প্যারেন্টিং এর সাধারণ কিছু ভুল | পর্ব-১

আর্টিকেলটিতে যেসব বিষয় আলোচনা করা হয়েছে -
শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য ভালো প্যারেন্টিং এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে সত্যি বলতে আমদের দেশে প্যারেন্টিং বিষয়টা নিয়ে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। গৎবাঁধা ছকে আঁকা জীবনে বাচ্চাকে বড় করতেই বেশীরভাগ বাবা মা অভ্যস্ত। কিন্তু বাবা মার ছোট ছোট যেকোনো ভুলই ছোট বাচ্চার জীবনে সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলে। ব্যাড প্যারেন্টিং কথাটার সূচনা মূলত এখান থেকেই।

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় প্যারেন্টিং এর এমনি কিছু সাধারণ ভুল নিয়ে যা হয়তো অনেক বাবা মা-ই মনের অজান্তে বা না বুঝেই করে থাকে।  

বিজ্ঞাপণ

প্যারেন্টিং এর সাধারণ কিছু ভুলঃ

বাবা মার লক্ষ্য পূরণের দায়ভার সন্তানের উপর চাপিয়ে দেওয়াঃ

অধিকাংশ বাবা মা-ই তাদের অপূর্ণ ইচ্ছা তাদের সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করার ইচ্ছে রাখেন। কিন্তু সেই ইচ্ছে সন্তানের জন্য ভালো হবে কিনা সেটা খুব কম বাবা মা-ই ভাবেন। আর এখানেই সমস্যাটার শুরু।

আপনি যা করতে চেয়েছেন সেটা আপনার ইচ্ছা কিন্তু সেটা আপনার সন্তানের ইচ্ছা নাও হতে পারে। আর যখন আপনি তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে আপনার ইচ্ছাকে চাপিয়ে দিবেন তখন আপনার সন্তান মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে, সন্তান দ্বিধায় পড়ে যাবে তার আসলে কি করা উচিত। আর এই কারণে ভবিষ্যৎ জীবনে সে নিজের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখতে পারবে না।

কি করা উচিত

এই ক্ষেত্রে প্রথমেই জানার ও বোঝার চেষ্টা করুন আপনার সন্তান কি চায়। এটা হতে পারে সন্তানের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার, শখ বা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটির জন্য। তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে আপনি তাকে সেই ইচ্ছা পূরণে সাহায্য করুন। এতে আপনার সন্তান আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং মানসিকভাবে দৃঢ়তা নিয়ে বেড়ে উঠবে। একই সাথে নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রাখতে শিখবে।

বাবা মা হিসেবে নিজেদের ভালো মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে না পারা

বাচ্চারা অনুকরণ প্রিয়। বাবা মা হিসেবে সন্তানদের সামনে যা করা হবে তারাও তাই শিখবে। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা মা বাচ্চাদের খারাপ কিছু করতে নিষেধ করছে কিন্তু তারা নিজেরাই তা মানছে না। অথবা মুখে সন্তানকে ভালো কিছু শিক্ষা দিচ্ছে কিন্তু নিজেরা তা করছে না। এই ক্ষেত্রে সন্তান বাবা মার কাজগুলো থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করবে, তাদের কথা থেকে না এবং বাবা মা-র প্রতি খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে। 

কি করা উচিত

বাবা-মা হিসেবে সন্তানদের সামনে সেটাই করুন যেটা সন্তানকে আপনারা শিক্ষা দিতে চান। সন্তানদের মৌখিক ভাবে শুধু শিক্ষা না দিয়ে তা বাস্তবিক অর্থে নিজেদের প্রাত্যাহিক জীবনে প্রয়োগ করে দেখালে সন্তান প্রকৃত অর্থেই তা শিখবে।

বয়স অনুযায়ী সন্তানকে স্বাধীনতা না দেওয়া

সন্তানকে বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতা দিতে অনেক বাবা মা-ই নারাজ। তারা মনে করে, সন্তান সবসময়ই যেহেতু বাবা-মার কাছে ছোট তাই সন্তানদের স্বাধীনতা দেওয়ার বিষয়টাও তাদের কাছে সেইভাবে গুরুত্ব পায় না। কিন্তু এতে বাচ্চাদের চিন্তা ও মানসিক বিকাশ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। এই কারণে বয়স অনুযায়ী তারা অনেক কিছুই বুঝতে পারে না ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

কি করা উচিত

সন্তান বড় হবার সাথে সাথে তার চারপাশের পরিবেশ বদলে যাবে এটাই স্বাভাবিক। সন্তানকে এই স্বাভাবিকতার সাথে অভ্যস্ত হতে দিতে হবে এবং একই সাথে বয়স অনুযায়ী তার পারিপার্শ্বিক পরিবর্তন ও অবস্থার বিষয়ে জানাতে হবে। বাবা মা হিসেবে সন্তানের প্রতি আস্থা রাখার কারণে সন্তান আত্নবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।

অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা করা ও সমালোচনা করা

প্রতিটা বাচ্চা আলাদা এবং তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে। কিন্তু বাবা মা হিসেবে অনেকেই নিজের সন্তানকে অন্য বাচ্চাদের সাথে প্রায়ই তুলনা করে এবং একই নিয়মে সকল বাচ্চা বড় হবে এটা ভেবে নিজের বাচ্চার সমালোচনা করে।

অনেক সময় দেখা যায়, সমবয়সী বাচ্চাদের মধ্যে কোন বাচ্চা হয়তো কোন বিষয়ে অন্যদের চেয়ে একটু দুর্বল বা আচরণগত ভাবে একটু বেশী ইমোশনাল। এই ক্ষেত্রে সেই বাচ্চাকে অন্য বাচ্চাদের সাথে তুলনা ও সমালোচনা করে মা-বাবা অনেক বড় ভুল করেন। এতে বাচ্চা মানসিকভাবে নিজেদের দুর্বল মনে করে এবং আত্মবিশ্বাস হারায়।

কি করা উচিত

নিজের সন্তানকে তার স্বকীয়তায় বেড়ে উঠতে দিন। সন্তানের দুর্বল দিকগুলোতে সময় দিন এবং সন্তানের ভালো কাজের জন্য প্রশংসা করুন।

[ আরও পড়ুনঃ চাইল্ড শেইমিং এর ক্ষতিকর দিক এবং কিভাবে তা এড়িয়ে চলবেন ]

সন্তানের জন্য সবকিছু করে দেওয়া

বাবা-মা হিসেবে সন্তানের জন্য করা দায়িত্ব হলেও এই দায়িত্বের ও একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। নির্দিষ্ট বয়সের পরও সন্তানের জন্য সবকিছু করে দিলে তারা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং একক ভাবে কোন কাজ ঠিক ভাবে করতে পারে না। একই সাথে তারা নিজেদের লক্ষ্যের প্রতি উদাসীন হয়। 

কি করা উচিত

ছোট থেকেই সন্তানকে ছোট ছোট কাজে যুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে বাবা মা হিসেবে সাহায্য করা যেতে পারে কিন্তু সন্তানকে নিজে থেকে কাজ করার আগ্রহ তৈরি করতে হবে। সন্তান ভুল করলেও তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কারণ নেই। কারণ ভুল থেকেই আরও ভালো ভাবে কাজ করার সুযোগ হবে। এতে সন্তান একক ভাবে নিজের কাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শিখবে ও আত্ননির্ভরশীল হয়ে উঠবে।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া দেখানো

বাবা মা হিসেবে এই ভুলটা হর-হামেশাই করা হয়। সন্তান কোন ভুল করলে সাথে সাথে বকা দেওয়া এবং সন্তানের তাৎক্ষণিক কোন খারাপ আচরণে আরও উত্তেজিত হয়ে মারধোর করা। এখানেই প্যারেটিং এর ভুল ধরা পড়ে।

বাবা মা হিসেবে আপনি যা করবেন সন্তান ও ঠিক তাই শিখবে। আপনি যদি কোন ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং নিজেকে সামলাতে না পারেন আপনার সন্তানও আপনার কাছ থেকে ঠিক এই জিনিসগুলোই শিখবে।

কি করা উচিত

সন্তান কোন ভুল করলে প্রথমেই তাকে বোঝান। বারবার একই ভুল করলে তাকে বকা দিবেন এবং সতর্ক করবেন যে পরবর্তীতে একই ভুলের জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে। এতে সন্তানকে পরবর্তীতে কঠোর কোন শাস্তি দিলেও সেটা তার খারাপ আচরণের শাস্তি হিসেবেই গণ্য হবে এবং সন্তান নিজের ভুল বুঝতে পারবে। 

বিজ্ঞাপণ

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর ভুল বা ব্যর্থতায় মা বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত ]

বাচ্চাদের কোলাহলে বাবা মার অংশগ্রহণ

অনেক বাবা- মা- ই সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে বাচ্চাদের সাথে নিজেদেরকেও কোলাহলে জড়িয়ে থাকেন। একই সাথে বাচ্চাদের পারস্পরিক রেষারেষিতে নিজেরাও যুক্ত হয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। ভুলটা হয় এখানেই। এই ভুলের কারণে বাচ্চারা নিজেরা এককভাবে কোন সমস্যার সমাধান করতে পারে না।

কি করা উচিত

বাচ্চাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বাবা মা হিসেবে সমাধানের চেষ্টা করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সন্তান নিজে থেকে সাহায্য চাচ্ছে। তবে এই ক্ষেত্রে সন্তানকে শুরু থেকেই নিজেদের সমস্যা গুলো সমাধানের চেষ্টা করতে বলবেন। যদি তা করতে ব্যর্থ হয় তখন বাবা মা সাহায্য করতে হবে। এর ফলে সন্তানের নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং যেকোনো কাজ করার মতো মানসিকতা তৈরি হবে।

বাচ্চাকে কোয়ালিটি টাইম না দেওয়া

কোয়ালিটি টাইম মানে হল দিনের নির্দিষ্ট একটি সময় সন্তানকে বুঝতে দেওয়া যে, বাবা মা হিসেবে আপনি তাকে কতটা ভালবাসেন বা তার জন্য কতটা চিন্তা করেন। এই সময়টুকুর গুরুত্ব অধিকাংশ বাবা মা-ই বুঝতে পারে না।

আজকাল কাজের ব্যস্ততার জন্য বাবা মা দুজনেই বাইরে থাকে কিন্তু সারাদিন শেষে সন্তান তার বাবা মার কাছ থেকে নিজের গুরুত্ব জানতে বা বাবা মার ভালোবাসা পেতে চায়। তারা চায়, তাদের দিকে বিশেষ ভাবে নজর দেওয়া হোক। কিন্তু যখন এই সময়টুকু বাচ্চা পায় না তখন তারা নিজেদের গুরুত্বহীন মনে করে এবং বাইরের জগতের দিকে বেশী মনযোগী হয়।

কি করা উচিত

সারাদিনে আপনি হয়তো অনেক ব্যস্ত বা বাইরে থাকতে হয়। কিন্তু দিনের ২০-৩০ মিনিট রাখুন সন্তানের প্রতি নিজের ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখাতে।

এখানে অনেক সময় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং সন্তান আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তাদের সব বিষয়ে আপনি চিন্তা করেন, তাদের সাথে সময় কাটাতে আপনি পছন্দ করেন এই বিষয়গুলো জানানো বেশী গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য এই সময়টুকু দেওয়ার কারণে সন্তান আপনার হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও নিজের অবস্থান বুঝতে পারবে এবং বাবা মার প্রতিও তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে।

[আরও পড়ুনঃ বাচ্চার সাথে সুন্দর সময় কাটানোর ১০ টি টিপস ]           

বাচ্চার কথা না শোনা বা অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া

অনেক সময়ই বাবা মা বাচ্চার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে না। আবার, বাচ্চা হয়তো নিজের কোন অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে বা তার কোন সমস্যা বা ভালো লাগার অনুভূতি প্রকাশ করছে কিন্তু বাবা মা নিজেদের কাজের ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে কথা ঠিকমতো শুনছে না বা শুনলেও ঠিকমতো সাড়া দিচ্ছে না। এতে বাচ্চারা নিজেকে একা ও অসহায় মনে করে। একই সাথে নিজের চিন্তা ভাবনা বাবা মার কাছে প্রকাশ না করে আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে।

কি করা উচিত

বাবা মা হিসেবে কাজের ব্যস্ততা থাকতেই পারে। এই ক্ষেত্রে বাচ্চা কোন কথা বলতে চাইলে বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে, কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করেই তার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হবে।

বিজ্ঞাপণ

একই সাথে কোন অনুভতি প্রকাশ করলে তাদের সেই অনুভূতির সাথে অংশীদার হতে হবে। এর ফলে সন্তান নিজের কথা ও ভাবনা বাবা মার কাছে প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করবে না এবং বাবা মার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

সন্তানের সবকিছুতে “হ্যাঁ” বলা ও চাওয়া মাত্রই সবকিছু দেওয়া

সন্তানকে আদর করা মানেই এটা না যে, তাকে চাওয়া মাত্রই সবকিছু দিতে হবে। সহজেই সবকিছু পেলে সন্তান কোন কিছু কষ্ট করে অর্জন করতে হয় তা কখনোই বুঝবে না। একই সাথে ভবিষ্যৎ জীবনে বেহিসাবি হয়ে উঠবে। আবার, সন্তানের অন্যায় আবদারে হ্যাঁ বলাও অন্যায়।

কি করা উচিত

বাবা মা হিসেবে নিজেদের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলেও বাচ্চাকে কিছুটা অভাববোধের মধ্যে রাখতে হয়। সন্তান কিছু চাইলে সাথে সাথে তা না দিয়ে কিছুদিন পর কোন ভালো কাজের পুরষ্কার হিসেবে সন্তানের সেই চাহিদা পূরণ করুন। এতে সন্তানের মধ্যে অর্জনের আনন্দ আসবে। একই সাথে ছোট থেকেই সন্তানের অন্যায় আবদারগুলো পূরণ না করে তাকে গল্পছলে সেই বিষয়ের ভালো ও খারাপ দিকগুলো বুঝাতে হবে।

সন্তানকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা

কিছু বাবা মা সন্তানের সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায়। সন্তানকে বুঝার চেয়ে বাবা মা হিসেবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতেই বেশী পছন্দ করে। এর ফলে বাচ্চারা নিজেদের স্বকীয়তা খুঁজে পায় না। নিজেদের মত করে কিছু করার আনন্দ পায় না এবং তারা ভবিষ্যৎ জীবনে হতাশাগ্রস্থ ও কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পায়।

কি করা উচিত

সন্তানকে অতিরক্ত নিয়ন্ত্রন না করে সন্তানকে ভালো খারাপ নিজে থেকেই যাচাই করার সুযোগ দিতে হবে এবং কিছু বিষয়ে ছাড় দিতে হবে। এর ফলে সন্তান নিজে নিজে নতুন কিছু করার উৎসাহ পাবে।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং ]

সবার জন্য শুভকামনা।

পর্ব – ২


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Leave a Comment

Related posts