একজন মায়ের ব্রেস্টফিডিং বন্ধ করার গল্প

Spread the love

লিখেছেন – Sharmin Shamon

সন্তানের সাথে কাটানো প্রতিটি মূহুর্তই মায়ের কাছে ভালো লাগার, আনন্দের। আর একটি সদ্যোজাত বাচ্চার সাথে মায়ের সম্পর্কটা শুরুই হয় সাধারনত ব্রেস্টফিডিং দিয়ে। অন্যতম একটি সুন্দর এবং পবিত্র দৃশ্য এটি। সন্তান এবং মা এই একটি সময়ে শারীরিক, মানসিক ভাবে এক হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপণ

কিন্তু কোন কিছুই চিরদিনের জন্য নয়, এই ছোট্ট বাচ্চাটি যখন বড় হয়ে যায়, প্রাকৃতিকভাবেই তাকে মায়ের দুধ ছেড়ে অন্য খাবার খেতে শিখতে হয়। প্রায় প্রতিটি মাকেই এই সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আজ লিখবো একজন মা হিসেবে আমার এই সময়টি কেমন ছিলো বা আমার কি অভিজ্ঞতা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে থাকে ২ বছর পর্যন্ত বাচ্চাকে ব্রেস্টফিডিং করানো যায়। অন্যদিকে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স বলে ১ বছর পর বন্ধ করে দেয়া যায়, কারন এক বছর পর বাচ্চার মূল খাবার হওয়া উচিত সলিড। আর সাধারনত অনেক বাচ্চারা ব্রেস্টফিডিং বেশি করে এবং অন্য খাবার তেমন খেতে চায়না বলে এক বছরের পর আয়রনের অভাবে ভুগে। কারন মায়ের দুধে একবছর বয়সের পর বাচ্চার জন্য দরকারি আয়রন, ভিটামিন ডি থাকেনা, যা বিভিন্ন সলিডে থাকে।

আমার গল্পে আসি এবার। আমি একদম খোলামেলা ভাবেই আমার গল্পটা লিখছি এতে লজ্জ্বার বা লুকানোর কিছু নেই বলে আমি মনে করি। কারন মাতৃত্ব আমার বিশেষ গুন, বিশেষ ক্ষমতা, আমি খুবই খুশি এবং গর্ববোধ করি যে আমি একজন মা, আমি একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীকে উপহার দিতে পেরেছি। এই গল্পের মধ্য দিয়ে আমি কাউকে কোন উপদেশ বা পরামর্শ দিব না, শুধু আমার অভিজ্ঞতাটাই শেয়ার করবো।

আমি একবছরের পর ব্রেস্টফিডিং বন্ধ করছিলাম না কারন আমার মেয়ে সলিড ভালো খেত আর ব্রেস্টফিডিং খুব কম করতো তাই। কিন্তু দেড় বছরের রুটিন চেকাপে ডাক্তার সরাসরি না বললেও ইঙ্গিত দিলো যে তোমাদের ( মা+বাচ্চা) জন্য কমফোর্টেবল সময় বের করে বন্ধ করে দিতে পারলে ভালো হয়। নয়তো যতবার ওকে নার্সিং করাবে ততোবার দাঁত ওয়াইপ করে দিবে, না হলে দাঁতের সমস্যা হবে পরে।

আমি একটু ভেবে দেখলাম আমার মেয়ে তো খায়ই ঘুমের আগে আগে আর রাতে ঘুমের মাঝখানে। এখন এটা কিভাবে সম্ভব যে ঘুমন্ত বাচ্চার দাঁত ওয়াইপ করে দিব, তাতে তো সে জেগে যাবে, কাঁদবে!! এবার ভাবলাম বন্ধ করার প্রজেক্ট হাতে নেয়া যাক। যেই ভাবা সেই কাজ।

যদিও টুকটাক জানা ছিলো, তবুও আবার বই খুললাম যে কিভাবে বন্ধ করা যেতে পারে, এই নিয়ে বেশ পড়ালেখা করলাম। এক কথায় বলতে গেলে বইয়ের নির্দেশনা হলো বাচ্চা যখন খেতে চাইবে ওকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করা, না দেয়া, অভারলুক করা। এটা বার বার করতে থাকলে বাচ্চা একসময় আর চাইবে না। ব্যাস কতো সহজেই বন্ধ করা যায় ভেবে এই কাজ শুরু করলাম।

মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর সময় দেইনা, সে চায় কিন্তু দেইনা, কিছুক্ষন পর আবার চায়, অন্যকিছুতে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করি, ১-২ মিনিট কাজ হয়, তারপর আবার চায়, আবারও না দিয়ে অন্যদিকে তার মন ঘুরানোর চেষ্টা করি কিন্তু এবার শুরু হয় তার কান্না, ভীষন কান্না। কিন্তু চেষ্টা করছিলাম কান্নাকে মেনে নিয়ে শক্ত হয়ে থাকার৷ এবার কান্না কাটি করে কোনমতে ঘুমালেও, মাঝরাতে যখন ঘুমের মধ্যে চায় কিন্তু দেইনা, তাতে সে উঠে বসে যায় এবং কি যে ভীষন কান্না, সে কান্না সহ্য করা কঠিন, অত্যন্ত কঠিন এমনকি ট্যানট্রামস।

এভাবে দুই-তিন দিন চেষ্টা করে আমি হার মেনে নিলাম, কিছুতেই পেরে উঠলাম না। সেদিন টের পেলাম বইয়ের কথা অনেক সময়ই বাস্তবে ঠিকঠাক নিজের বেলায় কাজ নাও করতে পারে। বলে রাখা ভালো আমার মেয়ে এমন ক্রেজি কখনো ছিলোনা ব্রেস্টফিডিং এর জন্য, কিন্তু বন্ধ করতে গিয়ে বুঝলাম সে খুব সিরিয়াস হয়ে গেছে এবং কিছুতেই তার এই অধিকার, তার এই জায়গা, তার এই আশ্র‍য় ছাড়তে রাজি না, বরং তীব্র প্রতিবাদ (কান্না) জানায়।

এভাবে আবার কিছুদিন খাওয়ানো চালিয়ে গেলাম আর ভাবতে থাকলাম কি করা যায়। এবার মনে পড়লো এক আপু, উনার বাচ্চাকে নিমপাতা দিয়ে ছাড়িয়েছিলেন। কিন্তু আমি এমন কিছু দিতে চাইছিলাম না যাতে বাচ্চার ক্ষতি হয় বা মানসিকভাবে আঘাত পেতে পারে। ভেবে ভেবে মনে পড়লো লেবু ক্ষতিকর নয়, আর আমার মেয়ে লেবু খেতে আগ্রহীও নয় মানে পছন্দ নয় তার।

এবার একদিন মনকে শক্ত করে শুরু করে দিলাম লেবুর ব্যবহার। একটু লেবুর রস লাগিয়ে খেতে দিলাম প্রথমবারেই সে ইয়াক ইয়াক বলে দূরে সরে গেলো। আমিও বললাম এটা খেতে আর ভালো লাগবে না, ইয়াকি হয়ে গেছে। এছাড়া আমার কোন উপায় জানা ছিলোনা।

মেয়ে খাচ্ছেনা, তবে কষ্ট পাচ্ছে, সেই সারাদিন এভাবেই গেলো। রাতে ঘুম পাড়ানোর সময় একই কাজ করলাম সেও একইভাবে রিজেক্ট করলো এবং খুব কষ্ট পেলো!!! তার মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম সে মেনে নিতে পারছেনা যে তার এতদিনের সুখের সময় বা সুখের জায়গার এ কি হলো!!! মেয়েটা খুব, খুব, খুব কাঁদতে থাকলো। আমার মেয়েটা খুবই ইজি আর ম্যানেজেবল বেবি জন্মের পর থেকেই। তাকে নিয়ে কোন বিপদে আমি পড়িনি কখনো কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে এটা আমার জন্য বিপদ এবং কঠিন সময় হতে যাচ্ছে।

মেয়ে কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো, কিন্তু ৩০-৪০ মিনিট পরপর উঠে যায় আর কাঁদে। খুব অনিরাপদ বোধ করছে এই জন্য যে সে আর ব্রেস্টমিল্ক খেতে পারছেনা, এর স্বাদ খারাপ হয়ে গেছে এটা তাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত অস্থির করে রাখছে৷

ব্রেস্টমিল্ক একটা বাচ্চার জন্য শুধু খাবার নয়, এটা মায়ের সাথে তার নিবিড় সময়, এটা অনেকখানি তার রাজত্বও। মেয়ে একেকবার উঠে আর ঘন্টাখানিক কাঁদে, তবে আর খেতে চায়না। বিছানায় মাথা রাখতে চায়না, শুধু কোলে ঘুমাতে চায়, যেই বিছানায় রাখি সাথে সাথে আবার শুরু হয় কান্না!! আমি সারারাত বসে বসে কাটালাম। না ঘুমিয়ে বসে কাটানোর থেকে বেশি কষ্ট দিচ্ছিলো মেয়ের কান্না!!

তবে মেয়েকে খুব ভালোবাসছিলাম, অত্যন্ত ধৈর্য্য ধরে খুব শান্তভাবে তাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। দ্বিতীয় দিনও একইভাবে কাটলো৷ সমস্যা হলো একা একা বাচ্চা+ঘর তার উপর সারারাত বসে কাটানো, বাচ্চার কান্না সবমিলিয়ে আমি শারীরিক এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি প্রায়।

বিজ্ঞাপণ

অন্যদিকে আরেকটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার আমি ফেইস করলাম দ্বিতীয় দিন রাত থেকে। জ্বী, ব্রেস্ট ভারী হয়ে ফুলে শক্ত হয়ে যাওয়ার কথা বলছি৷ কি যে যন্ত্রনা!!!খুব খুব খুব ব্যথা, পাগল পাগল লাগছিলো, মেয়েকে কোলে নিতে গেলেও ভীষন ব্যথা, অথচ মেয়ে খালি কোলে থাকতে চায়।

এবার ফ্রিজ থেকে বাঁধাকপি বের করে কয়েকটি পাতা খুলে ধুয়ে ফ্রিজে রেখে দিলাম আবার। আধা ঘন্টা পর ঠান্ডা পাতা বের করে আমি ব্রেস্টের উপর পাতা ভালোভাবে দিয়ে আন্ডার গার্মেন্টস পরে নিলাম। এই একটা জিনিস বেশ উপকার করলো আমার ব্যথা কমাতে। কিন্তু এদিকে ব্যথায় আমার জ্বর। রান্না করছি হঠাৎ শরীর বেশ খারাপ লাগছে, মনে হচ্ছে জ্বর জ্বর লাগছে, থার্মোমিটার বের করে দেখি ১০২.৮ জ্বর৷ কিন্তু এমনই জীবন যে আমার দু-দন্ড বসার, বা জ্বরকে আতিথেয়তা করার কোন সুযোগই নেই।

দিনটা কোনভাবে কেটে যেত, কিন্তু রাতটা ভয়াবহ যায়, কেন যে রাত আসে শুধু এটা মনে হতো। আমাকে সবচেয়ে ভোগাতো মেয়ের কান্না আর এটা কতোদিন চলবে, কবে ঠিক হবে এই ভাবনা। ৩য়, ৪র্থ, ৫ম…….এই দিনগুলিতে মেয়ে আমার কান্না আরো বাড়িয়ে দিলো, এমনও হয়েছে ২ ঘন্টা, কখনো ৩ ঘন্টাও কেঁদেছে একটানা। ওর গলা ভেঙে গেলো কাঁদতে কাঁদতে৷

আমার মেয়ের জন্মের পর থেকে তখন পর্যন্ত তার জীবনের সর্বমোট কান্নার পরিমানকে ছাড়িয়ে গেছে এই কয়েকদিনের কান্না আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। আমি আমার হাসব্যান্ড বসে অসহায়ের মতো সে কান্না দেখি, কখনো কখনো আমি নিজেও কাঁদতে থাকতাম। কি যে ভীষন ভয়ংকর দিন যাচ্ছিলো।

হাসব্যান্ড স্টুডেন্ট, পুরোদমে তার সেমিষ্টার চলছে, সেই সকালে বেরিয়ে যায়, রাতে ফিরে, অথচ নির্ঘুম রাত পার করতে হচ্ছিলো তাকেও। আর এইভাবে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমি বাচ্চার কাজ+ঘরের কাজ, তাও আবার ব্যথা নিয়ে জ্বর গায়ে সারাদিন বাচ্চাকে নিয়ে একা বাসায়। আমার মনে হচ্ছিলো এমন ঘোরতর খারাপ সময় আমার জীবনে আর আসেনি।

এভাবে ১০ দিন কেটে গেলো। আমি ২৪ ঘন্টায় ১-১.৫ ঘন্টা ঘুমাতে পারি কেবল তার উপর ষোল আনা কাজ। ততোদিনে আমার ব্রেস্টের ব্যথাটা অনেকটাই কমে গেছে। মেয়েও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছিলো। সে ৩-৪ ঘন্টা একটানা ঘুমাতে শুরু করলো।

বলে রাখা ভালো ব্রেস্টফিডিং বন্ধ করার প্রথম দিন থেকেই রাতে ঘুম পাড়ানোর আগে বিছানায় বই নিয়ে যেতে শুরু করলাম, কোলে নিয়ে গান গেয়ে, ছড়া শুনিয়ে ঘুম পাড়ানোর প্রজেক্ট শুরু করেছিলাম৷ ১২-১৩ তম দিনে এসে মেয়ে আমার সারা রাত একবারও কান্না না করে এমনকি ঘুম না ভেঙে ঘুমাতে শুরু করলো।

মেয়ে সারা রাত ঘুমালেও আমি ঘুমাতে পারছিলাম না আতঙ্কে যে উঠে যাবে না তো, আবার কাঁদবে না তো। যাই হোক, এখন একমাস হয়ে গেলো প্রায়। পুরো ব্যাপারটি এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। মেয়েটা এখন বেশিরভাগ দিনই একটানা সারা রাত ঘুমায়। এবার সে যখন একটু স্বাভাবিক হয়েছিলো তখন তাকে আমি বুঝিয়ে বলেছিলাম যে বাবা, এটা ইয়াক্কি না, এটা ইয়াম্মি, তবে এটা তোমার মতো বড় বেবিরা আর খায়না, ছোট বেবিরা খায়।

বিজ্ঞাপণ

আমি চাইছিলাম না, সে এটাকে খারাপ ভেবেই বড় হোক। টানা কয়েকদিন বুঝিয়ে বলার পর মেয়ে আর ইয়াক্কি বলেনা, তবে খেতেও চায়না, সে একদম মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে।

কয়েকটি বিষয় আমি পয়েন্ট করতে চাই যেগুলো আমাকে সাহায্য করেছেঃ

  • বাচ্চাকে কিছুদিন আগে থেকেই বার বার বুঝিয়ে বলতে শুরু করেছিলাম এটা খাবেনা, খেতে হয়না, বড় বেবিরা আর খায়না।
  • ব্রেস্টফিডিং বন্ধের পুরো সময়টাতে যতোটা সম্ভব বাচ্চাকে খুব ভালোবেসে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছি।
  • বাঁধাকপির পাতা দুই ঘন্টা পর পর ব্যবহারে অনেক আরাম পেয়েছি, ব্যথা এবং ফোলা কমায় এটা।
  • এই সময়টাতে আন্ডারগার্মেন্টস মানে ব্রা পড়া ভালো তাতে ব্যথা টা কম লাগে বলে আমার মনে হয়েছে।
  • ঘুম পাড়াতে বই নিয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে বাচ্চা অস্থির থেকে শান্ত হতে সাহায্য করেছে, আর বাচ্চার সাথে আরেকটু বাড়তি রিডিং টাইমও পাওয়া গেলো।
  • একবার যেহেতু মনকে বলেছি বন্ধ করবো তাই বাচ্চা যতই কাঁদুক না কেন আর দেইনি, কারন আবার দিলে বাচ্চা কনফিউজড হবে এবং সেটা আরো খারাপ হতে পারে।

এই ছিলো আমার গল্প। অনেকেরই হয়তো আমার চেয়েও কঠিন সময় পার করতে হয়েছে, হয়। আবার কারো কারো হয়তো একটু সহজ হয়। তবে সবচেয়ে বড় সত্য হলো এই সময়টা কম-বেশি সবার জন্যই কঠিন সময়। কিন্তু আমরা মায়েরা তো এক অদম্য শক্তি আর সাহস নিয়ে তবেই মা হই বা মা হতে গিয়ে আমরা সাহস আর শক্তি পাই তাই আমরা সকল কঠিন সময়কেই জয় করে সন্তানকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।

গল্পটি বেশ লম্বা হওয়ার কারনে দুঃখিত। ছোট করতে পারছিলাম না কেন জানি।

সবার জন্য শুভকামনা।

বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা নিয়ে Fairyland Parents এর লেখাগুলো পড়ুন-


Spread the love

Related posts

Leave a Comment