স্বাভাবিক প্রসবে যৌনাঙ্গ ও আশপাশ ছিঁড়ে যাওয়া বা পেরিনিয়াল টিয়ার (Perineal tears)

স্বাভাবিক প্রসব বা ভ্যাজাইনাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে ছিঁড়ে কেটে যাওয়াটা কতটা কমন ব্যাপার?

আপনার শিশুর পৃথিবীতে আগমন যদি ভ্যাজাইনাল ডেলিভারির মাধ্যমে হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে কিছু কাটা-ছেঁড়া হতেই পারে। আর সাধারণত এই ছেঁড়াটা পেরিনিয়াম নামক একটা অংশেই হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে আপনার যৌনাঙ্গ এবং মলদ্বারের মধ্যবর্তী অংশটিকেই পেরিনিয়াম বলা হয়ে থাকে।

প্রথমবার স্বাভাবিক প্রসব হওয়া মায়েদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটে থাকে। ছোটখাট কাটা ছেঁড়া থেকে শুরু করে অনেক গভীরভাবেও কেটে যেতে পারে যা কিছু কিছু পেলভিক ফ্লোর মাসলের ক্ষতি করতে পারে। এপিসিওটোমি করালে কাটাছেঁড়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই; বরং এপিসিওটোমির ফলে গভীরভাবে কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

পেরিনিয়াল টিয়ার কেমন হতে পারে? 

সাধারণত যখন এই ছেঁড়াটা কিঞ্চিৎ অগভীর হয়ে থাকে তখন পেরিনিয়ামের ত্বকের অংশ, যৌনাঙ্গের রাস্তায় অথবা যৌনাঙ্গে সামান্য ক্ষত সৃষ্টি হয় তবে এমতাবস্থায় কোন ধরনের পেশী ছিঁড়ে যায় না। এই ধরনের ছেঁড়াকে ডাক্তারি ভাষায় First-degree lacerations বলা হয়ে থাকে এবং এগুলো এতই সামান্য হয় যে সামান্য কয়েকটা সেলাইয়ের মাধ্যমেই সেটা ঠিক করে ফেলা যায়। এই ধরনের ছেঁড়া খুব দ্রুত ঠিক হয়ে যায় এবং আপনাকে খুব অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয় না।

আবার ক্ষত কখনো বেশ গভীর হয়ে উঠতে পারে অর্থাৎ ত্বকের নিচের মাংস পেশীও ছিঁড়ে যেতে পারে। এই ধরনের ছেঁড়াকে ডাক্তারি ভাষায় Second-degree lacerations বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের ছেঁড়ার ক্ষেত্রে স্তর অনুসারে অনেকগুলো সেলাই করার প্রয়োজন পরে।

এমতাবস্থায় আপনাকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বেশ অস্বস্তির মধ্যে থাকতে হতে পারে, কেননা এটা ঠিক হয়ে উঠতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। এই ঠিক হয়ে উঠার সময়টাতে সেলাইগুলো নিজ থেকেই মিলিয়ে যায়, আলাদা করে সেলাই কাটার প্রয়োজন পরে না।

যে সকল নারীরা স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন তাদের মধ্যে শতকরা চার ভাগ নারী তাদের পেরিনিয়ামে আরো গভীর ক্ষতের সম্মুখীন হন আর এই ক্ষত মাঝেমধ্যে এতটাই গভীর হয়ে পড়ে যে তাদের মলদ্বার পর্যন্ত ছিঁড়ে যায়।

এই ধরনের ছেঁড়ার কারণে বেশ কয়েক মাস ধরে ব্যথা হতে পারে এবং মলত্যাগের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে আসার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। মলত্যাগের উপর নিয়ন্ত্রণ কমে আসা বলতে এখানে বুঝানো হচ্ছে নিজের অজান্তেই মলদ্বার দিয়ে মাঝেমধ্যে মল বেরিয়ে আসতে পারে। ডাক্তারি পরিভাষায় একে anal incontinence বলা হয়।

এই ভয়াবহ মাত্রার কাটাছেঁড়া গুলোকে third অথবা fourth-degree laceration বলা হয়। থার্ড ডিগ্রি কাটা ভ্যাজাইনাল টিস্যু, পেরিনিয়াল স্কিন এবং পেরিনাল পেশি যা এনাল স্ফিংটারের (পায়ুপথের আশেপাশে থাকা মাংসপেশি) সাথে সংযুক্ত, ততটুকু পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ফোর্থ ডিগ্রি টিয়ার এনাল স্ফিংটার এবং এর অভ্যন্তরের টিস্যু পর্যন্ত ক্ষত করে দিতে পারে।

এ জায়গাগুলো ছাড়াও অন্যান্য স্থানেও কেটে যেতে পারে। কিছু কিছু নারীদের যোনীর একদম উপরের দিকে, ইউরেথ্রার পাশে কেটে যায়। এ জাতীয় কাটা কে পেরিইউরেথ্রাল লেসারেশন বলা হয়। এ জাতীয় কাটা খুব বেশি একটা গভীর হয় না এবং কয়েকটি সেলাইয়ের ফলে তা সহজেই ঠিক করে ফেলা যায়। অনেক সময় সেলাইয়েরও প্রয়োজন হয় না।

এই কাটাগুলোর ফলে কোন মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, তাই এগুলো শুকিয়ে যায় দ্রুত এবং পেরিনাল টিয়ারের মতো খুব একটা ব্যাথাও করে না। তবে এক্ষেত্রে যা অসুবিধা হয়, তা হলো প্রস্রাবের সময় বেশ জ্বালাপোড়া হতে পারে।

কোন কোন নারীদের সারভিক্স অথবা লেবিয়াতেও (যোনীর উপরিভাগের ভাজ) কেটে যেতে পারে। আবার যোনীর গভীরের টিস্যুও ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে৷ এ রকম কাটা ছেড়া গুলোকে sulcus tear বলে। যদিও এ জাতীয় কাটাছেড়া খুব বেশি একটা দেখা যায় না।

কারা বেশি থার্ড এবং ফোর্থ ডিগ্রির কাটাছেঁড়ার ঝুঁকিতে থাকে?

যে কারোরই গভীরভাবে কাটার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে কাটাছেঁড়ার প্রবণতা বেশিই লক্ষ্য করা যায়:

  •  প্রথমবার স্বাভাবিক প্রসব বা ভ্যাজাইনাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে,
  • পূর্বের কোন ভ্যাজাইনাল ডেলিভারিতে থার্ড কিংবা ফোর্থ ডিগ্রির কাটার অভিজ্ঞতা থাকলে,
  • এসিস্টেড ডেলিভারি, অর্থাৎ ফোরসেপের (বিশেষ কাঁচি) মাধ্যমে ডেলিভারি হলে,
  • এপিসিওটোমির মাধ্যমে ডেলিভারি হলে এবং পূর্বের কোন ডেলিভারিতে এপিসিওটোমি করালে
  • শিশু যদি বড় হয়,
  • শিশু যদি মায়ের গর্ভে পোস্টেরিয়র পজিশনে (মাথা নিচের দিকে) থাকে।
  • প্রসবের সময় দীর্ঘক্ষণ ধরে চাপ প্রয়োগ করলে
  • যোনীমুখ থেকে পায়ুপথের দূরত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হলে।

এই ধরনের ছেঁড়ার ক্ষেত্রে কীভাবে চিকিৎসা প্রদান করা হয়?

আপনার যদি এমন কোন কাটা হয় (এপিসিওটোমি করা হোক অথবা না হোক) যার জন্যে সেলাইয়ের প্রয়োজন আছে, তাহলে সরাসরি যে যায়গায় প্রয়োজন, সেখানে চেতনানাশক ইনজেকশন দিয়ে অবশ করে ফেলা হয়।

কিন্তু আপনার কাটার ক্ষত যদি খুব বেশি হয়, সেক্ষেত্রে হয়তো আপনাকে পুডেন্ডাল ব্লক দেওয়া হবে। এটা এমন একটা চেতনানাশক ইনজেকশন যা যোনীর উপরে দেওয়া হয়। এর ফলে পুডেন্ডাল নার্ভ ঠান্ডা হয়ে যায় এবং পুরো জেনিটাল এরিয়া অবশ হয়ে যায়। এর পর আপনার ডাক্তার ভাঁজে ভাঁজে ক্ষতস্থানগুলো সেলাই করে দেবেন।

সেলাই করে ফেলার পর, পরবর্তী ১২ ঘন্টা সেখানে আইসপ্যাক দিয়ে রাখার প্রয়োজন হতে পারে। আপনার কাটার পরিমাণ যদি ছোটখাটো থেকে কিছুটা বেশি হয়, তাহলে ব্যাথা বা বেশ অস্বস্তি হতে পারে। এমতাবস্থায় ব্যাথার ঔষধ চাইতে দ্বিধা করার কিছু নেই।

ভয়াবহ মাত্রার ছেঁড়ার ফলে যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কি?

ক্ষতটা হয়তো কয়েকদিনের মধ্যে সেড়ে যাবে কিন্তু আপনার অস্বস্তি তিন চার মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। থার্ড এবং ফোর্থ ডিগ্রি টিয়ারের মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষতস্থান নিরাময়ে নিম্নোক্ত পন্থাগুলো অবলম্বন করা যায়:

প্রস্রাব কিংবা পায়খানা করার সময় প্রচুর ব্যাথা হতে পারে। তাই ডাক্তার পায়খানা নরম করার কোন ঔষধ দিচ্ছেন কিনা সেটা নিশ্চিত হয়ে নিন। পায়খানা নরম করার ঔষধ ডেলিভারির পরপরই খেতে পারবেন এবং হাসপাতাল থেকে বাসায় যখন চলে আসবেন তখনও তিন চার সপ্তাহ পর্যন্ত খাওয়া চালু রাখুন।

পায়খানা করার যন্ত্রণার থেকে মুক্তি পেতে পায়খানা চেপে রাখা বা না করতে চাওয়ার কোন কারণ নেই। এর ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডাক্তারের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত  যৌন মিলনে আবদ্ধ হওয়া থেকে বিরত থাকুন।

মলদ্বারে কোন কিছু (সাপোজিটর কিংবা এনিমা) প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকুন

কাটার ক্ষত যদি স্ফিংটার কিংবা মলদ্বার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, সেক্ষেত্রে হয়তো গ্যাস কিংবা পায়খানা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চলে যেতে পারে অথবা কিছুটা কমে যেতে পারে। প্রস্রাব পায়খানা নিয়ন্ত্রণজনিত যে কোন সমস্যার মুখোমুখি হলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

প্রসবোত্তর প্রস্রাবের অনিয়ন্ত্রণ হলে কিভাবে তা পুনরায় আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায় তা জানতে এই পোস্টটি পড়ুন।

কাটাছেঁড়া প্রতিরোধে কি কোন পদক্ষেপ নিতে পারি?

ডেলিভারি যদি ধীরগতিতে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে হয় তবে শিশু বেড়িয়ে আসার জন্য পেরিনিয়াম প্রশস্ত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ পায় – এতে ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হ্রাস পায়। শিশুর মাথা যখন কিছুটা বেরিয়ে আসবে তখন আপনি বরং কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারেন এবং ক্রমাগত চাপ দেওয়ার ইচ্ছা থেকে নিজেকে কিছুটা বিরত রাখতে পারেন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রসবের দ্বিতীয় ধাপে (চাপ দেওয়ার সময়) পেরিনামে উষ্ণ কিছু দিয়ে সেক দেওয়ার ফলে ভয়াবহ মাত্রার কাটাছেঁড়ার প্রবণতা কমে যায়।

পরিশেষে, ডেলিভারি করানোর জন্যে এমন ডাক্তার পছন্দ করুন, যিনি এপিসিওটোমি করান না এবং পেরিনাম ঠিকঠাক রেখে বাচ্চা প্রসব করাতে অভিজ্ঞ। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে সবকিছুই আপনার কিংবা আপনার ডাক্তারের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনার কিছুই করার নেই। যেমন আপনার শিশু যদি বড় হয়, তার পজিশন যদি ওলট পালট হয় কিংবা আপনার টিস্যু যদি কিছুটা দুর্বল হয়, তাহলে কাটাছেঁড়া প্রতিরোধে আপনার করণীয় কিছু থাকবে না।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts