মৃত সন্তান প্রসব বা Stillbirth সম্পর্কে যেসব জানা জরুরী

মৃত সন্তান প্রসব বা Stillbirth কি?

হতে পারে আপনি কিছুদিনের মধ্যেই শুনেছেন যে আপনার গর্ভের শিশুটি মারা গিয়েছে এবং এটা যে কতটা কষ্টের একটি সংবাদ সেটা আর বলাই বাহুল্য।গর্ভধারণ করার ২০ সপ্তাহে বা এর পর যদি গর্ভের শিশুটি মারা যায় তাহলে তাকে মৃত সন্তান প্রসব বা stillbirth বলা হয়। উল্লেখ্য যে ২০ সপ্তাহের আগে যদি গর্ভের শিশু মারা যায় তাহলে তাকে মিসকারেজ বা গর্ভপাত বলা হয়ে থাকে।

আমেরিকার প্রায় ১৬০টি গর্ভধারণের মধ্যে গড়ে ১টির ক্ষেত্রে মৃত সন্তান প্রসব হতে দেখা যায়। বেশীরভাগ সময়েই প্রসব বেদনা (Labor) শুরু হওয়ার আগে গর্ভে থাকা অবস্থাতেই শিশুটি মারা যায়। তবে খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের সময়েও মারা গিয়ে মৃত সন্তান প্রসব হতে পারে।

গর্ভের সন্তান মারা গেছে কি না সেটা কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?

গর্ভবতী নারী হুট করেই খেয়াল করতে পারেন যে তার গর্ভের শিশুটি একদমই নড়াচড়া করছে না তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে ডাক্তার হয়ত তাকে জানাতে পারেন যে তার গর্ভের শিশুটি মারা গেছে। এছাড়া কখনো গর্ভবতী নারী বুঝতেই পারেন না যে তার গর্ভের শিশুটি মারা গেছে অথবা নড়াচড়া করছে না, তিনি হয়ত নিয়মিত রুটিন চেকআপের সময় এটা ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে পারেন। 

ডাক্তার ডপলার  নামক হাত দিয়ে ব্যাবহার করা যায় এমন এক ধরনের আলট্রাসাউন্ড ডিভাইস দিয়ে শিশুর হৃৎস্পন্দন শুনে থাকেন। এই আলট্রাসাউন্ড প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যদি দেখা যায় যে শিশুর কোন ধরনের হৃৎস্পন্দনই নেই তবে তিনি আলট্রাসাউন্ড করার পরামর্শ দেবেন। এর মাধ্যমে ডাক্তার নিশ্চিত হবেন যে শিশুর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং শিশুটি এখন মৃত।

কখনো কখনো আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে এটাও জানা যায় যে গর্ভের শিশুটি ঠিক কেন মারা গিয়েছে। এছাড়া ডাক্তার শিশুর শরীর থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেও শিশুর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে জানতে পারেন। এছাড়া amniocentesis নামক পরীক্ষার মাধ্যমেও জানা যায় যে শিশুর মৃত্যু কি ক্রোমোজোম জনিত কোন সমস্যার কারণে হয়েছে কি না।

মৃত সন্তান কীভাবে প্রসব করানো হয়?

স্বাস্থ্যগত কারণে অনেক সময় দেরী না করে তাৎক্ষনিক ভাবেই মৃত সন্তান প্রসব করিয়ে নিতে হয়, তবে স্বাস্থ্যগত কোন সমস্যা না থাকলে হয়ত কিছুটা দেরী করে দেখা যেতে পারে যে নিজে থেকেই প্রসবের সংকোচন শুরু হয় কিনা। তবে অপেক্ষার মধ্যবর্তী এই সময়টাতে ডাক্তার খুব মনোযোগ সহকারে আপনার দিকে লক্ষ্য রাখবেন যাতে করে আপনার গর্ভে কোন ইনফেকশন না হয় অথবা কোথাও রক্ত জমাট বেঁধে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি না হয়।

বেশিরভাগ নারীরাই যখন জানতে পারেন যে তাদের যে তাদের গর্ভের শিশুটি মারা গেছে তখন তারা Inducing labor বা কৃত্রিম উপায়ে প্রসব শুরুর মাধ্যমে সন্তান প্রসব করার ব্যাপারে ইচ্ছা পোষণ করে থাকেন, হোক সেটা সাধারণ প্রসব প্রক্রিয়া অথবা লোকাল ও জেনারেল এনেসথেসিয়া দেয়ার প্রক্রিয়া। মুল কথা হল, তারা গর্ভে মৃত সন্তান রেখে অপেক্ষা করতে চান না।

স্বাভাবিক প্রসব

যদি এমন ক্ষেত্রে নারীদের সারভিক্স সন্তান প্রসবের জন্য বিস্তৃত না হয় তাহলে ডাক্তার হয়ত তার যৌনাঙ্গ দিয়ে ঔষধ দিবেন যাতে করে সেই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যায়। এরপর তাকে hormone oxytocin (Pitocin) এর iv infusion দেয়া হয় যাতে করে জরায়ুর সংকোচন শুরু হয়ে যায়। বেশিরভাগ নারীরাই এই ধরনের অবস্থায় সাধারণ প্রক্রিয়াতেই প্রসব করতে পারেন।

Dilation এবং evacuation (D&E)

যদি গর্ভধারণের দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে থাকে এবং একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে গর্ভ থেকে মৃত শিশুর শরীর Dilation and evacuation (D&E) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বের করে নিতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে তাকে জেনারেল এনেসথেসিয়া অথবা iv sedation এবং লোকাল এনেস্থিসিয়া দেয়া হতে পারে যখন ডাক্তার তার সারভিক্স সম্প্রসারণ করবেন এবং মৃত শিশুটি বের করে নিবেন।

উপরে বর্ণীত দুই ধরনের প্রসব প্রক্রিয়াতে যাওয়ার সুযোগ যদি থাকে তাহলে নিম্ন বর্ণীত অবস্থাগুলো বিবেচনায় রাখা উচিৎঃ

যদি কেউ দ্রুত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্রসব প্রক্রিয়াটি শেষ করতে চায় আহলে D&E অবশ্যই একটা ভালো সিদ্ধান্ত। এছাড়া কোন অভিজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে যদি এই প্রক্রিয়াটি করানো হয় তাহলে কোন জটিলতার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। যদিও উভয় ধরনের প্রসব পদ্ধতিতেই ঝুঁকির পরিমাণ খুবই কম।

তবে যে সব নারীরা সন্তান মারা যাওয়ার কষ্ট কিছুটা লাঘব করার জন্য হলেও সাধারণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এবং সন্তান প্রসব করার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে চায় ও মৃত সন্তানকে দেখতে ও হাত দিয়ে ধরতে চায় তাদের জন্য inducing labor একটা ভালো সিদ্ধান্ত। এছাড়াও inducing labor পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবের পর মৃত শিশুর উপর পরীক্ষা করে মৃত্যুর সঠিক কারণ বের করাটা তুলনামূলক একটু সহজ হয়ে যায়।

মৃত সন্তান প্রসব পরবর্তী ধাপ

প্রসবের প্রক্রিয়াতে যাওয়ার পূর্বেই বাবা-মা এবং ডাক্তার আলোচনা করে নেয়া উচিৎ যে মৃত সন্তান প্রসবের পর ঠিক কি হবে। বাবা-মা যদি চায় যে তারা মৃত সন্তানকে দেখবে, হাত দিয়ে ধরবে এবং ধর্মীয় পদ্ধতি অনুসারে সন্তানকে কবর দিবে তাহলে সেটা আগে থেকেই ডাক্তারকে বলে দিতে হবে।

ডাক্তার বেশ কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বের করার চেষ্টা করতে পারেন যে শিশু ঠিক কি কারণে মারা গিয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে প্রসবের পরপরই তারা প্লাসেনটা, এর আবরণ এবং আমবিলিকার কর্ড পরীক্ষা দেখবেন। এরপর তারা অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে এর থেকে কোষ সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করবেন এবং মৃত শিশুর উপর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবেন।

সন্তান হারানোর বেদনায় আক্রান্ত পিতামাতার জন্য এই পর্যায়গুলো হয়ত বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া এত পরীক্ষার পরেও হয়ত জানা নাও যেতে পারে যে শিশুটি গর্ভে কেন মারা গিয়েছিল।

অপরদিকে পিতা-মাতারা বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জেনে নিতে পারবেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে মৃত সন্তান প্রসবের ব্যাপারটি যদি জেনেটিক সমস্যার কারণে না হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী গর্ভ ধারণের সময় যে সমস্যাগুলোর কারণে এমন হয়েছিল সেগুলো থেকে সতর্ক থাকা যাবে।

অথবা জানা যেতে পারে যে এই সমস্যাটি আবারও হওয়ার সম্ভাবনা কম, কেননা এখনকার সমস্যাটি হয়ত কোন ধরনের ইনফেকশনের কারণে হয়েছিল অথবা সাধারণ জন্মগত ক্রুটির কারণে। পুনরায় গর্ভ ধরনের পূর্বে এই ধরনের তথ্যগুলো জেনে নেয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ডাক্তাররা হয়ত পিতামাতাকে এটা জানাতে পারেন যে মৃত শিশুর শরীরের ময়না তদন্ত করে কি ধরনের তথ্য পাওয়া যেতে পারে, এটা কীভাবে করতে হবে এবং এর জন্য খরচ কত হতে পারে । যেসব পিতামাতারা সিদ্ধান্ত নেন যে তারা পূর্ণ ময়না তদন্ত করতে চান না তারা ছোটখাটো বেশ কিছু পরীক্ষা করে উপকারী কিছু তথ্য পেতে পারেন। এই ধরণের কিছু পরীক্ষা হল এক্স-রে, এমআরআই, আলট্রাসাউন্ড এবং কোষের নমুনা পরীক্ষা।

এছাড়া শিশুর মায়ের উপরেও স্বাস্থ্যগত এবং মাতৃত্ব জনিত বেশ কিছু ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এবং পারিবারিক স্বাস্থ্যগত ইতিহাস জেনে শিশুর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতে পারেন।

কি কি কারণে গর্ভের শিশু মারা যেতে পারে?

অনেক ক্ষেত্রেই এমনটা হয় যে অনেক ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পরেও গর্ভের শিশুর মৃত্যুর কারণ জানা সম্ভব হয়ে উঠে না। এবং অনেকসময় একের অধিক কারণেও গর্ভের শিশু মারা যেতে পারে।

গর্ভের শিশু মারা যাওয়ার সাধারণ কিছু কারনঃ

  • ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া। গর্ভকালীন সময়ে যেসব শিশুদের বৃদ্ধি খুব ধীরে ধীরে হয়ে থাকে তারা মৃত অবস্থায় প্রসব হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে ভ্রূণের বৃদ্ধিতে যদি বড় ধরনের সমস্যা আক্রান্ত হয়ে থাকে।
  • প্লাসেনটা ছিঁড়ে যাওয়া প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন । শিশু জন্ম গ্রহণ করার আগেই মাঝেমধ্যে প্লাসেন্টা জরায়ু থেকে আলাদা হয়ে যায়। এবং এটা মৃত শিশু প্রসবের অন্যতম একটা কারণ।
  • জন্মগত ক্রুটি। ক্রোমোজোম এবং জেনেটিক অস্বাভাবিকতা সহ শারীরিক গঠনের ক্রুটির কারণেও গর্ভের শিশুর মৃত্যু হতে পারে। কখনো গর্ভের শিশু বেশ কয়েকটি জন্মগত ক্রুটির কারণেও মারা যেতে পারে।
  • ইনফেকশন। মা, শিশু এবং প্লাসেন্টা জনিত ইনফেকশন গর্ভের শিশু মারা যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। বিশেষ করে এমন সমস্যা যদি গর্ভ ধারণের ২৮ সপ্তাহের মধ্যে হয়ে থাকে। গর্ভের শিশু যে ধরনের ইনফেকশনগুলোর কারণে মারা যায় তার মধ্যে ফিফথ ডিজিস, cytomegalovirous, listeriosis এবং syphilis অন্যতম।
  • আমবিলিকাল কর্ড জনিত কোন দুর্ঘটনার কারণে। আমবিলিকাল কর্ড জনিত কোন দুর্ঘটনার কারণেও গর্ভের শিশুটি মারা যেতে পারে, তবে এমনটা খুব কম হয়ে থাকে। যখন এই কর্ডের মধ্যে কোন গিঁট লেগে যায় অথবা প্লাসেনটার সাথে ভালোভাবে সংযুক্ত থাকে না তখন শিশু হয়ত ভালোমতো অক্সিজেন পায় না। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী শিশুদের মধ্যেও অনেক আমবিলিকার কর্ড জনিত সমস্যা হতে দেখা যায়। যাই হোক, শুধুমাত্র আমবিলিকাল কর্ডের সমস্যার কারণে শিশু মারা গিয়েছে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।

অন্যান্য কারণ, যেমন বিভিন্ন জটিলটার কারণে প্রসবের সময় শিশু যদি সঠিক পরিমাণ অক্সিজেন না পেয়ে থাকে অথবা মায়ের মানসিক আঘাতের কারণেও গর্ভের শিশুটি মারা যেতে পারে।

কি কারনগুলোর জন্য বেশ কিছু নারীরা মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকিতে একটু বেশিই থাকেন?

যে কারোরই গর্ভের শিশু মারা যেতে পারে, তবে বেশ কিছু নারীরা এই ধরনের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। নিম্নোক্ত কারণে গর্ভের শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়ঃ

  • পূর্বে যদি গর্ভের শিশু মারা গিয়ে থাকে অথবা পূর্বের গর্ভধারণের সময় যদি intrauterine growth restriction হয়ে থাকে। এছাড়াও ইতোপূর্বে যদি নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রিম্যাচিউর শিশু প্রসব হয়ে থাকে, গর্ভকালীন হাইপার-টেনশন হয়ে থাকে অথবা প্রিএক্লাম্পসিয়ার কারণেও মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • স্বাস্থ্যগত ক্রনিক সমস্যা যদি হয় যেমন লুপাস, হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিকস, কিডনি সমস্যা, thrombophilia (রক্ত জমাট বাঁধা জনিত সমস্যা) অথবা থাইরয়েড জনিত অসুখের কারণেও গর্ভের শিশুটি মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
  • এবারের গর্ভধারণে যদি জটিলটা বৃদ্ধি পায় যেমন intrauterine growth restriction, গর্ভকালীন সময়ে হাইপার-টেনশন, প্রিক্লাম্পসিয়া অথবা cholestasis of pregnancy এর কারণে গর্ভের শিশু মারা যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • ধূমপান, এলকোহল পান অথবা গর্ভকালীন সময়ে ক্ষতিকর ড্রাগ ব্যবহার করলে গর্ভের শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
  • গর্ভে যদি দুইয়ের অধিক সন্তান ধারণ করে তাহলে।
  • মা যদি অনেক স্থূলকায় অর্থাৎ মোটা হয় তাহলে গর্ভের শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

এ ধরনের সমস্যা অন্যান্য আরো অনেক কারণেও হয়ে থাকে। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান নারীরা অন্যান্য আমেরিকান নারীদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া যে সকল নারীরা বয়স হয়ে যাওয়ার পরেও গর্ভধারণ করছেন না তারাও মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকিতে থাকেন।

এছাড়া বেশ কিছু প্রমাণাদির উপর ভিত্তি করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, in vitro fertilization (IVF) এর ক্ষেত্রে অথবা intracytoplasmic sperm injection (ISCI) পদ্ধতিতে গর্ভধারণ করলে দুইয়ের অধিক শিশু বহন না করলেও গর্ভের শিশুর মারা যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ব্যাপারে বয়সও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কম এবং বেশি বয়সী নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যেটা ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে সন্তান গ্রহণ করলে অনেকাংশে কম থাকে। তবে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কম বয়সী মেয়দের ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক অপরিপক্বতা এবং জীবন যাপনের অভ্যাসের কারণে এই ধরনের ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া বেশীরভাগ বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তারা ক্রোমোজোম জনিত এবং জন্মগত ক্রুটি সম্পন্ন গর্ভধারণ করছেন, এছাড়া তাদের ডায়াবেটিক ও হাই প্রেশারের মত ক্রনিক সমস্যায় ভুগতে দেখা যায় ও যমজ শিশু গর্ভধারণ করতে বেশি দেখা যায় এবং এইসবগুলোই গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়।

গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ঝুঁকি কীভাবে কমানো সম্ভব?

গর্ভধারণের পূর্বে

আপনি যদি এখনো গর্ভধারণ করে না থাকেন, তাহলে গর্ভধারণের পূর্বের আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। এর মাধ্যমে আপনার মধ্যে যদি কোন ধরনের জটিলটা থেকে থাকে তাহলে গর্ভধারণের পূর্বেই সেটার পূর্ণ চিকিৎসা করার সুযোগ পেয়ে যাবেন। এছাড়া আপনার যদি ডায়াবেটিক এবং উচ্চ রক্ত চাপ থাকে তাহলে ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন যে গর্ভধারণের পূর্বেই কীভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যায়।

এছাড়া আপনি যদি কোন ধরনের ওষুধ ইতোমধ্যে গ্রহণ করতে থাকেন তাহলে সেটা আপনার ডাক্তারকে জানিয়ে রাখুন, যাতে করে প্রয়োজন অনুসারে তিনি সেই ওষুধের পরিমাণ বাড়িয়ে অথবা কমিয়ে দিতে পারেন। আর যে কোন ধরনের হারবাল ওষুধ এবং পেস্ক্রিপশন ছাড়াই কিনতে পাওয়া যায় এমন ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে জেনে নিন যে এটা গর্ভকালীন অবস্থার জন্য কতটুকু নিরাপদ।

দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড  (মাল্টি-ভিটামিনের সাথেও করতে পারেন আবার ছাড়াও গ্রহণ করতে পারেন) গ্রহণ করুন। আর এটা আপনি গর্ভধারণের চেষ্টা শুরু করার অন্তত এক মাস আগ থেকে শুরু করুন। ফলিক এসিড গ্রহণ করার মাধ্যমে শিশুর spina bifidia এর মত জন্মগত neural tube জনিত সমস্যার ঝুঁকি কমানো যায়।

আপনি যদি মোটা হন, তাহলে গর্ভধারণ করার আগেই শরীর কমানোর ব্যাপারে সচেষ্ট হন। তবে মনে রাখবেন গর্ভকালীন অবস্থায় কখনই ওজন কমাতে যাবেন না। আপনি কীভাবে ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক ওজনে চলে আসবেন এ ব্যাপারে আপনার ডাক্তার আপনাকে সাহায্য করতে পারেন। তবে ইন্সটিটিউট অফ মেডিসিনের মতে মোটা নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন অবস্থায় ১১-২০ পাউন্ডের বেশি ওজন বাড়তে দেয়া উচিৎ না।  

গর্ভকালীন অবস্থায়

গর্ভকালীন অবস্থা ধূমপান, এলকোহল এবং ক্ষতিকারক ড্রাগ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন। যদি এই ধরনের বদ অভ্যাস ত্যাগ করতে আপনার সমস্যা হয় তাহলে আপনার ডাক্তারের পরামর্শে মাদক পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। একটা গবেষণায় উঠে এসেছে যে সকল নারীরা প্রথম গর্ভধারণের সময় ধূমপান ছেড়ে দিয়ে থাকেন তাহলে পরবর্তী গর্ভধারণের সময় তাদের গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে আসে।

গর্ভধারণের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে যদি আপনার যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তক্ষরণ তাহলে সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, কেননা এটা placental abruption এর লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য লক্ষণ যেমন uterine tenderness, কোমরে ব্যথা, প্রায় সময় সংকোচন শুরু হওয়া অথবা তীব্র সংকোচন শুরু হওয়া এবং গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কমে আসলে সাথে সাথে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।

আপনার ডাক্তার হয়ত ২৮ সপ্তাহের দিকে শিশুর নড়াচড়ার পরিমাণ গণনা করে রাখতে বলতে পারেন। এছাড়া শিশু দশবার নড়াচড়া করতে আনুমানিক কতক্ষণ সময় নেয় সেটাও গণনা করে রাখা যায়। আপনি যদি দেখেন যে দুই ঘণ্টার মধ্যে দশবারের কম নড়াচড়া হচ্ছে অথবা আপনি যদি মনে করেন গর্ভের শিশু স্বাভাবিকের তুলনায় কম নড়াচড়া করছে তাহলে তাৎক্ষনিক ভাবে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে পড়ুন।  

এছাড়া গর্ভকালীন অবস্থায় আপনার যে কোন সমস্যা জনিত অন্যান্য লক্ষণ দেখা গেলেই দেরী না করে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন।

আপনার যদি ইতোপূর্বে গর্ভের সন্তান মারা গিয়ে থাকে (অথবা অন্য কোন কারণে গর্ভের সন্তান মারা যাওয়া ঝুঁকিতে থাকেন), তাহলে তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে থেকে আপনাকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করানো হবে এবং নিয়মিত গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।

শিশুর হৃদ স্পন্দন ঠিক আছে কিনা সেটা পরীক্ষা করা সহ nontress tests এবং biophysical profiles ধরনের পরীক্ষা করানো হবে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে যদি দেখা যায় যে আপনার শিশুর গর্ভে থাকার থেকে সিজারের মাধ্যমে অপারেশন করে ফেললে বরং নিরাপদে থাকবে তাহলে ডাক্তার আপনাকে অপারেশনের পরামর্শ দিবেন।

একবার যদি মৃত সন্তান প্রসব হয়, তাহলে এটা পুনরায় ঘটার ঝুঁকি কতটুকু?

ডাক্তার যদি ইতোপূর্বে গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার কারণ নির্ধারণ করে ফেলতে পারেন তাহলে ডাক্তাররাই বলতে পারবেন যে এটা আবার ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু।

আপনার মধ্যে যদি স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো এখনো বিদ্যমান থাকে যেমন lupus, chronic hypertesnsion, ডায়াবেটিক ইত্যাদি, তবে এর ঝুঁকি বেশি থাকে।  এছাড়া placental abruption এর মত গর্ভধারণের জটিলতার কারণে সন্তান মারা গিয়ে থাকলে পুনরায় একই ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল আকার ধারণ করে।

তবে এটা সত্য যে আপনার গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার মত ঘটনাটি যদি পুনরায় ঘটার সম্ভাবনা নাও থাকে তবুও এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে থাকাটা আপনার জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।

পুনরায় গর্ভধারণ করার আগে আপনার যাবতীয় স্বাস্থ্যগত সমস্যা ডাক্তারের মাধ্যমে পুনর্বিবেচনা করে নিবেন। যদি আপনি নতুন ডাক্তারের কাছে যান তাহলে তাঁর কাছে যেন আপনার পূর্বের সকল তথ্য এবং পরীক্ষার কাগজপত্র থাকে সেটা নিশ্চিত করুন।

এছাড়া আপনি একজন পেরিনাটোলোজিস্ট (এই ধরনের ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ) অথবা প্রয়োজন অনুসারে অন্যান্য কোন বিশেষজ্ঞ এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, যদি আপনার আশেপাশে এই ধরনের কোন বিশেষজ্ঞ থেকে থাকেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, আপনার শিশু যদি জেনেটিক সমস্যায় ভুগে থাকে তাহলে একজন জেনেটিক বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হলে গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার ঝুঁকি অথবা অন্যান্য কোন গর্ভকালীন সমস্যা হবে কি না এই সম্পর্কে জানা যেতে পারে।  

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts