সপ্তাহ ২৬ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ২৬ সপ্তাহে  আপনার গর্ভের শিশুর ওজন প্রায় ২ পাউন্ড হবে এবং তার দৈর্ঘ্য হবে পুরোপুরি ১৪ ইঞ্চি। শিশুটি এখন মুখ দিয়ে অল্প অল্প অ্যামনিওটিক তরল গিলবে আবার মূত্র হিসেবে সেই তরল বেরও করে দেবে। এই অ্যামনিওটিক তরলের মধ্যেই শিশুটি ভেসে থাকে এবং তার ফুসফুসের পরিপক্কতার জন্য এই তরল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এবং তার ঢোক গেলার অনুশীলন জন্মের পর প্রথমবারের মতো যখন সে শ্বাস নেবে তখন অনেক সহায়ক হবে।

গর্ভাবস্থার ২৬ সপ্তাহের শুরু নাগাদ শিশুটি প্রথমবারের মতো তার চোখ খুলবে। এসময় তার চোখের মণির রঙ থাকবে নীল বা গাঢ় নীল। তবে অনেক শিশুরই জন্মের সময় চোখের মণি নীল না হয়ে বাদামী হতে পারে। জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার চোখের মণি স্থায়ী বর্ণ ধারণ করবে।

আপনার গর্ভের শিশুটি যদি ছেলে হয় তাহলে এ সপ্তাহে তার অণ্ডকোষ পেটের দিক থেকে নিচে নামতে শুরু করবে এবং অণ্ডথলির অবস্থানে যাবে। তবে এর পূর্ণ বিকাশের জন্য আরো ২ থেকে ৩ দিন সময় লাগবে।শিশুটি এখন অনেক একটিভ থাকবে এবং আপনি তার নড়াচড়া টের পাবেন।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

এ সময় আপনার হজমের সমস্যা এবং বুক জ্বালাপোড়া করা আগের চাইতে বেশি হতে পারে। তাছাড়া, এখন আপনি একবারে বেশি খেতেও পারবেন না, কারণ শিশুটি আকারে বড় হয়ে ওঠার কারণে আপনার পাকস্থলীরও কিছুটা জায়গা কমে গেছে। এখন আপনি অল্পতেই খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। প্রতিদিনের টুকটাক কাজ, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কিংবা নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা – এসব কাজ একসাথে করতে গেলে তাল রাখাটাও কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে যেন বিশ্রামের ঘাটতি না হয়। আর যেহেতু একবারে বেশি খেতে পারবেন না, তাই একটু পর পর অল্প পরিমাণে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার খান। যদি আপনার একার জন্য সব কাজ করা একান্তই কঠিন মনে হয়, কিংবা যদি সামলে উঠতে না পারেন, তাহলে নিজেকে একটু ছুটি দিন আর কাছের কোনো মানুষকে বলুন আপনার হয়ে কাজটা করে দিতে। ক্লান্তিবোধ কমানোর জন্য আপনি কি কি করতে পারেন সে সম্পর্কে আরো জানুন।

বিগত কয়েক সপ্তাহের চাইতে এখন আপনার রক্তচাপ একটু বেশি থাকতে পারে। সাধারণত প্রথম ত্রৈমাসিক পর্যায়ের শেষের দিক থেকে রক্তচাপ কমতে থাকে এবং ২২ সপ্তাহ নাগাদ রক্তের চাপ সবচেয়ে কম থাকে। ২৬ সপ্তাহ থেকে রক্তচাপ আবার স্বাভাবিক হতে থাকে। যদি রক্তচাপ হঠাৎ করে বেড়ে যায় এবং আপনি দেখেন যে আপনার পা, মুখ, চোখ ফুলে যাচ্ছে, আপনি ঝাপসা দেখছেন এবং প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা করছে, তাহলে এটা প্রি-এক্লেম্পশিয়া’র লক্ষণ হতে পারে। এরকম হলে আপনাকে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

যদিও গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস মানেই বড়ো কোনো বিপদ নয়, তারপরও এর ফলে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে, এবং গর্ভের শিশুর উপরও ক্ষতিকর প্রভাব পরতে পারে। যেসব মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ( Gestational Diabetes ) থাকে তাদের গর্ভের শিশু আকারে বড় হয় এবং সিজারিয়ান সেকশনের ( Caesarean section) মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে হয় । জন্মের পর পরই সেই শিশুর রক্তে গ্লুকজের পরিমাণ কমে যাবার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ডায়াবেটিক মা কে তখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হয়। কখনো কখনো সেটা জন্মের আধা ঘণ্টার মধ্যেও হতে পারে ।

পেট বড় হবার কারণে যেহেতু আপনার পেটের পেশীগুলোতে টান পড়ছে, আপনার পিঠের নিচের দিকে মৃদু ব্যথা হতে পারে। আপনার বর্ধিষ্ণু জরায়ুর কারণে এখন শরীরের ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে আপনার পেটের পেশীগুলো এখন সচল থাকার জন্য আরো বেশী কাজ করতে থাকবে। এছাড়াও আপনার শরীর রিলাক্সিন নামক একটা হরমোন নিঃসরণ করবে যা আপনার পেশী এবং লিগামেন্টগুলোকে শিথিল করে জরায়ুকে বিস্তৃত হতে সাহায্য করবে। আপনার শিশুর কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ওজন এই ব্যথাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে এবং দিনশেষে আপনি প্রচণ্ড পিঠের ব্যথা অনুভব করবেন।

২০তম সপ্তাহ থেকেই হঠাৎ হঠাৎ আপনার জরায়ুর পেশী কুঁচকে যাওয়ার মতো অনুভূতি শুরু হতে পারে, তবে এতে কোনো ব্যথা থাকবে না। এটাকে বলা হয় Braxton hicks contraction ( এটাকে  practice contractions ও বলা হয়) । কিন্তু যদি পেশীর এই সঙ্কোচনভাব বেশি বেশি হয় এবং সাথে ব্যথাও থাকে, তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ কারণ এটা সময়ের আগেই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

খাওয়ার পর পরই বুক জ্বালা-পোড়া করা বা বদহজমের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফুলে যেতে পারে। এসময় অনেকের মাড়ি ফুলে যাওয়ার সমস্যাও হয়ে থাকে, ফলে দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেয়া জরুরি।

আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের ভাব এখনই দূর হয়ে যাবে না। এ সময় প্রচুর পানি খাওয়া আপনার জন্য উপকারী হবে। এতে করে মূত্রনালির কোনো সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে তাও কমে যাবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

একজায়গায় বেশিক্ষণ বসে বা দাঁড়িয়ে থাকবেন না। সম্ভব হলে একটু পর পর অল্প জায়গার মধ্যেই হাঁটুন। আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসুন বা দাঁড়ান। এমন কাজ না করাই ভালো যেখানে আপনাকে ঝুঁকতে হবে বা শরীর মোচড় দিতে হবে। পিঠে বেশি ব্যথা হলে আরামের জন্য তোয়ালে পেঁচিয়ে হট-ওয়াটার ব্যাগ পিঠের নিচে দিয়ে রাখতে পারেন। বাম কাত হয়ে ঘুমান এবং শোয়ার সময় দুই পায়ের ফাঁকে এবং পেটের নিচে বালিশ দিয়ে নিন। পিঠের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যান্য উপায়গুলো সম্পর্কে জানুন।

আপনি কি খেয়াল করেছেন যে আপনার জুতোগুলো আর পায়ে লাগছে না? তার কারণ রিলাক্সিন হরমোন আপনার পায়ের পাতার লিগামেন্ট আর পায়ের সংযুক্তিগুলোকে শিথিল করে দিয়েছে এবং এর ফলে পায়ের মাপ একটু বড় হয়ে গেছে। আপনি হয়তো খেয়াল করলে দেখবেন যে আপনার পায়ের জন্য এখন আধা ইঞ্চি বড় জুতোর প্রয়োজন হবে।

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থায় নানা শারীরিক সমস্যা হয়। এ সময় হতে পারে পিঠে ব্যথা, রাতে ঘুম না হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি। ব্যায়ামের উপকারিতা এখানেই। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পিঠে ব্যথা কমে যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমিয়ে ব্যায়াম রাতে ঘুম আনতে সাহায্য করে। শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে চেহারায়।হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য এ সময় জয়েন্ট শিথিল হয়ে যায়। তাই হাত, পায়ে ব্যথা হতে পারে। ব্যায়াম করলে জয়েন্টের ভেতর যে লুব্রিকেটিং ফ্লুইড থাকে, তার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হাত, পায়ের ব্যথা কমায়।ব্যায়াম শরীরের নিম্নাংশের মাসল টোন করে শরীরকে ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত করে। মাসলকে শক্তিশালী করে ডেলিভারির সময় লেবার পেইন কমায়।গর্ভধারণের পর শরীরে অনেক পরিবর্তন হয়। এগুলো অনেক সময় মেনে নিতে কষ্ট হয়; তাই মন-মেজাজ ভালো থাকে না। ব্যায়াম করলে ব্রেনে এক ধরনের কেমিক্যাল নিঃসৃত হয় যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে মুড ভালো রাখে। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ব্যায়াম করলে বাচ্চা হওয়ার পর দ্রুত বেড়ে যাওয়া ওজন কমে যায়।তবে যে ধরনের ব্যায়ামই করুন না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে কোনো ব্যায়াম শুরু করবেন না।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৫
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৭ >>

 

তথ্যসূত্রঃ

www.maya.com.bd/content/web/wp/1927/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment