শিশুর গড়ে ওঠা ঘুমের অভ্যাসের হঠাৎ পরিবর্তন বা স্লীপ রিগ্রেশন

Updated on

স্লীপ রিগ্রেশন আসলে কি?

ঠিক যখনই আপনি নিয়মিত ঘুমাতে পারছিলেন, তখনই ব্যাপারটা ঘটল—দেখা যাচ্ছে আপনার নিয়মিত ঘুমানো শিশু প্রায় সময়েই রাতে ঘুম থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করছে, রাতে ঠিকমত ঘুমাচ্ছে না অথবা অসময়ে ঘুম থেকে উঠে যাচ্ছে এবং আর ঘুমাতে যেতে চাচ্ছে না। প্রায় অনেক শিশুকেই এই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটাকেই স্লিপ রিগ্রেশন বলে।

যখন দেখা যায় শিশু হুট করেই কিছুদিন ধরে ঘুমাচ্ছেনা অথচ সে আগে বেশ ভালোভাবেই ঘুমাত, সাধারণত এগুলোকেই বলে শিশুর হঠাৎ ঘুমের অনিয়ম বা স্লিপ রিগ্রেশন। এটা কোন বৈজ্ঞানিক অথবা ডাক্তারি ভাষা না হলেও, এই শব্দটি আপনারা সাধারণত বাবা-মা’দের থেকে, ঘুম বিশেষজ্ঞদের থেকে এবং এমনকি শিশু বিশেষজ্ঞদের থেকেও শুনে থাকতে পারেন।

শিশু বড় হতে থাকলে তার ঘুমের সময় এবং রুটিনও পরিবর্তন হতে থাকে—তবে এগুলো খুবই সাময়িক। অনেকের মতে শিশুর দৈনন্দিন রুটিনে যখন কোন ধরনের পরিবর্তন আসে তখনই শিশুর ঘুমের অনিয়ম হয়। যেমন শিশু যদি ছুটিতে কোথাও ঘুরতে যায়। আবার শিশু যখন নতুন কিছু দক্ষতা অর্জন করে, যেমন শিশুর দাঁড়ানো, হাঁটা অথবা হামাগুড়ি দেয়া শেখে তখনই তার ঘুমের অনিয়ম হতে পারে।

সাধারণত শিশুর এমন ঘুমের অনিয়ম নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়, তবে কখনো শিশুর ঘুমের অনিয়ম ঠিক করার জন্য আপনাকেও শিশুর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হতে পারে। আর এমনই সাহায্যের মধ্যে অন্যতম একটা হল, শিশুর জন্য ঘুমের প্রশিক্ষণ। 

আপনার শিশুর নিয়মিত ঘুমের হঠাৎ অনিয়ম বা স্লীপ রিগ্রেশন কখন শুরু হতে পারে?

সব শিশুর ক্ষেত্রেই কিন্তু ঘুমের অনিয়ম হয় না, কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, সে খুব সহজেই রাতে ঘুমিয়ে যাচ্ছে এবং সারারাত একবারের জন্যও জেগে উঠে না এবং এ নিয়মের তেমন একটা পরিবর্তন হয়না। তবে কিছু কিছু বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৪ মাস, ৯ মাস এবং ১ বছরের সময়ে বাবা মা’রা শিশুর মধ্যে ঘুমের অনিয়ম পরিলক্ষিত করেন।

শিশুর শৈশব এবং বাল্যকালের যে কোন সময়েই ঘুমের অনিয়ম দেখা যেতে পারে, তবে সাধারণত নবজাতক শিশুর মধ্যে ঘুমের তেমন কোন অনিয়ম পরিলক্ষিত করা যায় না। কেননা নবজাতক শিশুর ঘুমের নির্দিষ্ট কোন রুটিন থাকে না। প্রথম তিন মাস বয়সের সময় শিশু সাধারণত একটানা এক থেকে চার ঘণ্টা ঘুমায় এবং রাতের বেলায় খাওয়ার জন্য প্রায়ই তার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

[ আরও পড়ুনঃ জন্ম থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর ঘুমের ধরণ ও করণীয় ]

শিশু তিন মাস থেকে পাঁচ মাস বয়সের সময় সাধারণত রাতের বেলায় একটু বেশি ঘুমায় এবং একটানা প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকলেও প্রায়শই জেগে উঠতে পারে। শিশু সাধারণত ছয় থেকে নয় মাস বয়সের সময় সারারাত একটানা ঘুমানো শিখে যায়। তবে এটা আসলে নির্ভর করে আপনার শিশুর উপর এবং আপনি তার ঘুমের সঠিক অভ্যাসের উপরে গুরুত্ব দিয়েছেন কি না তার উপর।

[ আরও পড়ুনঃ ৬ থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর ঘুমের ধরণ ও করণীয় ]

শিশুর ঘুমের অনিয়মের কারণ কি?

শিশুর ঘুমের অভ্যাস অনেক কারণেই পরিবর্তন হয় এবং কিছুদিন ভালো ঘুমালেও আবার অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে। ঘুমের অনিয়মের বেশ কিছু সাধারণ কারণ নিম্নে বর্ণিত হলঃ

ঘুমের সময়ের পরিবর্তনঃ তিন থেকে ছয় মাস বয়সের সময় শিশুরা সাধারণত দিনে বেশি জেগে থাকতে এবং রাতে লম্বা সময় ঘুমানো শিখে যায়। এই সময় তাদের ঘুমের সাইকেল ও অনেকটা বড়দের মত হয়ে যায়, অর্থাৎ রাতে ঘুমের সময় ঘুমের হালকা ও গভীর ঘুমের পর্যায় শুরু হয়। কিন্তু এই পর্যায়গুলো পরিবর্তনের সময়গুলোতে শিশুর ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে এবং সে সময় সে নিজে থেকে আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারেনা। আমরা বড়দেরও কিন্তু রাতে এই কারণে বেশ কয়েকবার ঘুম ভাঙ্গে কিন্তু আমরা পরমুহুরতেই আবার ঘুমিয়ে পরি এবং তা আমাদের সকাল বেলা মনেই থাকেনা।

শিশু যখন তার মাইলস্টোনগুলো অতিক্রম করেঃ শিশু যখন নতুন কোন ধরনের ক্ষমতা অর্জন করে, যেমন সে যখন দাঁড়ায়, হামাগুড়ি দেয় অথবা হাঁটা শিখে তখন তার মধ্যে বাবা-মা’রা ঘুমের অনিয়ম পরিলক্ষিত করে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সময়টাতে শিশু তার নতুন অর্জন করা ক্ষমতা চর্চা করতে সবসময় ব্যস্ত থাকে, এমনকি রাতের বেলাতেও সে এই চর্চা অব্যাহত রাখতে চায়। এমনকি শিশু যখন নতুন নতুন দাঁড়াতে শিখে তখন রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে তার বিছানার কার্নিশ ধরে দাঁড়ায় এবং সে তখন কান্না শুরু করে। কেননা শিশু তখনও জানে না কীভাবে আবার সে নিচে বসবে অথবা আবার শুয়ে পড়বে। 

আবহাওয়া পরিবর্তনের সময়ঃ শিশুর চারপাশে সামান্য যে কোন পরিবর্তনের কারণেও তার ঘুমের অনিয়ম হতে পারে। আবহাওয়া পরিবর্তন শিশুর রুমের তাপমাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে, যেটা রাতের বেলায় তাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। এমনকি রাতের বেলায় পাশের বাসা থেকে শিশুর রুমের মধ্যে আসা ক্ষীণ আলোর কারণেও সে সারারাত জেগে থাকতে পারে।    

বাবা-মা থেকে দূরে চলে যাওয়ার উদ্বেগ বা সেপারেশন অ্যাঙ্গযায়েটিঃ   ছয় থেকে বারো মাস বয়সের সময় শিশুরা সাধারণত বুঝতে শিখে যে সে আপনার থেকে আলাদা অথবা আপনি কখনো তার থেকে দূরে চলে যাচ্ছেন। আর তাই যখনই আপনি অথবা আপনার সঙ্গী শিশুর রুম থেকে বের হয়ে যান তখনই সে উদ্বিগ্ন হয়ে পরে।

দূরে চলে যাওয়ার এই উদ্বেগ সাধারণত দশ থেকে আঠারো মাস বয়সের সময় খুব বেড়ে যায় এবং দুই বছর পার হয়ে গেলে যে কোন কাজে আপনার দূরে চলে যাওয়াকে শিশু স্বাভাবিক ভাবে নেয়। কেননা সে তখন বুঝতে শিখে যে, একটু পরে আপনাকে সে আবার দেখবে।

শিশু রাতের বেলায় হয়ত জেগে যেতে পারে, কান্না করতে পারে এবং তার বিছানা টপকিয়ে নিচে নেমে যেতে পারে অথবা আপনার সাথে ঘুমাতে চাইতে পারে। জেনে রাখা ভালো যে, আপনার থেকে দূরে চলে যাওয়ার এই উদ্বেগ শিশুর মানসিক পরিপক্বতার খুব স্বাভাবিক একটা অংশ। 

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর সেপারেশান অ্যাংযাইটি । নিরাপত্তাহীনতা । প্রিয়জনকে হারাবার ভয় ]

শিশুর দৈনন্দিন রুটিনে যে কোন ধরনের পরিবর্তনঃ আপনারা সবাই মিলে যখন কোথাও ঘুরতে যান, স্বভাবতই আপনার শিশুটি অন্যান্য সময়ের তুলনায় একটু দেরি করে ঘুমাতে পারে। আবার দেখা যেতে পারে আপনার শিশু একটু অসুস্থ অথবা রাতের বেলায় বারবার তার কাছে যেয়ে আদর করে আসার বিষয়টাতে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। প্রতিদিনের এই ধরনের যে কোন রুটিনে অল্প পরিবর্তন আসলে সাময়িকভাবে আপনার শিশুর ঘুমের কিছুটা সমস্যা হবে।

শিশু যদি ঠিকমত না ঘুমায় তাহলে কি আপনি উদ্বিগ্ন হবেন?

সাধারণত এর উত্তর হল, না! শিশুর প্রথম কয়েক বছরে এই ধরনের ঘুমের টুকটাক অনিয়ম একদমই স্বাভাবিক একটা বিষয়। এছাড়া অন্য কারো শিশু ছয় মাস বয়সে সারারাত ঘুমাচ্ছে, তার মানে এই না যে আপনার শিশুও ঠিক তেমন করে ঘুমাবে। কেননা কোন কোন শিশুর ঘুম খুব সহজেই ভেঙ্গে যায় এবং তাদেরকে কোন একটা ঘুমের রুটিনে নিয়ে আসাটা বেশ খানিকটা কষ্টকরই বটে।

যাই হোক, শিশুর স্বাস্থ্যগত কোন কারণেও কিন্তু ঘুমের এই অনিয়ম হতে পারে। যদি আপনার শিশুর বয়স ছয় মাসের বেশি হয় এবং রাতের বেলা বেশ কয়েকবার করে জেগে উঠে তাহলে বিষয়টা আপনার শিশুর ডাক্তারকে অবহিত করুন। শিশুর শারীরিক কোন সমস্যা না থাকলে ডাক্তার আপনাকে সেটা জানাবে এবং যদি ঘুমের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন থাকে সেই ব্যাপারে আপনাকে বলবেন।

শিশুর স্বাস্থ্যের যে সমস্যাগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে 

অসুস্থতাঃ শিশুর জ্বর, কানে কোন ধরনের ইনফেকশনের ব্যথা, পেটে ব্যথা অথবা দাঁত উঠার সময় শিশুর প্রায় সারা রাত জেগে থাকতে পারে।

Sleep apnea অর্থাৎ ঘুমের সময় শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যাঃ আপনার শিশু যদি ঘুমানোর সময় ঠিকমত শ্বাস প্রশ্বাস নিতে না পারে তাহলে ডাক্তারি ভাষায় একে Sleep Apnea বলা হয়ে থাকে। ছয় মাস বয়সের নিচে যে কোন শিশুর শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা অথবা দুই নিঃশ্বাসের মাঝখানে পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডের মত বিরতি থাকা একদমই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

তবে আপনার শিশু যদি অনেক জোরে শ্বাস নেয় অথবা জোরে নাক ডাকে, দুই শ্বাসের মাঝখানে বিশ সেকেন্ড অথবা তার বেশি সময় বিরতি থাকে অথবা আপনার শিশু যদি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে কাশতে কাশতে ঘুম থেকে উঠে যায়, তাহলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন।

Gastroesophageal reflux অর্থাৎ পাকযন্ত্রের অস্বাভাবিক ক্রিয়া: এই ধরনের সমস্যায় শিশু খাবার তার পাকস্থলী থেকে আবার অন্ত্রে ফিরে আসে। তাই আপনার শিশু যদি প্রায়শই বমি করে অথবা বেশি পরিমাণে দুধ মুখ থেকে বের হয়ে আসে অথবা ব্যথায় চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে উঠে তাহলে হয়ত সে এই রোগে ভুগছে। এই ধরনের সমস্যায় শিশুর অন্ত্রের সাথে পাকস্থলীর স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এতে করে শিশুর পাকস্থলী থেকে অম্ল ও খাবার তার মুখে চলে আসে। এই ধরনের সমস্যায় শিশু ভুগলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর রিফ্লাক্স (Reflux) ও গ্যাস্ট্রোএসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ GERD]

আপনি কীভাবে শিশুকে আগের মত ভালোভাবে ঘুমাতে সাহায্য করতে পারেন?

আপনার শিশুর বয়স যদি চার মাসের বেশি হয়ে যায় এবং তার অনিয়মিত ঘুম হয় অথবা প্রায়শই জেগে থাকে তাহলে শিশুকে ঘুমের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে ভাবতে পারেন। ঘুমের প্রশিক্ষণে উপায়গুলোর মধ্যে অল্প কাঁদা, একদমই না কাঁদা যে কোন ধরনের পন্থা আপনি অবলম্বন করতে পারেন।

শিশুকে আগের মত ভালোভাবে ঘুম পাড়ানোর আরো কিছু উপায় নিম্নে বর্ণীত হলঃ

আপনার শিশু যদি মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে আপনাকে ডাকে তাহলে তার ডাকে সাড়া দেয়ার আগে একটু অপেক্ষা করুন। তখন আপনি যদি শিশুর দৃষ্টি সীমার মধ্যে নাও থাকেন তাহলে তাকে জানিয়ে দিন যে আপনি আছেন এবং শিশুকে মনে করিয়ে দিন যে এখন তার ঘুমের সময়।

ঘুমের একটা নিয়মিত রুটিন অনুসরণ করুনঃ ইতোমধ্যেই যদি শিশুর জন্য ঘুমের কোন রুটিন প্রস্তুত না করে থাকেন, তাহলে শিশুর জন্য সুবিধা হয় এমন একটা ঘুমের রুটিন তৈরি করে ফেলুন। এছাড়া শিশুর ঘুমের আগে তার ঘুমানোর পোশাক পড়িয়ে তাকে ছবি ওয়ালা গল্পের বই পড়ে শুনাতে পারেন অথবা গান শুনাতে পারেন। ঘুমের সময় শিশুর সাথে এই ধরনের সম্পর্ক শিশুকে নিরাপদ অনুভব করতে সাহায্য করে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

শিশু জেগে থাকা অবস্থায় তাকে তার বিছানায় রেখে দিনঃ শিশু যখন খাবার খায়, কোলে থাকে অথবা আপনার বিছানায় থাকে সেই অবস্থায় যাতে শিশু ঘুমিয়ে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। শিশুর মধ্যে যখন ঘুমিয়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখবেন তখন তাকে তার বিছানায় রেখে দিন যাতে করে সে নিজ থেকেই ঘুমিয়ে যায়। এই ধরনের কাজের মুল উদ্দেশ্য হল শিশু যাতে করে নিজে থেকেই ঘুমানো শিখে যায়, এতে করে পরবর্তীতে শিশুর ঘুম পাড়ানোর জন্য আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। 

যে কোন ধরনের বদ অভ্যাসের ক্ষেত্রে উৎসাহ দিবেন নাঃ আপনার শিশু যদি একটু বড় হয়ে থাকে তাহলে সে যদি রাতের বেলায় ডাকে অথবা কাঁদে তাহলে সাথে সাথেই তার কাছে যেয়ে তাকে আদর করে ঘুম পাড়াবেন না অথবা আপনার কাছে নিয়ে এসে ঘুমাবেন না। কেননা এতে করে শিশু ঘুমানোর জন্য খুব দ্রুতই আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

শিশুর বয়স যখন চার মাস হয়ে যাবে, তখন সে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে পরে কিনা এটা দেখার জন্য কিছু সময় শিশুকে কাঁদতে দিতে পারেন। যদি শিশুর কাছে তখন আপনার যাওয়াটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে তখন শিশুকে কোলে না নিয়ে বিছানায় রেখেই তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে পারেন। সে যখন একটু শান্ত হয় তখন শিশু জেগে থাকতে থাকতেই আপনি রুম থেকে চলে যেতে পারেন।   

রাতের সময়টা নিরিবিলি রাখুনঃ রাতের সময়টা আনন্দ করার সময় না, এ ব্যাপারে শিশুকে শিক্ষা দিন। রাতের বেলায় যদি শিশুর জামা পালটাতে হয় অথবা শিশুকে খাওয়াতে হয় তাহলে দ্রুত সেটা করে ফেলুন। চেষ্টা করুন যাতে করে এই ধরনের সকল কাজে একটু কম শব্দ হয় এবং রুমের বাতি বন্ধ থাকে। এছাড়াও দিনের বেলায় শিশুর প্রতি যথেষ্ট পরিমাণে মনযোগী হন যাতে করে সে বুঝতে পারে রাতের বেলা নয় বরং দিনের বেলা হল আনন্দের সময়।

যে কোন অভ্যাসে নিয়মিত হনঃ চেষ্টা করুন যাতে করে শিশুর দৈনন্দিন রুটিন নিয়মিত অনুসরণ করা যায়, যদি সেটা অনুসরণ করতে কখনো একটু কষ্টও হয় তবুও চেষ্টা করুন। আপনার পরিবারের বাকি সদস্যদেরও শিশুর দৈনন্দিন রুটিন সম্পর্কে জানিয়ে দিন। যদি শিশু কোন কারণে অসুস্থ হয়ে পরে অথবা অন্য কারণে রুটিনে অনিয়মিত হয়ে যায় তাহলে যত দ্রুত সম্ভব আগের রুটিনে ফিরে আসার ব্যাপারে সচেষ্ট হন।

রাতের বেলায় খাওয়ানোর অভ্যাস পরিত্যাগ করুনঃ চার থেকে ছয় মাস বয়স হলেই বেশিরভাগ শিশুরা দিনের বেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে পারে এবং রাতে ঘুম তার উঠে খাবার প্রয়োজন পরে না। যদি আপনি মনে করেন যে রাতের বেলায় শিশুকে খাওয়ানো বন্ধ করার সময় হয়ে এসেছে, তাহলে দুই সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে শিশুকে রাতের বেলায় খাওয়ানোর অভ্যাস বন্ধ করে দেখু।

শিশু যাতে আরামে থাকে সেদিনে সচেষ্ট হনঃ শিশুর রুমের তাপমাত্রা কি ঠাণ্ডা না কি বেশি গরম সেটা দেখে নিন। এছাড়াও বাইরে কোন শব্দ হচ্ছে কি না অথবা কোথাও লাইট জ্বলছে কি না যেটা আপনার শিশুকে ঘুমাতে দিচ্ছে না সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। যদি সম্ভব হয় তাহলে এমন কোন ফ্যান চালিয়ে দিন যেটার কারণে আশেপাশের শব্দ শিশুর কানে না আসে।

জানালায় গাড় পর্দা ব্যাবহার করুন যাতে করে বাইরের আলো শিশুর রুমে না আসে। রুম পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেলে আপনার শিশু যদি অস্বস্তিতে ভুগে তাহলে ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখতে পারেন অথবা শিশুর রুমের বাইরে একটা আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারেন যাতে করে অল্প আলো শিশুর রুমে আসে।

শিশুকে দাঁড়াতে এবং শুয়ে পড়তে সাহায্য করুনঃ আপনার শিশু যদি মাত্রই দাঁড়াতে শিখে থাকে তাহলে আবার শুয়ে পড়তে তার হয়ত সমস্যা হতে পারে। রাতে রাত বিছানায় দাঁড়িয়ে যেয়ে আবার শুয়ে যেতে না পেরে শিশু হয়ত আপনার সাহায্যের জন্য কাঁদতে পারে। শিশু যাতে নিজে থেকেই আবার শুয়ে পড়তে পারে এই ব্যাপারে দিনের বেলা তাকে শিখিয়ে দিন যে কীভাবে হাঁটু ভাঁজ করে বসতে হয় এবং এরপর শুয়ে পড়তে হয়। 

শিশুকে জড়িয়ে ধরার জন্য কিছু দিনঃ বেশিরভাগ শিশুই একটা নরম খেলনা অথবা নরম কম্বল জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পছন্দ করে। তবে শিশুর বয়স এক বছর হওয়ার আগে তার বিছানায় ঘুমানোর সময় কোন খেলনা দিবেন না, কেননা এতে করে শিশুর নাক আটকে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

[ আরও পড়ুনঃ ঘুমানোর সময় শিশুকে কিভাবে শোয়ানো নিরাপদ ]

সবসময় শান্ত থাকুনঃ আপনার শিশুকে একটু বুঝতে চেষ্টা করুন, কেননা অনেক সময় শিশু যখন অবুঝের মত আচরণ করে তখন অনেকেই বেশ হতাশ হয়ে যায়। তাই এইসময় যদি আপনি হতাশ অথবা রেগে যান তাহলে শিশুর ঘুমের সমস্যাটা তো ঠিক হবেই না বরং সমস্যা আরো দীর্ঘায়ত হবে। মনে রাখবেন, আপনি যদি শান্ত থাকেন তাহলে আপনার শিশুও শান্ত থাকবে।

আপনি যখন অনেক ক্লান্ত থাকেন তখন শিশুর ঘুমের অনিয়মের সাথে কীভাবে মানিয়ে নিবেন?

শিশু যদি রাতের বেলায় প্রায়শই ঘুম থেকে জেগে উঠে অথবা রাতে খুব সহজে ঘুমাতে না যায় তখন এটা বাবা মায়েদের জন্য কখনো কখনো খুব হতাশার এবং ক্লান্তিকর একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তাদের জন্য এটা খুবই কষ্টকর হয়ে যায় যখন এমনটা হয় যে আগে শিশু খুব ভালোভাবেই ঘুমাতে কিন্তু হঠাৎ করেই শিশুর ঘুমের অনিয়ম শুরু হয়ে যায়।

নিচে কিছু উপকারী টিপস বর্ণিত হল

যখনই সুযোগ পান একটু ঘুমিয়ে নিনঃ আপনি যদি বাসায় থাকেন তাহলে শিশু যখন দিনের বেলায় ঘুমায় তখন আপনিও একটু ঘুমিয়ে নিন। এতে করে আপনার ঘুমের চাহিদা পরিপূর্ণ হবে। অথবা আপনি যদি অফিসে থাকেন তাহলে দুপুরের খাবারের সময় অথবা অফিস থেকে ফেরার পথে গাড়িতে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন।

ঘুমের সমস্যার সাথে মানিয়ে চলার চেষ্টা করুনঃ যদি দিনের বেলায় হুট করে একটু ঘুমিয়ে নেয়া আপনার জন্য সহজ না হয়ে থাকে তাহলে কীভাবে দিনের বেলায় কীভাবে এই ঘুমের সমস্যার সাথে মানিয়ে চলবেন এটা নিয়ে বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। হ্যাঁ, এটা সত্য যে একটা চমৎকার ঘুমের আসলে কোন বিকল্প হয় না, তবুও এই সমস্যার সাথে মানিয়ে চলার অনেক রকম উপায় রয়েছে।

সবকিছু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাখার চেষ্টা করুনঃ মনে রাখবেন আপনার শিশুর ঘুমের অনিয়ম কিন্তু একদমই সাময়িক একটা বিষয়। বেশিরভাগ শিশুই কিছু দিন, সপ্তাহ অথবা কয়েক মাসের মধ্যেই ঘুমের সঠিক নিয়মে ফিরে যায়।

অন্যদের সাহায্য নিনঃ রাতের বেলায় শিশুর দেখাশুনা করার জন্য আপনার সঙ্গীর সাথে সময় ভাগ করে নিন, এতে করে দুইজনেরই ঘুমের চাহিদা পূর্ণ হবে। অন্যান্য বাবা-মা’দের সাথে কথা বলে জানতে চেষ্টা করুন যে, তারা কীভাবে তাদের সন্তানের ঘুমের এই সমস্যার সমাধান করেছে এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।

আপনার শিশুর ডাক্তারের সাথেও প্রয়োজনে এই ঘুমের সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে পারেন। যদি এতেও কোন উপকার না হয়, তাহলে একজন ঘুমের কনসাল্ট এর কাছ থেকে প্রফেশনাল সাহায্য নিতে পারেন। তিনি অবশ্যই এই ঘুমের সমস্যার সমাধানে আপনাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সাহায্য করবেন।

[ আরও পড়ুনঃ বাচ্চার ঘুমের বিষয়ে যে সব ভুল বাবা মায়েরা করে থাকেন এবং তা শোধরানোর উপায় ]

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts