় তারা সেটির অস্তিত্ব ভুলে যায়।

যদি কখনো শিশুর ট্যারা চোখ দেখেন তাহলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ফোকাস করার জন্য তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। শিশুর চোখের পেশীগুলো আরো শক্তিশালী হয়ে উঠলে এটি ঠিক হয়ে যায়।

আরেকটি  মজার ব্যাপার হলো জন্মের পর বাচ্চার নাক একটু বড় থাকে। নাকের কারণে বাচ্চার চোখের সাদা অংশ কিছুটা দেখা নাও যেতে পারে। এটা pseudoesotropia নামের দৃষ্টিভ্রম তৈরি করতে পারে। তাই প্রাথমিক অবস্থায় নবজাতক শিশুর চোখ ট্যারা না হলেও কিছুটা ট্যারা দেখাতেও পারে।

ঘ্রাণশক্তি

একটি শিশু পরিপূর্ণ ঘ্রাণশক্তি নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে। খুব দ্রুতই তারা মায়ের ঘ্রাণ চিনে ফেলে এবং স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুধার্ত অবস্থায় বুকের দুধ খাওয়ার জন্য মায়ের দিকেই মুখ ঘুরিয়ে রাখে। এমনকি একটি নবজাতক শিশু তার মায়ের বুকের দুধ এবং অন্য দুধের মধ্যেও ঘ্রাণের পার্থক্য করতে পারে।

শিশুর নড়াচড়া ও সচেতনতা

এ বয়সে শিশু তার হাত ও পায়ের অস্তিত্ব বুঝতে পারলেও সেগুলোর নাড়ানোর সমন্বয় করতে আরো  মাস খানেক বা মাস দুয়েক সময় লাগবে। জন্মের প্রথম দিকে তার নড়াচড়া অনেকটা নিয়ন্ত্রণহীন হলেও প্রথম মাসের শেষের দিকে তা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসে। খেয়াল করলে দেখবেন ৪ সপ্তাহের দিকে সে তার হাত মুখের কাছে আনার চেষ্টা করছে।

ঘাড় ও মাথা

শিশুর ঘাড়ের পেশী এখনও অনেক দুর্বল। তারপরও খেয়াল করবেন যখন সে তার পেটের উপর শুয়ে থাকে বা আপনার কোলে থাকে তখন সে তার মাথা হয়তবা সামান্য তুলে ধরতে পারে। এছাড়াও এসময় শিশু তার মাথা এদিক ওদিক সামান্য নাড়াতে পারে।

রিফ্লেক্স

নবজাতক শিশুরা আশেপাশের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই বেশ কিছু সহজাত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকে।এগুলোকে রিফ্লেক্স বলে। শিশুর এই ধরনের প্রতিক্রিয়াগুলো তার নিয়ন্ত্রনাধীন নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে। বেশীরভাগ রিফ্লেক্স বেশ জরুরি এবং এগুলো নবজাতকের মধ্যে জন্মের প্রথম দিন থেকেই বা জন্মের আগে থেকেই উপস্থিত থাকে।

খেয়াল করলে হয়তো দেখবেন শিশুর গালে আপনি যেদিকে আঙুল বুলাচ্ছেন সে সেদিকেই মুখ ঘুরিয়ে হা করছে। এই সহজাত প্রবৃত্তি শিশুকে মায়ের বুক থেকে অথবা ফিডার থেকে দুধ খেতে সাহায্য করে। এই ধরনের প্রতিক্রিয়ার কারণে শিশু মায়ের বুকের নিপল কোথায় এবং এর আকৃতি সম্পর্কে ধারনা পায়। এমনকি অন্ধকারেও তার মায়ের বুকের দুধ খেতে সমস্যা হয় না। এই ধরণের রিফ্লেক্সকে রুট রিফ্লেক্স বলে।

রুট রিফ্লেক্সের মতই যে কোনো  কিছু চোষার প্রবণতা নবজাতকের আরো একটি সহজাত প্রবৃত্তি যাকে সাকিং রিফ্লেক্স বলা হয়।  যখন কোনো কিছু নবজাতক শিশুর উপরের ঠোঁট স্পর্শ করবে তখন শিশু নিজ থেকেই সেটা চুষতে শুরু করবে। এই অভ্যাসটি গর্ভধারণের ৩২ সপ্তাহ পর থেকেই শিশুর মধ্যে চলে আসে এবং এই প্রতিক্রিয়া পরিপক্বতা লাভ করতে করতে ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যায়। একারণেই প্রিম্যাচিউর শিশু অর্থাৎ সঠিক সময়ের আগেই জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে মায়ের বুকের দুধ ঠিকমত চুষতে পারার ক্ষমতা বেশ কম দেখা যায়।

শিশুর আশেপাশে কোন উচ্চ শব্দ অথবা দ্রুত নড়াচড়া হলে শিশুকে চমকে উঠতে দেখা যায়। উচ্চ শব্দে শিশু সাধারণত তার মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে দেয় এবং হাত পা ছুড়ে কান্না করতে থাকে।  তারপর আবার হাত এবং পা শরীরের দিকে ভাঁজ করে কুঁকড়ে যায়। শিশুর নিজের কান্নার শব্দেও এই প্রতিক্রিয়া বা রিফ্লেক্স দেখাতে পারে।একে মোরো বা স্টার্টল রিফ্লেক্স বলে।

কখনো  বাবা মায়েরা এই আঁতকে ওঠাকে “seizure” অর্থাৎ খিঁচুনির সাথে তুলনা করে ফেলেন। তবে এই দুইটির মধ্যে সহজ পার্থক্য হল আঁতকে উঠাটা কেবলমাত্র অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয়ে থাকে। অপরদিকে, খিঁচুনি দীর্ঘ সময়ে ধরেও হতে পারে।

এ সময় কি কি  মাইলস্টোন আপনার শিশু অর্জন করতে যাচ্ছে তা জানার সাথে সাথে ভুলে যাবেন না যে এটি  শুধু মাত্র একটা গাইডলাইন। প্রতিটি শিশুই ইউনিক ( স্বকীয় ) এবং তার বেড়ে ওঠার গতিও ভিন্ন।

এই টাইমলাইন সিরিজ যেন আপনার কোন রকম দুঃশ্চিন্তার কারন না হয় সেটি খেয়াল রাখবেন। প্রতিটি টাইমলাইনকে একটি গাইড হিসেবে ধরে নিতে হবে ।নবজাতকের বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোনো  আশঙ্কা বা জিজ্ঞাসা থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

কিভাবে প্রথম মাসে আপনার শিশুর বিকাশে সাহায্য করবেন

শিশুর সাথে হাত নেড়ে কথা বলুন এবং সে না পারলেও, আপনি তার সাথে আই কন্টাক্ট করুন। কথার অর্থ না বুঝলেও আপনার গলার স্বর ও স্নেহ মাখা টোন তাকে নিরাপদ বোধ করাবে এবং নবজাতকের সাথে এই কথাবার্তা পরবর্তীতে তার ভাষার বিকাশ ও সামাজিকতার বিকাশে সাহায্য করবে।

চতুর্থ সপ্তাহ থেকে সে বিভিন্ন শব্দ করার চেষ্টা করবে, বিশেষ করে মা কিংবা বাবাকে দেখলে ‘আ,  ওহ বা এ ধরণের কিছু শব্দ তৈরি করার চেষ্টা করবে। শিশু অন্যদের দেখে শেখে , তাই সে এ ধরণের শব্দ করলে অবশ্যই তাকে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এতে সে বুঝতে পারবে সবসময় আপনি তার পাশে আছেন।

শিশু জন্মের পর থেকেই সব ধরনের রঙ দেখতে পায় তবে তখন বিভিন্ন ধরনের রঙের মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য করতে পারেনা। যেমন, দুমাস বয়সী শিশু লাল এবং কমলা রঙ আলাদা করতে পারেনা। কেননা দুটো রঙই প্রায় কাছাকাছি। ঠিক এই কারণে ২ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর কাছে গাঢ় সাদাকালো রঙের প্যাটার্ন অনেক পছন্দ।

বিজ্ঞাপণ

উজ্জ্বল রং এর ঝুনঝুনি তার দৃষ্টি সীমার মধ্যে নাড়াতে থাকুন যাতে সে তার দৃষ্টি দিয়ে তা অনুসরণ করতে পারে। শিশুর বিছানার উপর উজ্জ্বল রং এর কিছু ঝুলিয়ে রাখুন। এতে তার ফোকাসের  উন্নতি হবে।

বাচ্চারা চুষতে পছন্দ করে। তাই সে হাত মুখে দিলে এটি  থামানোর চেষ্টা করবেন না। অনেক সময় শিশুকে শান্ত করার জন্য যখন আর কিছুই কাজ করেনা তখন চুষনী উপকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।  American Academy of Pediatrics এর গবেষণায় দেখা গেছে ঘুমানোর সময় চুষনির ব্যাবহার নবজাতকের SIDS এর আশঙ্কা কম করে।

নবজাতক শারীরিক খেলাধুলা পছন্দ করে, বিশেষ করে যখন আপনি তাদের মুখে হালকাভাবে সুড়সুড়ি দেবেন বা তাদের হাত-পায়ের আঙ্গুলগুলি গুনে খেলা করবেন।

মাত্র কয়েক মিনিট বয়সের বাচ্চারা, যদি তারা পরিতৃপ্ত ও সচেতন থাকে, চারপাশের লোকজনের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। এসময় ধীরে ধীরে আপনার মুখ হা করার কিংবা জিভ বের করার চেষ্টা করে দেখুন- আপনার বাচ্চা হয়তো আপনাকে নকল করার চেষ্টা করবে।

শিশুকে আপনার ত্বকের সংস্পর্শে রাখুন। এই সংস্পর্শে রাখাটাকে অনেক সময় ‘ক্যাঙ্গারু কেয়ার’ (Kangaroo Care) ও ডাকা হয়ে থাকে কারণ মা ক্যাঙ্গারুও ঠিক একই ভাবে জন্মের পরপরই  শিশু ক্যাঙ্গারুকে পর্যাপ্ত উষ্ণতা, নিরাপত্তা ও খাওয়ানোর সুবিধার জন্যে নিজের পেটের সামনে থাকা ঝোলায় নিয়ে নেয়। জন্মের পর এভাবে ত্বকের সংস্পর্শে রাখা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বেশ উপকারী।

শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে আপনি যখনই সময় পাবেন, শিশুকে ত্বকের সাথে  জড়িয়ে রাখতে পারেন যা আপনার এবং শিশুর মধ্যকার বন্ধনকে সুদৃঢ় করবে ও পাশাপাশি বুকের দুধ পান করানোও অনেক সহজ করবে।

আপনি যখন জেগে থাকবেন,  বিছানায় বা মাটিতে শুয়ে শিশুকে আপনার পেটের উপর বা বুকের উপর রেখে কয়েক মিনিটের জন্য তাকে টামি টাইম দিতে পারেন। জন্মের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই টামি টাইম শুরু করা যায়।

এসময় বাচ্চার সাথে প্রচুর কথা বলুন এবং তার সাথে আই কন্টাক্ট করুন। আপনার বাড়ন্ত শিশুর জন্য টামি টাইমের উপকারিতা অপরিসীম। এভাবে পেটের উপর ভর দিয়ে থাকলে শিশুর মেরুদণ্ড, ঘাড় এবং কাঁধ আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এভাবে শিশু যখন বড় হতে থাকতে তখন সে এই অবস্থা থেকে উপরের দিকে ওঠার জন্য হাত দিয়ে নিচের দিকে ধাক্কা দেবে এবং তার হাত সোজা করার চেষ্টা করবে। আর এভাবেই শিশু গড়ানো শিখে যায় এবং ধীরে ধীরে হামাগুড়িও দেয়া শিখে যায়।

বিপদ চিহ্ন

প্রত্যেকটি বাচ্চাই তার নিজস্ব গতিতে বেড়ে ওঠে। তারপরও যদি প্রথম মাসে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখেন তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন-

  • যদি খুবই আস্তে আস্তে খায় এবং ভালভাবে চুষতে না পারে।
  • যদি দৃষ্টি ফোকাস করতে না পারে এবং আশপাশের নড়াচড়া দিকে মনোযোগ না দেয়।
  • উজ্জ্বল আলোতে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখায়।
  • বাচ্চা যদি নেতিয়ে থাকে।
  • উচ্চ শব্দে যদি কোনো  প্রতিক্রিয়া না দেখায়।


পরিশিষ্ট

সন্তান জন্মগ্রহণ করার কয়েকদিনের মধ্যে আপনার কিছুটা মনমরা ও খিটখিটে অনুভূতি হতে পারে। এমনকি খুব সাধারণ কারণে আপনার কান্নাও চলে আসতে পারে। এই ধরনের লক্ষণকে সাধারণত বেবি ব্লুজ (Baby Blues) বলা হয়ে থাকে।

নবজাতক ফুটফুটে সন্তান কোলে নেয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই এই ধরনের অনুভূতির কারণে আপনার নিজের কাছেই অনেক খারাপ লাগতে পারে।তবে এসব যদি ২ থেকে ৩ সপ্তাহের বেশী স্থায়ী হয় এবং আপনি সারাদিনই অবসাদগ্রস্থ থাকেন, কোন কাজেই আপনার উৎসাহ না থাকে, খাবারে অরুচি, আতঙ্কিত, অপরাধ বোধ, ঘুমের সমস্যা এমনকি আত্মহত্যার চিন্তার মত উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে বুঝতে হবে Postpartum Depression এর আশঙ্কা রয়েছে।

এক্ষেত্রে অতিসত্বর চিকিৎসকের  পরামর্শ নিন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথেও আলোচনা করুন। । এ ব্যাপারে শিশুর বাবা ও আপনজনের সহায়ক ভূমিকা নতুন মায়ের এই কঠিন অবস্থা থেকে ফিরে আসাকে সহজ করবে। 


সবার জন্য শুভকামনা।

 <<শিশুর বেড়ে ওঠা – ২ মাস


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment