ভুল আচরণের জন্য শিশুর কাছে ক্ষমা চাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কেন

Spread the love

ভুল করে তা স্বীকার করার বা তার জন্য ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা আমাদের অনেকেরই থাকেনা। নিজের সন্তানের কাছে ক্ষমা চাওয়াটা অনেক বাবা-মা ই স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনা। কিন্তু আপনি কি জানেন যে ভুল স্বীকার করার চর্চা এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা আপনার ও আপনার সন্তানের মধ্যকার সম্পর্কের জন্য কতোটা জরুরী?

কি হতে পারে যদি ভুল আচরণের জন্য সন্তানের কাছে ক্ষমা না চান

ভুল করাটা আমাদের জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা সবাই কমবেশি অযাচিত কাজ করে ফেলি। অধিকাংশ পিতা-মাতা মনে করে যে সন্তানের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করলে মনে হয় তারা ছোট হয়ে যাবেন কিংবা সন্তানের উপর অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। বিষয়টি কিন্তু এরকম নয়।

বিজ্ঞাপণ

‘আমার কোন ভুল নেই” অথবা “আমি কেন সরি বলব” এই মনোভাব আসলে কোন সম্পর্কের জন্য কল্যাণকর নয়। আপনার সন্তান বয়সে ছোট হলেও সে একজন আলাদা ব্যক্তি, তার নিজস্ব সত্তা রয়েছে। আপনি যদি তাকে অন্যায়ভাবে আঘাত করে থাকেন তাহলে আপনার অবশ্যই এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। আপনি যদি আপনার ভুলের জন্য অনুতপ্ত না হন তাহলে ভবিষ্যতে আপনার সন্তান ও কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করতে অপারগতা জানাতে পারে।

ভুল স্বীকার করে তার জন্য ক্ষমা চাওয়াটা খুব সুন্দর একটি পারিবারিক রীতি হতে পারে। এর মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ভাল হবে। নিজের কৃত অন্যায় অথবা ভুলের জন্য মাফ না চাওয়ার কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। যেমন-

সম্পর্কে ক্ষত সৃষ্টি করে

আপনার শিশু কিন্তু সর্বদা শিশু থাকবে না। প্রকৃতির নিয়মে তারা বড় হবে এবং অতীতের অনেক বিষয় তারা মনে রাখবে। আজ আপনি কোন ভুল করে যখন সেটার জন্য দুঃখ প্রকাশ না করেন তা আপনার সন্তানের মনে এক স্থায়ী ক্ষতের জন্ম দিতে পারে।

শ্রদ্ধার জায়গা নষ্ট হয়ে যায়

শ্রদ্ধার ব্যাপারটি কিন্তু একতরফা হয়না। পারস্পরিক সম্মান একান্ত আবশ্যক একটি সুন্দর সম্পর্কের জন্য। শিশুরা কিন্তু অধিকাংশ সময়েই বুঝতে পারে যে কোন আচরণটি ভুল আর কোনটি সঠিক। আপনি তাকে ন্যায়-অন্যায় শিক্ষা দিবেন কিন্তু নিজে অন্যায় করে সেটার জন্য ক্ষমা চাইবেন না তা মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়।

দ্বিমুখী নীতির চর্চা শুরু হয়

আমরা বড়রা ছোটদের ভুলভ্রান্তি হলে তাদের বকা-ঝকা করি অথবা তাকে বোঝাই যে সে কাজটি ঠিক করেনি। বাচ্চারা নিজেরা যখন মারামারি করে আমরা তাদের শেখাই যে এরকম করা যাবেনা, কাউকে কষ্ট দেয়া খারাপ ইত্যাদি। যখন বাচ্চা দেখে যে তার বাবা-মা তাকে কষ্ট দিয়েছে কিন্তু সেটার জন্য সরি বলছেনা তখন সে খুব দ্বিধায় পরে যায়। সে এরকম দ্বিমুখী নীতিতে মনে মনে অসন্তোষ লালন করতে থাকে।

ক্ষমা চাওয়ার কারণে কিভাবে আপনার শিশু উপকৃত হবে

নিজের ভুল স্বীকার করাটা আসলে কিছুটা কঠিন হয়ে পরে অনেকের জন্য কিন্তু এই কঠিন কাজটি করতে পারলে জীবনের অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। বাচ্চারা বয়সে অনেক ছোট হলেও তাদের আত্ম-সম্মানবোধ রয়েছে। অকারণে তাদের যদি কষ্ট দিয়ে ফেলেন তবে তার জন্য আন্তরিক ভাবে ক্ষমা চাইতেও দেরি করা উচিত নয়।

“সরি” বা “দুঃখিত” খুব ছোট কিন্তু কার্যকরী শব্দ। শিশুদের কাছে ভুল করে “দুঃখিত” বলার অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে।

ভালো ব্যবহারের রোল মডেল প্রতিষ্ঠা করা

শিশুরা বাবা-মা কে নিজেদের রোল মডেল বা আদর্শ মনে করে। তারা বড়দের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে ও তা অনুকরণ করার চেষ্টা করে। আপনি যদি কোন ভুল করেন অথবা বাচ্চার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন তা আপনার সন্তানের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সে পরবর্তীতে এরকম আচরণ অন্যদের সাথে করতে পারে।

পক্ষান্তরে, আপনি যদি ভুল করে তা স্বীকার করেন এবং আন্তরিক ভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন তাহলে আপনার শিশুও আপনার এই আচরণকে অনুসরণ করবে। সে শিক্ষা পাবে যে অন্যায় করলে তার জন্য ক্ষমা চাইতে হয়।

পারস্পরিক সম্মানের চর্চা

যেকোনো সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মান খুব জরুরী। সম্মানের ক্ষেত্রে বয়স কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যেও সম্মানের চর্চা থাকা প্রয়োজন। কৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সরি বললে তা পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গাকে আরও দৃঢ় করে।

দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করা

আপনি যখন কোন ভুল করে তার জন্য সরি বলেন তখন আপনি একটি বার্তা পৌঁছে দেন যে প্রত্যেক মানুষকে তার কাজের জন্য দায়িত্ব নিতে হয় ও জবাবদিহি করতে হয়। আপনার শিশু এটা বুঝতে শিখবে যে কোন মানুষই শতভাগ শুদ্ধ নয় এবং যার যার কর্মের জন্য তাকেই দায়িত্ব নিতে হবে।

ভুল কাজের জন্য যে জবাবদিহিতার প্রয়োজন হয় তাও শিখে নেবে সে। এভাবে আপনি তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তুলতে পারবেন।

সত্য বলতে অনুপ্রাণিত করা

ভুল করে তা স্বীকার করলে আপনার শিশু আপনার সততা ও সত্যবাদিতার সাথে পরিচিত হতে পারবে। সে যখন দেখবে যে তার বাবা/মা কোন ভুল করলে তা গোপন করার জন্য মিথ্যা না বলে সততার আশ্রয় নিয়ে তা স্বীকার করছে তখন শিশুটি সত্য বলার জন্য অনুপ্রেরণা পাবে।

সে ধরে নিবে যে ভুল করলে তা মেনে নেওয়াই হচ্ছে একমাত্র সঠিক পন্থা। এই শিক্ষা সে নিজের জীবনে কাজে লাগবে এবং যখন সে কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করবে সে সেটা লুকাবে না বরং তা স্বীকার করে নিজেকে শুধরে নেবে।

ক্ষমা চাইতে ও ক্ষমা করতে শেখানো

সরি বলার মধ্য দিয়ে আপনার শিশু ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করতে শেখার দীক্ষায় দীক্ষিত হবে। সে বুঝতে পারবে ভুল হলে তা মেনে নিয়ে ক্ষমা চাওয়াটা উত্তম এবং কারো ভুলের জন্য তাকে ক্ষমা করে দেয়াটাও একটি সুন্দর রীতি।

কিভাবে নিজের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করা যায়

বাচ্চারা যখন কোন ভুল করে, যেমন- ভাইবোনের সাথে ঝগড়া কিংবা বন্ধুর সাথে মারামারি, তখন আমরা খুব করে চাই সে যেন অপরপক্ষকে সরি বলে। আমরা চাই আমাদের সন্তান যেন ভুল করলে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়, কিন্তু যখন আমরা তাদের সাথে কোন অন্যায় করে ফেলি তখন আমরা কি করি?

আমাদেরও উচিত বাচ্চাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা, তাদের কে সরি বলা কিন্তু এই কাজটি করতে আমরা জড়তা অনুভব করি। কিভাবে সরি বলব, কখন বলব ইত্যাদি বিষয়ে আমরা মাঝে মাঝে দ্বিধায় ভুগি।

আসুন দেখে নেই কি কি উপায়ে আমরা দুঃখ প্রকাশ করে সরি বলতে পারি:

প্রায়শই সরি বা দুঃখিত বলার চেষ্টা করুন

যখনই প্রয়োজন হবে সরি বলার চেষ্টা করতে পারেন। হয়ত আপনার বাচ্চা খেলা করছে, আপনি খেয়াল করেননি আর তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে ফেললেন; তখন সাথে সাথে এরকম বলা যায় “ইস, তুমি ব্যথা পেয়েছ, আমি খেয়াল করিনি, আমি দুঃখিত।“

ঘটনা ব্যাখ্যা করুন

আপনার ক্ষমা প্রার্থনায় যেন আপনার কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা থাকে তা খেয়াল রাখবেন। আপনার হয়ত মেজাজ খারাপ ছিল, এরকম সময় আপনার বাচ্চাকে জোরে ধমক দিয়েছেন যে সে ভয় পেয়েছে। এরকম ক্ষেত্রে তাকে বলতে হবে যে “আমি মাথা গরম করে তোমাকে ধমক দিয়েছি তাই তুমি ভয় পেয়েছ। আমি খুব লজ্জিত, আমার এরকম করা উচিত হয়নি।“

বিজ্ঞাপণ

তার কষ্টকে বুঝতে হবে

শুধু বলার জন্য সরি না বলে বাচ্চার আবেগের দিকটা চিন্তা করে দুঃখ প্রকাশ করলে সেটা উপযুক্ত হয়। আপনার আচরণে সে কতোটা আঘাত পেয়েছে সেটা খেয়াল করতে হবে। আপনি হয়ত যেটাকে সাধারণ কিছু ভাবছেন আপনার বাচ্চার কাছে হয়ত সেটাই মন খারাপের বড় কারণ।

ভুলের দায়ভার নিতে হবে

ভুল আমরা সবাই করি। যখন আমরা ভুল কিছু করব তখন তার দায়িত্ব আমাদের নেয়া উচিত। হয়ত আপনি আপনার বাচ্চার শখের কোন খেলনা ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে ভেঙে ফেলেছেন, এক্ষেত্রে তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলতে পারেন যে কাজটি যদিও আপনি ইচ্ছা করে করেননি কিন্তু আপনি খুব দুঃখিত তাকে কষ্ট দেয়ার জন্য।

সন্তনের কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি খুব কঠিন কিছু নয়। চারটি বিষয় মনে রাখলে এ ব্যাপারটি আপনার কাছে খুব সহজ হয়ে যাবে এবং এর উপকারিতাও আপনি বহুগুণে বাড়িয়ে তুলতে পারবেন।

  • বোঝার চেষ্টা করুন (Face it)

যখনই আপনার শিশুর সাথে এমন কোনো আচরণ করবেন যে আচরন পেতে আপনার নিজের ভালো লাগেনা তখনি থামুন এবং সেটা নিয়ে একটু ভাবুন। মনে রাখবেন শিশুদের অন্যায় বোঝা এবং আঘাত পাওয়ার অনুভূতি বড়দের চাইতে অনেক বেশি। যেটা আপনার কাছে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে, যেমন- তার বন্ধুদের সামনে তাকে ধমক দেয়া, সেটা তার কাছে অনেক বড় কিছু। আপনার এ ধরণের আচরণের কারণে তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে সে তার অধিকার এবং আত্মসম্মানের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠবে এবং বুঝতে শিখবে প্রত্যেকটি মানুষেরই সম্মান প্রাপ্য।

  • অনুভব করার চেষ্টা করুন (Feel it )

একবার ভাবুন তো, অফিসের বসের কাছে ধমক খেতে আপনার কেমন লাগবে? এটা সত্যি! নিজের চাইতে ক্ষমতাবান কারো দ্বারা অপমানিত হলে তা খুব বেশি মনে আঘাত করে। এবার আপনার সন্তানের জায়গায় দাঁড়িয়ে অনুভব করুন সে কেমন বোধ করতে পারে। এই বিষয়টি অনুভব করতে পারলেই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি আপনা আপনিই চলে আসবে।

  • ঠিক করার চেষ্টা করুন (Fix it)

বিষয়টি এমন না যে আপনার ভুল কোনো আচরণের জন্য আপনি সরি বললেন আর সবকিছু ঠিক হয়ে গেলো। আপনি যে তা মন থেকে বলছেন তা তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। যেমন ধরুন- রাগ করে আপনি তার কোনো প্রিয় খেলনা ভেঙ্গে ফেললেন। সে ক্ষেত্রে তাকে সরি বলার সাথে সাথে বলুন – “ চল তোমার পছন্দের খেলনাটি আবার কিনে দেব”। যদি তা সম্ভব না হয় তবে তাকে বুঝিয়ে বলুন কেন আপনি তার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারছেন না। ঠিক যেমনটা অন্য কোনো বড় মানুষের সাথে আপনি করবেন। এই ধরণের ব্যবহার শিশুর সাথে আপনার বন্ধন আরও মজবুত করে তুলবে।

  • পরিবর্তন করার চেষ্টা করুন (Change it)

যদি প্রতিবার ভুল আচরণ করে শুধুমাত্র ক্ষমা চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন, কিন্তু সে আচরণ পরিবর্তনের কোন চেষ্টা যদি আপনার মধ্যে না থাকে তবে ক্ষমা চাওয়াটার আসলে কোন মূল্যই থাকবেনা। যদি শিশু দেখে আপনি আপনার আপনার ভুল আচরণগুলো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করছেন বা পরিবর্তন করার চেষ্টা করছেন তবে জীবনের ঘাত প্রতিঘাত সামলে কিভাবে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হয় তা শিশু বুঝতে পারে।

যে কাজগুলো করা যাবেনা

অনেকের মধ্যেই একটা ভয় থাকে যে বাচ্চাকে সরি বললে হয়ত বাচ্চা আর তাদের সম্মান করবেনা কিংবা বাচ্চা হয়ত তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আসলে ব্যাপারটি এর বিপরীত। আমরা যখন কারো কাছ থেকে আঘাত পাই আমরা কিন্তু চাই যে আমাদের কাছে সেই মানুষটি ক্ষমা চাক এবং আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে আমরা মাফ করে দেই। বাচ্চারাও চায় যে আপনি তাদের কষ্টকে অনুভব করে তাদের সরি বলবেন।

শিশুর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে এবং কয়েকটি কাজ একদমই করা যাবেনা।

প্রথমত, কোন অজুহাত দেবেন না। আপনি কথা দিয়েছিলেন যে আপনি আপনার শিশুকে বেড়াতে নিয়ে যাবেন কিন্তু কাজের চাপে আর পারেন নি। এক্ষেত্রে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলবেন এবং তার মন রক্ষা করতে না পেরে আপনি দুঃখিত তাও বলবেন। সে যেন মনে না করে যে আপনি শুধু অজুহাত দিচ্ছেন কাজের।

দ্বিতীয়ত, নিজের দোষ সন্তানের কাঁধে চাপাবেন না। আপনি যেহেতু বড় তাই নিজের আবেগ ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব আপনার উপরই বর্তায়। 

পিতামাতা ও সন্তানের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও আবেগে পরিপূর্ণ। সন্তান প্রতিপালনে নানা বিষয়েই খেয়াল রাখতে হয়। আপনি যা করবেন আপনার বাচ্চা তাই শিখবে। ভুল করলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়ায় লজ্জার কিছু নেই বরং তা আপনার ও সন্তানের সম্পর্ককে মজবুত করবে।

বিজ্ঞাপণ

সবার জন্য শুভকামনা।


Spread the love

Related posts

Leave a Comment