শিশুকে কথা শোনানোর কিছু টিপস

Last Updated on

বাচ্চারা আমাদের মতোই-তারাও সবসময় কথা শোনে না। এই বয়সে তাদেরকে আপনার শেখানো দরকার কীভাবে মনোযোগ দিতে হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে হয় কি, বাবা মায়েরা বাচ্চাদের একটা কথা দশবার বলেন এরপর তারা শাস্তি দেয়া শুরু করেন।

এভাবে বাচ্চারা কথা শোনা শিখে না। এতে বাচ্চা বুঝতে পারে যে সে আপনাকে প্রথম দশবার এড়িয়ে গেলেও আপনি হয়তো কিছু বলবেন না, শুধু তখনই শুনবে যখন আপনি মেজাজ হারাতে যাচ্ছেন। সন্তানকে আপনার কথা শোনানোর জন্য আপনাকে যুদ্ধ করতে হবে না। নিচের কতগুলো টিপস মেনে ব্যাপারটাকে অনেকটা সহজ করতে পারেন।

চোখে চোখ রেখে কথা বলুন

যেহেতু সব মা-বাবারাই আগে বা পরে বোঝেন যে, দুর থেকে জোরে চিৎকারের ( এমনকি সেটা পাশের রুম হলেও) ফল খুব কমই প্রত্যাশিত হয়। বাচ্চাকে কোলে নিন বা আপনি নিচু হয়ে বসুন, যাতে আপনি তার সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন ও তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন।

আই কন্টাক্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা বেশ কাজে দেয় যখন আপনি সন্তানের চোখে চোখে তাকিয়ে কিছু বলেন।  সে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনবে যদি আপনি নাস্তার টেবিলে তার পাশে বসে তাকে কর্ণফ্লেক্স খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন অথবা রাতে তার পাশে বিছানায় বসে আপনি লাইট বন্ধ করতে যাচ্ছেন সে কথা বলতে যান।

স্পষ্ট করে বলুন

আপনার কথা স্পষ্টভাবে, সহজভাবে এবং পুরোপুরি কর্তৃত্বের সাথে বলুন। আপনার সন্তান মনোযোগ হারাবে যদি আপনি একটা বিষয়ে অনেক্ষন বলতে থাকেন। শব্দবহুল কথাবার্তা, যেমন “বাইরে আসলেই ঠান্ডা আর তুমি ইদানিং অসুস্থ হয়ে গেছ, এজন্য আমি চাই আমরা দোকানে যাওয়ার আগে তুমি সোয়েটার পর”, এতো লম্বা কথায় শিশুর পক্ষে মূল বিষয়বস্তু খুজে পাওয়া কঠিন।

কিন্তু “এখন তোমার সোয়েটার পরার সময়” – এখানে ভুল করার সম্ভাবনা কম। আর আপনার সন্তানের কিছু বেছে নেয়ার বিষয় না থাকলে প্রশ্ন আকারে কিছু বলবেন না। “ এসো, গাড়ির সিটে এসে বসো, হ্যা, লক্ষিটি”? বলার চেয়ে “এখন গাড়ির সিটে বসার সময়” বলাটা বেশি কাজের।

শিশুদের অপশন দেয়া ভালো, কিন্তু নিশ্চিত হোন যে আপনি যে যে অপশনগুলো দিচ্ছেন সেগুলোর কোনটিতেই আপনার আপত্তি নেই -আর শুধু দুটি অপশন থেকেই বাছাই করতে দিন। এভাবে আপনার শিশুকে বাছাই করতে দিলে সে নিজেকে কর্তৃত্বের অধিকারী মনে করবে আর আপনিও এর ফলাফলে সন্তুষ্ট হবেন।

যেটা বলবেন সেটাই করুন

আপনি যেটা বলছেন সেটাই করবেন তা তাকে বুঝিয়ে দিন। আর এমন কথা বলবেন না যা তার জন্য  হুমকিস্বরূপ হয় অথবা এমন প্রতিশ্রুতি দিবেন না যা আপনি রাখতে পারবেন না। যদি আপনার দুই বছর বয়সী বাচ্চাকে বলেন, “তোমাকে রাতের খাবারের পর কিছু পানি খেতে হবে”  তবে তাকে পানিই খাওয়াবেন, তার কাছে হার মেনে জুস খেতে দেবেন না। আপনি যখন তাকে সতর্ক করবেন যে ভাইকে মারলে তাকে “টাইম-আউট” দেওয়া হবে তারপরও যদি সে মারে তখন টাইম-আউটে রেখে দিন।

আপনার পার্টনার আপনার নিয়মগুলো জানে এবং মানে এটা নিশ্চিত করুন যাতে বাচ্চা বুঝতে পারে যে আপনাদের দুজনের কাছ থেকেই সে একই ব্যাবহারই পাবে। আর যদি সেখানে ভুল বোঝাবুঝি হয়, এটা নিয়ে আলোচনা করুন; এতে আপনি পরিষ্কার হবেন কী বলা দরকার বা করা দরকার যখন বিষয়টি আবার সামনে আসে।

আর আপনার নির্দেশনাগুলো বারবার পুনরাবৃত্তি করে  ঝামেলায় পড়বেন না, যেমন ধরুন “ তোমার কাপটি টেবিলে রাখো” কথাটি বার বার না বলে বাচ্চার হাত ধরে দেখিয়ে দিন যাতে সে বুঝতে পারে আপনি আসলে কি চাইছেন।

আপনার কথাকে গুরুত্ব দিয়ে বলুন 

মুখে কোন নির্দেশনা দেয়ার সাথে সাথে আপনার আরও কিছু কাজকর্মের মাধ্যমে তাকে আপনার কথার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিন, বিশেষ করে যখন তাকে তার কোন খেলা থেকে তুলতে চান। তাকে বলুন- “এখন ঘুমানোর সময়” এবং এটা বলার সাথে সাথে তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য তাকে বিভিন্ন ধরণের ইঙ্গিত দিন, যেমন- লাইটের সুইচ বারবার অন অফ করা,  খেলনা থেকে আপনার দিকে ভদ্রভাবে তার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য কাঁধে হাত বুলিয়ে বা  তাকে বিছানার দিকে নিয়ে এসে, কভারগুলো টেনে, বালিশ চাপড়ে।

আপনার সন্তানের এও জানা গুরুত্বপূর্ণ যে কখন কোনো কিছু বিশেষভাবে বিপজ্জনক এবং আপনার সাহায্য নেয়া, কীভাবে নিরাপদে কাজটি করা যায়। যেমন, যখন আপনার সন্তানকে নিয়ে রাস্তা পার হবেন, সবসময় তার হাতটা ধরেছেন কিনা নিশ্চিত হোন।  এভাবে, সে রাস্তার বিপদ সম্পর্কে বুঝতে শিখবে এবং সাবধানী হবে।

আগাম সতর্ক করুন

বড় কোনো পরিবর্তন ঘটার আগে আগ্রিম বার্তা দিন, বিশেষ করে যদি সে খুশিমনে খেলনা বা কোনো বন্ধুর সাথে ব্যাস্ত থাকে।  আপনি বাসা থেকে বের হওয়ার আগে, “ আমরা কয়েক মিনিট পর বের হব”  বা “ আর দশ মিনিটের মধ্যেই আমরা শুয় পড়ব” এ ধরণের আগাম সতর্কবার্তা তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখবে।

বিষয়টিকে শিক্ষামূলক এবং মজাদার করুন

ওকে বাস্তবধর্মী কাজ দিন- “চলো হলুদ ব্লকগুলো সরিয়ে রাখি” তখন আপনি এটাকে খেলায় পরিণত করতে পারেন –  “ভালো, এখন চলো নীল ব্লকগুলো সরিয়ে রাখি” এভাবে কাজকে মজাদার করে তুলুন।

চিৎকার করে আদেশ দিলে ফলাফল আসতে পারে, কিন্তু কেউই এটা উপভোগ করবে না। অধিকাংশ শিশু সাড়া দেয় যখন আপনি দারুণ হাস্যরসের সাথে তাদের সাথে আচরণ করেন।আপনার কথাটা জানাতে বোকাটে স্বর বা গান করার চেষ্টা করুন- উদাহরণস্বরূপ আপনি “ এখন দাঁত মাজার সময়” কথাটি লন্ডন ব্রিজ গানের সুরে গাইতে পারেন।

নিশ্চিত হোন যে আপনার কথা শোনার ফলাফল তার কাছে অর্থবোধক হয়। “তোমাকে দাঁত মাজতে হবে নাহলে ক্যাভিটিজ হবে” বা “এখনিই দাঁত মাজো”  এর বদলে “দাঁত মাজো এবং তোমার পছন্দের নাইটগাউন পর” এধরনের কথা বললে তার বুঝতে সুবিধা হয়।  দাঁত মাজার পর তার প্রশংসা করুন।

আপনি তার সাথে এইভাবে কথা বলার সময় যে হাস্যরস, স্নেহ, এবং আস্থা দেখান সেটা তাকে আপনার কথা মেনে চলতে উৎসাহ দেবে কারণ সে জানবে যে আপনি তাকে ভালবাসেন এবং তাকে বিশেষ মনে করেন। 

নিজেই ভালো আচরণের আদর্শ হয়ে উঠুন

শিশুরাও আপনার কথা ভালোভাবে শুনবে যদি তারা দেখে যে আপনি তাদের কথা ভালোভাবে শুনছেন। শিশুদের কথা শোনার অভ্যাস গড়ুন যেভাবে আপনি বড়দের কথা শোনেন। যখন সে আপনার সাথে কথা বলে তার দিকে তাকান, নম্রভাবে সাড়া দিন, এবং যখনই সম্ভব তাকে কোনো বাঁধা ছাড়াই কথা শেষ করতে দিন।

যখন আপনি রান্না করছেন বা কোন জরুরী কাজ করছেন, সে সময় মনে হতে পারে এটা খুব কঠিন কাজ এবং আপনার বাচ্চা বেশ উৎসুক তখন তার কথা বলায়। তারপরও এড়িয়ে না যাওয়ার বা মুখ ফিরিয়ে না নেয়ার চেষ্টা করুন। কারণ শিশুরা আপনার করা কাজটাকেই গুরুত্ব দেবেন এবং সেটাই শিখবে।

সন্তানের সাথে তার ভালো কাজ নিয়ে কথা বলুন

সন্তান যে ভুল করছে তা নিয়ে আপনি কয়বার সন্তানের সাথে কথা বলেন? আপনি কি এমন কারো কথা শুনতে পছন্দ করেন, যেমন আপনার বস, যে আপনাকে শুধু নেগেটিভ ফিডব্যাক দেয়?

খেয়াল করে দেখবেন, আপনার শিশু খুব মনোযোগ দিয়ে আপনার কথা শুনছে যখন আপনি তার কোন ভালো ব্যাবহার নিয়ে তার সাথে বলছেন। “ প্রথমবার বলাতেই তুমি তোমার পুতুল সরিয়ে রেখেছো। ধন্যবাদ” অথবা “তুমি ছোট ভাইয়ের সাথে খুবই ভদ্র ছিলে, আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত!”। এভাবে সন্তানকে ইতিবাচক কথাবার্তা বলুন। দেখবেন অন্যান্য সময়ও সে আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts