লনমোওয়ার প্যারেন্টিং সম্পর্কে যা আপনার জানা প্রয়োজন | Lawn mower parenting

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

যেকোনো সন্তানের তার কাছের মানুষ তার মা-বাবা।  সন্তানের জন্য কখন কি ভালো হবে, কখন কি করতে হবে এগুলো মা-বাবারাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। মা-বাবা সবসময় চান এমন কিছু করতে যাতে তার সন্তান ভালো থাকে। কিন্তু অনেক সময় হয় কি খুব বেশি ভালো করতে গিয়ে সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দুটোই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

আপনার সন্তানকে কীভাবে প্যারেন্টিং করবেন সেটা একান্তই আপনার ব্যাপার। তবে এই “ভালো প্যারেন্টিং” করতে গিয়ে যেনো আপনার সন্তান বা আশপাশের কোনো কিছুর যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখা জরুরি। পূর্বে আমরা হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং সম্পর্কে জেনেছি। এই আর্টিকেলে আমরা “লনমোওয়ার প্যারেন্টিং” সম্পর্কে জানবো।  

বিজ্ঞাপণ

লনমোওয়ার প্যারেন্টিং বলতে কী বোঝায়?

‘লন’ বা বাসার উঠোনের  ঘাস কাটার জন্য ‘মোওয়ার’ বা ঘাস কাটার যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয় তার থেকেই এই নামের উৎপত্তি।  লনমোওয়ার (Lawn mower) যেমন সব আগাছা কেটে সমান করে ফেলে তেমনি কিছু পিতা-মাতা তাদের সন্তানের উন্নতি, সুখ ও সাফল্যের জন্য সন্তানের সামনে আসা যেকোনো বাধা-বিপত্তি বা সমস্যাকে কেটে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলতে চান। এজন্যই এই ধরনের প্যারেন্টিংকে “লনমোওয়ার প্যারেন্টিং” বলা হয়।

এটিকে “বুলডোজার প্যারেন্টিং” নামেও আখ্যায়িত করা হয়। তবে নাম যাই হোক, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন সন্তানের জীবনের সাথে পিতা-মাতার  এতো বেশি জড়িয়ে থাকা সন্তানের ভবিষ্যতে জীবন বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

লনমোওয়ার প্যারেন্টরা তাদের সন্তানের জীবনের সাথে অতিরিক্ত জড়িয়ে থাকতে চান। তারা চান তাদের সন্তানকে সকাল প্রকার হতাশা, ব্যর্থতা, দুর্দশা, অস্বস্তিবোধ থেকে রক্ষা করতে। তারা চান সবকিছু ঠিকঠাক করে দিয়ে তাদের সন্তানকে সাহায্য করতে।

প্রথম দৃষ্টিতে বেশ ভালো মনে হলেও আসলে এটি মোটেও তা নয়। একটা কাজে “সাহায্য” করা আর যেকোনো কিছুর বিনিময়ে কাজটা আদায় করে নেয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। লনমোওয়ার প্যারেন্টরা তাদের সন্তানের জন্য যেকোনো কিছুই করে ফেলতে পারেন। এজন্য বিশেষজ্ঞরা লনমোওয়ার প্যারেন্টিং এর প্রতি উৎসাহিত করেন না।

লনমোওয়ার প্যারেন্টরা তাদের সন্তানকে কোনো কিছুই নিজ থেকে করতে উৎসাহিত করেন না। লেখক ও সামাজিক কর্মী কারলা নাউমবার্গ, পিএইচডি, বলেন, “সন্তানের পথ পরিষ্কার করার জন্য তারা(লনমোওয়ার প্যারেন্ট) সবকিছুই করতে পারে”। তিনি আরো বলেন, “তারা(লনমোওয়ার প্যারেন্ট) চান না তাদের সন্তান কখনো দেয়ালের সাথে ধাক্কা খাক বা হোঁচট খেয়ে পড়ে যাক অথবা পথ হারিয়ে ফেলুক, এজন্য তারা বারবার নিজেদের সামনে নিয়ে আসেন, তাদের সন্তানের সবচেয়ে সহজ যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য তারা নিজেদের সর্বোচ্চটাই করেন”।

হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং লনমোওয়ার প্যারেন্টিং এর মধ্যে পার্থক্য

অনেকেই মনে করেন যে হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং ও লনমোওয়ার প্যারেন্টিং একই। কিন্তু আসলে তা নয়। হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং ও লনমোওয়ার প্যারেন্টিং কাছাকাছি হলেও তাদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

হেলিকপ্টার প্যারেন্টরা তাদের সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য তাদের আশেপাশে থাকেন। আর লনমোওয়ার প্যারেন্টরা তাদের সন্তানকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নিজেরা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে যান।

হেলিকপ্টার প্যারেন্টরা সন্তান বাড়ির কাজ করলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে সে সব ঠিক মতো করছে কিনা তা দেখার জন্য। আর লনমোওয়ার প্যারেন্টরা সন্তানকে পাশে রেখে নিজেরাই সন্তানের বাড়ির কাজ করে দেন।

সুতরাং, হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং আর লনমোওয়ার প্যারেন্টিং মোটেও সমকক্ষ নয়, বরং লনমোওয়ার প্যারেন্টিং হেলিকপ্টার প্যারেন্টিংয়ের চেয়েও এক ধাপ উপরে।

কীভাবে বুঝবেন আপনি একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট কিনা

সন্তানের খারাপ ফলাফলের জন্য আপনি তার শিক্ষকদের কাছে জবাবদিহি চান? সন্তানের স্কুল/ কলেজ প্রশাসনের কাছে অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া করেন? তাকে পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেওয়ার জন্য তার শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করেন? ঘুষ বা কোনো অবৈধ উপায়ে সন্তানকে ভালো স্কুল বা কলেজে ভর্তি করাতে চান? সন্তানের চাকরির জন্য উপরের মহলের সুপারিশ কামনা  করেন? যদি এই সমস্ত কাজ আপনি করে থাকেন, তাহলে আপনি একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট।

নিচের লক্ষণগুলি আপনার সাথে মিলে কিনা খেয়াল করুন। যদি মিলে যায়, তাহলে ধরে নিতে পারেন আপনিও একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট।

আপনি আপনার সন্তানের খেলাধূলার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে

আপনি আপনার সন্তানকে যার-তার সাথে খেলতে দেন না। যারা একদম শান্তশিষ্ট, যাদের সাথে আপনার সন্তানের কোনো রকম ভুল বোঝাবুঝি হবে না, শুধুমাত্র তাদের সাথেই আপনি আপনার সন্তানকে খেলার অনুমতি দেন।

সামান্যতম ভুল বোঝাবুঝি বা ঠিকঠাক মতো না খেললে আপনি আপনার সন্তানকে সেখানে খেলার অনুমতি দেন না। আপনার সন্তানের এক বিন্দুও আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে আপনি আপনার সন্তানকে খেলতে দেন না। মোদ্দকথা আপনার সন্তানের খেলাধূলার ব্যাপারটা পুরোটাই আপনি নিয়ন্ত্রণ করেন।

সন্তানের সাথে কারো মতের অমিল হলে আপনি বিচারকের ভূমিকা পালন করেন

যদি আপনার সন্তানের সাথে তার বন্ধু বা আত্মীয় বা যে কারো সাথে কোনো তর্কাতর্কি বা মতের ভেদাভেদ হলে আপনি তৎক্ষনাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। আপনি তাদেরকে বিষয়টা তাদের মতো করে সমাধান করতে বিন্দুমাত্র সুযোগ দেন না। আপনি চান কারো অনুভূতিতে আঘাত হানার আগে বিষয়টা মিটমাট হোক। বিশেষত আপনার সন্তান যেনো কষ্ট না পায়, সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখেন আপনি।

সন্তানের প্রতি আপনার অন্ধবিশ্বাস

সন্তানকে সমর্থন করা, তার পাশে থাকা খুবই ভালো। কিন্তু সন্তান ভুল করলে সেটা ধরতে পারা এবং শুধরিয়ে দেওয়াটাও জরুরি। আপনি যদি মনে করেন যে আপনার সন্তান কোনো ভুল করতে পারে না, তাহলে আপনি তার প্রতি অন্ধবিশ্বাস রাখছেন।

মানুষ মাত্রই ভুল আর এটাই স্বাভাবিক। আপনি যদি তাকে তার ভুল বুঝতে ও শুধরাতে না শেখান তাহলে সে পরবর্তীতে অনেক সমস্যায় পড়বে। পাশাপাশি কেউ তার সাথে খারাপ কিছু করলে তাকে ক্ষমা করতে শেখাও জরুরি। অন্যথায় তার সাথে কারো ভালো সম্পর্ক থাকবেনা। এমনকি সে একঘরে হয়ে পড়তে পারে।

সন্তানের বাড়ির কাজ বা স্কুলের প্রজেক্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজেই সম্পন্ন করেন

আপনার সন্তান বাড়ির কাজ বা স্কুলের প্রজেক্টের কাজে সমস্যায় পড়লে আপনি সাহায্য করতেই পারেন। কিন্তু আপনি যদি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন বা নিজে বাড়ির কাজ করে দেন তাহলে আপনি খুব মারাত্মক ভুল করছেন। কারণ এতে সে বোর্ড পরীক্ষায় বা স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় কোনো সমস্যায় পড়লে সেটা নিজ থেকে সমাধান করতে পারবেনা। কারণ সে যখন কোনো সমস্যায় পড়েছে তখন আপনি তাকে সেটা নিজে করে দিয়েছেন। তাই সে নিজ থেকে সমাধান করতে চেষ্টা করলেও পারবেনা।

সন্তান কিছু নিতে ভুলে গেলে আপনি তৎক্ষনাৎ তাকে সেটা পৌঁছে দেন

সন্তান কোনো বই বা বাড়ির কাজ ফেলে স্কুলে বা কোচিংয়ে চলে গেলে আপনি তৎক্ষনাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে সেগুলো দিয়ে আসেন। কারণ আপনি মনে করেন যে এটি ছাড়া হয়তো তাকে তার শিক্ষক শাস্তি দিতে পারে বা তার পড়াশোনায় সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এতে ক্ষতিটা আপনার সন্তানেরই হচ্ছে। সে আজ শাস্তি পেলে কাল হয়তো এই ভুল করতো না, কিন্তু আপনি তাকে ভুল থেকে শেখার সুযোগ করে না দিয়ে পুনরায় সেই ভুল করার সুযোগ দিচ্ছেন।

সন্তানের উন্নতির জন্য খানিকটা পিছিয়ে নেওয়া

শুনতে অবাক লাগছে? কেউ কেনো তার সন্তানকে পিছিয়ে নিতে চাইবে? কিন্তু এটাই সত্য। লনমোওয়ার প্যারেন্টরা অবস্থাভেদে তাও করতে পারেন।

ধরুন আপনার সন্তান স্কুলের ফুটবল বা ক্রিকেট দল থেকে বাদ পড়েছে। তখন আপনি চাচ্ছেন দায়িত্ববান ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে তাকে এক বছর পিছিয়ে নিয়ে জুনিয়র দলে খেলাতে। কারণ আপনি মনে করছেন এই এক বছরে সে নিজের খেলায় আরো উন্নতি করে পরবর্তীতে সে মূল দলে জায়গা করে নিবে। তাই আপনি এই বিরাট ঝুঁকি নিতেও দ্বিধা করেন না।

লনমোওয়ার প্যারেন্টিংয়ের প্রভাব

লনমোওয়ার প্যারেন্টিং কিন্তু ভালো উদ্দেশ্যে নিয়েই শুরু হয়। আসলে তারা সন্তানের কোনো হতাশা, কষ্ট, অস্বস্তিবোধ, ব্যর্থতার কথা চিন্তাও করতে পারেন না। তারা তাদের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে সন্তানকে কোনো রকম কষ্ট বা খারাপ লাগা থেকে রক্ষা করতে চান। তারা যেটাকে অনেক ভালো প্যারেন্টিং মনে করছেন, বাস্তবে যে এটা কতোটা ক্ষতি হচ্ছে তা তারে বুঝতে পারেন না।

লনমোওয়ার প্যারেন্টিং সন্তান ও পিতা-মাতা উভয়ের উপরই বাজে প্রভাব ফেলে।

বিজ্ঞাপণ

সন্তানের উপর প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে লনমোওয়ার প্যারেন্টের সন্তানদের জন্য স্বাধীন ভাবে কোনো কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। লনমোওয়ার প্যারেন্টিংয়ের মাধ্যমে বড় হওয়া সন্তানরা বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়। যেমন :

  • কমিউনিকেশন গ্যাপ বা যোগাযোগ করার ক্ষমতা কম হওয়া।
  • আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া।
  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি না হওয়া।
  • হতাশা, দুঃচিন্তা বেড়ে যাওয়া।
  • প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরি না হওয়া।

লনমোওয়ার প্যারেন্টের সন্তানরা যখন দেখে যে তাদের সবকিছুই হাতে ধরে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে তখন তারা হতাশ হয়ে পড়ে। তারা মনে করে যে তারা কাজগুলো করতে সক্ষম নয়, তাদের মা-বাবা তাদেরকে যোগ্য ভাবছে না। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় লনমোওয়ার প্যারেন্টরা তাদের সন্তানের কাছে এই বার্তা পৌঁছিয়ে দেন। এতে করে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। নিজেকে তারা আর কোনো কিছুর যোগ্য ভাবতে পারে না। ফলশ্রুতিতে তারা বিভিন্ন রকম দুঃচিন্তা, হতাশাসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভোগে।

যেসব শিশুরা সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছে, যারা কষ্টের কিছুই দেখে নি, কষ্ট কি জানেই না, তারা পরবর্তীতে খুব অসহায়বোধ করে। কারণ তারা এসবের সাথে পরিচিত নয়। তাদেরকে বুঝতে দেওয়া হয় নি যে এগুলো জীবনেরই অংশ। তোমাকে এগুলোর সাথে লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হবে। এজন্য যখন তারা এসব সমাধান করে দেওয়ার জন্য কাউকে পাশে পায় না, তখন তারা আরো হতাশ হয়ে পড়ে।

এছাড়াও তারা ছোট ছোট কাজগুলোও নিজ থেকে করতে সক্ষম হয় না। যেমন শহরে নতুন কেউ এমন রাস্তার হদিস জানতে চাইলো যা মোটামুটি সবাই জানে। কিন্তু ওই সন্তান চিনে না বা বলতে পারছেনা। কারণ তার হয়ে এসব তার মা-বাবাই করে সবসময়। আবার কোনো প্রজেক্ট বা এসাইনমেন্টে কোনো শিক্ষকের সাহায্য বা স্বাক্ষর দরকার হলো। তারা যে শিক্ষকের কাছে যাবে সেই সাহসও তাদের হয় না।

আসলে তারা কখনো এগুলো নিজ থেকে করেনি, তাই তাদের কোনো ধারণা নেই কিভাবে এগুলো করতে হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন লনমোওয়ার প্যারেন্টিংয়ের পরিণাম কি ভয়াবহ হতে পারে। তাই আপনাদের সন্তানকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে শেখান। যাতে সে ভবিষ্যতে এরকম ঘটনাগুলো সহজেই সামলাতে পারে।

পিতা-মাতার উপর প্রভাব

যখন মা-বাবাদেরকে ধারাবাহিকভাবে সন্তানের সবকিছুর শিডিউল ঠিকঠাক করতে হয়, সন্তানের সব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত কর‍্তে হয় এবং সন্তানের পক্ষে ওকালতি কর‍্তে হয় তখন একটা পর্যায়ে তারা ক্লান্তি ও চাপ বোধ করেন।

সন্তানের জীবন সহজ করতে গিয়ে তাদের নিজেদের জীবনই অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ব্যস্ত শিডিউল ও কাজের চাপে তারা খুব ক্লান্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সন্তানদের সাথে অতিরিক্ত জড়িয়ে থাকতে গিয়ে তারা নিজেদের অন্য পরিচয়টাও ভুলতে বসেন।

হঠাৎ করেই তাদের জগতটা এতোটাই তাদের সন্তানকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে যে তারা নিজেদের শখ, আগ্রহ, আহ্লাদ, ইচ্ছা সব বিসর্জন দিয়ে দেন।

যদি তারা তাদের লনমোওয়ার প্যারেন্টিং অভ্যাস পরিবর্তন না করেন তাহলে তারা ভবিষ্যতে বিভিন্ন রকম শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রকম মানসিক সমস্যা, আলসার, উচ্চ-রক্তচাপ ইত্যাদি। সুতরাং, পিতা-মাতাদের উচিত আজই লনমোওয়ার প্যারেন্টিং অভ্যাস বদলিয়ে ফেলা।

কীভাবে আপনি একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট হওয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেন

আপনি যদি ইতিমধ্যে একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট হয়ে থাকেন বা লনমোওয়ার প্যারেন্টিংয়ের চিন্তাভাবনা করে থাকেন তাহলে আজকেই সেই চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। এই ক্ষেত্রে আপনি নিচের নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করতে পারেন :

নিজের নিজের সন্তানের প্রতি সৎ থাকুন

আপনি যদি একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট হয়ে থাকেন তাহলে এই প্যারেন্টিং অভ্যাস বদলানো সহজ নয়। শুধু আপনার জন্য নয়, আপনার সন্তানের জন্যও অনেক কঠিন।

এই বিষয়ে শিক্ষাবিদ, লেখক ও লেকচারার জেনি গ্রান্ট রেনকিন বলেন, “আপনি যদি একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট হয়ে থাকেন যিনি পরিবর্তিত হতে চান, তাহলে সৎ হোন”। “তার সাথে বসুন এবং তাকে বোঝান যে আপনি তার প্রতি অতিরিক্ত সহনশীল হয়ে পড়েছিলেন। আপনি ভেবেছিলেন বাধা বিপত্তি দূর করে তাকে সাহায্য করছিলেন, কিন্তু এখন আপনি বুঝতে পেরেছেন যে এসব বাধা বিপত্তি আসার ফলাফল ও কষ্ট জীবনে বড় হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাকে বোঝান যে এখন থেকে সবকিছুই পরিবর্তিত হবে, এবং সেটা কীভাবে তা তাকে বোঝান আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজের পরিকল্পনায় অটুট থাকুন। প্রথমদিকে আপনার সন্তানের একটু কষ্ট হবে, সে চাইবে আপনি আবার আগের দিনগুলিতে ফিরে যান। তাই শক্ত থাকুন, ভালো প্যারেন্টিং সহজ হয়ে আসবে”।

সময় বুঝে আপনার সন্তানকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিন

কোনো বাবা-মাই চাইবেন না তাদের সন্তান আজীবন তাদের উপর নির্ভর করে থাকুক। সন্তানের সবকিছু দেখাশোনা করার জন্য তারা সবসময় থাকতে পারবেন না। মাতা-পিতা হিসেবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে তাকে একজন যোগ্য, পরিশ্রমী, সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এর পরে তাকে মুক্ত করে দিন এবং তার নিজের বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে সবকিছু করতে দিন। জানি এটা চিন্তা করা কঠিন, কিন্তু অদূর ভবিষ্যতের কথা ভাবলে এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।

সমস্যা সমাধানের কৌশল বাতলে দিন

যদি এই যাবৎকাল আপনিই তার সব সমস্যার সমাধান করে দিয়ে থাকেন, তাহলে তার জন্য হুট করেই কোনো সমস্যার সমাধান করা সহজ হবেনা। তাই আপনি তার জন্য কাজটা কিছুটা সহজ করে দিতে পারেন।

বিজ্ঞাপণ

লাইসেন্সড থেরাপিস্ট সাবা হারুনি লুরি পরামর্শ দেন, “আপনার সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন সে কীভাবে সমস্যাটির সমাধান করতে পারে, এটি তাদেরকে বিকল্প কিছু ভাবতে সহায়তা করবে”। “তাকে সমস্যাটি কয়েক ভাগে ভাগ করে দিয়ে সাহায্য করুন যাতে সমস্যাটি আরো সহজগম্য হয়ে উঠে। তাদেরকে সমর্থন করুন এবং তাদের প্রশংসা করুন যখন তারা সমস্যাটির একেকটি ভাগের সমাধান করত পারে, যেটি তাদেরকে নিজের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে শিখাবে, ফলাফল যাই আসুক নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে শিখবে”।

আপনার সন্তানকে কষ্ট পেতে দিন

কেউ কি মায়ের পেট থেকে হাঁটা শিখেছে? হাঁটা শিখতে গিয়ে পড়ে যায়নি, ব্যাথা পায়নি এমন কেউ আছে? সবাই তো কষ্ট পেয়েই শিখেছি তাই না? তেমনি জীবনে বড় হতে হলেও অসংখ্যবার হোঁচট খেতে হয়।

সাবা হারুনি লুরি বলেন, “সন্তানের পিতা-মাতা হিসেবে তাদেরকে পড়ে যেতে দেওয়া সম্ভবত কঠিন ছিলো, কিন্তু আমাদের সেটা করতে হয়েছে যাতে তারা হাঁটা শিখতে পারে। যতোই তারা উন্নতির নতুন ধাপে পা রাখবে ততোই তারা অসংখ্যবার পড়বে, আর এটা আমাদের জন্য খুব জরুরি যে আমরা যেনো নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি”।

প্রয়োজন ছাড়া আপনার সন্তানের কোনো ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবেন না

যদি আপনার সন্তানের কারো সাথে কোনো রকম মতবিরোধ হয় বা কারো সাথে যোগাযোগ করতে হয় তাহলে এসব ব্যাপার তাকে নিজ থেকেই সামলাতে দিন। কারণ এগুলো তার ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। মানুষের সাথে কথোপকথন কর‍্তে না জানলে তা পরবর্তীতে সমস্যায় ফেলবে। এজন্য নেহায়েত খুব প্রয়োজন ছাড়া আপনার এসব ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই।

কখন লনমোওয়ার প্যারেন্ট হওয়া উপকারী হতে পারে

সন্তানকে বড় করার জন্য যখন মা-বাবা অতিরিক্ত পর্যায়ে চলে যান, তখন সেখানে বিভিন্ন রকম সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। ফলস্বরূপ বাবা মায়েরা কখনো কখনো নিজেদের গায়ে “লনমোওয়ার প্যারেন্ট” ট্যাগ না লাগানোর জন্য সন্তানকে একরকম নিজেদের মতোই ছেড়ে দেন এবং তাদেরকে ভুল করার সুযোগ দেন। কিন্তু এমন কিছু সময় আছে যখন আপনার লনমোওয়ার প্যারেন্ট হওয়া বা সন্তানকে উদ্ধারে এগিয়ে আসা ১০০% যৌক্তিক।

যেমন আপনার সন্তান যদি তার স্কুল বা কলেজে ক্রমাগত হুমকির শিকার হয়, তখন আপনি তার নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের সাথে কথা বলতেই পারেন। আর যদি মনে করেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সেক্ষেত্রে আপনি তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের বিষয়েও ভাবতে পারেন। কারণ দিনশেষে আপনার সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়ে আপনাকেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে। তখন অবশ্যই আপনি একজন লনমোওয়ার প্যারেন্ট হতে পারেন।

আবার ধরুন আপনার সন্তান একটি নতুন স্কুল বা কলেজে ভর্তি হলো। স্কুল ছুটির পর প্রচুর ভীড় ও বিভ্রান্তির কারণে সে প্রতিষ্ঠানের বাস ধরতে পারলোনা। তখন আপনি তাকে নিজে গিয়ে নিয়ে আসতেই পারেন। কারণ প্রথমদিন নতুন স্কুল বা কলেজে গিয়ে সে এমনিই অনেক নার্ভাস, অনেক চাপবোধ করছে। তার উপর বাস মিস হওয়াতে সে আরো ভীত ও আহত হবে। সেক্ষেত্রে আপনি তাকে পায়ে হেঁটে বা বিকল্প কোনো উপায়ে বাসায় না আসতে বলে আপনি নিজে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে পারেন। এতে করে সে কিছুটা সহজ হয়ে আসবে এবং তার মনও প্রফুল্ল হয়ে উঠবে। পাশাপাশি সে বুঝবে যে তার বাবা-মা সবসময়ই তার পাশে আছে। এজন্য সে আপনাকে আরো বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করবে।

সুতরাং পরিস্থিতি মোতাবেক আপনি লনমোওয়ার প্যারেন্টিংয়ের চিন্তাভাবনা করতেই পারেন। তবে সেটা যেনো নিয়মিত কিছুতে পরিণত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি।

যেমনটা শুরুতেই বলেছি সন্তানের জন্য কি কর‍্তে হবে, কি করলে তার ভালো হবে এগুলো মা-বাবারাই ভালো বোঝেন। অবশ্যই আপনার সন্তানকে কীভাবে প্যারেন্টিং করতে হবে সেটাও আপনি ভালো বুঝবেন। তবে পরামর্শ থাকবে যাই করবেন সেটার ফলাফল কি হতে পারে সেটা ভেবেই করবেন।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Leave a Comment

Related posts