বাচ্চার হার্টবিট না আসার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত

Updated on

গর্ভাবস্থায় সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে আছে কি না অর্থাৎ আপনার গর্ভাবস্থা স্বাভাবিকভাবে আগাচ্ছে কিনা সেটা বোঝার সবচাইতে ভালো নির্দেশক হোল শুরুর দিকের আলট্রাসাউন্ডে বাচ্চার হার্টবিট আসা বা শুনতে পাওয়া।

সাধারণত গর্ভকালীন সময়টা এই ধাপে পৌঁছালেই আমরা ধারনা করে নিতে পারি যে গর্ভপাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশ কমে এসেছে। তবে এই সময়ে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করার পর যদি শিশুর হৃৎস্পন্দন শুনতে না পান, তখন?

আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে আলট্রাসাউন্ডে বাচ্চার হার্টবিট না আসার মানেই হল গর্ভপাত হয়ে যাবে। তবে এমতাবস্থায় কি ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হতে যাচ্ছেন অর্থাৎ আপনি কি আশার দোলায় দোদুল্যমান অবস্থায় থাকবেন নাকি একেবারেই আশাহত হতে যাচ্ছেন, এই আর্টিকেলটি পড়লে আপনি এই সম্পর্কে সবিস্তারে জানতে পারবেন।

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় বাচ্চার হার্টবিট না আসার কারণ কি?

আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় শিশুর হৃদ স্পন্দন না আসার কারণ সম্পর্কে জানার আগে নিম্ন বর্ণীত তিনটি বিষয় সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরী। কেননা, গর্ভকালীন সময়ের একদম শুরুর দিকে শিশুর হৃদ স্পন্দন নাও শোনা যেতে পারে।

এমতাবস্থায় আপনার মধ্যে যদি অন্যান্য আরো বিভিন্ন লক্ষণ না দেখা যায় তাহলে আরো এক সপ্তাহ অপেক্ষা করে এরপর আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করাটাই শ্রেয়। প্রথমেই যে তিনটি বিষয় সম্পর্কে জেনে রাখা জরুরী বলা হয়েছিল সেগুলো নিম্নরূপ:

আলট্রাসাউন্ড এর ধরন: সাধারণত গর্ভকালীন সময়ের একদম শুরুর দিকে Transvaginal আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষাটাই সবচাইতে বেশি নিখুঁত হয়ে থাকে। এই ধরনের পরীক্ষায় জরায়ুর বেশি কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য আপনার যৌনাঙ্গ দিয়ে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার একটি যন্ত্র ঢুকানো হবে।

গর্ভকালীন সময়ের প্রথম ৮ সপ্তাহ পার হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। এছাড়া হাত দ্বারা পরিচালিত যন্ত্র দিয়ে শিশুর হৃদ স্পন্দন খুঁজে বের করাটা একটু সময় সাপেক্ষই বটে।

গর্ভকালীন সময়ে প্রথম ৭ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত শিশুর হৃদ স্পন্দন শোনা গেলেও মাঝেমধ্যে ১২ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই হৃদ স্পন্দন শোনা নাও যেতে পারে।

গর্ভকালীন সময়: আপনার গর্ভকালীন সময় যদি ৭ সপ্তাহের কম হয়ে থাকে তাহলে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় সাধারণত শিশুর হৃদ স্পন্দন শোনা যায় না। তবে Transvaginal আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণত ৭ম সপ্তাহের সময় খুব ভালোভাবে শিশুর হৃদ স্পন্দন শোনা যায়।

এছাড়া তলপেটের উপর করা আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা তুলনামূলক ভাবে একটু কম সংবেদনশীল তাই এই পরীক্ষার মাধ্যমে হৃদ স্পন্দন শোনার জন্য আপনাকে একটু অপেক্ষা করতে হবে।

গর্ভধারণের তারিখ সম্পর্কে সঠিক তথ্য: আপনার গর্ভকালীন সময়ের ৭ সপ্তাহ পার হয়ে গেছে ভেবে যদি আপনি  Transvaginal আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করে থাকেন, তবে জেনে রাখুন আপনার তারিখের হিসেব হয়ত ভুলও হতে পারে।

গর্ভধারণের প্রথম দিকে অনিয়মিত মাসিক এবং অভুলেশনের সময়ের কারণেও আপনার তারিখের হিসেব রাখতে কিঞ্চিৎ ভুল হয়ে যেতে পারে। আর সেই হিসবের ভুলের কারণেও আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় শিশুর হৃদ স্পন্দন না শোনা যেতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর ঠিক দুই সপ্তাহ পরে যদি ডিম্ব-স্ফোটন না হয়ে থাকে তাহলে মাসিক বন্ধ হওয়ার পর ৭ সপ্তাহ হয়ে গেলেও আলট্রা পরীক্ষা করার সময় হয়ত আপনার গর্ভকালীন সময়ের ৭ সপ্তাহ পূর্ণ নাও হতে পারে।

[ আরও পড়ুনঃ গর্ভের বাচ্চার হার্টবিট বা হৃদস্পন্দন কখন শুরু হয় ? ]

পরবর্তী আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষাতেও যদি হার্টবিট  না শোনা যায়

প্রথমবার পরীক্ষা করার এক সপ্তাহ পরের আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষাতেও যদি শিশুর হৃৎস্পন্দন না শোনা যায় তাহলে তাহলে আপনার গর্ভপাতের সম্ভাবনা কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি পায় তবুও এ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে আসার জন্য সময়টা এখনও একটু তাড়াতাড়ি হয়ে যেতে পারে।

কেননা আপনার মাসিক যদি আগে থেকেই অনিয়মিত হয়ে থাকে এবং মাসিক শেষ হওয়ার পর সাত সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও আপনার গর্ভকালীন সময়ের হয়ত তখন মাত্র চার সপ্তাহ পার হয়েছে আর তাই দ্বিতীয় বারের আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার সময়েও হয়ত আপনার গর্ভকালীন সময়ের মাত্র পাঁচ সপ্তাহ পূর্ণ হয়েছে।

গর্ভকালীন সময়ের ৭ সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরেও (Transvaginal আলট্রাসাউন্ড এর ক্ষেত্রে) যদি হার্টবিট না আসে

গর্ভকালীন সময়ের ৭ সপ্তাহ পার হয়ে যাওয়ার পরেও যদি হৃদ স্পন্দন না শোনা যায় তাহলে এটাকে গর্ভপাতের একটা লক্ষণ হিসেবে ধরে নেয়া হয়ে থাকে (Transvaginal আলট্রাসাউন্ড এর ক্ষেত্রে) । কিন্তু এই নিয়মের বেশ কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। কেননা আপনি ইতোমধ্যে হয়ত অনেকের ক্ষেত্রেই দেখেছেন যে তারা এক সময় নিশ্চিত ছিল যে তাদের গর্ভপাত হয়ে যাবে কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে তারা একদমই স্বাস্থ্যকর এবং স্বাভাবিক ভাবে গর্ভধারণ করছেন।

যেহেতু বেশ কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে তাই আপনার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই আপনার গর্ভপাত হতে যাচ্ছে কি না এই ব্যাপারে একদম নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞান বেশ কিছু গাইডলাইন অর্থাৎ নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছে।

হার্টবিট শোনা না গেলে কখন সেটা গর্ভপাতের লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়?

কখনো হৃৎস্পন্দন না শোনা গেলে সেটাকে গর্ভপাতের লক্ষণ হিসেবে পরিলক্ষিত করা হয়। এই ধরনের অবস্থাগুলো সাধারণত নিম্নরূপ হয়ে থাকে:  

  • পূর্ববর্তী পরীক্ষায় যদি হৃৎস্পন্দন শোনা গিয়ে থাকে কিন্তু পরবর্তীতে আবার এই পরীক্ষা করার পর যদি শিশুর হৃৎস্পন্দন শোনা না যায়।
  • হৃদ স্পন্দন শোনা না যাওয়ার পাশাপাশি যদি এক ধরনের গর্ভকালীন অবস্থার হরমোন hCG এর অনুপাত কমে আসে।
  • এমনভাবে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা যার মাধ্যমে অবশ্যই হৃৎস্পন্দন শোনা যাওয়ার কথা।

আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভপাত নির্ণয়ের কিছু সাধারণ নির্দেশনা

বিভিন্ন মেডিকেল সংস্থা আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভপাত নির্ণয়ের জন্য বেশ কিছু উপায় অবলম্বন করে থাকে।

কানাডার দ্য সোসাইটি অফ অবস্টেট্রিক্স এন্ড গাইনোলোজি নিম্ব বর্ণীত উপায় অবলম্বন করে থাকেঃ

  • গর্ভের ভ্রূণের আকার ৫ মিলিমিটার হওয়ার পরেও যদি কোন ধরনের হৃৎস্পন্দন শোনা না যায়।
  • Gestational Sac এর আকৃতি ৮ মিলিমিটার হওয়ার পরেও কোন yolk sac না থাকা।
  • Gestational Sac এর আকৃতি ১৬ মিলিমিটার হওয়ার পরেও কোন ভ্রূণ না থাকা।

দ্য আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিক্স এন্ড গাইনোলোজি এই নির্ণায়কগুলোকে আরেকটু সম্প্রসারিত করেছে যাতে করে কোন ধরনের ভুল নির্দেশনা না দেখা যায়। তাদের মতেঃ

  • ভ্রূণের হৃদযন্ত্র সম্পৃক্ত কোন প্রকার কার্যকলাপ না থাকা এবং এর পাশাপাশি crown-rump length (CRL) অর্থাৎ ভ্রূণের আকৃতি ৫.৩ মিলিমিটার হওয়া।
  • কোন ভ্রূণ ছাড়াই Gestational Sac এর আকৃতি ২১ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়ে যাওয়া (সেখানে yolk sac থাকুক অথবা না থাকুক)।
  • যদি প্রাথমিক পরীক্ষায় Gestational Sac খালি দেখায় এবং পরবর্তীতে কিছুদিন পরেও yolk sack অথবা ভ্রূণের অনুপস্থিতি থাকে তাহলে সেটা সাধারণত গর্ভপাতের দিকেই গড়ায়।

আপনাকে যদি বলা হয়ে থাকে আপনার গর্ভপাত হয়েছে, তখন আপনার করনীয় কি?

উপরের বিভিন্ন নির্দেশনাগুলো অনেকের জন্যই একটু কঠিন মনে হতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সবচাইতে যেটা বেশি জরুরী সেটা হল আপনার ডাক্তার ঠিক কি কারণে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন সেগুলো সম্পর্কে জানা এবং ডাক্তার কি আসলেই ঠিক কি না সে ব্যাপারে সুনিশ্চিত হয়ে নেয়া।

একটা ব্যাপার মনে রাখবেন, আপনি এখন যেই সিদ্ধান্তই নেন না কেন, পরবর্তীতে কখনো এগুলো নিয়ে মন খারাপ করা যাবে না আপনাকে বাস্তবতার সাথে নিজেকে অবশ্যই মানিয়ে নিতে হবে।

আপনার ডাক্তার যদি প্রথম অথবা দ্বিতীয় আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার পরেই আপনাকে গর্ভপাতের জন্য চিকিৎসা নিতে বলে থাকেন আর সেক্ষেত্রে আপনি যদি একদম শতভাগ সুনিশ্চিত না হয়ে থাকেন তাহলে এই ব্যাপারে ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন এবং আরো একটি আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করানোর জন্য ডাক্তারকে অনুরোধ করুন। কেননা ectopic pregnancy এর মত কোন গুরুতর সমস্যা না দেখা দিলে সাধারণত আরো কিছুদিন অপেক্ষা করে গর্ভপাত সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ক্ষতি নেই।

অন্যথায় আপনি চাইলে যে কোন সময়েই দ্বিতীয় আরেকজনের মতামতের জন্য অন্য কোন গাইনোকোলোজিস্ট এর সাথে দেখা করতে পারেন। একটা ব্যাপার অবশ্যই মাথায় রাখবেন, অন্য আরেকজন ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে যে কোন ব্যাপারে সুনিশ্চিত হওয়ার মধ্যে দোষের কিছু নেই।

পরিশেষে কিছু কথা

আপনার কি গর্ভপাত হয়েছে কি না এটা জানার জন্য অপেক্ষা করাটা আসলেই খুব কষ্টদায়ক একটা সময়। এমনকি এই সময়টা হয়ত আপনার জীবনের সবচাইতে কষ্টদায়ক একটা সপ্তাহ হতে পারে—তবে হুট করেই চিকিৎসা শুরু করার আগে একদম সুনিশ্চিত হয়ে নেয়াটা আসলেই খুব জরুরী।

নিজের যত্ন নিজেই করতে শিখুন। আপনার মনে যদি কোন ধরনের সন্দেহ থেকে থাকে তাহলে যত রকম প্রশ্ন মনে উদয় হয় সবগুলোই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন এবং বেলা-শেষে সবকিছু পরিষ্কার ভাবে জেনে নিয়েই তবে সিদ্ধান্ত নিন।

আপনি যে ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন এই ধরনের গর্ভপাত তার কাছে নিত্য ব্যাপার হতে পারে কিন্তু আপনার কাছে বিষয়টা মোটেই স্বাভাবিক নয়। কেননা গর্ভপাতের মাধ্যমে আপনি শুধুমাত্র আপনার শিশুকেই হারাচ্ছেন না বরং শিশুর সাথে জড়িত হাজারো স্বপ্ন মলিন হয়ে যাচ্ছে।

আরেকটা ব্যাপার মনে রাখবেন, হোক সেটা হার্টবিট শুনতে না পাওয়া অথবা গর্ভপাত হওয়া, সবকিছুর ক্ষেত্রেই মন খারাপ হওয়াটা একদমই স্বাভাবিক। অন্যান্য ক্ষতির মতই সবাই গর্ভপাতের পরেও শোকগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং একেকজনের শোক প্রকাশ একেক ধরনের হবে এটাই স্বাভাবিক।

তবে সবসময়েই নিজের প্রতি সম্মানটা বজায় রাখবেন এবং আপনার ও আপনার সঙ্গীর জন্য যেটা ভালো হবে বলে আপনারা মনে করবেন সেভাবেই শোক প্রকাশ করার চেষ্টা করবেন।

[ আরও পড়ুনঃ গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ সংক্রান্ত প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা ]

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts