শিশুর বো লেগ (Bow-leg) বা বাঁকা পা

Updated on

আপনার শিশু যখন জন্ম গ্রহণ করে, দেখবেন সে সবসময় পা নিজের দিকে একটু বাঁকা করে রাখতে চায় সবসময়। গর্ভকালীন সময়ে এই অবস্থাতে ছিল বলেই সে সবসময় এমনভাবে পা বাঁকিয়ে রাখে। মজার ব্যাপার হল জন্মের পরপরই আপনার শিশুকে ছোট্ট একটি বলের মত করে ভাঁজ করে রাখা সম্ভব, কেননা গর্ভকালীন সময়ে সে ঠিক এই অবস্থাতেই ছিল। প্রসবের পরই শুধুমাত্র তার পা সামান্য একটু সোজা হয় এবং প্রায় বেশ কয়েক সপ্তাহ পরই সে পা পুরোপুরি সোজা করতে পারে।

গর্ভকালীন সময় মায়ের জরায়ুর ছোট জায়গার কারণে শিশুর পা বাঁকা থাকে। শিশুর পা বাঁকা কিনা এটা বোঝার সহজ উপায় হল, শিশু যখন দুই পায়ের গোড়ালির একসাথে করে তার উপর ভর দিয়ে দাঁড়ায় এবং তার দুই হাঁটু একে অপরকে স্পর্শ করেনা, তখন বুঝতে হবে যে আপনার শিশুর পা বাঁকা।

কখনো এই বাঁকার পরিমাণটি খুবই সামান্য এবং খুব দ্রুতই এটা ঠিক হয়ে যায়। কখনো এটা একদমই সুস্পষ্ট এবং আশেপাশের অনেকেই আপনার শিশুর পা যে আদতে বাঁকা এটা নিয়ে মন্তব্য করবে। এটা খুব সামান্য হোক অথবা গুরুতর, শিশুকে এইভাবে হাঁটতে দেখলে অনেক বাবা মা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

আপনার শিশুর পা জন্মগত ভাবেই কিছুটা বাঁকাএটা কি স্বাভাবিক?

এটা আদতে খুবই স্বাভাবিক এবং বোধগম্য একটি ব্যাপার কেননা শিশুর যখন গর্ভকালীন অবস্থায় থাকে তখন সে খুব শক্তভাবে গুটানো অবস্থায় থাকে আর এজন্য পায়ের হাড় কিছুটা বাঁকা হয়ে যেতে পারে। গর্ভকালীন অবস্থায় পায়ের হাড় বেশ নরম থাকা অবস্থাতেই বৃদ্ধি পায়।

এমনকি যখন শিশুর জন্ম হয় তখনও হাড়গুলো বেশ নরম থাকে এবং খুব ধীরে ধীরে তারা শক্ত এবং স্বাভাবিক পর্যায়ে আসতে থাকলেও জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহ এগুলো বেশ কিছুটা বাঁকা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে যখন শিশু হাঁটা শুরু করে এবং পায়ের উপর শরীরের ভর যায় তখন এই কিঞ্চিৎ বাঁকা পা প্রাকৃতিক ভাবেই ধীরে ধীরে সোজা হতে থাকে।

যখন শিশু প্রথমবারে মত হাঁটা শুরু করে, তখন তার পা দেখতে কিছুটা বাঁকা মনে হলেও আসলে কিন্তু তার পা বাঁকা নয়। এর কারন হল, শিশু যখন হাঁটা শুরু করে তখন সে খুব সতর্ক থাকে কোথায় পা রাখছে সেটা নিয়ে। পা রাখার সাথে সাথে তাকে আবার শরীরের ভারসাম্যও ধরে রাখতে হচ্ছে যেটা একটা শিশুর জন্য খুব সহজ কোন ব্যাপার না। একারণেই শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য নবজাতক শিশু তার হাঁটু কিছুটা বাঁকা করে রাখে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, এগুলো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

তবে যদি একই রকম অর্থাৎ দুই পা সমভাবে বাঁকা না হয় অথবা এই বাঁকার পরিমাণটা খুবই বেশি এবং সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে তাহলে তাহলে কিন্তু এটা আবার উদ্বিগ্ন হওয়ার মত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া আপনার শিশুর যদি হাঁটার সময় ব্যথা পায় অথবা একদমই হাঁটতে না চায় তাহলে আপনার শিশু কি এই পা বাঁকা থাকার কারণে আরো কোন সমস্যায় ভুগছে কি না এ ব্যাপারে আপনাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে। এমতাবস্থায় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

খুব কম কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি এর অভাবে এমন হতে পারে। এটাকে রিকেটস বলে। এছাড়াও হাড়ের একধরনের সমস্যা যেটা Blount’s disease নামে পরিচিত, তার কারণে পা বাঁকা হতে পারে।

কতদিন পর্যন্ত নবজাতক শিশুর পা কিঞ্চিৎ বাঁকা হয়ে থাকে?

শিশু হাঁটা শুরু করার কয়েক মাস পর্যন্ত তার পা কিঞ্চিৎ বাঁকা দেখাতে পারে। সময়ের সাথে সাথে এই বাঁকা অবস্থা ঠিক হয়ে যাবে এবং শিশু তার পা পুরোপুরি সোজা করে হাঁটতে পারবে। এই সময়ে পায়ের হাড় পরিপক্ব এবং শক্ত হতে থাকে। কারো ক্ষেত্রে এটা ঠিক হতে মাত্র কয়েক মাস লাগে আবার কারো ক্ষেত্রে প্রায় বছর খানেক সময় লেগে যায় এটা ঠিক হতে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার শিশু স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছে এবং পায়ে কোন ব্যথা হচ্ছে না ততক্ষণ পর্যন্ত এটা হয়তোবা স্বাভাবিক।

তবে এই ধরনের সমস্যার ঠিক উল্টাটাও হতে পারে অর্থাৎ শিশুর হাঁটু একে অপরের সাথে ধাক্কা খেতে পারে যাকে ইংরেজিতে knock-knees বলে। এই সমস্যা থাকলে, শিশু যখন হাঁটে অথবা দৌড়ায় তখন তার হাঁটু এঁকে অপরের সাথে বাড়ি লাগে কিন্তু তার পায়ের গোড়ালি বাইরের দিকে বাঁকানো থাকে। সাধারণত তিন থেকে ছয় বছরের মধ্যে এই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। তবে শিশু যখন বড় হতে থাকে সাধারণত দুই ধরনের বাঁকা পা’ই ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়।

ছবিঃ kidsorthopedic

কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের অবস্থাগুলো একেবারেই স্বাভাবিক পর্যায়ে পরে এবং এই দুই ধরনের বাঁকা পা’ই ঠিক হয়ে যায়। তবে আপনি যদি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং শিশুর মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে থাকেন তাহলে তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান এবং ডাক্তারকেই পরীক্ষা করতে দিন যে আপনার শিশু কি স্বাভাবিক আছে কি না। যদি কোন ধরনের সমস্যা থেকে থাকে তাহলে ডাক্তারই সেটা চিহ্নিত করবেন।

তিন বছর বয়সের দিকে সাধারণত শিশুর বাঁকা পা নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে যদি তিন বছর অতিক্রম করার পরেও যদি শিশুর এই কিঞ্চিৎ পরিমাণে বাঁকা পা ঠিক না হয়ে যায় তাহলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

এছাড়াও যদি এই সমস্যা শুধুমাত্র এক পায়ে হয় অথবা সময়ের সাথে সাথে পায়ের বাঁকা ভাব আরো বেড়ে যায় তাহলেও তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যান।  

যে সকল সময়ে শিশুর বাঁকা পা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন এবং তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবেন, তা নিম্নে বর্ণীত হলঃ

  • পা ধীরে ধীরে আরো বাঁকা হয়ে যাচ্ছে এবং দুই বছর অতিক্রম হয়ে গেছে এমতাবস্থায়
  • এক পা অন্য পা থেকে একটু বেশি বাঁকা
  • শিশুর পায়ের পাতার সামনের অংশ একে অপরের দিকে কিছুটা বাঁকা হয়ে থাকলে।
  • শিশু যদি তার বয়স অনুপাতে খাটো হয় এবং হাঁটতে সমস্যা দেখা যায় অথবা সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারলে।
  • হাঁটার সময় হাঁটু বাঁকা হয়ে থাকার কারণে যদি ব্যথা অনুভব করে।

শিশুর হাঁটা নিয়ে যে কোন সময় যদি উদ্বিগ্ন হন তাহলে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। কেননা সবসময়ই পরবর্তীতে আফসোস করার থেকে নিরাপদ থাকাটাই ভালো।    

শিশুর বাঁকা পায়ের চিকিৎসা ডাক্তার কীভাবে করবে?

এমতাবস্থায় ডাক্তার শিশুর বিভিন্ন ধরনের রক্ত পরীক্ষা করাতে পারেন অথবা দুই পায়ের এক্স-রে করাতে পারেন। যদি দেখা যায় যে শিশু ভিটামিনের অভাবে এই ধরনের সমস্যায় ভুগছে তাহলে শিশুর পা স্বাভাবিক করার জন্য কি করতে হতে পারে তা ডাক্তার বলে দিবেন। পায়ের হাড়ে কোন প্রকার সমস্যা থেকে থাকলে তা এক্স-রে এর মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়।

কখনো এমন দেখা যেতে পারে যে শিশু কোন ধরনের সমস্যায় ভুগছে এবং আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ তাকে নিয়ে অর্থপেডিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বলতে পারেন। এমতাবস্থায় সেই অর্থপেডিক ডাক্তার আপনার শিশুর কি ধরনের সমস্যায় ভুগছে তা নির্ণয় করবেন।

কখনো দেখা যায় যে শিশুর বাঁকা পা দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও আগের মত থাকে অথবা আরো বাঁকা হয়ে যায়। যদি এই ধরনের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে ডাক্তার তার বায়ে ব্রেজ পড়াতে বলতে পারেন, যাতে করে শিশুর পা সোজা হয়েই বৃদ্ধি পেতে থাকে।

কখনো অপারেশনেরও প্রয়োজন পড়তে পারে, তবে সেটা খুবই স্পেশাল কিছু ক্ষেত্রেই শুধু প্রয়োজন পড়ে। সবসময় মনে রাখবেন, দুই থেকে তিন বছর পায় হয়ে যাওয়ার পরেও শিশুর বাঁকা যদি ঠিক না হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তাকে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাবেন।

এই ধরনের সমস্যায় কখনো বিলম্ব করবেন না অর্থাৎ ডাক্তার দেখাতে দেরি করবেন না। কেননা দেরি করার কারণে শিশুর হাঁটু, কোমর সহ অন্যান্য জয়েন্টে আরো বড় ধরনের কোন সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts