শিশুর মেনিনজাইটিস

মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ডকে আবরণ করে রাখা তিনটি ঝিল্লী বা মেমব্রেনের (মেনিনজেস) প্রদাহকে মেনিনজাইটিস বলা হয়।যদিও যে কোন বয়সের মানুষেরই মেনিনজাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে অনেক বেশী।

শিশুর শরীরের কোন অঙ্গ যদি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস কিংবা ফাঙ্গাস দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে রক্ত প্রবাহের মাধ্যমে তা শিশুর মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ডে পৌছুলে, শিশুর মেনিনজাইটিস হতে পারে।

২০১৭ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, জীবিত জন্ম নেওয়া প্রায় ১০০০ জন ২৮ দিনের কম বয়সী শিশুর মধ্যে ০.১ থেকে ০.৪ জন মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত। হিসাবটা বেশ ভয়াবহ, তবে এদের মধ্যে ৯০ শতাংশ শিশুই বেঁচে যায়। তবে একই সমীক্ষা বলে, মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ শিশুই বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা যেমন শেখার প্রবণতা হ্রাস পাওয়া, চোখে কম দেখা প্রভৃতি সমস্যায় ভুগে।

যদিও মেনিনজাইটিসের টিকা দেওয়ার প্রবণতা খুব একটা প্রচলিত নয়, তবে টিকার মাধ্যমে কিন্তু ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিস অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব।

সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, নিউমোকোকাল ভ্যাকসিন আসার আগে, ১ বছর বয়সী ১০০,০০০ শিশুর মধ্যে ১০ জনই নিউমোকোকাল মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত ছিল। কিন্তু ২০০২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত এই ভ্যাকসিন নিয়মিত ব্যাবহার করার ফলে, ২০১১ সালের আর্টিকেল অনুযায়ী, ১ মাস থেকে ২৩ মাস বয়সী ১০০০০০ জন শিশুর মধ্যে ৮ জন কোন এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়।

শিশুর মেনিনজাইটিসের লক্ষণ

মেনিনজাইটিস হলে, এর উপসর্গগুলো শিশুর মধ্যে খুবই দ্রুত সময়ের মধ্যে চলে আসবে। উপসর্গগুলো যখন দেখা দেবে, শিশুকে শান্ত করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে নিম্নোক্ত জিনিসগুলো থাকতে পারে :

  • হঠাৎ করে তীব্র জ্বর
  • খাবার না খাওয়া
  • বমি হওয়া
  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ দুর্বল হয়ে যাওয়া
  • স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশী ঘুমানো, ঘুম থেকে উঠতেই চাইবে না
  • খিটখিটে হয়ে থাকবে
  • মাথার সামনে তালুর নরম অংশটা ফুলে যাবে

এগুলো ছাড়াও আরো কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো আপনি হয়তো সহজে বুঝতে পারবেন না:

  • মাথা ব্যাথা হওয়া
  • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
  • উজ্জ্বল আলোয় সংবেদনশীলতা

কিছু কিছু শিশুর মধ্যে খিঁচুনিও দেখা যায়। তবে খিঁচুনিটা জ্বরের কারণেই হয়ে থাকে, মেনিনজাইটিসের কারণে নয়।

শিশুর মেনিনজাইটিসের কারণ

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ফাঙ্গাস – এর যে কোন একটি কারণেই শিশুর মেনিনজাইটিস হতে পারে। এদের মধ্যে ভাইরাস জনিত মেনিনজাইটিসই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিসের টিকা আবিষ্কারের পর এর পাদুর্ভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও ভাইরাস জনিত মেনিনজাইটিস এখনো বেশ ভুগিয়েই যাচ্ছে। তবে ফাঙ্গাসের কারণে যে মেনিনজাইটিস, সেটা খুব বেশী একটা দেখা যায় না।

ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিসের কারণ

ব্যাকটেরিয়া কিংবা ফাঙ্গাস জনিত মেনিনজাইটিসের মতো ভাইরাল মেনিনজাইটিস ততোটা সিরিয়াস না হলেও কিছু কিছু ভাইরাস বেশ বাজে ধরণের ইনকফেকশন ঘটাতে সক্ষম।

নিম্নোক্ত ভাইরাসের কারণে হালকা ধরণের অসুখ বিসুখ হতে পারে:

নন-পোলিও এন্টারোভাইরাস (Non-polio enteroviruses) : এই ভাইরাসের কারণেই সবচেয়ে বেশী ভাইরাস জনিত মেনিনজাইটিস দেখা যায়। এটি বিভিন্ন ধরণের ইনকফেকশন ঘটাতে সক্ষন যার মধ্যে ‘সর্দি‘ অন্যতম। প্রচুর পরিমাণ মানুষ এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসে কিন্তু এদের মধ্যে খুব কম মানুষই মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়। মল এবং নাকের সর্দির মাধ্যমে এই ভাইরাস বিস্তার করে থাকে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা (Influenza): এই ভাইরাসের কারণে ‘ফ্লু‘ জনিত অসুখ হয়ে থাকে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের বুকের কাশি, হাঁচি কিংবা মুখের লালার সংস্পর্শে কোন সুস্থ মানুষ আসলে, তিনি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।

মিসেলস ও মাম্পস ভাইরাস (Measles and mumps viruses) : খুবই সংক্রামক এই ভাইরাসের কারণে অবশ্য মেনিনজাইটিস হওয়াটা সাধারণত দেখা যায়না। এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের হাঁচি, কাশি থেকে এই ভাইরাস খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

নিম্নোক্ত ভাইরাসগুলোর কারণে ভয়াবহ রকমের মেনিনজাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে:

ভেরিসেলা (Varicella): ভেরিসেলা ভাইরাসের কারণে চিকেনপক্স হয়। অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাসে আক্রান্ত কোন মানুষের সংস্পর্শে এলেই তা আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে যেতে পারে।

হার্পেস সিম্পলেক্স ভাইরাস (Herpes simplex virus): একজন শিশু জন্মের সময় কিংবা মায়ের গর্ভ থেকেই এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।

ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস (West Nile virus): মশার কামড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস বিস্তার করে থাকে।

৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ভাইরাস জনিত মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। শিশু জন্ম নেওয়ার পর থেকে ১ মাস আগ পর্যন্ত ভাইরাস জনিত ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিসের কারণ

শিশু জন্মের পর থেকে ২৮ দিন – এই সময়ের মধ্যে নিম্নোক্ত ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে।

গ্রুপ বি স্ট্রেপটোকোকাস (Group B Streptococcus): জন্মের সময় মায়ের শরীর থেকে এই ব্যাকটেরিয়া শিশুর শরীরে যায়।

গ্রাম-নেগেটিভ বাকিলি যেমন এসচেরিচিয়া কোলি (ই.কোলি) এবং ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া (Gram-negative bacilli, such as Escherichia coli (E. coli) and Klebsiella pneumoniae): ই.কোলি সাধারণত দূষিত খাবারের মাধ্যমেই ছড়িয়ে থাকে। এছাড়াও এমন কারো দ্বারা রান্না করা খাবার, যিনি টয়লেট ব্যাবহারের পর ঠিকঠাক হাত ধৌত করেন না কিংবা মায়ের গর্ভ থেকেও এই ব্যাকটেরিয়া শিশুর শরীরে যেতে পারে।

লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজেনিস (Listeria monocytogenes):  শিশুরা এটা মায়ের গর্ভ থেকেই পেয়ে থাকে। সাধারণত, ডেলিভারির সময়েই শিশু এটির দ্বারা আক্রান্ত হয়। মূলত দূষিত খাবার খাওয়ার ফলেই মা এই ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসেন।

১ মাস বয়সী শিশু থেকে ৫ বছর পর্যন্ত, নিম্নোক্ত ব্যাকটেরিয়াগুলোর কারণে শিশুর মেনিনজাইটিস হতে পারে:

স্ট্রেপটোকোকাস নিউমোনিয়া (Streptococcus pneumoniae): সাইনাস, নাক কিংবা ফুসফুসে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো দেখতে পাওয়া যায়। হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেই বাতাসে অন্য কেউ নিঃশ্বাস নিলে তার মাঝেও সংক্রমিত হয়। ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিসের সবচেয়ে বড় কারণ এই ব্যাকটেরিয়া!

নেইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস (Neisseria meningitidis): এটিকে ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিসের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যাক্তির মুখের লালা, বুকের কফ কিংবা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া বিস্তার লাভ করে। ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকে।

হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Haemophilus influenzaetype b (Hib): এই ব্যাকটেরিয়া বহনকারী ব্যাক্তির মুখের লালা থেকে এটি অন্য আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ব্যাকটেররিয়ার বহনকারীই আক্রান্ত ব্যাক্তি নন। বহনকারী নিজে অসুখে পড়েন না, তবে আপনার শিশুকে অসুখে ফেলতে সক্ষম।

বহনকারীর সাথে বেশ কিছুদিন নিবিড়ভাবে মিশিলে, তবেই এই ব্যাকটেরিয়া অন্য কারো শরীরে যেতে পারে। এমনকি তারপরও, অধিকাংশ শিশু কেবল এই ব্যাকটেরিয়ার বহনকারীই হয়, মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয় না।

ফাঙ্গাসজনিত মেনিনজাইটিসের কারণ

যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব একটা ভালো নয়, শুধুমাত্র তাদেরই হয় বলে, ফাঙ্গাসজনিত মেনিনজাইটিস খুব একটা দেখা যায় না।

বিভিন্ন রকমের ফাঙ্গাসের কারণে মেনিনজাইটিস হতে পারে। তিন ধরণের ফাঙ্গাস বাস করে মাটিতে, আর এক ধরণের বাস করে বাদুর কিংবা পাখির মুখ থেকে ফেলা দেওয়া উচ্ছিষ্টে। নিঃশ্বাসের মাধ্যমেই ফাঙ্গাস শরীরে প্রবেশ করে।

প্রিম্যাচিওর শিশু যাদের ওজন খুব একটা বেশী হয় না, সেসব শিশুর ‘ক্যান্ডিডা’ নামক এক ধরণের ফাঙ্গাস থেকে রক্তে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশী থাকে। সাধারণত শিশু জন্মের পর হাসপাতালেই এই ফাঙ্গাসের সংস্পর্শে আসে। আর তা যদি শিশুর মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে, তাহলে মেনিনজাইটিস হয়।

শিশুর মেনিনজাইটিসের রোগ নির্ণয় পদ্ধতি

শিশুর মেনিনজাইটিস হয়েছে কিনা, যদি হয়ে থাকে সেটা কি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নাকি ফাঙ্গাসের কারণে হয়েছে সেগুলো বের করতে বেশ  কিছু টেস্ট করা প্রয়োজন। টেস্টগুলো হলো:

ব্লাড কালচার: এই টেস্টে শিশুর ধমনী থেকে রক্ত নিয়ে তা এমন একটি বিশেষ প্লেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয় যেখানে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক দ্রুত বেড়ে উঠতে পারে। যদি এদের মধ্যে কোনটা বেড়ে উঠতে দেখা যায়, তবে সেটার কারণেই মেনিনজাইটিস হয়েছে ধরে নেওয়া হয়।

ব্লাড টেস্ট: শিশুর শরীর থেকে কিছু রক্ত নেওয়া হয় ল্যাবে এটা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে যে, রক্তে কোন প্রকার ইনফেকশন হয়েছে কি না।

লাম্বার পাংচার: এই টেস্টকে ‘স্পাইনাল টেপ’ বলেও ডাকা হয়। মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ডের চারপাশে অবস্থান করা তরল থেকে কিছু তরল বের করা হয় এবং পরীক্ষা করা হয়। এদেরও একটি বিশেষ প্লেটে রাখা হয় যাতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক কিছু বেড়ে উঠে কিনা তা বোঝা যায়।

সিটি স্ক্যান (CT Scan): শিশুর মাথায় ‘এবসেস’ নামক কোন ইনকফেকশনের চিহ্ন আছে কিনা তা জানতে ডাক্তার হয়তো আপনার শিশুর মাথার সিটি স্ক্যানও করাতে পারেন।

শিশুর মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা

মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা নির্ভর করে কি কারণে মেনিনজাইটিস হয়েছে সেটার উপর। কিছু কিছু ভাইরাস জনিত মেনিনজাইটিস কোন প্রকার চিকিৎসা ছাড়া আপনা আপনিই ভালো হয়ে যায়।

তবে সে যাই হোক, আপনার শিশুর মেনিনজাইটিস হয়েছে সন্দেহ হলে যত দ্রুত সম্ভব তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। কারণ ডাক্তার টেস্ট করার আগ পর্যন্ত আপনি নিশ্চিত হতে পারবেন না যে শিশুর মেনিনজাইটিস কোন কারণে হয়েছে কারণ – ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা ছত্রাক যে কারণেই হোক না কেন, এদের উপসর্গগুলো অন্যান্য অসুস্থতার উপসর্গের মত।

ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝবেন চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কিনা। যদি প্রয়োজন হয়, তবে ভালো ফলাফল পেতে  যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া উচিত।

ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, নন-পোলিও এন্টারোভাইরাসেস, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং মাম্পস ও মিসেলস ভাইরাস থেকে হওয়া মেনিনজাইটিস তেমন একটা গুরুতর পর্যায়ে যায় না। তবে নবজাতক শিশু হলে বিভিন্ন গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। আপনার শিশু এসবের মধ্যে কোন ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত চিকিৎসা ছাড়াই ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যেতে পারে।

তবে ভেরিসেলা, হার্পেস সিম্পলেক্স এবং ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের কারণে যদি শিশুর মেনিনজাইটিস হয়, তবে সেটা বেশ সিরিয়াস পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এর মানে হলো, আপনার শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা লাগতে পারে এবং তাকে ইনজেকশনের (আইভি) মাধ্যমে রক্তে ভাইরাসের ঔষধ দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা

ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিসের চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিকই ব্যাবহার করা হয়।  শিশুর ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক সাধারণত আইভি’র (IV) মাধ্যমে দেওয়া হয়। এই কারণে শিশুকে হয়তো কিছুদিন হাসপাতালে অবস্থান করা লাগতে পারে।

ফাঙ্গাস জনিত মেনিনজাইটিসের চিকিৎসা

ফাঙ্গাস জনিত ইনফেকশনের ক্ষেত্রে আইভির মাধ্যমে এন্টিফাঙ্গাল ঔষধ দেওয়া হয়। এই মেনিনজাইটিস হলে আপনার শিশুকে হয়তো এক মাস কিংবা এরও বেশী সময় ধরে হাসপাতালে পরিচর্যায় রাখতে হবে কারণ ফাঙ্গাসজনিত ইনফেকশন থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ কথা নয়।

শিশুর মেনিনজাইটিস  প্রতিরোধ

ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে বেশ কিছু মেনিনজাইটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও এর মাধ্যমে সব ধরণের মেনিনজাইটিস থেকে শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। কোনকিছুরই ১০০% গ্যারান্টি নেই, তাই শিশুকে মেনিনজাইটিসের টিকা দিলেও শিশুর এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যায়।

যদিও একটি টিকাকে,’মেনিনজাইটিস ভ্যাক্সিন’ বলা হয়, কিন্তু এই ভ্যাক্সিন শুধুমাত্র মেনিনগোকোকাল মেনিনজাইটিস প্রতিরোধেই কাজ করতে সক্ষম। উন্নত বিশ্বের দেশ আমেরিকাতে এই টিকা কেবলমাত্র একটু বয়স্ক শিশু এবং টিনএজারদের দেওয়া হয়; অল্পবয়সী শিশুদের দেওয়া হয় না। অবশ্য যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশে শিশুদেরও এই টিকা দেওয়া হয়ে থাকে।

ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস

ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস প্রতিরোধে নিম্নোক্ত ভ্যাক্সিনগুলো কাজ করে:

ইনফ্লুয়েঞ্জা: ফ্লু ভাইরাসের কারণে যে মেনিনজাইটিস হয়, সেটা প্রতিরোধে এই টিকা দেওয়া হয়। শিশুর বয়স ৬ মাসের পর থেকে এটি দেওয়া হয়। এর চেয়ে কম বয়সী শিশুদের এই টিকা না দেওয়া হলেও পরিবারের অন্যান্য বা শিশু যাদের সংস্পর্শে নিয়মিত আসে, তাদের এই টিকা দেওয়া থাকলে শিশুও নিরাপদে থাকে।

ভেরিসেলা: এই ভ্যাক্সিন শিশুকে চিকেনপক্স হওয়া থেকে রক্ষা করে। শিশুর বয়স, ১২ মাস হলে, তারপরই তাকে এই টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া যায়।

মিসেলস, মাম্পস ও রুবেল ( MMR): শিশুর যদি হাম অথবা মাম্পস হয়ে থাকে, তবে তা মেনিনজাইটিসে রূপ নিতে পারে। এই টিকা শিশুকে এই ভাইরাসগুলো থেকে সুরক্ষিত রাখে। শিশুর বয়স ১২ মাস হলে, তবেই এই ভ্যাক্সিন তাকে দেওয়া যায়।

ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিস

ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিস প্রতিরোধে নিম্নোক্ত ভ্যাক্সিনগুলো শিশুকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখে:

হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib) ভ্যাক্সিন: এই ভ্যাক্সিন এইচ.ইনফ্লুয়েঞ্জা ব্যাকটেরিয়া থেকে শিশুকে রক্ষা করে। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে এই ধরণের মেনিনজাইটিস প্রায় নির্মূল করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে এই ভ্যাক্সিন দ্বারা। এই ভ্যাক্সিন শিশুকে এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি ‘বাহক’ হওয়া থেকেও সুরক্ষিত রাখে।

আর বাহক কমে যাওয়ায়, এই দেশগুলোতে ‘সামষ্টিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’ বা Herd Immunity তৈরি হয়েছে। এর মানে, এই দেশগুলোতে এখন যদি কোন শিশুকে ভ্যাক্সিন নাও দেওয়া হয় তারপরও তার এই ব্যাকটেরিয়ার বাহকের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা কম। শিশুর ২ মাস বয়স হকেই এই টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া যায়।

নিউমোকোকাল (PCV13) ভ্যাকসিন: এই ভ্যাকসিন শিশুকে বিভিন্ন প্রজাতির স্ট্রেপটোকোকাস নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখে। দুই মাস বয়সী শিশুদের এই টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়।

মেনিনগোকোকাল ভ্যাক্সিন: নেইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে শিশুকে নিরাপদে রাখতে এই টিকা দেওয়া হয়। শিশুর বয়স ১১ বছর না হওয়ার আগ পর্যন্ত নিয়মমাফিক এই টিকা দেওয়া যায় না। তবে শিশু যদি এমন কোন যায়গায় ভ্রমণে যায়, যেখানে এই ব্যাকটেরিয়ার খুব বেশী প্রাদুর্ভাব রয়েছে কিংবা শিশুর যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি খুব একটা ভালো না হয়, সেক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম হতে পারে। তখন শিশুকে ২ মাস বয়সের পর থেকে নিয়মমাফিক এই টিকা দেওয়া হয়।

গ্রুপ বি স্ট্রেপের ক্ষেত্রে, শিশুকে নিরাপদে রাখতে, মায়ের প্রসববেদনার সময়ই তাকে এন্টিবায়োটিক দেওয়া যায়।

পাস্তুরিত নয়, এমন দুধ থেকে তৈরি চিজ লিস্টেরিয়ার অন্যতম প্রধান উৎস, তাই গর্ভবতী মায়েদের এমন চিজ পরিহার করা উচিত। এর মাধ্যমে মা নিজে লিস্টেরিয়া সংস্পর্শ থেকে নিরাপদে তো থাকবেনই পাশাপাশি গর্ভের শিশুর মাঝেও তা ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

মায়েরা ইনফেকশন থেকে সুরক্ষিত থাকতে এবং কোন প্রকার ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া জনিত মেনিনজাইটিস থেকে নিরাপদে থাকতে নিম্নে লিখিত সতর্কতাগুলো অবলম্বন করতে পারেন

সবসময় হাত ধুয়ে রাখুন। বিশেষত,

  • খাবার রান্না করা কিংবা প্রক্রিয়াজাত করার আগে,
  • বাথরুম ব্যাবহারের পর
  • শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করার পর
  • হাঁচি বা কাশি দেওয়ার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার পর,
  • নাকের সর্দি পরিষ্কার করার পর,
  • ইনফেকশন রয়েছে কিংবা সংক্রামক কোন রোগে আক্রান্ত কারো শুশ্রূষা করার পর

হাত ধোয়ার সঠিক কৌশল অবলম্বন করুন। অর্থাৎ গরম পানি ও সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে। নিশ্চিত হয়ে নিন, নখের নিচে এবং আঙ্গুলে আংটি থাকলে এর নিচেও ধোয়া হয়েছে কিনা।

যখন হাঁচি বা কাশি দেবেন, কনুইয়ের ভেতর কিংবা টিস্যু দিয়ে মুখটা ঢেকে রাখুন। মুখ ঢেকে রাখার জন্যে যদি হাত ব্যাবহার করে থাকেন, সাথে সাথে হাত ধুয়ে ফেলুন।

মুখের লালা লেগে থাকতে পারে এমন বস্তু যেমন ব্যাবহৃত স্ট্র, চামচ, চায়ের কাপ প্লেট এগুলো আরেকজনটা আরেকজন শেয়ার করবেন না। অসুস্থ কাওকে চুমো খাওয়া থেকেও বিরত থাকুন।

হাত ধোয়া না থাকলে ঠোঁটের ভেতরে কিংবা মুখে স্পর্শ করবেন না।

যে জিনিসগুলো আপনার নিয়মিত ধরা হয় যেমন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কি বোর্ড, টিভির রিমোট, চাবির রিং, দরজার নব, খেলনা প্রভৃতি সবসময় পরিষ্কার করে রাখুন।

ফাঙ্গাসজনিত মেনিনজাইটিস

ফাঙ্গাসজিনিত মেনিনজাইটিস প্রতিরোধে কোন ভ্যাকসিন নেই। ফাঙ্গাস বাস করে এমন পরিবেশে শিশুরা সাধারণত থাকেনা, তাই ফাঙ্গাসজনিত মেনিনজাইটিস শিশুদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।

কম ওজনের প্রিম্যাচুর শিশুদের ক্যান্ডিডা ইনফেকশন হতে পারে, যা ভয়াবহ রূপ নিলে তা মেনিনজাইটিস পর্যন্ত যেতে পারে। যেহেতু এই ফাঙ্গাসের উৎস হাসপাতাল, তাই শিশুর জন্মের পর ইনফেকশনের রুটিন চেকআপ করানোর সময় এ নিয়ে সতর্ক থাকলে ফাঙ্গাসজনিত কোন অসুখের ঝুঁকি এড়ানো যায়।

মেনিনজাইটিসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

মেনিনজাইটিস বেশ অপ্রচলিত কিন্তু বেশ সিরিয়াস  এবং শিশুর জীবনের জন্যে হুমকিস্বরূপ এক ইনফেকশন। তবে সঠিক সময়ে রোগ ধরা পরলে এবং সঠিক চিকিৎসা করাতে পারলে শিশু পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে সক্ষম।

চিকিৎসা করাতে যদি দেরি হয়ে যায়, তবুও শিশু রোগমুক্তি পেতে পারে তবে সেক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে এই রোগের কিছু দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যায়। যেমন –

  • অন্ধ হয়ে যাওয়া
  • কানে না শোনা
  • খিঁচুনি
  • মস্তিষ্ককে ঘিড়ে তরল  (hydrocephalus)
  • মস্তিষ্কের ক্ষতি
  • বুদ্ধিবৃত্তি ঠিকঠাক বেড়ে না ওঠা

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) এর মতে, মেনিনগোকোকাল ব্যাকটেরিয়া দ্বারা মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত ৮৫% থেকে ৯০%  মানুষই (শিশু এবং বয়ষ্ক) বেঁচে যায়। বাকি ১১ থেকে ১৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে কোন না কোন দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থেকে যায়।

এটা শুনতে বেশ ভয়াবহ শোনায়। কিন্তু আরেকটা ব্যাপার এখানে যোগ করা যায়- যারা মেনিনজাইটিস থেকে বেঁচে ফিরে আসে, তাদের মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষেরই পরবর্তীতে এর কোন প্রভাব থাকে না। CDC এর মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে- নিউমোকোকাস দ্বারা আক্রান্ত মেনিনজাইটিস থেকে প্রায় ৯২% শিশুই বেঁচে ফিরে আসে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts