শাস্তি না দিয়েই কিভাবে শিশুকে শৃঙ্খলা শেখানো যায়

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

সন্তান প্রতিপালন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন ও মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সব বাবা-মা কেই খুব বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তান মানুষ করতে হয়। সন্তান প্রতিপালনের অনেকগুলো ধাপের একটি হচ্ছে শৃঙ্খলা শেখানো

বাচ্চাকে শৃঙ্খলা অবশ্যই শেখাতে হবে, তবে তা যেন হয় গঠনমূলক ও ইতিবাচক উপায়ে। শাস্তি ও  শৃঙ্খলার মধ্যে যে সীমারেখা রয়েছে তা জানতে হবে এবং শিশুকে শাস্তি না দিয়েই কিভাবে শৃঙ্খলিত জীবনে অভ্যস্ত করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। 

বিজ্ঞাপণ
Loading...

আরও পড়ুনঃ শিশুকে শৃঙ্খলা শেখাতে শাস্তি দেয়া কতটা কার্যকরী

শাস্তি ছাড়াই কিভাবে শিশুকে শৃঙ্খলা শেখানো যায়?

শাস্তি না দিয়েও শিশুকে শৃঙ্খলা শেখানো যায়। অনেকের কাছেই মনে হতে পারে যে শুধু মুখে বলে হয়ত বাচ্চাকে সঠিক পথে আনা যায়না কিন্তু এটা একটি ভ্রান্ত ধারনা। একটু আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে শাস্তি না দিয়েই শিশুদের শৃঙ্খলা ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণ শেখানো সম্ভব।

দেখান ও শেখান

বাচ্চা কোন ভুল কিছু করলে তাকে শান্তভাবে তার ভুলটি ধরিয়ে দিন। কাজটি কিভাবে করলে ভালো হবে তা তাকে দেখিয়ে দিন। এভাবে করলে শিশু নিজের ভুল বুঝতে পারবে আবার কিভাবে সঠিক কাজ করবে তাও শিখতে পারবে।

নির্দিষ্ট সীমারেখা বেধে দিন

কিছু কিছু ব্যাপারে শিশুকে একটা সীমারেখা বেঁধে দিন। এই সীমা যেন অবশ্যই শিশুর বয়সের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। বাচ্চা যদি বেশি টিভি দেখতে চায় তবে সেক্ষেত্রে শুরু থেকেই একটু কঠোরতা অবলম্বন করে বাচ্চাকে সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে।

শিশুকে সময় দিন

বাচ্চাকে শাসন করেন তাতে কোন ক্ষতি নেই কিন্তু বাচ্চাকে শাসন করার আগে বাচ্চা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি বুঝতে হবে।আপনি যত ব্যস্ত থাকেন না কেন আপনাকে অবশ্যই আপনার সন্তানকে একটু সময় দিতে হবে।

শিশুরা চায় তাদের কথা সবাই শুনুক, তাদের কে বোঝার চেষ্টা করুক। বাচ্চাদের সাইকোলজি বড়দের থেকে ভিন্ন। তাদের চিন্তার জগতটাই অন্যরকম। তাদের ভুল কাজের সমালোচনা করার আগে তাদের মনোজগতের খবর নেয়াটা জরুরী।

তাদের ভাল কাজের প্রশংসা করুন

শিশুরা অনেকসময় বুঝতে পারেনা যে তারা কি ভাল কাজ করছে না খারাপ। তাদের ভুল ধরার পাশাপাশি তাদের ভাল কাজেরও প্রশংসা করতে হবে। তাদের উৎসাহ দিতে হবে যাতে তারা পরবর্তীতে এই ভাল কাজ আবারও করতে আগ্রহী হয়।

সবকিছু লক্ষ্য করবেন না

একটু বেশি মনোযোগ, একটু বেশি আদর পাবার জন্য অকারনে কান্না, রাগারাগি করাটা শিশুদের জন্য অদ্ভুত  কিছু নয়। সব কিছু ঠিকঠাক, তবু দেখবেন একটু নাকি কান্না, একটু অতিরক্ত আহ্লাদ করছে আপনার শিশুটি।

এসব ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ওদের এই ব্যাবহারগুলো পুরপুরি উপেক্ষা করুন। শুনতে একটু কঠোর মনে হলেও এটা ওদের ভবিষ্যতের জন্য ভাল একটা পদক্ষেপ। বাচ্চাদের এইসব ব্যাবহারে যদি আপনি ওদের মনোযোগ দেন তাহলে এই ব্যাবহার আর বাড়তি মনোযোগ আদায়ের জন্য এর পরেও করবে।

একটা সময় যখন ওরা এসব করে চুপ হয়ে যাবে তখন ওকে নিয়ে খেলতে পারেন বা বাইরে যেতে পারেন। ম্যাসেজটা খুব পরিষ্কার, হইচই কান্নাকাটি করে বাড়তি মনোযোগ পাওয়া যাবে না।

মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়া

অনেকসময় বাচ্চারা কিছু করার না পেয়ে দুষ্টুমি করতে থাকে। হয় সে খেলার কিছু পাচ্ছেনা অথবা তার হয়ত ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগছেনা এরকম হতে পারে। এরকম ক্ষেত্রে বাচ্চার মনোযোগ অন্যদিকে নেয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। বাচ্চার সাথে খেলতে পারেন, তাদের গল্প শোনানো যায় কিংবা বাগানের কাজে তাদেরকে ব্যস্ত রাখা যেতে পারে।

অপেক্ষাকৃত বেশী সমস্যাযুক্ত ব্যবহারগুলো নিয়ে আগে কাজ করুন

আপনার শিশুর সাথে প্রতিদিনকার সকল যুদ্ধ যদি আপনি একসাথে জিতে নিতে চান তাহলে কিন্তু কোনোটারই ঠিকঠাক সমাধান হবে না। নিয়মকানুনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে অবশ্যই আপনাকে বেছে বেছে সমস্যা ধরে এগুতে হবে। যদি আপনার পরিকল্পনায় অনেক বেশী নিয়মকানুন ও তার উপযোগী শাস্তির ব্যাবস্থা রাখেন, তাহলে গন্ডগোল পাকিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

আপনার শিশুর আচার-আচরণে যদি অনেক বেশীই সমস্যা থাকে সেক্ষেত্রে বেছে বেছে অপেক্ষাকৃত বেশী সমস্যাযুক্ত আচরণ নিয়ে প্রথমে কাজ শুরু করুন। ছোট-বড় সব সমস্যা একসাথে ঠিক করতে চাইলে শিশুর পাশাপাশি একসময় আপনিও ক্লান্ত হয়ে পড়বেন এবং এক পর্যায়ে ধারাবাহিকতা ভেঙে যাবে।

নিয়মকানুনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিক থাকুন

যে নিয়ম কানুন গুলো আপনি চাইবেন যেন আপনার শিশুর অভ্যাসে পরিণত হোক, সেগুলোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট এবং ধারাবাহিক থাকুন। যেমন আপনি যদি চান যে দুপুরের খাবারের পর আপনার শিশু ঘুমিয়ে যাক, সেক্ষেত্রে এটা সবসময়ই মেনে চলুন। যদি সে ঘুমুতে না-ও চায়, তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিন।

যদি রাতের খাবারের পর কার্টুন দেখা মানা হয়ে থাকে, সেটা যেন সবসময় মানা-ই থাকে। আপনি যদি ‘শুধু আজকেই’ তাকে দেখতে দেন যাতে আপনি হাতের একটা কাজ শেষ করে নিতে পারেন তাহলে কিন্তু আগামীকালও সে ডিনারের পর কার্টুন চেয়ে বসবে, এমনকি তার পরের দিন এবং তার পরের দিনও।

খেলাধুলার সুযোগ করে দিন

এই বয়সের শিশুরা সবসময়ই দৌড়ের উপর থাকতে পছন্দ করে। এটা নিশ্চিত করুন যাতে সে দিনে দৌড়াদৌড়ি অর্থাৎ শারিরীক কার্যকলাপের জন্যে যথেষ্ট সময় পায়। যদি না সে ঘুমিয়ে থাকে, টানা এক ঘন্টার বেশী শিশুকে কোন কাজ ছাড়া বসিয়ে রাখা ঠিক না। আপনার শিশু যত সক্রিয় থাকবে, তা তার মাংসপেশী তত সুগঠিত, নিয়ন্ত্রিত থাকবে।

আপনার শিশুর সাথে এমন খেলায় অংশ নিন যেখানে আপনিও সক্রিয় ভূমিকায় থাকবেন৷ যেমন আপনার শিশুর দিকে একটা বল ছুড়ে মারুন, তাকেও বলুন আপনার দিকে ছুড়ে মারতে। এই খেলার মাধ্যমে আপনার শিশু আত্মনিয়ন্ত্রণটা শিখে যাবে।

আপনার শিশু যখন বুঝে যাবে যে সে শারিরীকভাবে কোন কিছু করার জন্য দক্ষ হয়ে উঠেছে, এটা তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। আর সে যত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে, তার ব্যবহারও তত সুন্দর ও গোছানো হয়ে যাবে।

কিছু সময়ের জন্য করুন “সময় বন্দী”

এই ব্যাপারটা বহুযুগ ধরেই শিশুদের শাসন করতে ব্যাবহার হচ্ছে। শুধু স্থান, কাল ভেদে নামটা ভিন্ন। পশ্চিমা দেশগুলোতে এটা “টাইম-আউট” নামে খুবই পরিচিত। কোন রকম বকাঝকা না করে বাচ্চাদের শাসনে এটা মায়েদের এক মস্ত হাতিয়ার।

আপনিও এটা করতে পারেন। ছোটোখাটো দুষ্টুমির জন্য ওকে বাড়িরই কোন ঘরে বা নিরিবিলি কোনে কিছু সময়ের জন্য বসিয়ে রাখতে পারেন। কিন্ত একটা ব্যাপারে খুব সাবধান। ওই ঘরটা যেন ওর জন্য একদম নিরাপদ হয়। আঘাত পেতে পারে বা ওর ক্ষতি হতে পারে এমন কিছুই ওই ঘরে রাখা যাবে না।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

সাধারানত বাচ্চাদের যত বয়স তত মিনিট বসিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।তারমানে, আপনার বাচ্চার বয়স দুই বছর হলে ওকে খুব বেশি হলে দুই মিনিট এভাবে বসিয়ে রাখুন।

নিজের যত্ন নিন

যত কঠিনই হোক, নিজের জন্যে, শুধুমাত্র নিজের জন্যে প্রতিদিন কিছু সময় বরাদ্দ রাখুন। ঘরটা সবসময়ই সম্পূর্ণ গোছানো হতে হবে কিংবা রাতের খাবারটা সবসময়ই খুব ভালো হতে হবে এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন৷ অনেক রাত হয়ে গিয়েছে, আপনিও খুব টায়ার্ড এদিকে রান্নাঘরটা ময়লা হয়ে আছে, থাকুক না! খুব বেশী ক্ষতি হয়ে যাবে কি!

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, শিশু যখন ঘুমিয়ে থাকবে এর মাঝে আরাম করে গোসলটা সেড়ে ফেলুন। রাতে যখন আপনার শিশু ঘুমিয়ে থাকবে, রাতটা পুরোপুরি আপনার পার্টনারের সাথে কাটান, নিজের আয়েশের জন্যে রাখে দিন।

সবচেয়ে বেশী যেটা জরুরি, নিজের কিছু রিল্যাক্সিং পয়েন্ট বের করুন। হতে পারে সেটা আপনার পার্টনারের সাথে কথা বলা, বন্ধুবান্ধবদের সাথে থাকা, আপনার মায়ের সাথে কথা বলা বা যেকোন কিছু যা তাৎক্ষণিক আপনাকে রিল্যাক্স করবে, আপনার মুখে হাসিটা ধরে রাখবে। আপনি যখন সুখে থাকবেন, আপনার মেজাজ যখন ঠিক থাকবে, আপনার শিশুও এর দ্বারা উপকৃত হবে, সঠিক আদর ও সেবা পাবে।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment