শিশুর কৃমি হলে করনীয়

কৃমি হওয়া বলতে কি বোঝায়?

এর মানে হলো আপনার শিশুর অন্ত্রে কৃমির সংক্রমণ হয়েছে। আপনার শিশু অন্য কারো মাধ্যমে, সংক্রমিত স্থানে খালি পায়ে হাটা, দূষিত পানিতে খেলাধুলা করা কিংবা অপরিষ্কার খাবার খাওয়া সহ বিভিন্ন কারণেই কৃমি দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে।

কৃমি দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার পর সেগুলো যদি শিশুর পেটের ভেতরে ডিম পাড়ে, তাহলে সেখান থেকে আরো কৃমির জন্ম হয়, সেগুলোও আরো ডিম পাড়ে এবং এই বিস্তারটি খুবই দ্রুত হয়।

শিশুর কৃমির সংক্রমণ হওয়াটা কতটা স্বাভাবিক?

কৃমির সংক্রমণ খুব অস্বাভাবিক কোন বিষয় নয় এবং এটি ছড়ায়ও খুব দ্রুত। তবে বড় কথা হলো, তেমন কোন বড় উপসর্গ দেখা না দেওয়ায়, বাইরে দেখে বোঝার উপায় নেই যে কৃমির সংক্রমণ আসলে কতটা সিরিয়াস পর্যায়ে আছে। কখনো কখনো হয়তো জানতেও পারবেন না যে শিশুর পেটে কৃমিজনিত ইনফেকশন হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন যে কোন এক প্রকারের কৃমির ইনফেকশনে আক্রান্ত। শিশুদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো বেশী।

বিভিন্ন প্রকারের কৃমির কারণে শিশুর পেটে ইনফেকশন হতে পারে। কমবয়সী শিশুদের আক্রান্ত করে এমন কৃমিদের মধ্যে সুতা কৃমি অন্যতম। এটি দেখতে অনেকটা পাতলা সুতার মত যা লম্বায় স্ট্যাপলার পিনের মতো, সাধারণত তিন মি.মি থেকে ১০ মি.মি. পর্যন্ত হয়।

সুতাকৃমি ছাড়াও বক্রকৃমি, গোলকৃমি ও হুইপওয়ার্ম দ্বারা ইনফেকশনও বাংলাদেশে বেশ দেখা যায়। শিশুর কৃমির ইনফেকশন হয়েছে এটা মা বাবার জন্যে হতাশার বিষয় তো বটেই। তবে বেশি দুশ্চিন্তার কিছু নেই, কৃমি থেকে মুক্তি পাওয়াটা খুব একটা কঠিন তো নয়ই বরং তুলনামূলক দ্রুত।

শিশুর কৃমি হয়েছে, কীভাবে বুঝবেন?

শিশুর পেটে কৃমির ইনফেকশন হলে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এর কোন লক্ষণ কিংবা উপসর্গ দেখা যায় না। যদি দেখাও যায়, লক্ষণগুলো এতই মামুলি থাকে যে সেগুলো এড়িয়ে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে কোন ধরণের কৃমি দ্বারা শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং ইনফেকশনটি কতটা সিরিয়াস সেটার উপর ভিত্তি করে কিছু কমন লক্ষণ বা উপসর্গ আপনি দেখতে পারেন। আপনার শিশুর মধ্যে যদি নিম্নোক্ত লক্ষণগুলো দেখে থাকেন, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে  নিয়ে যান।

  • পেটে ব্যাথা হওয়া
  • শরীরের ওজন কমে যাওয়া
  • খিটখিটে ভাব বেড়ে যাওয়া
  • সবসময় বমি বমি ভাব হওয়া
  • পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া
  • বমি বা কাশি হওয়া; বমি বা কাশির সাথে কৃমি বের হতে পারে।
  • যেখান দিয়ে কৃমি শরীরে প্রবেশ করে অর্থাৎ মলদ্বারে চুলকানি হওয়া এবং এর আশেপাশে ব্যাথা হওয়া। সুতাকৃমির ক্ষেত্রেই এটা হয়ে থাকে।
  • চুলকানির কারণে ঘুম কম হওয়া।
  • ইউরিনারি ট্র‍্যাক্ট ইনফেকশনের কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হবে কিন্তু প্রস্রাবের প্রচুর সময় ব্যাথা হবে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি হয়
  • শরীরের ভিতরে কোন ক্ষত হয়ে রক্তপাত হতে পারে। এর ফলে শরীর থেকে আয়রন বেরিয়ে যায় এবং এতে এনিমিয়া, ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়াও শিশুর পুষ্টি গ্রহণ করার ক্ষমতা কমে যায় তাই খাওয়ার রুচিও চলে যায়।
  • যদি শিশুর পেটে কৃমি অনেক বেশি হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে শিশুর অন্ত্রে জমাট বেধে যেতে পার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশুর বমির সাথে কৃমি বের হতে পারে। গোলকৃমির (দেখতে অনেকটা কেঁচোর মতো) ক্ষেত্রেই এটা বেশি হয় যদিও এটা খুব বেশী একটা দেখা যায় না।
  • কিছু কিছু ফিতাকৃমির ইনফেকশনের ফলে খিঁচুনি হতে পারে।
  • কৃমির সংক্রমণের আরেকটি উপসর্গ হলো পাইকা (PICA)। পাইকা এক ধরণের খাওয়ার ডিজঅর্ডার যার কারণে শিশু খাওয়ার অযোগ্য জিনিস যেমন মাটি, চক, কাগজ ইত্যাদি খেয়ে ফেলে।

দাঁত কিড়মিড় করাকেও অনেকে কৃমির ইনফেকশনের লক্ষণ বললেও কিছু কিছু গবেষণায় এর সত্যতা মেলেনি।

আপনার শিশুর সুতাকৃমির ইনফেকশনটা যদি অত একটা সিরিয়াস না হয় তাহলে তার মধ্যে খুব একটা লক্ষণ বা উপসর্গ হয়তো আপনি দেখবেন না তবে রাত হলে মলদ্বারে চুলকানির ব্যাপারে সে আপনাকে বলতে পারে।

রাতে শিশু ঘুমানোর পর মলদ্বার ঠিকভাবে পরীক্ষা করুন। নিতম্ব একটু ফাক করে মলদ্বারে টর্চ দিয়ে দেখুন, যদি শিশুর সুতাকৃমির ইনফেকশন হয় সেক্ষেত্রে সেখানে কিংবা শিশুর প্যান্টে কিংবা বিছানায় দু একটা সুতাকৃমি আপনি দেখতে পাবেন। এমনকি শিশুর মলে লক্ষ্য করলেও সুতাকৃমি দেখা যাবে।

শিশুকে বক্রকৃমি বা হুকওয়ার্ম আক্রমণ করলে নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলো খেয়াল করবেন:

  • শিশুর গায়ে বিশেষত যেদিক দিয়ে কৃমি প্রবেশ করেছে সেখানে ছোট বড় ফুসকুড়ি কিংবা হাইভস (Hives) উঠতে পারে।
  • এনিমিয়া হতে পারে

শিশুর মধ্যে উপরোক্ত উপসর্গগুলো দেখলে ডাক্তারের সাথে দ্রুত কথা বলে করণীয় বুঝে নিন।

শিশু কিভাবে কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে?

নিম্নোক্ত উপায়ে শিশুর কৃমি সংক্রমণ হতে পারে:

দূষিত মাটি

এট সবচেয়ে কমন উপায় যার মধ্যে সুতাকৃমি, গোলকৃমি, ফিতাকৃমি এবং হুইপওয়ার্ম শিশুর শরীরে ঢুকে পড়ে।

কৃমির ইনফেকশনে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি যখন মাটিতে থাকা কোন টয়লেটে যায়, তখন মাটিতে কৃমির ডিম পড়ে। পরে সেগুলো লার্ভাই (অপরিণত কৃমি) পরিণত হয়। লার্ভ ধীরে ধীরে পূর্ণ কৃমিতে রূপান্তরিত হয়। এখন মাটিতে যদি শিশু খালি পায়ে হাটে কিংবা হামাগুড়ি দেয়, সেক্ষেত্রে সুতাকৃমির লার্ভা শিশুর  সংস্পর্শে আসে যা পায়ের চামড়া ভেদ করে শরীরের প্রবেশ করতে পারে।

অন্য কৃমিদের ক্ষেত্রে, শিশু যখন হাত দিয়ে দূষিত মাটি ধরে এবং মাটি তার নখে ঢুকে যায় – তখন শিশু হাত না ধুয়ে দূষিত হাত মুখে দিলে তখন কৃমিও এর সাথে প্রবেশ করে।

দূষিত পানি

কিছু কিছু কৃমি পানিতে বংশবিস্তার করে। এই কৃমিগুলো লেক, ডোবা, বাধ প্রভৃতি যায়গায় পাওয়া যায়। এসব দূষিত পানিতে খেলা, গোসল করা, সাতার কাটা কিংবা এসব পানি দিয়ে রান্না করা খাবার খাওয়ার ফলে কৃমির ইনফেকশন হতে পারে।

মূলত প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত কম হয়, কৃমি আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।

আধসেদ্ধ অথবা দূষিত খাবার

কৃমি আক্রান্ত মল যদি মাটিতে মেশে তাহলে সে মাটিতে জন্ম নেওয়া শাক সবজিতেও কৃমির ডিম থাকতে পারে। যদি সেসব শাক সবজি ভালোভাবে না ধুয়ে রান্না করা হয়, তাহলে সে সবজি খেলেও কৃমির সংক্রমণ হতে পারে।

পানিতে কিংবা পানির আশেপাশে পানির উপর নির্ভর করে যে প্রানীগুলো বাড়ে অর্থাৎ মাছ, গরু, ছাগল, ভেড়া প্রভৃতিও ফিতাকৃমির মতো কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। আর তাই মাছ কিংবা মাংস যদি ভালোভাবে রান্না না করা হয় কিংবা আধাসিদ্ধ খাওয়া হয়, সেক্ষেত্রেও সে খাবারের মাধ্যমেও শরীরে কৃমির সংক্রমণ হতে পারে।

কৃমি সংক্রমিত মানুষের সংস্পর্শে

শিশু যদি এমন কোন মানুষের সংস্পর্শে আসে যে কৃমি সংক্রমিত এবং সে অতোটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নয়- তাহলে সে ব্যাক্তির কারণে শিশু কৃমি সংক্রমিত হতে পারে। সুতাকৃমি এই পদ্ধতেতে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

কৃমি সংক্রমিত ব্যাক্তির হাত অপরিষ্কার থাকলে কিংবা ঠিকঠাকভাবে হাত না ধুলে আঙুলের কোণায়, নখে কৃমি থাকতে পারে যা শিশুর খেলনা কিংবা সরাসরি মুখেও ঢুকে যেতে পারে। সুতাকৃমি প্রায় তিন সপ্তাহ পর্যন্ত কাপড়ে কিংবা বেডশিটে বেঁচে থাকতে পারে।

কৃমির সংক্রমণ কিভাবে শিশুর উপর খারাপ প্রভাব ফেলে?

কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ইনফেকশন অতোটা সিরিয়াস না হলে, কৃমির সংক্রমণ যতটা না বেশী রোগ হিসেবে ধরা হয় তার চেয়ে বেশী এটা বিরক্তির কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু তবু যদি এর চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে পরবর্তীতে ইনফেকশন বেশ সিরিয়াস হয়ে যেতে পারে, যার ফলে শরীরের ভেতরে রক্তপাতও হতে পারে। এর ফলে অপুষ্টি, শরীরের ওজন কমে যাওয়া এমনকি এনিমিয়ার মতো জটিল রোগেরও সম্মুখীন হতে পারে।

কৃমি আক্রান্ত হলে যেহেতু শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় তাই শিশু খুব অল্পতেই অসুখ বিসুখে পড়ে যায়। ফিতাকৃমি এক্ষেত্রে খুবই বিপদজনক হতে পারে কারণ বেশি সিরিয়াস পর্যায়ে চলে গেলে মস্তিষ্কে সিস্ট হতে পারে। যদিও এটা খুব বেশি একটা ঘটতে দেখা যায় না, তবুও যে কোন খারাপ অবস্থাতেই ডাক্তারর শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেব করলে, কৃমির ইনফেকশন শিশুর ভবিষ্যতের শারিরীক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। বৃদ্ধি ও উন্নতি দেরিতে হওয়ায় তা পুরো শরীরের সিস্টেমেই সমস্যা করতে পারে বিশেষত যদি কৃমির কারণে অপুষ্টি কিংবা এনিমিয়া হয়ে যায়। তবে সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শিশুকে এ সংক্রান্ত জটিলতা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

কৃমির ইনফেকশন আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে শিশুকে কি কি পরীক্ষা করানো উচিত?

শিশুর কৃমির ইনফেকশন হয়েছে কিনা তা ঠিকঠাক পরীক্ষা করতে সবচেয়ে ভালো হয় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে। ডাক্তার নিম্নোক্ত পরীক্ষা গুলো থেকে কোনটা কোনটা করতে পারেন।

মল পরীক্ষা: ডাক্তার হয়তো আপনার কাছে শিশুর মলের স্যাম্পল চাইতে পারেন যা ল্যাবে পাঠানো হবে এবং পরীক্ষা করে দেখা হবে এতে কৃমি কিংবা কৃমির ডিম আছে কিনা।

স্টিকি টেপ টেস্ট: মূলত সুতাকৃমির ক্ষেত্রেই এই পরীক্ষা করা হয় যেখানে শিশুর মলদ্বারে একটি আটালো টেপ লাগিয়ে রাখা হয়  যাতে সম্ভাব্য কৃমির ডিম লেগে যায়। পরবর্তীতে সে টেপটি পরীক্ষার জন্যে ল্যাবে পাঠানো হয়।

নখের কোণা পরীক্ষা: কৃমির ডিম আটকে আছে কিনা তা দেখতে ডাক্তার হয়তো শিশুর নখের ফাকে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

কটন বাড দিয়ে পরীক্ষা: কৃমির ডিম লেগে যায় কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে ডাক্তার বা নার্স হয়তো একটি কটন বাড দিয়ে শিশুর মলদ্বারের আশেপাশে মুছে দিতে পারেন।

আল্ট্রাসনোগ্রাফি টেস্ট: কৃমির ইনফেকশন যদি বেশি সিরিয়াস পর্যায়ে চলে যায়, তখনই কেবল এই টেস্ট করা হয়।  আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে, শরীরে ঠিক কোন যায়গায় ইনফেকশন হয়েছে তা ডাক্তার বুঝতে পারেন।

শিশুর কৃমির ইনফেকশন হলে এর চিকিৎসা কি? 

সৌভাগ্যক্রমে, অধিকাংশ কৃমির ইনফেকশনই খাওয়ার ঔষধের মাধ্যমে নিরাময় করে ফেলা সম্ভব। শিশুকে কোন ধরণের কৃমি আক্রান্ত করেছে সেটার উপর ভিত্তি করে ডাক্তার শিশুকে কৃমিনাশক ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখে দেবেন। শিশুর যদি এনিমিয়া হয়ে যায় সেক্ষেত্রে শিশুকে আয়রন সাপ্লিমেন্টও খেতে দিতে পারেন।

কোনকভাবেই, শিশুকে ওভার দ্য কাউন্টার মেডিসিন কিংবা হারবাল ঔষধ দেওয়া ঠিক হবে না৷ অনেক কৃমির ঔষধই আছে যা ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের খাওয়ার জন্যে উপযুক্ত নয়। আপনি হয়তো ভিন্ন কিছু খাওয়াতে হারবালের কথা চিন্তা করতে পারেন কিন্তু এগুলো যে ঠিকঠাক কাজ করবে তার নিশ্চয়তা কিংবা প্রমাণ কোনটাই কিন্তু নেই। হারবাল ঔষধ যদি খাওয়াতে চানও, অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিন।

কৃমির ইনফেকশন খুব দ্রুত ছড়ায় এবং এতে বার বার ভোগারও সম্ভাবনা আছে। তাই আপনার শিশুর যদি এমন ইনফেকশন হয়, সেক্ষেত্রে ডাক্তার হয়তো আপনার পরিবারের সবাইকেই কৃমিনাশক ঔষধ খেতে বলতে পারেন। যদি অন্যদের কৃমিজনিত কোন সমস্যা নাও থাকে, তবু নিরাপত্তার জন্যে খাওয়া উচিত।

শিশুর কৃমির ওষুধ খাওয়ার নিয়ম 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, ৩/৪ বছর বয়সী শিশুদের অবশ্যই নিয়ম মাফিক কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়া উচিত। শিশুর বয়স ১ বছর হলে তার পর প্রতি ৬ মাস অন্তর অন্তর শিশুকে কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়ানোটাই নিয়ম। কৃমির ওষুধে সাধারণত পরিণত কৃমি ধ্বংস হয় কিন্তু কৃমির ডিমগুলো রয়ে যায় যা থেকে আবার পরবর্তীতে কৃমির জন্ম হয়। এই কারণেই ৬ মাস অন্তর কৃমির ওষুধ খাওয়াতে বলা হয়। 

কৃমির ওষুধ সাধারণ দুই ডোজে খাওয়ানো হয়। প্রথমবার খাওয়ার পর ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ৭ থেকে ১০ দিন পর আরেক ডোজ খাওয়াতে হয়। 

শিশু হাটতে শিখে যাওয়ার সাথে সাথে তাকে কৃমি সংক্রমিত করে ফেলার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।  নিয়মিত শিশুকে কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়ান, প্রয়োজনে ক্যালেন্ডারে লিখে রাখুন এবং মাঝে মাঝে ডাক্তারের কাছে যেয়ে চেক আপ করিয়ে আসুন।

গরমকালে কৃমিনাশক খাওয়া যাবে না—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। গরম, শীত, বর্ষা যেকোনো সময়ই কৃমিনাশক খাওয়া যাবে। তবে খাওয়ার পর বা ভরা পেটে খাওয়া ভালো।

যেকোনো ওষুধ সেবনের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিন।

শিশুকে কৃমি থেকে দূরে রাখতে কি কি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারি?

শিশুকে কৃমির ইনফেকশন থেকে দূরে রাখতে নিম্নোক্ত পন্থা অবলম্বন করতে পারেন:

  • শিশুর ন্যাপি নিয়মিত পাল্টে দিন এবং এর পর অবশ্যই ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
  • দু একদিন অন্তর অন্তর ঘর ভালোভাবে মুছে দিন অবশ্যই ভালো জীবানুনাশক দিয়ে।
  • শিশু যখন হাটতে শিখবে, তাকে বদ্ধ জুতা পড়তে দিন। শিশু যখন বাইরে খেলতে যাবে, অবশ্যই যেন জুতা পড়েই যায়। শিশুকে যখন বাসায় নিয়ে আসবেন, আপনি এবং শিশু উভয়ই হাত পা সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • খেয়াল করুন শিশু যাতে কর্দমাক্ত কোন যায়গায় খেলাধূলা না করে। বিশেষত বর্ষাকালে এখানে সেখানে পানি জমে থাকে এবং দূষিত পানির উপদ্রবও বেশ বেড়ে যায় এ সময়ে।
  • শিশু যেন সবসময় পরিষ্কার ও শুকনো পরিবেশে খেলাধুলা করে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হোন।
  • শিশুর খেলাধূলার পরিবেশটা কোনভাবেই যেন পানির আশেপাশে যেমন ডোবা, নালা, বদ্ধ পুকুর ইত্যাদির পাশে না হয়।
  • শিশু যাতে খোলা যায়গায় মলত্যাগ না করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টয়লেটেই করে, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেষ্ট হোন।
  • আপনার টয়লেট জীবাণুমুক্ত রাখুন। শিশু প্রস্রাব কিংবা পায়খানা করার পর অবশ্যই ভালোমত তাকে ধুয়ে দিন। এরপর আপনার দু হাতও সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে ভুলবেন না। শিশু যদি যথেষ্ট বড় হয়, তাহলে টয়লেট ব্যাবহারের পর অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যাবহারের পরে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাসটা পরিবারের সবার মধ্যে আছে কিনা নিশ্চিত হোন।
  • শিশুর নখ ছোট এবং পরিষ্কার রাখুন। শিশুর নখেও কৃমির ডিম লেগে থাকতে পারে যা সারা ঘর ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  • সবসময় বিশুদ্ধ পানি পান করুন। পানি ফুটিয়ে কিংবা ফিল্টারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করতে পারেন।
  • ফলমূল, শাকসবজি খাওয়া কিংবা রান্না করার পূর্বে অবশ্যই পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন৷ বিশেষ করে শাকের ক্ষেত্রে পাতাগুলো ভালোমত পরিষ্কার করুন কারণ এতে প্রচুর মাটি ও ধুলিকণা লেগে থাকতে পারে।
  • মাছ মাংস রান্না করার আগে ফ্রেশ কিনা ভালোমত পরীক্ষা করে নিন। আধসিদ্ধ মাছ মাংস খাওয়া একদমই উচিত নয়। রান্না করার সময় মাছ ও মাংস ভেতরে একদম ভালোভাবে সিদ্ধ হয়েছে সেটা নিশ্চিত হয়ে নিন।
  • বাসার কাজের জন্যে গৃহপরিচারিকা কিংবা আয়া যদি কেউ থাকে তিনিও যাতে শতভাগ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। সবচেয়ে ভালো হয়, পরিবারের সবাই যখন কৃমির ঔষধ খাবেন, তাকেও খাইয়ে দিন। এতে করে তার এবং আপনার পরিবার উভয়েরই উপকার হবে।

শুনেছি, কৃমি নাকি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে! এটা কি সত্যি?

এটা নিশ্চিত করে বলার কোন উপায় নেই। কিছু কিছু গবেষকেরা বলে থাকেন যে শিশুকালে কৃমির আক্রমণ হলে তা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো যা তাকে এলার্জি এবং ‘অটো ইমিউন ডিজিজ’ থেকে প্রতিরোধ করে। যদিও এই থিওরিটি অনুমান নির্ভর, যাকে ‘ওল্ড ফ্রেন্ডস’ বলা হয়।

নিচে বিভিন্ন দেশের কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো যা এই এই থিওরিকে সমর্থন করে:

১ শতাব্দী আগে, ইংল্যান্ডে তখন কৃমির সংক্রমণ খুব বেশি এবং প্রায় প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক মানুষেরই ছোট বড় কৃমির ইনফেকশন ছিল। সে সময়ে মানুষদের মধ্যে এলার্জিজনিত সমস্যা খুব একটা দেখা যায় নি।

আরেকটি গবেষণায়, উগান্ডায় গর্ভবতী নারীদের যখন কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়ানো হলো, তাদের শিশুদের একজিমা হওয়ার ঝুঁকি বেশ বেড়ে গিয়েছিল।

অবশ্য এটা অন্য কারণেও হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, ধারণাটি অনুমাননির্ভর।

প্রোবায়োটিক কি কৃমির সংক্রমণ কমাতে সাহায্য করে?

প্রোবায়োটিক খাবার যেমন দই, রাইতা, লাচ্ছি এগুলা শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের বাড়তে সাহায্য করে যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে এই ধরণের খাবার কৃমি প্রতিরোধ করে কিনা সে ব্যাপারে খুব একটা গবেষণা হয় নি। এ কথা জোর দিয়ে বলার জন্যে আরো গবেষণার প্রয়োজন।

এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শরীরে পরজীবি প্রানীদের (যার মধ্যেও কৃমিও রয়েছে) প্রতিরোধে প্রোবায়োটিক খাবার কার্যকরী হতে পারে। যদিও গবেষণাটি করা হয়েছে ইদুরের উপরে এবং এর ফলাফল অপরিষ্কার।

কৃমি প্রতিরোধে প্রোবায়োটিক খাবার কাজ করবে, এ কথা জোর দিয়ে বলার কোন উপায় নেই। যদি শিশুকে এ জাতীয় খাবার খাওয়াতে চান, খাওয়াতে পারেন কিন্তু অবশ্যই ডাক্তার নির্দেশিত কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়ানোর পাশাপাশি খাওয়াতে হবে- সেটা বন্ধ করে নয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts