বেবি ওয়াকার (Walker) কি শিশুদের জন্য নিরাপদ?

Updated on

আশি এবং নব্বই শতকের দিকে শিশুদের প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকায় প্রথম সারিতে ছিল এই বেবি ওয়াকার, তবে এর বয়েস তার থেকেও একটু বেশি! ১৫ শতকের দিকেও শিশুর হাঁটা শেখার ক্ষেত্রে সাহায্য করার জন্য বেবি ওয়াকার দেয়া হত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে এখনকার সময়ে এই বেবি ওয়াকারের অনেক ক্ষতিকারক দিক উঠে এসেছে। কোন কোন বিশেষজ্ঞরা বেবিওয়াকারকে বিপদজনক বলে আখ্যায়িত করেন এমনকি কোন কোন দেশ বেবি ওয়াকারকে ইতোমধ্যে নিষিদ্ধও করে দিয়েছে।

বেবি ওয়াকার কি আসলেই ক্ষতিকর?

এই আর্টিকেলে বেবি ওয়াকার সম্পর্কে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরা হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলঃ

  • বেবি ওয়াকার কি এবং এটা কি কাজে ব্যবহৃত হয়?
  • শিশু স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নিয়ে যে বিষয়গুলো বেবি ওয়াকারের সাথে জড়িত
  • হাঁটার আগে শিশুর হামাগুড়ি দেয়ার গুরুত্ব
  • শিশুকে হাঁটতে শিখতে কিভাবে সাহায্য করবেন?

বেবি ওয়াকার কি এবং এটা কি কাজে ব্যবহৃত হয়?

বেবি ওয়াকার হল এমন একটি মাধ্যম যার সাহায্যে শিশুরা হাঁটতে পারে, এমনকি নিজ থেকে হাঁটা শুরু করার আগেই। সময়ের পরিক্রমে এই বেবি ওয়াকারকে বিভিন্ন নামে ডাকা হত যেমন, বেবি ট্রেইনার, ওয়াকিং স্টুল ইত্যাদি।

একদম ছোট শিশুকে হাঁটা শিখানোর জন্যও এই বেবি ওয়াকার দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সতেরশো শতকের দিকে ভাবা হত, শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বেবি ওয়াকার বেশ উপকারী ভূমিকা পালন করে।   

ইদানীং কালে বেবি ওয়াকার প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয় এবং এর নিচে চাকা লাগানো থাকে। এছাড়া আরো এক ধরনের বেবি ওয়াকার আছে, যেগুলো দিয়ে এক যায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যায় না বরং একটা সার্কেলের মধ্যেই শিশু ঘুরতে পারে।

বেবি ওয়াকার কি নিরাপদ?

বাবা মা’রা কেন শিশুকে বেবি ওয়াকারে দিতে চায় এটা সহজেই বোঝা যায়। কেননা বেশিরভাগ শিশুই বেবি ওয়াকার বেশ পছন্দ করে এবং বেবি ওয়াকারে শিশুকে রেখে দিয়ে বাবা মা’রা অন্যান্য কাজ করতে পারেন অর্থাৎ সবসময় শিশুর সাথে না থেকে তারা কিছুটা অবসর সময় কাটাতে পারেন। তবে অপ্রিয় হলে সত্য যে, বেবি ওয়াকার শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। তার কারণ নিচে বর্ণিত হলঃ

বেবি ওয়াকার শিশুর আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে

বেবি ওয়াকার কিছুটা দ্রুত চলাচল করে আর এইজন্য বাবা মা বুঝে উঠার আগেই শিশু হয়ত উঁচু যায়গা থেকে নিচে পড়ে যেতে পারে অথবা তার আঙুল মচকে যেতে পারে। এছাড়াও বেবি ওয়াকারের মাধ্যমে সে বিপদজনক এমন কিছু ধরে ফেলতে পারে, যেটা সাধারণত তার নাগালের বাইরে থাকে।

১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ২৩ হাজার শিশু বেবি ওয়াকারের কারণে আঘাত পায় এবং তার মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই মাথায় আঘাত পেয়েছিল। 

বেবি ওয়াকারের কারণে শিশু অন্যান্য যে ধরনের আঘাত পেতে পারে

  • পুড়ে যাওয়া এবং বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া (এর কারণ হল তারা এমন কোন বিপদজনক কিছুতে হাত দিয়ে ফেলতে পারে সাধারণত যেটা তার নাগালের বাইরে থাকে)
  • পায়ের আঙুল অথবা গোড়ালি মচকে যেতে পারে
  • টয়লেটে অথবা সুইমিং পুলের পানিতে পড়ে যেতে পারে
  • খাবারের ট্রে এর সাথে গলায় চাপ লেগে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে (যদিও এই ধরনের ঘটনা খুবই বিরল)

১৯৯৪ সালের দিকে যখন ষ্টেশনারী বেবি ওয়াকার তৈরি হয়েছিল তখন এই আঘাত পাওয়ার সংখ্যা বেশ কমে গিয়েছিল। কেননা এই ধরনের বেবি ওয়াকার দিয়ে শিশু এক যায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে না বরং নির্দিষ্ট একটা সার্কেলের মধ্যেই শিশু হাঁটতে পারে।

১৯৯৭ সালের দিকে বেবি ওয়াকারকে আরো নিরাপদ করে তোলা হয় এবং ১৯৯০ থেকে ২০০১ এর দিকে শিশুর আঘাত পাওয়ার সংখ্যা প্রায় ৭৬ শতাংশ কমে এসেছিল। যদিও এটা নিরাপত্তার দিক থেকে বেশ ভালো উন্নতি, বিশেষজ্ঞদের মতে তবুও এর মধ্যে বিপদের অনেক কিছুই বিদ্যমান।

এবিসি নিউজে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শিশু বিশেষজ্ঞ গ্যারি স্মিথ বলেন, “বেবি ওয়াকার শিশুর জন্য অনিরাপদ এবং শিশুরা এখনো এর মাধ্যমে আঘাত পাচ্ছে তাই বেবি ওয়াকার তৈরি এবং বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন।”

বেবি ওয়াকার শিশুর শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধিকে স্থবির করে তুলতে পারে

বেবি ওয়াকার যদি নিরাপদও হয় তবু এর মাধ্যমে শিশু সঠিক ভাবে হাঁটা শিখতে পারে না। এমনকি এর মাধ্যমে শিশুর দেরীতে বৃদ্ধি হওয়ার ব্যাপারেও তথ্য পাওয়া যায়।

এক গবেষণায় এটা উঠে এসেছে, যে শিশুরা বেবি ওয়াকারে হাঁটা শিখে তারা তুলনামূলক ভাবে অন্য শিশুদের থেকে দেরীতে হাঁটতে পারে। অন্য একটি গবেষণাতেও একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে, যে শিশুরা বেবি ওয়াকারে থাকে তারা দেরীতে বসে, হামাগুড়ি দেয় এবং হাঁটে। এছাড়াও যে শিশুরা বেবি ওয়াকারে বেশি সময় থাকে মানসিক এবং শারীরিক পরিপক্বতার পরিমাপে তাদের নাম্বার বেশ নিচের দিকেই হয়।  

তবে শিশুর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই দেরী হওয়ার কারণ কি? এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে শারীরিক সঠিকভাবে বৃদ্ধি না হওয়ার কারণ হল, বেবি ওয়াকারে বেশিরভাগ সময় থাকার কারণে শিশু তার পা দেখতে পায় না। কেননা শিশু যখন তার পা দেখতে পায় তখন পায়ের ব্যাবহারের ক্ষেত্রেও সে বেশ সচেষ্ট থাকে। 

পেশির শক্তি বৃদ্ধিতে বেবি ওয়াকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে

হ্যাঁ! এটা দেখতে অনেক দারুণ দেখায় যখন আপনার শিশু বেবি ওয়াকারে করে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। আপনি যেমন একটু অবসর পেলেন তার সাথে আপনার শিশুও পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখতে পারছে। তবে এটা জেনে রাখবেন বেবি ওয়াকার শিশুর পেশি শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

ঠিকমত হাঁটার জন্য শিশুর যে পেশীগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি শিশুর জন্য অনেক প্রয়োজনীয়, বেবি ওয়াকার সেগুলোর বৃদ্ধিতে বাঁধা দেয়। একটা শিশুর অনেক ধরনের অভ্যাসের প্রয়োজন, যেমন উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা থেকে শুরু করে হামাগুড়ি দেয়া। এগুলো শিশুকে হাঁটার জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত করে তুলে। আর ঠিক এখানেই বেবি ওয়াকার বিপত্তি শুরু করে দেয়, কেননা বেবি ওয়াকারে যখন আপনি শিশুকে দেন তখন শিশু তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি সাহায্য করার কাজগুলো করতে পারেনা। 

শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ এলেন গ্রিনের মতে, বেবি ওয়াকার শিশুর পায়ের নিচের দিকে পেশিগুলো শক্ত করে তোলে তবে তার হাঁটার জন্য আরো প্রয়োজনীয় অংশ যেমন পায়ের উপরের দিক এবং কোমরকে মজবুত করে তোলে না।

এছাড়াও শিশু যখন বেবি ওয়াকারে করে একদিন থেকে অন্যদিকে যেতে পারে তখন তার মধ্যে হামাগুড়ি দেয়ার প্রবণতাও কমে যায় এবং ফলাফল স্বরূপ হাঁটা শুরু করতে তার বেশ দেরি হয়।  

এছাড়াও শিশু বিশেষজ্ঞ এমি পিকলারের মতে যে শিশুরা সাধারণ ভাবে অর্থাৎ বেবি ওয়াকার ছাড়াই বড় হয় তারা তুলনামূলক ভাবে একটু শক্তিশালী, অটল এবং চলাফেরার সময় অনেক আত্মবিশ্বাসী থাকে। 

বেবি ওয়াকার কি নিষিদ্ধ?

যদিও American Academy of Pediatricians (AAP) বেবি ওয়াকারকে নিষিদ্ধ করার পরামর্শ দিয়েছে, তবুও আপনি চাইলেই এখনো আমেরিকাতে বেবি ওয়াকার কিনতে পারবেন।

তবে ২০০৪ সালের দিকে আমেরিকার প্রতিবেশী দেশ কানাডাতে কিন্তু বেবি ওয়াকার পুরোপুরি ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কানাডাতে যদি আপনি বেবি ওয়াকার বিক্রয় করতে যান তাহলে আপনার এক লাখ ডলার জরিমানা হতে পারে এমনকি আপনার ছয় মাসের জেলও হতে পারে।  

হাঁটার আগে শিশুর হামাগুড়ি দেয়ার গুরুত্ব

শিশুর মাইলস্টোনগুলো দেখতে খুবই ভালো লাগে! তাই শিশুকে তার বৃদ্ধির এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাবা মা’রা কেন এত আগ্রহী থাকেন এটা সহজেই অনুমেয়। তবে এর জন্য বৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার যে কোন একটা পর্যায়কে এড়িয়ে যাওয়া অথবা তাড়াহুড়া করাটা শিশুর জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।

মা বাবা হিসেবে শিশুকে নিজে থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে দিয়ে অপেক্ষা করাটা একটু কষ্টকরই বটে। তবে শিশুকে তার স্বাভাবিক ভাবে বাড়তে দেয়াটা জরুরী, তাই হাঁটার আগে শিশু যাতে হামাগুড়ি দেয় সেটাও শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। 

হামাগুড়ি দেয়াটা শিশুর জন্য বেশ জটিল একটা কাজ, হামাগুড়ি দেয়ার জন্য শিশুকে মস্তিষ্কের বাম এবং ডান উভয় পাশই ব্যবহার করতে হয়। আর তাই হামাগুড়ি দেয়া যে শুধুমাত্র শিশুকে হাঁটতে সাহায্য করে তা নয় বরং বিশ্লেষণ ক্ষমতা, উঁচু-নিচু ও সামনে পিছনে বোঝার ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। একটা গবেষণায় এটা উঠে এসেছে, যে শিশু বেশি সময় ধরে হামাগুড়ি দেয় পরবর্তীতে পড়ালেখায় সে অনেক ভালো করে।  

একটি শিশু স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটা শিখে নেয় এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এবং নিরাপদ ভাবে হাঁটা শিখতে দেয়াটাই শিশুর জন্য সবচাইতে ভালো।  

শিশুকে হাঁটতে শিখতে কিভাবে সাহায্য করবেন?

জন্মের পর শিশুর কোমল দেহে ক্রমেই পেশিগুলো সুগঠিত হতে থাকে। অভিভাবকরা এক্ষেত্রে শিশুর হাত-পা প্রসারণ ও সঙ্কোচন করার মাধ্যমে পেশি সুগঠিত করতে সহায়তা করতে পারেন। খেলনা বা আকৃষ্ট হবে এমন জিনিসগুলো শিশুর নাগালের বাইরে রাখলে নিজ থেকেই তার মধ্যে সেগুলো ধরার প্রেরণা তৈরি করবে, যা তাকে হাত-পা নড়াচড়া করতে শেখাবে। একটা সময় সে নিজেই বসতে শিখে যাবে।

বসতে শেখার পর শিশুর দেহের ভারসাম্য তৈরি হওয়া মুখ্য। এই সময়ে দৃষ্টি সীমানার মধ্যে খেলনাজাতীয় বস্তু ধরে তার মধ্যে আলোড়ন তৈরি করতে হবে। তখন সে সেসব খেলনা ধরার জন্য হামাগুড়ি দেওয়া শিখতে শুরু করবে। আর এই সময়ে শিশুর মেরুদণ্ড, ঘাড়, পা ও বাহু শক্ত হয়ে হাঁটার উপযোগী হতে শুরু করে।

দাঁড়াতে শেখার পর শিশু নিজ থেকেই কোনো কিছু ধরে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। শিশুকে দুই হাতে ধরে সামনে-পেছনে হাঁটানোর মাধ্যমে পায়ের কদম ফেলতে সহায়তা করা যায়। এতে শিশুর হাঁটতে শেখার সময় কমিয়ে আনা সম্ভব। একটা সময় সে নিজ থেকেই হাঁটতে চাইবে। শুরুতে ঘরের আসবাব বা দেয়াল ধরে সে একাই হাঁটার চেষ্টা করবে।

বাবুকে সাহস যোগান। বাবুরা হাঁটবে নিজে নিজেই, এটা হবে তার সময় মতোই। কিন্তু যদি দেখেন যে আপনার বাবু একটু দ্বিধাগ্রস্ত, হাঁটতে গিয়েও ভয় পাচ্ছে, তখন তাদের সাহস দিন। বাবুর সামনে তার পছন্দের খেলনা ধরে তাকে কাছে আসতে উৎসাহ দিন।

বাসায় বাবুকে সবসময় খালি পায়ে হাঁটার উৎসাহ দিন।বাচ্চাকে ঠেলে এগুনোর মতো একটি খেলনা দিন, যাতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো, হাঁটা দুইটাই করা যাবে। কিন্তু তাকে ওয়াকার দেবেন না, ওয়াকারে বাচ্চারা ব্যথা পায় বেশী।

শিশু পড়ে গেলে তাকে তুলে আবার হাঁটতে উৎসাহ দিন বা হাত ধরে ধরে তার সাথে হাঁটুন। বাচ্চারা হাঁটতে শুরু করার পরে আবার থেমে গিয়ে কয়েকদিন হামাগুড়ি দিয়ে চলা শুরু করতে পারে। এতে ভয় পাবেন না বা দুশ্চিন্তা করবেন না। তাদের হাঁটার উৎসাহ দিন।

পড়ে যাওয়া নিয়ে ভাববেন না। বাচ্চারা হাঁটা শুরু করলেই, বাবা-মায়ের মনে দুর্ঘটনার ভয় যুক্ত হয়। তারা পড়বে, ব্যথা পাবে, উঠবে, হাঁটবে, আবার ব্যথা পাবে। এই চক্র চলবেই। এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts