সি সেকশন বা সিজারের পর সেরে ওঠা কেমন হতে পারে?

Updated on

সি সেকশন বা সিজারের পর আমি কেমন অনুভব করবো?

যে কোন নতুন মায়ের মতোই, আপনি একইসাথে উত্তেজিত এবং আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবেন যার কারণ আপনার পাশে শুইয়ে থাকা ছোট্ট শিশুটি। কিন্তু সিজারিয়ান হলে প্রসবোত্তর বিভিন্ন স্বাভাবিক জটিলতা যেমন স্তন জমাট বেধে যাওয়া, যোনীস্রাব, মুডের তারতম্য এগুলোর পাশাপাশি আপনার পেটে যে মেজর একটা অস্ত্রোপচার হয়ে গিয়েছে সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে এবং মানিয়ে চলতে হবে।

অস্ত্রোপচারের পর পর আপনার বেশ দুর্বল লাগতে পারে, বমি বমি হওয়াটাও স্বাভাবিক। বমি বমি ভাবটা অস্ত্রোপচারের ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে তবে নার্সকে জানালে তিনি আপনার অস্বস্তি দূর করার জন্যে ঔষধ দেবেন।

অনেক মায়েরাই পুরো শরীরজুড়েই চুলকানি অনুভব করেন, বিশেষত সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের আগে মেরুদন্ডের হাড়ে চেতনানাশক ঔষধ ব্যবহৃত হয়ে থাকলে চুলকানি হয়ে থাকে। যদি  আপনার চুলকানি হয়ে থাকে, ডাক্তারকে বলুন- তিনি তা নিরাময়ের জন্য ওষুধ দেবেন।

সিজারিয়ান রোগীকে মূলত বাসায় যাওয়ার আগে ২ থেকে ৪ দিন হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়। কিন্তু আপনার সম্পূর্ণ আরোগ্যলাভের হিসেবটা কিন্তু দিনে হবে না, হবে সপ্তাহে। তাই আপনার এবং আপনার নবজাতক শিশুর সঠিক যত্নের জন্যে আত্মীয় স্বজনদের থেকে যত বেশী সম্ভব সহায়তা গ্রহন করুন।

তার উপর যদি আপনার আরেকটি বাচ্চা থাকে তাহলে তো কথাই নেই। আপনি বেশ কদিন ঘরের বাইরে হাসপাতালে আছেন, তারপর ফিরলেন একটা বাচ্চা নিয়ে- এতটা সহজ নয় সেটা আগের শিশুর জন্যে৷ সেই শিশুর কাছেও একজনের থাকা প্রয়োজন। আর তাইতো এই সময়ে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কে কিভাবে কোথায় সাহায্য করবে সেটা আগে থেকে ঠিক করে রাখুন।

অস্ত্রোপচারের পর প্রসবোত্তর ব্যাথা নিরাময়ে আমি কি গ্রহণ করবো?

অস্ত্রোপচারের সময়, মেরুদণ্ডে যে চেতনানাশক দেওয়া হয়, সেখানে আপনার ডাক্তার মরফিন যোগ করে দিতে পারেন, যা আপনাকে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত প্রসবোত্তর ব্যাথা লাঘবে সাহায্য করবে। তবে চেতনানাশকের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে হালকা দুর্বল লাগা কিংবা শরীর টলায়মান অবস্থায় থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারেরা চেতনানাশক দেয়ার সিরিঞ্জটি অস্ত্রোপচারের ১২ থেকে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত রেখে দেন যাতে  আপনাকে সময়ে সময়ে সঠিক ঔষধপত্র দেওয়া যায়, যদি ডাক্তার প্রয়োজনবোধ করেন।

এরপর, আপনাকে নিয়মমাফিক ব্যাথা লাঘবের জন্যে চেতনানাশক ঔষধ অথবা এইসটামিনোফেন দেয়া হতে পারে। ইবোপ্রোফেন গ্রহণের মাধ্যমেও বেশ উপকার পাওয়া যায়। এছাড়া এত বেশী ব্যাথানাশক ব্যবহারের ফলে যাতে আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য জনিত কোন সমস্যা না হয়, সেজন্যে মল স্বাভাবিক রাখার ঔষধও দেওয়া হয়।

তবে সিজার অপারেশনের সময় আপনাকে যদি সাধারণ চেতনানাশক দেওয়া হয় এবং মেরুন্ডের মাধ্যমে মরফিন বা এপিডিউরাল দেওয়া না হয়, সেক্ষেত্রে প্রসবোত্তর ব্যাথা সাথে সাথে লাঘবের জন্যে নিয়মমাফিক কিছু ঔষধ দেওয়া হবে।

আপনাকে প্রতি তিন থেকে চার ঘন্টা পর পর ব্যাথার ঔষধ দেওয়া হতে পারে অথবা আপনাকে ‘পেশেন্ট কন্ট্রোলড এনালজেসিয়া’ নামক এক ধরণের সিস্টেম ব্যাবহার করতে দিতে পারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এই সিস্টেমে আপনার বিছানার কাছে একটি বাটন দিয়ে দেওয়া হবে, যখন আপনি ব্যাথা কিংবা অসুবিধা বোধ করবেন সেই বাটনে চাপ দেবেন এবং আইভি’র মাধ্যমে আপনার শরীরে ঔষধ পৌঁছে যাবে৷ ডোজ নিয়ন্ত্রণের জন্যে একটি মেশিন সংযুক্ত থাকে তাই নিরাপদ মাত্রার ঔষধই আপনার শরীরে প্রবেশ করবে।

তবে যে কোন পরিস্থিতিতেই হোক না কেন, আপনার কোন অসুবিধা হলে কিংবা আরো ঔষধ লাগবে মনে হলে অবশ্যই তা নার্সকে জানান। অবশ্যই নীরবে কষ্ট সহ্য করবেন না। নার্সকে যত দেরি করে জানাবেন যে আপনার আরো ঔষধ হয়তো প্রয়োজন, ততই আপনার পক্ষে ব্যাথা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়বে৷

আপনার যদি মনে হয় যে আপনাকে যে ঔষধ দেওয়া হচ্ছে তা ঠিকঠাক কাজ করছে না, সেটাও নার্সকে জানান। নার্স যদি আপনাকে সহায়তা করতে না পারে, সেক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারকে বলুন। কারণ আপনার দ্রুত সুস্থ হওয়াটা বেশী জরুরি। আপনি যত তাড়াতাড়ি আরাম বোধ করবেন, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো কিংবা চলাফেরাও আপনার জন্যে তত সহজ হয়ে যাবে৷

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর কখন শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারব?

আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে চান, অস্ত্রোপচারের পরপর রিকভারি রুমেই খাওয়াতে পারেন। নার্সকে বলুন যাতে এক পাশ ফিরে শিশুকে দুধ পান করানোর পদ্ধতিটি শিখিয়ে দিতে যেন পেটে সেলাইয়ে কোন চাপ বা টান না লাগে।

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর পেটের সেলাই ঠিকঠাক শুকানোর অর্থাৎ ব্যাথা কমার আগ পর্যন্ত আসলে বুকের দুধ পান করানোটা বেশ কঠিন একটি কাজ। আর তাইতো যত দ্রুত সম্ভব একজন দুগ্ধপান বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন যিনি আপনাকে নিরাপদ ও আরামদায়ক উপায়ে শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দেবেন যাতে আপনার নিপলে কোন ক্ষত বা ঘা না হয়ে যায়।

যদি হাসপাতালে দুগ্ধপান বিশেষজ্ঞ না-ই থাকে, সেক্ষেত্রে এই বিষয়ে পারদর্শী এমন নার্সের সহায়তা নিন।

সি সেকশন বা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হবার প্রক্রিয়ার প্রথম দিনগুলো কেমন হবে?

পেটের কাটা অংশ ঘা-মত লাগতে পারে কিংবা অবশ মনে হতে পারে আবার সে ক্ষতটা কিছুটা উচু হয়ে ফুলে যাওয়া, সাধারণ ত্বকের রঙের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কালোবর্ণ ধারণ করা ইত্যাদি ব্যাপারও ঘটতে পারে। আপনার শরীরের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে এবং আপনার ঘা ঠিকঠাক ভালো হচ্ছে কি না তা দেখতে প্রতিদিনই ডাক্তার আপনাকে দেখে যাবেন।

আপনার পেটে চাপ লাগতে পারে এমন যেকোন কিছুতেই প্রথম প্রথম বেশ ব্যাথা পেতে পারেন তবে ধীরে ধীরে উন্নতিটা আপনি নিজেই অনুভব করবেন। তবে হাঁচি, কাশি কিংবা হাসি দেওয়ার সময় অবশ্যই পেটে যাতে টান না লাগে সেজন্যে বালিশ বা হাত দিয়ে সাপোর্ট দিয়ে রাখবেন।

আপনাকে চেক আপ করতে ও কি লাগবে না লাগবে সেটা দেখভাল করতে কয়েক ঘন্টা পরপরই নার্স এসে দেখে যাবেন। তিনি আপনার শারিরীক বিভিন্ন লক্ষণগুলো চেকআপ করবেন, যোনীর রক্তপাত পরিমাপ করবেন এবং পেট পরীক্ষা করে দেখবেন যে জরায়ু ঠিকঠাক আছে কিনা।

মাত্রই শিশু জন্ম দেওয়া যেকোন স্বাভাবিক মায়ের মতো আপনারও লোচিয়া নামক যোনীস্রাব হবে যাতে রক্ত, ব্যাকটেরিয়া এবং জরায়ু থেকে নির্গত টিস্যু থাকে। জন্মদানের প্রথম কয়েকদিন পর্যন্ত এই স্রাব উজ্জ্বল লাল বর্ণের হয়ে থাকে।

এছাড়া কিভাবে কাশি ও জোরে নিঃশ্বাস নেওয়ার মাধ্যমে ফুসফুসে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখা যায় সেটাও নার্স শিখিয়ে দেবেন। আপনাকে যদি সাধারণ চেতনানাশক দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে এই কাজটা করা খুবই জরুরি। এতে করে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

যদি সব ঠিকঠাক থাকে, তবে অস্ত্রোপচারের ১২ ঘন্টার মধ্যেই নার্স আপনার আইভি স্যালাইন এবং মূত্রনিষ্কাশন যন্ত্র (Catheter)  খুলে ফেলবেন।

পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, নার্সকে জানিয়ে আপনি পানি খেতে পারবেন এবং অস্ত্রোপচারের ৬ থেকে ৮ ঘন্টা পর ডাক্তার আপনাকে তরল কিংবা হালকা খাবার খেতে বলতে পারেন। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ডাক্তার এর চেয়ে বেশী সময় অপেক্ষা করতে বলতে পারেন।

প্রথম দুই দিন পেটে গ্যাসজনিত কারণে ব্যাথা অনুভব  করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই সময়ে গ্যাস হয় কারণ অস্ত্রোপচারের পর পেটের অন্ত্রগুলো ধীরগতিতে কাজ করে। শোয়া থেকে উঠে বসলে এবং হালকা হাটাচলা করলে পেটের হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসে।

তবে গ্যাস যদি আপনাকে বেশিই ভুগিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে নার্সকে বলুন। তিনি আপনাকে সিমেথিকোনযুক্ত ঔষধ খেতে দেবেন যা সকল গ্যাসকে একত্র করে বের করে দেবে। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সিমেথিকোন কোন সমস্যা সৃষ্টি করে না।

অস্ত্রোপচারের পরদিন থেকে কিংবা অস্ত্রোপচারের দিনই ডাক্তার আপনাকে দিনে কয়েকবার বিছানা থেকে উঠে হাটাচলা করতে পরামর্শ দেবেন। তবে কোনভাবেই নিজে থেকে উঠার চেষ্টা করবেন না৷ প্রথম কয়েকবার অবশ্যই নার্সের সহায়তা নিয়ে তারপরই শোয়া থেকে উঠবেন।

এই সময়ে পায়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাওকে বলুন আপনার পায়ের পাতা ঘসে দিতে, গোড়ালিতে ম্যাসাজ করে দিতে। আপনি নিজেও পা নাড়াবেন এবং এদিকে ওদিকে প্রসারিত করবেন।

ওয়াসরুমে হেটে যাওয়াটা আপনার কাছে আপাতত অসম্ভব মনে হলেও হাটাচলাটা কিন্তু আপনার জন্যে খুব উপকারিই বটে। এতে করে শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক তো হবেই পাশাপাশি কোন যায়গায় রক্তজমাট বাধার সম্ভাবনাও থাকে না৷ এগুলো ছাড়াও হাটাচলার ফলে আপনার পেটের অন্ত্রসমূহেও নাড়াচাড়া হবে এবং আপনি দ্রুতই বেশ আরামবোধ করা শুরু করবেন।

এইসব কারণে প্রতিদিনই ডাক্তার একটু একটু করে হাটার পরামর্শ দিয়ে থাকেন৷ দিনে ব্যাথা ঔষধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর কিংবা যখন অন্য সময়ের তুলনায়একটু সুস্থ অনুভব হয়, তখনই হাটার চেষ্টা করুন।

এছাড়া প্রস্রাব আটকে না রেখে নিয়মিত বাথরুমে যেয়ে সেড়ে আসাই উত্তম। কারণ ব্লাডার ভর্তি হয়ে থাকলে জরায়ুর সংকুচিত হয়ে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে এবং তা পেটের কাটা অংশেও চাপ প্রদান করে।

সাধারণত অস্ত্রোপচারের তিন থেকে চারদিন পর ডাক্তার আপনার সেলাই খুলে ফেলবেন। মিনিটের মধ্যেই কাজটা হয়ে যাবে এবং আপনি সামান্য খোঁচা ছাড়া তেমন কোন ব্যাথাই অনুভব করবেন না। এটা মূলত হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার সময়েই করা হয়।

তবে অস্ত্রোপচারের দ্বিতীয় দিনেই যদি আপনি বাসায় চলে যেতে চান সেক্ষেত্রে পরে ডাক্তারের চেম্বারেও করা যায়। আবার ডাক্তার যদি মনে করেন যে, ঘা শুকানোর জন্যে আপনার আরো বেশী সময় প্রয়োজন, তখনও হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পরে তিনি চেম্বারেও সেলাই খুলতে পারেন। সাধারণত একটু স্থুলকায় এবং ডায়বেটিস এর রোগীদের বেশী সময় লাগে।

পরিশেষে, আপনি হাসপাতাল ছাড়ার আগে, আপনাকে পূর্বে কোন প্রয়োজনীয় টিকা যদি দেওয়া না হয়ে থাকে (যেমন রুবেলা, টিড্যাপ, চিকেন পক্স এবং ফ্লু শট) সেগুলো দেওয়া হবে। এছাড়া আপনি এখনও কোন পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহন না করে থাকলে ডাক্তার আপনাকে সেটা নিতেও সাহায্য করবেন।

হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরে আসার পর সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া কেমন হবে?

বাসায় আসার পর যত বেশী পারুন সবার থেকে সকল প্রকারের সাহায্য গ্রহণ করুন। কারো থেকে যদি তেমন সাহায্য না পান তবে আপনার স্বামী, শ্বশুর বাড়ির লোকজন বা নিজের বাসার লোকজন, বন্ধুবান্ধব এদেরকে বলুন আপনার পাশে থাকতে৷

এর পরেও যদি আপনি চিন্তিত থাকেন যে আপনি যথেষ্ট সাপোর্ট পাবেন কিনা, তাহলে যদি সম্ভব হয় কাজের লোক রাখুন। মাথায় রাখুন, এই সময়ে আপনার সবদিক থেকেই সাহায্য প্রয়োজন, প্রচুর সহযোগিতার হাত লাগবে এই সময়ে।

হাসপাতাল ছাড়ার সময়ে সাথে দেওয়া প্রেসক্রিপশনে ব্যাথা কমার জন্যে পেইনকিলার এবং মল স্বাভাবিক রাখার ঔষধ দেওয়া হবে যা অস্ত্রোপচারের ১ সপ্তাহ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া লাগতে পারে। আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ পান করিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে কোনভাবে এসপিরিন অথবা যেখানে এইসটায়লসালিসিলিক এসিড আছে, এমন ঔষধ খাওয়া ঠিক হবে না।

এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে প্রচুর পানি পান করতে হবে। ধীরে ধীরে আপনার পেটের কাটা অংশে জন্নতি লক্ষ্য করবেন এবং কয়েকদিন যাওয়ার পর উন্নতির মাত্রাটাও বেশ ভালো হবে। তবে অবস্থা যত ভালোই হোক, কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত এ নিয়ে সতর্কতার সাথেই চলাফেরা করা উচিত।

বাসায় ফিরে ইনফেকশন কিংবা নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখলে অবশ্যই আপনার ডাক্তার কিংবা আপনার যত্ন যিনি নিচ্ছেন তাকে জানান:

  • পেটে কাটা অংশ লালবর্ণ ধারণ করলে, গরম হয়ে গেলে, ফুলে গেলে কিংবা চুয়ে চুয়ে পানি পড়লে
  • ব্যাথা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা অথবা হুট করে প্রচন্ড ব্যাথা হওয়া
  • জ্বর হওয়া, এমনকি পেটের ক্ষত ঠিকঠাক থাকার পরও
  • যোনিস্রাবে বাজে গন্ধ হওয়া
  • প্রস্রাবের সময় ব্যাথা কিংবা জ্বালাপোড়া হওয়া। ঘনঘন প্রস্রাব আসা কিন্তু সে তুলনায় পরিমাণে কম প্রস্রাব হওয়া। প্রস্রাব কালচে অথবা রক্তবর্ণের এবং খুবই অল্প পরিমাণে হওয়া।

যোনির রক্তপাত কিংবা যোনিস্রাব ধীরে ধীরে কমে আসবে, যদিও তা ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে পারে। প্রথম প্রথম স্রাব দেখতে উজ্জ্বল লাল বর্ণের হবে, পরবর্তীতে গোলাপী এবং এরপরে হলদে-সাদা রঙের হয়ে যাবে। যদি ডেলিভারির প্রথম চারদিনের পরেও মাসিকের মতো রক্ত বের হয় কিংবা ধীরে বন্ধ হয়ে আবার ফিরে আসে, সাথে সাথে তা আপনার ডাক্তারকে জানান।

এছাড়াও শরীরের কোথাও রক্তজমাট বেধে যাচ্ছে এমন লক্ষণ দেখা গেলে যত দ্রুত সম্ভব তা ডাক্তারকে জানান। শরীরের কোন যায়গায় তীব্র কিংবা একটানা অনেক্ষণ ধরে ব্যাথা, নরম হয়ে আসা অথবা পায়ের কোন অংশ গরম হয়ে যাওয়া অথবা এক পা অপেক্ষা আরেক পা ফুলে যাওয়া প্রভৃতি রক্ত জমাটের লক্ষণ।

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর আমার কতটা সক্রিয় থাকা উচিত?

বাসায় থাকাকালীন অবস্থায় আপনাকে প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে এবং পাশাপাশি প্রতিদিন নিয়মিত উঠে বসা ও হাটাচলাও করতে হবে। নিয়মিত হাটার ফলে আপনার দ্রুত সুস্থতা আসবে এবং রক্তজমাটসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থেকেও মুক্তি পাওয়া যাবে।

তবে অবশ্যই অতিরিক্ত করা যাবে না। আস্তে আস্তে শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে আপনার সক্রিয়তা বাড়ান। যেহেতু আপনার পেটে মেজর একটি অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাই বেশ কিছুদিন পর্যন্ত পেটে ক্ষত থাকবে স্বাভাবিক। ব্যাপারটিকে স্বাভাবিকভাবেই নিন কিন্তু ৮ সপ্তাহ পর্যন্ত গৃহস্থালি কঠিন কাজকর্ম করা এবং শিশু অপেক্ষা ভারী কিছু আলগানো কিংবা তোলা থেকে বিরত থাকুন।

ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে, আপনি মোটামুটি ব্যায়াম করার মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। তবে অবশ্যই ডাক্তারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে তবেই ব্যায়ামের চিন্তা ভাবনা করুন। আপনার শরীর পুরো সুস্থ স্বাভাবিক হতে হতে কয়েক মাস কিংবা এর বেশীও লাগতে পারে।

আপনি যদি ঠিকঠাক অনুভব করেন এবং ডাক্তার কোন সমস্যা না দেখেন, তাহলে ছয় মাস পর আপনি আবার যৌনমিলন শুরু করার মতো অবস্থায় থাকবেন। তবে তার আগে, এখন কোন পদ্ধতির জন্মনিরোধক ব্যাবহার করা উচিত হবে তা নিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

হতে পারে, আপনি পূর্বে যে ধরণের জন্মনিরোধক ব্যাবহার করতেন সেটাই চালু রাখা যাবে আবার এমনও হতে পারে যে পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন আপনি যদি আগে ডায়াফ্রেম ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে এখন সেটা নতুন সাইজে প্রতিস্থাপন করতে হবে কারণ গর্ভবতী হওয়া এবং শিশু জন্ম দেওয়ার কারণে পুরনো সাইজটা আর ঠিকঠাক কাজ করবে না।

পেটের সিজারিয়ান ক্ষতের দাগটা কেমন হবে?

প্রথমদিকে ক্ষতটা বেশ উঁচু, মোটা এবং চামড়ার রঙের তুলনায় বেশ কালো হবে কিন্তু অস্ত্রোপচারের ছ’সপ্তাহ পার হতে হতে এটি ধীরে ধীরে বেশ কিছুটা মিলিয়ে আসবে।

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে ক্ষতটা কেবল চার থেকে ছয় ইঞ্চি লম্বা এবং এক ইঞ্চির আট ভাগের এক ভাগের মতো প্রস্থের হয়ে থাকে। ক্ষতটা ভালো হয়ে আসলে, ধীরে ধীরে তা চামড়ার বর্ণের সাথে মিশে যায়। এবং প্রস্থেও প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। ক্ষত শুকানোর সময়টাতে হালকা চুলকানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এই দাগটা পেটের বেশ নিচেই করা হয়ে থাকে। কোমড়বন্ধনীর অনেকটুকু নিচে আপনার অন্তর্বাসের ভেতরেই এই দাগ ঢাকা পড়ে যাবে।

সি-সেকশনের পর আমার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে?

সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর মায়েদের মানসিক অবস্থা হরেক রকমের হতে পারে, তাই এটা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন যে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন হবে।

এটা আপনার জন্যে কিছুটা হতাশার হতে পারে যদি আপনি স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসবের জন্যে আগে থেকে মনে প্রাণে স্থির করে থাকেন। আবার এমনও হতে পারে যে, স্বাভাবিকভাবে বাচ্চা প্রসবের জটিলতা এবং শিশুর স্বাস্থ্যের আশংকা নিয়ে ইতোমধ্যে অবগত থাকায় আপনি এটা নিয়ে খুব চিন্তিত নন।

দীর্ঘ সময়ের প্রসব বেদনা সহ্য করে এসে অস্ত্রোপচারের পর অনেক মায়েরাই বেশ স্বস্তি অনুভব করেন। আবার অনেকে আছেন যারা এটা ভেবে বেশ দুঃখ পান যে, দীর্ঘ সময় ধরে এত কষ্টের পর শেষমেষ  সিজারিয়ান-ই করাতে হলো! একেকজনের অনুভূতি আসলে একেক রকম হয়ে যায়।

কিছু কিছু সিজারিয়ান মায়েরা তো নিজেদের প্রতারিত হিসেবেই ধরে নেন- বিশেষত যারা শিশুর জন্ম নিয়ে বেশ স্টাডি করেছেন, ক্লাস করেছেন এবং ‘ভ্যাজাইনাল বার্থ’কেই ‘আদর্শ জন্ম’ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার ‘স্বাভাবিকে হয় নি, সিজারিয়ানই প্রয়োজন হয়েছে!’ এটা ভেবে নিজেদের নারীত্বে একটি ছোটখাটো প্রশ্নবোধক চিহ্নও বসিয়ে দেন।

এমন মিশ্র অনুভূতি হওয়াটা স্বাভাবিক এবং এর সমাধান করাও কঠিন। আপনার যদি এমনই কিছু অনুভব হয়, সময় নিন। গর্ভাবস্থায় আপনি হয়তো শিশু জন্ম দেওয়ার সময়কার অবস্থা নিয়ে একরকম প্রত্যাশা করেছিলেন কিন্তু হয়তো বাস্তবে আসলে সেটা এর চেয়ে জটিল ছিল- সেই প্রত্যাশা আর বাস্তবতা বিচার করতেও কিন্তু কিছু সময় প্রয়োজন।

তবে এটা জেনে আপনি খুব অবাক হবেন যে অনেক মায়েদের ক্ষেত্রেই, (হোক সেটা স্বাভাবিক জন্মদান কিংবা সিজারিয়ান কেস) শিশু প্রসবকালীন সময়ে তাদের প্রত্যাশা এবং বাস্তবতায় বিস্তর ফারাক থেকে যায়। তবে অস্ত্রোপচারের আগে, আপনার মনে যদি খুঁতখুঁত সন্দেহ রয়ে যায় যে আপনার আসলেই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে কিনা, সেক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এবং তাকে বলুন অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোন সুযোগ আছে কিনা৷

সিজারিয়ানের পর হতাশা কাজ করলে মনে রাখবেন, আপনার মনে যে হতাশা কাজ করছে, সেটা আর দশটা মায়ের প্রসবোত্তর সময়েও হয়ে থাকে। শিশু ভ্যাজাইনাল বার্থেই হোক কিংবা সিজারিয়ান এ হোক, প্রসবোত্তর এই হতাশাটা স্বাভাবিক যা শিশু জন্ম দেওয়ার কয়েকদিন পর থেকে কিছু দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।

কিন্তু যদি এই হতাশাটা নিজে থেকেই কয়েক সপ্তাহ পর চলে না যায় এবং মানসিক অবস্থা ভালো হওয়ার বদলে উল্টো খারাপের দিকে যায়- তবে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এবং আপনার অবস্থা তাকে জানান। আপনি হয়তো ‘প্রসবোত্তর বিষন্নতা‘ নামক সিরিয়াস সমস্যায় ভুগছেন যা সাড়াতে চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।

ডাক্তারকে সবকিছু জানালে তিনি আপনাকে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ঠিকানা দেওয়া সহ সম্ভব সকল ধরণের সহযোগিতা করবেন। আপনার যদি মনে হয় যে আপনি নিজেকে কিংবা শিশুকে যে কোন সময় আঘাত করতে পারেন কিংবা এটা মনে হয় যে আপনি শিশুর যত্ন নেওয়ার মতো যথেষ্ট সক্ষম নন- তাহলে অবশ্যই দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।

পরিশেষে, আপনি পুরোপুরি সুস্থ হতে এবং আগের অবস্থায় ফিরে আসতে এত সময় লাগছে কেন এটা ভেবেও আপনি হতাশাগ্রস্ত হতে পারেন।

মনে রাখবেন, কেবল অস্ত্রোপচারের ধকল সামলাতেই কিন্তু আপনার বেশ শক্তি ও সময় ক্ষয় হয়ে যায়। এর সাথে আছে প্রসবোত্তর সময়কার শরীরের স্বাভাবিক কিছু বড় পরিবর্তন। আবার এর পর যোগ হয়েছে মা হিসেবে অবশ্যই করণীয় সবসময় চলমান দায়িত্বগুলো। এতসব কিছুর মধ্যে প্রথম বেশ কয়েক মাস আপনার শরীরের অবস্থা ‘একদম ফিট’ থেকে কয়েক ডিগ্রী নিচে থাকবে, এটাই কি স্বাভাবিক নয়?

এতসব দুশ্চিন্তা না করে, এর চেয়ে বরং একটু স্থির হোন, ধৈর্য্য ধরুন৷ ধীরে ধীরে একসময় আপনি বেশ ভালো অনুভব তো করবেনই, আপনার ছোট্ট সোনামণিটাকে ঘিরে আপনার সংসারটিও সুখের ও উপভোগ্য হয়ে উঠবে।

[ আরও পড়ুনঃ সিজারের পর মায়ের যত্ন ও করনীয় ]

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment