লকডাউনের দিনগুলোতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা

Spread the love

সাম্প্রতিক এই অস্থির সময়ে, আমরা সবাই অসুস্থতা এবং মহামারী সম্পর্কে আলোচনা করলেও একটি বিষয় নিয়ে এখনো সেভাবে কথা বলছি না – আর বিষয়টি খুব দুঃখজনকভাবে বিশ্বব্যাপী বর্তমান মহামারীর একটি  স্পর্শকাতর পরিণাম হতে যাচ্ছে। এই বিষয়টি আমাদের ছোট নিষ্পাপ শিশুদের নিয়ে, যারা এই মুহূর্তে পরিবারের অন্যদের সাথেই বাস করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক কিছু শিশুর মৃত্যু ব্রেইন ট্রমা জাতীয় কিছু সমস্যায় হয়েছে, যেগুলো চাইল্ড অ্যাবিউযের কারণে হয়েছে বলে সেখানখার ডাক্তাররা আশংকা করছেন। UNICEF এবং শিশু-কল্যান বিশেষজ্ঞরা তাদের কিছু বিবৃতিতে  এই মহামারী ও এই সংক্রান্ত বিভিন্ন চাপের কারণে শিশুদের সাথে দুর্ব্যবহার, তাদের যথার্থ যত্নে অবহেলা, যৌন হয়রানী কিংবা আরো নানারকম সহিংসতার পরিণাম বেড়ে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছে। 

বিজ্ঞাপণ

সমাজকর্মীরা  ন্যাশনাল লকডাউনে বাড়িতে অবস্থান করা প্রতিবন্ধী শিশুদের কথা ভেবেও বিশেষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, যাদের বিভিন্ন বিকাশকেন্দ্রের উপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। শিশুদের প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে ছয় বছরের চেয়ে কম বয়সী বাচ্চারা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলেনয় স্টেইটের একটি সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্কুল-কলেজ বন্ধ এবং ন্যাশনাল শাটডাউনের পর থেকে, চাইল্ড অ্যান্ড ফ্যামিলী সার্ভিস ডিপার্ট্মেন্টের হটলাইনে নাটকীয়ভাবে অভিযোগের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে।  কারণটা যদিও খুব সহজেই অনুমান করা যায়।

স্কুল কিংবা বাইরের কারো দ্বারা হওয়া শিশু নির্যাতনগুলো কিংবা বুলিইং কেইসগুলো কমে গেছে, যেগুলোর জন্য সচরাচর বাবা-মায়েরাই অভিযোগ করে থাকতেন। কিন্তু এই রিপোর্ট দেখে এবং সাম্প্রতিক পারিবারিক কিছু নির্যাতনের কেইস বিবেচনা করে শিশু-কল্যান বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে,  বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর অভিযোগ পাওয়া যেত, যেটি  বরং এখন পাওয়া খুব দুষ্কর হয়ে পড়ছে  যেহেতু এই অ্যাবিউযের ঘটনাগুলো বাবা-মা কিংবা পরিবারের কোন সদস্য দ্বারাই ঘটছে। এসব ঘটনা অন্য সময় যে একেবারেই ঘটে না তা নয়।কিন্তু জাতীয় এধরণের দুর্যোগ মুহূর্তে এর হার আশঙ্কাজনক বেড়ে যাবার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।             

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমাজকল্যান এবং সমাজ সেবা সার্ভিসগুলোয় বেশ হতাশাজনক কিছু তথ্য আসতে শুরু করেছে। উন্নত বিশ্বের সার্ভিস ডিপার্টমেন্টগুলো এসব বিষয়ে সচেতন হওয়ার কারণে আমরা এদেশে বসেই হয়তো সেসব তথ্য পাচ্ছি। তবে, এরকম ভাবার কোন কারণ নেই, কেবল কিছু দেশে বিশেষ করে অ্যামেরিকায় এসব ঘটছে। এই চিত্রটি বিশ্বের বেশীরভাগ দেশেরই,  কিন্তু এসব বিষয়ে সচেতনতা এবং সঠিক  তথ্য প্রদানের  অভাবে আমরা জানতেই পারছি না বন্ধ দরজাগুলো ভেতরে কত অসহায় প্রাণ গুমরে কাঁদছে, যারা মহামারী কিংবা লকডাউন শব্দটির মানেই বুঝতে শেখেনি এখনো।  

যে সমস্ত কারণে বাবা-মায়েরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকতে পারেন

বিশ্বজুড়ে এবং দেশ জুড়ে মন্দার কারণে অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং বেকারত্ব

পুঁজিবাদী সমাজে আমরা ভোগ্য পণ্য এবং বিভিন্ন সুবিধায় এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, সাময়িকভাবে কোন কিছু বন্ধ ঘোষণা, কোন কিছুর আশঙ্কা কিংবা কোন গুজব শুনলেই আমাদের দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধা বন্ধ হবার কথা ভেবেই আতঙ্কিত এবং অসহায় বোধ করতে থাকি। ডায়াপার এবং শিশু খাদ্যের ঘাটতির কথা চিন্তা করেও মা –বাবা আতঙ্কিত বোধ করেন।

শিশুদের সাধারণ অসুস্থতায় যেহেতু আগের মত চিকিৎসা সেবাও পাওয়া যাচ্ছে না, এমন অবস্থায়, সাধারণ শারীরিক সমস্যায়ও বাবা মা আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারেন। বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে অনেকেই বিকল্প আয়ের উপায় খুঁজতে হন্য হয়ে পড়ছেন, ফলশ্রুতিতে তারা শিশুর যথার্থ যত্ন নিতে এবং শিশুর সাথে ভালো সময় কাটাতে পারছেন না। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার, কিছু কিছু সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে শিশু নির্যাতনের মত ঘটনার পরিমাণ আগের চেয়ে আশংকাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে।

শিশুদের বৈরী আচরণ

প্রযুক্তির এই যুগে হাইপার অ্যাক্টিভ কিংবা  ADHD সমস্যায় আক্রান্ত বাচ্চার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এই মুহূর্তে ডে কেয়ার, স্কুল কিংবা বিভিন্ন ডেভেলপমেন্ট সেন্টারগুলো বন্ধ থাকায় বাচ্চারা একটানা বাড়িতেই অবস্থান করছে। ফলশ্রুতিতে তাদের শারীরিক মুভমেন্ট এবং মানসিক বৃদ্ধির  বিভিন্ন কার্যক্রম যেগুলো সাধারণত স্কুলে হয়ে থাকে –সেগুলো ঘটছে না, কিংবা অনেক কমে গেছে।

খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘরে অবস্থান করা বেশীরভাগ বাচ্চাই বৈরী আচরণ করবে। শিশুর শারারিক এবং মানসিক বৃদ্ধির খুব স্বাভাবিক কিছু চাহিদা আছে যেগুলো প্রকৃতির সান্নিধ্যে এবং দুষ্টুমি, খেলাধুলা, কৌতূহল প্রদর্শন সেই সাথে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের  মাধ্যমে পূর্ন হয়ে থাকে।

একটা সময় ছিলো, বাবা-মায়েরা এসব বিষয় নিয়ে তেমন একটা ভাবতেন না, কিন্তু বাচ্চারা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে  উঠতো যার অনেক সুফলও ছিলো। কিন্তু এখন বাবা মায়েরা অনেক সচেতন হলেও, বাচ্চার বিকাশের জন্য খুব বেশি একটা সময় দিতে পারছেন না।  প্রাকৃতির সান্নিধ্যেও বেড়ে ওঠার সুযোগ নেই বেশীরভাগ শহুরে  বাচ্চার। অনেক শিশুর জীবন এখন খাওয়া , ঘুম আর টিভি কিংবা বিভিন্ন হ্যান্ড ডিভাইসের বেড়াজালেই আবদ্ধ। 

সত্যি কথা বলতে,  শিশু-বিকাশের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডগুলো অনেকাংশেই এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ভর হয়ে গেছে।  আর প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় গৃহ-বন্দী শিশুরা সময় কাটাতে, একঘেয়েমি কাটাতে কিংবা তাদের জমে থাকা এনার্জি  খরচের জন্য অনেক দুরন্তপনা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে হাইপার-অ্যাক্টিভিটি দেখাচ্ছে, যেটি ভীত এবং স্ট্রেসড  হয়ে থাকা বাবা মায়ের জন্য সামাল দেয়া অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।      

এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক কিংবা রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে না পারার কারণে হয়তো কিছু বাচ্চা ডিপ্রেশানে ভুগতে পারে কিংবা বাবা মাকে দায়ী করতে পারে, কারণ কিছু বাচ্চার পারিবারিকভাবে ছুটি কাটানোর হয়তো আর কোন মাধ্যম হয়তো নেই। তারা হয়তো জানেই না, বাবা মায়ের সাথে বাসায় বসে ছুটি কিংবা সময় কিভাবে কাটানো যায়?  আমাদের বেশীরভাগ বাবা-মায়ের গড়ে দেয়া জীবনধারণ প্রণালী  এসব প্রতিকূল অবস্থায় বাচ্চাদের অসহায় করে তোলে, কারণ মহামারীর বিপর্যয় বোঝার মত মানসিক পরিপক্বতা তাদের এখনো গড়ে ওঠেনি।   

আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য

সত্যি কথা বলতে, শারীরিকভাবে সুস্থ এবং প্রতিকূলতায় মানসিকভাবে শক্ত থাকার জন্য যে লাইফস্টাইল প্রয়োজন, আমাদের অনেকেই সেটি অনুসরণ করি না, কিংবা অনেক সময় করতে পারি না। আমাদের কর্মজীবণ, ট্র্যাফিক জ্যাম,  দূষিত বাতাস, নানা রকম ডিভাইস থেকে নির্গত হওয়া ক্ষতিকর রেডিয়েশান  আর নানারকম প্রিযারভেটিভ দেয়া খাবারের ভিড়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকাটাই কঠিন, যদি না অসম্ভব কঠোরভাবে আর নিয়মানুবর্তী  হয়ে স্বাস্থ্যবিধিগুলো মেনে চলা না হয়। 

সত্যি কথা বলতে, আমরা আমাদের কাজের এবং মনের চাপ কমাতে অনেক সময়ই ভেঙ্গে চলেছি বেঁচে থাকার ন্যুনতম বিধিনিষেধগুলোকে। তাই, নিজেরদের পারিবারিক কিংবা সামাজিক জীবনে আমরা হ’য়ে পড়ছি অসুখী, এবং এর পেছনে বড় একটি কারণ হলো শারীরিক দুর্বলতা কিংবা অসুস্থতা । 

তার উপর  যখন আমাদের জীবনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, অজানা উৎকণ্ঠার ভেতর দিনের পর দিন কাটাতে হয়, স্বাভাবিকভাবেই বাচ্চাদের বিভিন্ন আবদার, দুষ্টুমি ,ঘ্যানঘ্যান কিংবা অবুঝপনা সামাল দেয়ার মত মানসিক শক্তি  অনেকেরই হয়তো থাকছে না। অস্বীকার করার কোনই উপায় নেই, কিছু ক্ষেত্রে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের ইনভল্ভমেন্ট অনেকসময়ই নিজের পরিবারের সাথে এবং শিশুদের সাথে দূরত্ব তৈরি হবার বেশ বড় একটি কারণ।

তাই আসুন, এই পৃথিবীর এই দুঃসময়ে  যতটুকু সম্ভব নিজেদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রেখে এই দুর্যোগ মোকাবেলা করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বের এই দুর্যোগে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কিছু গাইডলাইন প্রদান করেছে। আমরা সেগুলোর আলোকেই কিছু বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

এই দুর্যোগে কিভাবে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেবেন

কোন দুর্যোগে আমরা যখন আতংকিত কিংবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি, বাচ্চারাও সেটা অনেকটাই আঁচ করতে পারে। মানসিক ভাবে পরিণত না হওয়ায় তারা তাদের মনের ভাব কিংবা আবেগকে সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। ফলে দেখা যায়, ঘ্যানঘ্যান করা, ঘুম কিংবা খাদ্যাভ্যাসের ব্যতিক্রম ঘটা এবং মা –বাবাকে কিংবা কেয়ার-গিভারকে আঁকড়ে ধরে থাকা (সেপারেশান আংযাইটি) অনেক বেড়ে যায়। সুতরাং যথাসম্ভব শিশুদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করুন।

মনে রাখবেন, তাদের অন্যায্য আচরণ বেশীরভাগ সময়ই তাদের নিরাপত্ত্বাহীনতা-বোধের কারণে হয়ে থাকে, যেহেতু তাদের অনুভূতি এবং আবেগের নিয়ন্ত্রণ এবং বহিঃপ্রকাশ শিখতে বেশ কিছু বছর সময় লেগে যায়। তাদের সাথে যথাসম্ভব নরম সুরে কথা বলুন এবং নিজেদের মনের অ্যাংযাইটি যেন তাদের মধ্যে সংক্রমিত না হয়, সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখুন। এ সময়টিতে শিশুদের জন্য একটু বাড়তি মনোযোগ এবং সময় রাখুন।

শিশু কথা বুঝতে পারার মত বয়স হলে তাকে তার বয়স কিংবা বোঝার ক্ষমতা অনুযায়ী সমস্যাটির কথা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুন। তার করা কোন প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর পযিটিভ্ উপায়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। সেইসাথে তাকে যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে সাহসী এবং প্রত্যয়ী হবার শিক্ষা দিন।  মা বাবা এবং পরিবারের অন্যদের সংযত এবং সহযোগিতাপুর্ন আচরণ এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করে। 

বিজ্ঞাপণ

নিউজ চ্যানেল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার খবর তাদের সামনে খুব বেশি আলোচনা কিংবা প্রদর্শনের ব্যাপারে সতর্ক হোন, তারা এসব ব্যাপারের ভুল ব্যাখা করতে পারে।  

বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকলেও একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার উপকরণ সরবরাহ করে তাদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা চালু রাখুন, অল্প পরিসরে হলেও। সেই সাথে বয়সোপোযোগী  বিভিন্ন ধরণের বই  কিংবা অ্যাক্টিভিটি টয় দিয়ে ব্যস্ত রাখতে পারেন।

বাচ্চার সাথে রিডিং টাইম খুবই প্রয়োজনীয়। চাইল্ড-ডেভেলপমেন্ট এক্সপার্টরা বাচ্চার মানসিক বৃদ্ধি এবং বুদ্ধির বিকাশে বাচ্চাকে বই পড়ে শোনানোর উপর বেশ জোর দিয়ে আসছেন। এমনকি নবজাতক কিংবা গর্ভস্থ শিশুকেও বই পড়ে শোনানোর জন্য উপদেশ দিচ্ছেন। তাই প্রতিদিনের রুটিনে কিছুটা সময় অবশ্যই বাচ্চার সাথে বই পড়ে , বইয়ের ছবি দেখিয়ে, এবং সে বিষয়ে গল্প করে অতিবাহিত করুন। এতে বাচ্চার মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মা-বাবার কিংবা যিনি এ কাজটি করছেন তার স্ট্রেস-লেভেলও কমতে সাহায্য  করে এবং শিশুর সাথে ভালো একটি বন্ধন তৈরি হয়।  

শিশুরা সাধারণত যাদের সাথে বেশি সময় কাটায়, হতে পারে গ্র্যান্ডপ্যারেন্টস কিংবা অন্য কোন কেয়ারগিভার, কিংবা তারা যাদের সাথে থাকতে অভ্যস্ত, খুব বেশি প্রয়োজন না পড়লে তাদের থেকে  আলাদা করবেন না। এতে বাচ্চার মধ্যে নিরাপত্বাহীনতা তৈরি হয়। তবে, বিশেষ প্রয়োজনে আলাদা থাকতে হলে, নিয়মিত ফোনে অথবা ভিডিও চ্যাটে তাদের সাথে শিশুর যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করুন।

লক-ডাউনে শিশুর একঘেয়ে লাগছে মনে হলেই, শিশুদের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়তে সাহায্য করবেন না। ওয়াই-ফাই, অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম (টিভি/ হ্যান্ড ডিভাইস) শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে বাধা দেয়ার সাথে সাথে, বাচ্চাদের স্ট্রেস –লেভেল বাড়িয়ে দেয়। তাই, স্ক্রিন টাইম কোন অবস্থাতেই সীমিত সময়ের বেশি হওয়া উচিত নয়।

অতিরিক্ত চিনি যুক্ত খাবার (চকলেট,পেস্ট্রি, নিউটেলা, আইস্ক্রিম ইত্যাদি),  টিনজাত এবং অতিরিক্ত লবন সমৃদ্ধ খাবার যেমন চিপ্স, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই অথবা জাঙ্ক ফুড যতটা পারা যায় বর্জন করুন। এগুলো শিশুদের হাইপারঅ্যাক্তিভিটি বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যকর খাবারে রুচি নষ্ট করে দেয়।

সম্ভব হলে বাচ্চাদের বাইরে খেলতে দিন, যদি নিরাপদ ছাদ কিংবা বাড়ীর সামনে বা পিছনে খেলার মত জায়গা থাকে। অন্যথায়, বাড়িতেই বাচ্চাদের খেলতে দেয়ার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করতে পারেন যেখানে শারীরিক কসরতের সুযোগ থাকবে।  লকডাউনের দিন-গুলোয় বাচ্চাদের জন্য অনেক মজার এবং ক্রিয়েটিভ কর্মকাণ্ডের আইডিয়া রয়েছে চাইল্ড-ডেভেপমেন্টের ওয়েবপেইজগুলোয়  এবং ইউটিউবে। 

সর্বোপরি মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যদের আলাদাভাবে বাড়ীর শিশু-কিশোরদের কথা মাথায় রেখে নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সমর্থ থাকতে চেষ্টা করে যেতে হবে।

বাবা মা কিংবা প্রাপ্ত-বয়স্কদের নিজেদের জন্য যা করনীয়

দুঃখ পাওয়া, টেনশান বা মানসিক চাপ, বিভ্রান্তি, ভয় পাওয়া কিংবা রেগে যাওয়া –এগুলো সঙ্কটের সময় মানুষ মাত্রেই ঘটতে পারে। তাই প্রথমেই এই সত্যটিকে মেনে নিন। এবং কিভাবে বিপদের সময় কিংবা কোন কিছুর ক্রান্তিলগ্নে নিজেকে শান্ত রাখবেন তার জন্য মানসিকভাবে কিছু প্ল্যান করে নিন। যদিও সবসময় মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ প্ল্যান অনুযায়ী চলে না, তবুও বাস্তবতাকে মেনে নেয়া, নিজের দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেই অনুযায়ী নিজের ইমোশান কন্ট্রোল করার জন্য সুষ্ঠু একটি পরিকল্পনা করা –অনিয়ন্ত্রিত আবেগের বহিঃপ্রকাশ অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে।

 অবশ্যই একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা মেনে চলুন। নির্দিষ্ট সময় মেনে স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত আহার, আর যথেষ্ট পরিমান পানি পানের কোন বিকল্প নেই। মানসিক চাপ কমাতে এবং শরীর ভালো রাখতে চিনিযুক্ত খাবার বর্জন করার অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। সাথে অন্যান্য কার্ব জাতীয় খাবার পরিমিত খেতে বলা হয়। অ্যালকোহল, নেশাজাতীয় কোন ড্রাগ এবং স্মোক-করা থেকে বিরত থাকুন। এগুলো  মানুষের চিন্তাশক্তি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে বিরুপ ভূমিকা রাখে।

নিয়মিত হাঁটাচলা এবং এক্সারসাইয করা চালিয়ে যান। নিজের এবং পরিবারের কিছু কাজ ভাগ করে নিন। এই বিষয়টির উপকারিতা ত্রিমুখী – এতে শরীর, মন এবং পারিবারিক বন্ধন- তিনটিই মজবুত হয়ে ওঠে। অনেকক্ষণ একটানা বসে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। পর্যাপ্ত ঘুম এবং রেস্টের দিকেও খেয়াল রাখুন।    

বিজ্ঞাপণ

কিছুটা সময় নিজেকে দিন, যার যার ধর্ম অনুসারে প্রার্থনা কিংবা ম্যাডিট্যাশান আমাদের আত্ত্বোপলব্ধি এবং নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ জোরালো করতে সাহায্য করে। 

সামাজিক জমায়েত এড়িয়ে চললেও সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন। আজকাল ফোন এবং ইন্টারনেটের কল্যাণে ভার্চুয়ালি যোগাযোগ করা খুবই সহজ। পরিবার, আত্মীয়, সহকর্মী ও বন্ধু-বান্ধবের সাথে কথা বলুন, তাদের কুশল জানুন এবং নিজের অবস্থার কথাও শেয়ার করুন।  সম্ভব হলে প্রতিবেশীদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করুন। তাদের সাথে নিরাপদ দুরত্বে থেকে কিছুসময় গল্প করতেও পারেন। 

টেকনোলোজির ব্যবহার সম্ভব হলে সীমাবদ্ধ রাখুন। সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব বেশি সময় দেয়া বন্ধ করে দিন। নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া যেকোনো খবর কিংবা গুজব বিশ্বাস করা কিংবা না জেনেই শেয়ার করা থেকেও বিরত থাকুন।

নিজের ভাল লাগে এমন কিছু শখের কাজ করুন, যেমন নতুন কিছু রান্না করা, কোন ধরনের খেলাধুলা, আর্ট কিংবা ক্র্যাফটের কাজ করা, বাগান করা কিংবা অন্য যেকোনো ক্রিয়েটিভ কাজ যেটি অবশ্যই স্ক্রিন কিংবা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস নির্ভর হবে না। অন্যথায় হিতে বিপরীত হবে।

পরিবার, সমাজ এবং পরিবেশের প্রতি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করুন। সোশাল ওয়েলফেয়ারের কাজগুলো ঐচ্ছিক, সাধারণত মানুষ এর কোন প্রতিদান আশা করে না। তবে, এই কাজগুলো নিজের স্বার্থে একেবারেই আসেনা তা কিন্তু না। মনে রাখবেন , মানসিক সন্তুষ্টি এবং আনন্দের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি সোর্স হলো নিজের দায়িত্ব পালন করা এবং অন্যের জন্য কিছু করা। এমনকি রাস্তার অসহায় কুকুর, বেড়াল কিংবা পাখিকে খাবার দিলেও দেখবেন অসাধারণ তৃপ্তি কাজ করে মনে।

কিছুই করা সম্ভব না হলে কারো সাথে একটু হেসে কথা বলুন, কারো মন ভালো করে দিন, স্পাউসকে একটা কবিতা ডেডিকেট করুন, কিংবা নিজের বৃদ্ধ মা বাবার সাথে চা খেতে খেতে একটু মন ভালো করা গল্প করুন। অন্যকে সাহায্য করা মানেই কিন্তু আর্থিক সাহায্য নয়। আপনার একটু হাসি কিংবা কোন পসিটিভ কথাও হতে পারে, হতাশায় ডুবে যাওয়া কোনো মানুষের ভেসে ওঠার শক্তি।   

সবার জন্য শুভকামনা।


Spread the love

Related posts

2 Thoughts to “লকডাউনের দিনগুলোতে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা”

  1. Nahrin

    Well organised content.. Good to read..

Leave a Comment