গর্ভাবস্থায় মুড সুইং বা মেজাজের ওঠানামা

Updated on

ইদানীং আপনি এত বিষণ্ণ থাকেন কেন?

অবসাদ, মানসিক চাপ এবং শরীরের বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তনের কারণে গর্ভকালীন সময়ে মুড সুইং করাটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। তবে আপনি মা হতে যাচ্ছেন অচিরেই, তাই অন্যান্য আরো অনেক নতুন অনুভূতির স্বাদ পাবেন এই সময়ে।

এই ধরনের পরিবর্তনের সময়ে একেকজনের মধ্যে একেক ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। কিছু মায়েরা এই সময়ে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের আবেগের ক্ষেত্রেই একটু অতিরিক্ত মাত্রায় আবেগ অনুভব করেন। অন্য মায়েদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের মধ্যে অতিমাত্রায় হতাশা অথবা উদ্বেগ দেখা যায়।

অনেক মায়েরা ৬ষ্ঠ সপ্তাহ থেকে ১০ম সপ্তাহ পর্যন্ত এই ধরনের আবেগ অনুভব করেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার থেকে এগুলো ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে আসতে থাকে। তবে এই মুড সুইং এর ব্যাপারটা প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে আবার দেখা যায়।

গর্ভকালীন সময়টা মায়েদের জন্য বেশ মানসিক চাপের একটা বিষয়। হুট করে দেখা যাবে আপনি মা হতে যাচ্ছেন এটা ভেবে আপনার খুবই ভালো লাগছে আবার পরক্ষনেই নিজের মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টা আপনাকে একটু অবাক করতে পারে। এছাড়া আপনি কি ভালো মা হতে পারবেন কি না, আপনার শিশু কি সুস্থ এবং স্বাভাবিক হবে কি না অথবা নতুন শিশু আগমনের কারণে যে বাড়তি খরচ হবে সেটা কি পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে মানাবে কি না এই ধরনের যাবতীয় চিন্তায় আপনি হয়ত একটি ভীত হয়ে উঠতে পারেন।

আবার নবজাতক শিশুর কারণে সঙ্গীর সাথে আপনার সম্পর্ক কি আগের মত থাকবে কি না অথবা ঘরের অন্য শিশুদের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন হবে এই ধরনেই চিন্তাও আপনার মাথায় জেঁকে বসতে পারে। কেননা, আপনি হয়ত একটু ভয় পাচ্ছেন যে নবজাতক শিশুর বাড়তি যত্ন নিতে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের দিকে আপনি ঠিকমত মনোযোগ দিতে পারবেন কি না।

আপনার গর্ভধারণ করার বিষয়টি যদিও একদম পূর্ব পরিকল্পিত হয়ে থাকে তবুও আগামীতে কি হতে যাচ্ছে এইসব নিয়ে আপনি অনেক উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে পারেন। যেহেতু বাবা মায়েদের উপর অনেক বেশি প্রত্যাশার চাপ থাকে তাই এই ধরনের মিশ্র অনুভূতির বিষয়টি একদমই অবাক করার মত কিছু নয়। এমনকি শিশুর জন্মের আগে থেকেই এই ধরনের মানসিক চাপ মায়েদের মধ্যে বিরাজ করে।

প্রতিনিয়তই আপনি হয়ত উদ্বিগ্ন হবে যে, আপনি সঠিক বইটা পড়ছেন তো? আপনি সঠিক পণ্যটি কিনতে পারছেন তো? এছাড়া শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বাড়তি যত্নের বিষয়ে সবকিছু আপনার জানা আছে কিনা এ নিয়েও অনেক চিন্তা আপনার মাথায় জেঁকে বসতে পারে।

ইতোমধ্যে আপনার শরীরে যে সমস্ত পরিবর্তন আসছে সেগুলোর কারণে আপনাকে হয়ত খারাপ লাগছে এমন চিন্তা ও আপনার মধ্যে আসতে পারে। বিশেষ করে আপনি যদি আগে থেকেই ব্যায়াম করতেন এবং স্বাস্থ্য সচেতন হন তাহলে গর্ভকালীন সময়ে অতিরিক্ত ওজনের জন্যও আপনার কাছে খারাপ লাগতে পারে।

এছাড়া গর্ভকালীন আরো কিছু লক্ষণ যেমন বুক জ্বালাপোড়া করা, অবসাদ এবং অতিরিক্ত প্রস্রাব হওয়াও আপনার মধ্যে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া এই গর্ভকালীন সময়ে নিজের শরীরের উপর এবং জীবনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন এই ধরনের চিন্তা আসাটাও একদম অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর এই সকল যাবতীয় উদ্বেগ আপনার চিন্তা ভাবনা এবং আবেগের মধ্যে অনেক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসবে এটাই স্বাভাবিক।

মুড সুইং এর বিষয়টা আপনি কিভাবে মানিয়ে চলবেন? 

নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিন যে এই গর্ভকালীন সময়ে এই ধরনের অনুভূতি হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। একটা বিষয় প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে, নিজের সঠিক ভাবে পরিচর্যা এবং সচেতনতা এই সময়ে আপনাকে শান্ত থাকতে সাহায্য করবে।

সবকিছু সহজ ভাবে নিন। নবজাতক শিশু আগমনের আগেই অনেক কিছু আপনাকে গুছিয়ে নিতে হবে এই ধরনের মানসিক তাড়না থেকে নিজেকে প্রতিহত করুন। অফিস থেকে গর্ভকালীন ছুটি নেয়ার আগে আপনার হয়ত মনে হতে পারে যে এখন অনেক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার। তবে এই ধরনের চিন্তা করবেন না বরং আপনার করনীয় কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বেছে আলাদা করে ছুটি নেয়ার আগে শুধুমাত্র সেগুলোই করে নিন। কেননা এই সময়ে নিজেকে প্রাধান্য দিয়ে নিজের যত্ন করাটাই আদতে শিশুর যত্ন নেয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার সঙ্গীর সাথে আপনার অনুভূতিগুলো শেয়ার করুন। কেননা সঙ্গীর সাথে নিজের সব অনুভূতিগুলো শেয়ার করার মাধ্যমেই আদতে আপনি নিজেদের বন্ধন আরো মজবুত করে নিচ্ছেন। এই সময়ে আপনার সঙ্গীর সাথে অনেক বেশি করে সময় অতিবাহিত করুন, প্রয়োজনে অফিস থেকে ছুটি নিন দুই একদিনের জন্য। এখনই আপনাদের দুইজনের সম্পর্ক অনেক সুন্দর ও মজবুত করে তুলুন যেন নবাগত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর একে অপরকে সাহায্য করতে পারেন।

আপনি যদি একা হন তাহলে আপনার পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে সম্পর্ককে সুন্দর করে তোলার ব্যাপারে সচেষ্ট হন। অথবা আপনার মত আরো যারা সিঙ্গেল মা তাদের সাথে সময় অতিবাহিত করুন, কেননা এটা আপনাকে এখন এবং পরবর্তীতে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর একা একা সন্তান বড় করার ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য করবে।

এমন কিছু করুন যেটা করলে আপনার ভালো লাগবে। এর মানে হতে পারে সঙ্গীর সাথে অন্তরঙ্গ সময় পার করার জন্য কিছু সময় আলাদা করে রাখুন। অথবা আপনি নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করুন একটু ঘুমিয়ে নিন, একটু হেঁটে আসুন অথবা বন্ধুদের সাথে হলে গিয়ে একটা মুভি দেখে আসুন।

নিজের অনুভূতিগুলো কারো সাথে শেয়ার করুন। ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের যে উদ্বেগ, সেগুলো নিয়ে আপনার কোন কাছের বন্ধুর সাথে আলাপ করুন। নিজের উদ্বেগগুলো ভাষায় প্রকাশ করে ফেলাটাই অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধানের জন্য এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং সঙ্গীর কথাগুলো জানার সাথে সাথে আপনার এবং সঙ্গীর মধ্যে অনুভূতি শেয়ার করার বিষয়টা নিয়ে সচেষ্ট থাকুন। খেয়াল রাখবেন যেন এই অনুভূতি শেয়ারের ব্যাপারটা যেন শুধুমাত্র এক পাক্ষিক না হয় বরং দুইজনেই যেন সমান ভাবে আপনাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন/

মানসিক চাপগুলো নিয়ন্ত্রণ করুন। গর্ভকালীন সময়ে নিজের হতাশাগুলো খুব বেশি বাড়তে না দিয়ে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপার সচেষ্ট হন। এই সময়ে ঘুম, খাওয়া দাওয়া, ব্যায়াম এমনকি আনন্দের সময়ও যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। নিজের মধ্যে হতাশার কারণগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করুন এবং যতটুকু সম্ভব হয় পরিবর্তন নিয়ে আসুন। উদাহরণ সরূপ বলা যেতে পারে, নিজের সম্ভাব্য কাজগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বেছে আলাদা করে নিন।

এরপরেও যদি আপনার উদ্বেগের পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয় তাহলে গর্ভকালীন সময়ের জন্য বিশেষ ইয়োগা ক্লাসে ভর্তি হতে পারেন, মেডিটেশন করতে পারেন অথবা নিজেকে শান্ত রাখার অন্যান্য পন্থাগুলো অবলম্বন করতে পারেন। প্রয়োজনে একজন প্রফেশনাল কাউন্সিলরের সাথে আলাপ করতে পারেন।

নিজের মুড সুইং কোনভাবেই যদি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারেন  

আপনার মুড সুইং যদি আরো বেশি পরিমাণে বাড়তে থাকে এবং প্রায়শই হতে থাকে তাহলে আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন। একজন ভালো কাউন্সিলরের ব্যাপারে আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন এবং কাউন্সিলরের সাথে যোগাযোগ করুন। শতকরা ১৪ থেকে ২৩ শতাংশ নারী গর্ভকালীন হতাশার মধ্যে দিয়ে যান এবং আপনিও হয়ত তাদের মধ্যে একজন।

আপনি যদি দেখে থাকেন যে মুড সুইং আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রচুর পরিমাণে বাঁধা দিচ্ছে তাহলে আপনি হয়ত anxiety disorder এ ভুগছেন। এবং আপনার এই মুড সুইং যদি অনেক বেশি পরিমাণে হতে থাকে এবং অনেক প্রকট আকার ধারণ করে তাহলে আপনি হয়ত bipolar disorder এ ভুগছেন। এমতাবস্থায় আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন তিনি অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন।

আপনার যদি কোন কারণে মনে হয় আপনি এ জাতীয় সমস্যায় ভুগছেন তবে গর্ভাবস্থাতেই এর চিকিৎসা করানো জরুরী। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে মানসিক সমস্যার চিকিৎসা করা না হলে তা গর্ভের বাচ্চার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর কারণে প্রি-টার্ম লেবার এবং প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts