সন্তানের সামনে বাবা মায়ের ঝগড়া | সামাল দেয়ার ৫ টি টিপস

সকল মানুষের মাঝে যেসব অনুভূতি আদিকাল থেকে বিরাজমান তাদের মধ্যে রাগ অন্যতম। সেই রাগ কখনো রূপ নেয় নিরবতায়, কখনো ঝগড়ায়। বাবা-মাও মানুষ। তাদেরও মনমালিন্য হয়, রাগ হয়। কিন্তু সেই রাগ কি বাচ্চাদের সামনে প্রকাশ করা উচিত? বাচ্চাদের সামনেই কি স্বামী-স্ত্রী ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া উচিত? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কয়েক প্রজন্ম ধরে বাবা-মায়েরা খুঁজে আসছেন।

সাধারণভাবে অনেকেই হয়তো বলবেন, ‘অবশ্যই নয়! বাচ্চাদের সামনে ঝগড়া করা একদমই উচিত নয়।’ কিন্তু কেউ কেউ উল্টোটা মনে করেন। তাদের সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। এই দ্বিতীয় পক্ষের ভাষ্য, ‘মতের মিল না হওয়া, তর্ক হওয়া ইত্যাদি মানব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই বাচ্চাদের সামনেই এসবের মিটমাট হওয়া উচিত। এতে বাচ্চারা শিখবে কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়।’

বিজ্ঞাপণ

অন্যদিকে প্রথম পক্ষের ব্যক্তিরা মনে করেন, বাবা-মায়ের মধ্যকার ঝগড়া বা তর্ক দেখা বাচ্চার জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কের একটি বিষয়। বাবা-মায়ের উচিত বাচ্চাদের চোখের আড়ালে, বন্ধ দরজার ওপাশে যাবতীয় সমস্যার সমাধান করা।

কোন পক্ষ সঠিক? – দু’পক্ষই সঠিক, আবার কোনো পক্ষই সঠিক নয়। বিষয়টা পরিষ্কার করা যাক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে দ্বন্দ্ব ছিল, আছে, থাকবে। দ্বন্দ্বগুলোকে যদি পরিপক্ব আচরণের মাধ্যমে সমাধান করা হয়, উচ্চবাচ্য না করে সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্বের নিরসন করা হয় তাহলে সেটা দেখে বাচ্চারা ভাল কিছু শিখবে।

তারা শিখবে কীভাবে এরকম পরিস্থিতি সুন্দর করে সামাল দিতে হয়। আর এই শিক্ষাটা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। পাঠ্যবই থেকে এই শিক্ষা হয়তো সে কখনো পাবে না। তাই বাবা-মায়ের কাছ থেকে শিখতে হবে। বাস্তব জীবন থেকেই শিক্ষা নিতে হবে তাকে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের অনেকেই এধরনের পরিস্থিতি সুস্থভাবে মোকাবিলা করতে জানি না। তাই বাচ্চাদের সামনে ঝগড়া হলে বা কোনো তর্ক শুরু হলে আমরা ইতিবাচক শিক্ষা দেওয়ার বদলে নেতিবাচক আচরণই বেশি করে থাকি।

আমরা তর্ক করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে যাই, স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের শত্রুর মতো আচরণ করি, কোনো একটি বিষয়ে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে আমরা উঠে-পড়ে লাগি কিন্তু মূল সমস্যার সমাধানের দিকে আমাদের নজর থাকে না।

এধরনের ঝগড়া, তর্ক-বিতর্কগুলোই মূলত বাচ্চাদের কাছে আতঙ্কের বিষয়। এই তিক্ত ঘটনাগুলো বাচ্চাদের মনে গাঢ় দাগ ফেলে এবং সেই দাগ তাদের স্মৃতিতে আজীবন রয়ে যেতে পারে।

তবে দিন বদলেছে। মানুষ ধীরে ধীরে এসব নিয়ে ভাবতে শিখেছে। কী করলে সমস্যার সমাধান হবে তা নিয়ে গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। বাচ্চাদের সামনে বাবা-মায়ের কীভাবে ঝগড়ার পরিস্থিতি সামাল দেওয়া উচিত এ ব্যাপারে ৫টি মূল্যবান পরামর্শ থাকছে আজকের লেখায়।

শান্ত থাকুন এবং সম্মান দিন

বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য এটা হচ্ছে সেরা উপায়। চিৎকার করবেন না, নাম ধরে টানাটানি করবেন না, দরজায় চাপড় মারবেন না, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে কিছু বলা থেকে বিরত থাকুন, হুমকি দেবেন না, কোনো জিনিস ছুঁড়ে মারবেন না বা লাথি দেবেন না। সর্বপরি যেকোনো ধরনের উগ্রতা, হিংস্রতা ও সহিংসতা এড়িয়ে চলুন।

আপনার হিংস্র আচরণ দেখে বাচ্চা প্রচণ্ড ভয় পাবে। ভেতরে ভেতরে চুপসে যাবে। তাছাড়া আপনার আচরণ দেখে তারা ভাববে রাগের মাথায় সহিংসতা বা উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ একটি স্বাভাবিক বিষয়। ফলে পরবর্তীতে বাচ্চা তার ভাই-বোন বা বন্ধু-বান্ধবের সাথে উত্তেজিত মুহূর্তে এরকম উগ্র আচরণ করে বসবে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিজ্ঞাপণ

আপনার স্বামী/স্ত্রী যদি নিজের মেজাজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েও ফেলে তবুও আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। শান্তভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরুন, আলোচনা করুন। কিন্তু যদি আপনার মনে হয় আপনিও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হতে পারেন তাহলে চুপ করে থাকুন। পরে মেজাজ ঠাণ্ডা হলে ধীরে-সুস্থে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করুন।

এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরী। অভিভাবকরা যখন নিজেরা ‘একা’ থাকেন তখনো উপরোক্ত পরামর্শটি মেনে চলা প্রয়োজন। অনেক বাবা-মা আছেন, যারা ঝগড়া শুরু করার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। বাচ্চা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর তারা তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত হন। কিন্তু তারা হয়তো জানেন না, তাদের বাচ্চাটি মাঝরাতে তাদের ঝগড়ার আওয়াজ শুনে জেগে গেছে এবং বিছানায় শুয়ে চুপচাপ বাবা-মায়ের ঝগড়া শুনছে আর একটু পরপর ভয়ে কাঁপছে ।

বাচ্চা যেন জানতে পারে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে

একটি দৃশ্য কল্পনা করুন, স্বামী/স্ত্রীর সাথে আপনি ঝগড়া করছেন। খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেছেন, কণ্ঠস্বর চড়ে গেছে, একে অন্যকে দোষারোপ করছেন তারপর হঠাৎ খেয়াল করলেন- আপনার বাচ্চা সব শুনছে!

বাচ্চার সামনে আপনি আর ঝগড়া বাড়ালেন না। আপাতত চেপে গেলেন। পরে সুযোগ বুঝে ঝগড়া করবেন। এই যে, চিৎকার করতে করতে হুট করে চুপ হয়ে যাওয়ার বিষয়টা বাচ্চাকে বিব্রত করে। পরবর্তীতে বাবা-মা স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করলেও বাচ্চার মনের ভেতর খচ খচ করে বাবা-মা হয়তো এখনো পরস্পরের ওপর রাগ করে রয়েছে। ফলে বাচ্চা একধরনের সংকোচবোধ করে এবং স্বাভাবিক হতে পারে না।

তাই বাচ্চা যদি ঝগড়া করতে দেখে ফেলে তাহলে ঝগড়া মিটে যাওয়ার বিষয়টিও তার দেখা বা জানা প্রয়োজন। সবচেয়ে ভাল হয় যদি বাবা-মা বাচ্চার সামনে একে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে সমস্যার সমাধান করেন। এতে বাচ্চাও সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে শিক্ষা পেয়ে যাবে এবং বাবা-মায়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন হওয়ায় সে স্বস্তিবোধ করবে।

কোন বিষয়ে তর্ক করছেন মাথায় রাখুন

কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে বাচ্চার সামনে আলোচনা করা বা তর্ক করা একদমই উচিত নয়, এতে আপনার যতই কষ্ট হোক না কেন। বিষয়গুলো নিম্নরূপ :

বিজ্ঞাপণ
  • বাচ্চার ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোনো মতের অমিল হওয়া।
  • এমন কাউকে নিয়ে কঠোর আলোচনা বা তর্ক করা যাকে বাচ্চা খুব ভালবাসে। যেমন : দাদা, দাদু, নানা, নানু।
  • আপত্তিকর বা অনুপোযুক্ত কোনো আচরণ নিয়ে তর্ক করা। যেমন : ফ্লার্ট, পরকীয়া, ড্রাগস কিংবা মাতলামো।
  • প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয়। যেমন : নিজেদের যৌন জীবন নিয়ে কোনো তর্ক।

ঝগড়ায় বাচ্চাকে জড়াবেন না

স্বামী-স্ত্রীর তর্কের মাঝে কখনো বাচ্চাকে টেনে আনা উচিত নয়। তাকে এটাও জিজ্ঞেস করা উচিত নয় সে কাকে সমর্থন করছে। বাচ্চার জীবনে বাবা-মা দু’জনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কারো পক্ষ নেয়ার কথা বললে বাচ্চা দ্বিধায় পড়ে যাবে। তাই বাচ্চাকে কখনো তর্কে জড়ানো যাবে না।

নিজেদের মধ্যে নিঃশব্দে যুদ্ধ চালাবেন না

শিশুরা অত্যন্ত সতর্ক ও তীক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন হয়ে থাকে। আপনি যদি স্বামী/স্ত্রীর সাথে কোনো মৌখিক বাকবিতণ্ডা না করে চুপচাপ থাকেন, আর হাঁটতে চলতে একে অন্যকে এড়িয়ে যান এসব কিন্তু বাচ্চা ঠিকই বুঝতে পারে। বাচ্চা টের পায় বাবা-মায়ের মাঝে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সেই ‘কিছু একটা’ যে কী এবং কতটা গুরুতর সেটা তারা জানে না। তাই এটা বাচ্চার ওপর মানসিক চাপ ফেলে। যা কোনো অভিভাবকের কাম্য নয়।

বাচ্চারা অনুকরণ প্রিয় হয়। বাবা-মা তাদের সামনে যা যা করে বাচ্চা নিজের অজান্তে সেই আচরণগুলো অনুকরণ করে থাকে। তাই বাচ্চার সামনে বাবা-মাকে এসব বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে বাচ্চাদের সামনে তারা আজ যা করবে তা সেই বাচ্চার আচার, আচরণ, স্বভাব, চরিত্রের মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রতিফলিত হবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment