টক্সোপ্লাজমোসিস (toxoplasmosis) । গর্ভাবস্থায় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

আর্টিকেলটিতে যেসব বিষয় আলোচনা করা হয়েছে -

Updated on

টক্সোপ্লাজমোসিস (toxoplasmosis) কি ? 

টক্সোপ্লাজমোসিস (Toxoplasmosis) হোল একধরনের ইনফেকশন যা টক্সোপ্লাজমা গণ্ডি ( Toxoplasma gondii)  নামক একধরনের ক্ষুদ্র পরজীবীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়।

যদিও স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন কোন ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হলে সামান্য শারীরিক অসুস্থতা ছাড়া তেমন কোন বড় ধরনের জটিলতা খুব একটা দেখা যায় না। তবে গর্ভকালীন সময়ে এই রোগটি বেশ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা টক্সোপ্লাজমা গণ্ডি নামক এই ক্ষুদ্র পরজীবী আপনার প্লাসেন্টা (গর্ভফুল) এবং অনাগত সন্তানকেও সংক্রমিত করতে পারে।  

বেশ কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে যে আমেরিকায় প্রতি বছর ৪ মিলিয়ন শিশুর মধ্যে চারশ থেকে প্রায় চার হাজারের মত শিশু এই টক্সোপ্লাজমোসিস রোগ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকে (এটাকে অনেকে জন্মগত টক্সোপ্লাজমোসিস রোগ নামেও আখ্যায়িত করে থাকেন)। 

এই সংক্রমণটা খুব সামান্য হতে পারে আবার খুব ভয়াবহও হতে পারে, এমনকি এই সংক্রমণ মৃত সন্তান প্রসবের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়াও এই সংক্রমণের ফলে দীর্ঘ মেয়াদী শারীরিক গঠন এবং স্নায়ুগত জটিলতা সৃষ্টি সহ আরো অন্যান্য ভয়াবহ জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এটুকু জেনেই হতাশ হয়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই, কেননা আশার কথা হল বেশ কিছু পদক্ষেপ আছে যার মাধ্যমে আপনি এই সংক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন।

গর্ভের শিশুর টক্সোপ্লাজমোসিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

ডিজিস কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন অধিদপ্তরের মতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের মধ্যে কেবল মাত্র ১৫% নারীরাই এই রোগের ঝুঁকি মুক্ত থাকে। তবে সুখবর হল এই যে, গর্ভকালীন সময়ে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে একটু কম। এছাড়া আক্রান্ত সকল নারীর গর্ভের শিশুর মধ্যেও এই রোগের সংক্রমণ হবেই, ব্যাপারটা তাও নয়।

গর্ভকালীন সময় যত অতিবাহিত হতে থাকে গর্ভের শিশুর মধ্যেই এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তত বাড়তে থাকে। গর্ভধারণ করার প্রথম তিন মাসের মধ্যে যদি আপনি এই রোগে আক্রান্ত হন, তাহলে আপনার শিশুর মধ্যেও এই রোগের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ১৫%। এছাড়া ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ মাসের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হলে গর্ভের শিশুর মধ্যে সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা ৩০% এবং ৭ম মাসের পরে আক্রান্ত হলে সেই সম্ভাবনা বেড়ে শতকরা ৬০% এ গিয়ে দাঁড়ায়।

যদিও গর্ভাবস্থার শেষের দিকে শিশুর মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে তবে প্রথম তিন মাসের মধ্যে গর্ভের শিশু যদি এই রোগে আক্রান্ত হয় তাহলে সেটা গর্ভের শিশুর জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়াও গর্ভধারণ করার পূর্বে কয়েক মাসের মধ্যে যদি আপনার মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ হয়ে থাকে তাহলে আপনার গর্ভের শিশুর মধ্যেও এই রোগের সংক্রমণের কিছুটা ঝুঁকি রয়ে যায়। আর তাই আপনি যদি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হল, গর্ভধারণের চেষ্টা করার আগে আপনার অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করা উচিৎ।

টক্সোপ্লাজমোসিস রোগটি কীভাবে ছড়ায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে বেশীরভাগ মানুষই টক্সোপ্লাজমোসিস রোগে আক্রান্ত হয় কাঁচা অথবা অল্প সিদ্ধ হওয়া মাংস খাওয়ার কারণে। তবে আপনি যদি সংক্রমিত খাবার ভালো করে ধুয়ে না খান, সংক্রমিত পানি পান করেন তাহলেও এই পরজীবীতে আক্রান্ত হতে পারেন। এছাড়া যদি আপনি সংক্রমিত মাটি, বিড়ালে মল অথবা কাঁচা মাংস স্পর্শ করেন এবং ভালো করে হাত না ধুয়েই মুখ, নাক অথবা চোখে সেই হাত দিয়ে স্পর্শ করেন, তাতেও এ রোগ ছড়াতে পারে।

টক্সোপ্লাজমোসিস রোগটি একজন মানুষ থেকে অন্যজন মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হয় না তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় মা এবং গর্ভের শিশুর ক্ষেত্রে। এছাড়াও সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ অথবা সংক্রমিত ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমেও এই রোগ ছড়াতে পারে।

বাসায় কি বিড়াল রাখা যাবে?

হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। আপনি হয়ত ইতোমধ্যেই অনেকের কাছ থেকে শুনেছেন বিড়ালের মল থেকে টক্সোপ্লাজমোসিস নামক এই রোগটির প্রচুর সংক্রমণ হয়ে থাকে। তবে তারমানে এই না যে আপনাকে প্রিয় বিড়ালটিকে বাসা থেকে বের করে দিতে হবে। তবে সুস্থ থাকার জন্য এক্ষেত্রে আপনাকে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কীভাবে বিড়াল এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে এবং কীভাবে এই রোগ সংক্রমণ করে থাকে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিনঃ

প্রাকৃতিক ভাবেই টক্সোপ্লাজমা গণ্ডি নামক এই ধরনের ক্ষুদ্র পরজীবী বিড়াল প্রজাতির মাধ্যমে বংশ বিস্তার করতে পারে। এই পরজীবী সাধারণত আক্রান্ত বিড়ালের অন্ত্রে বংশ বিস্তার করে থাকে। একটা বিড়াল হয়ত এই রোগে আক্রান্ত শিকার খেয়ে, অল্প সিদ্ধ মাংস খেয়ে অথবা অপাস্তুরিত দুধ ও সংক্রমিত পানি পান করে টক্সোপ্লাজমোসিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

আক্রান্ত বিড়ালের নাড়িতে এই পরজীবী এক ধরনের “oocysts” এর আকার ধারণ করে এবং আক্রান্ত বিড়াল পরবর্তী তিন সপ্তাহ ধরে মিলিয়ন মিলিয়ন “oocysts” নিঃসরণ করতে থাকে। এই ধরনের “oocysts” খালি চোখে দেখা যায় না এবং এমনকি আপনার বিড়াল পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আপনি বুঝতেও পারবেন না।

এই ক্ষুদ্র সিস্টগুলো শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংক্রামক হয়ে ওঠে । উপযোগী আবহাওয়া পেলে এগুলো মাটিতে, ময়লায় এবং বিড়ালের মলে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এই সময়ের মধ্যে এই রোগে ছড়িয়ে পড়ে, পানির মধ্যে সংক্রমিত হয়, ফল-ফলাদির মধ্যে এমনকি মানুষের মধ্যেও সংক্রমণ হয়।

আর তাই বিড়ালের মল পরিষ্কার করার সময় যেমন এই রোগের দ্বারা সংক্রমণ হতে পারে ঠিক তেমনই বাগান করার সময়, ভালো করে না ধুয়ে শাক সবজী খেলে, সংক্রমিত পান করার মাধ্যমেও এই রোগের সংক্রমণ হতে পারে।

বাসায় যদি বিড়াল থাকে তাহলে এই রোগের সংক্রমণ থেকে কীভাবে বেঁচে থাকবেন?

আপনার বাসায় যদি বিড়াল তাকে তাহলে নিম্ন প্রদত্ত পরামর্শগুলোর দিকে একটু মনযোগী হয়ে নিনঃ

অন্য কাউকে দিয়ে দৈনিক বিড়ালের ময়লাগুলো পরিষ্কার করে নিতে পারেন। এভাবে আপনি এই সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারেন। কেননা, বিড়ালের মলের মাধ্যমে প্রথম ২৪ ঘণ্টা এই রোগ সংক্রমিত হয় না। তবে এই কাজটি যদি আপনাকেই করতে হয় তাহলে অবশ্যই গ্লাভস পড়ে নিবেন এবং অবশ্যই একবার ব্যবহারের পর গ্লাভসটি ফেলে দিবেন।

আর হ্যাঁ, অবশ্যই পরিষ্কার করার পর আপনার হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে ভুলবেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে ময়লা পরিষ্কার করার সময় আপনার মাস্ক পরে থাকা উচিৎ, কেননা ময়লার কোন অংশ বাতাসের মাধ্যমে আপনার নাক দিয়ে শরীরে ঢুকে যাওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে গর্ভকালীন অবস্থায় আপনার বিড়ালকে ভালো কোম্পানির বাজারজাত খাবার অথবা বাসার সবার খাওয়া শেষে উচ্ছিষ্ট খাওয়াতে পারেন। কোন অবস্থাতেই এই সময়ে বিড়ালকে কাঁচা অথবা হালকা সিদ্ধ মাংস খাওয়াবেন না।

বিড়ালকে বাসার মধ্যে রাখুন যাতে করে আপনার বিড়াল বাইরে যেয়ে আক্রান্ত ইঁদুর অথবা পাখী শিকার করতে না পারে (তবে মনে রাখবেন, বাসার মধ্যে যদি কোন ইঁদুর থাকে তাহলে সেটাও কিন্তু আপনার বিড়ালের সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে)।

আপনার বিড়ালকে রান্নাঘর এবং খাবার টেবিল থেকে দূরে রাখুন।

যদিও আপনার বিড়ালের লোমের মধ্যে এমন কোন পরজীবীর বসবাস করার সম্ভাবনা তেমন একটা নেই তবুও বিড়ালের সাথে খেলার পর অবশ্যই হাত ভালো করে ধুয়ে নিতে ভুলবেন না। বিশেষ করে খাওয়ার আগে অথবা হাত মুখে দেয়ার আগে ভালো করে ধুয়ে নেয়া খুবই জরুরী।

গর্ভকালীন সময়ে নতুন কোন বিড়াল ঘরে আনবেন না এবং রাস্তার কোন বিড়ালকেও এই সময়ে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।

মাংস খাওয়ার মাধ্যমে এই রোগের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

বিড়াল যদিও মলত্যাগের মাধ্যমে এই পরজীবী শরীর থেকে বের করে দেয় তবে অন্যান্য বেশ কিছু প্রাণীর শরীরে এবং কোষের মধ্যেও এই পরজীবী বাসা বাঁধতে পারে। শুকর, ভেড়া এবং বেশ কিছু পাখির মাংসের মাধ্যমেই এই রোগের সংক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। তবে যে কোন মাংসে টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ থাকতে পারে আর তাই সাবধানতার সাথে মাংস ধরতে হবে এবং ভালো করে রান্না করতে হবে।

মাংসের ক্ষেত্রে নিম্ন বর্ণীত কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা যেতে পারেঃ

রান্না করার পূর্বে কয়েকদিন মাংস ফ্রিজে রেখে দিন। তবে এর মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো গেলেও একদম দুরভিত করা সম্ভব হয় না।

মাংস ভালো করে রান্না করুন। শুধুমাত্র ভালো করে সিদ্ধ করার মাধ্যমেই আপনি টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকতে পারেন। মাংসের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিমাপ করার জন্য অর্থাৎ মাংস যথেষ্ট পরিমাণ সিদ্ধ হয়েছে কি না সেটা বুঝার জন্য খাবারের থার্মোমিটার ব্যবহার করতে পারেন।

বেশীরভাগ মাংসই ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে সিদ্ধ করা উচিৎ। তবে পোল্ট্রি মুরগীর রানের মাংস সিদ্ধ করার জন্য ১৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট এর প্রয়োজন হতে পারে। খাবারের থার্মোমিটার ব্যবহার করাই সবচাইতে ভালো তবে থার্মোমিটার না থাকলে লক্ষ্য রাখতে হবে যে মাংসের ভেতরের অংশের গোলাপি ভাবটা চলে গেছে এবং মাংস থেকে আর পানি বের হচ্ছে না। এছাড়া মনে রাখবেন, রান্নার সময় কখনই খেয়ে দেখতে যাবেন না যে মাংস সিদ্ধ হয়েছে কি না।   

অনেকেই সল্টেড মাংস অথবা স্মোকড মাংস খেতে পছন্দ করেন, তবে মনে রাখবেন যথেষ্ট পরিমাণে সিদ্ধ না করে এই ধরনের মাংস খাওয়া যাবে না।  উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে এই ধরনের মাংস পিজ্জার মধ্যে দিয়ে বেক করে খেতে কোন সমস্যা নেই। যদি এই ধরনের মাংস রান্না না হয়ে থাকে তাহলে কিন্তু  টক্সোপ্লাজমোসিস এর ঝুঁকিটা থেকেই যায়, কেননা এগুলো ঠিকমত সিদ্ধ না করেই বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এছাড়াও শুকনা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন, কেননা শুকনো মাংস সঠিকভাবে সিদ্ধ করে শুকানো নাও হতে পারে।

টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আরো কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে?

টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকতে হলে নিম্ন বর্ণীত পরামর্শগুলো মেনে চলুনঃ

অপাস্তুরিত দুধ পান করবেন না অথবা অপাস্তুরিত দুধ থেকে তৈরি কোন খাবার খাবেন না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে কিছু চিজ এবং দই অপাস্তুরিত দুধ থেকে তৈরি হয়ে থাকে। এগুলোর সাথে সাথে কাঁচা ডিম খাওয়া থেকেও বিরত থাকুন।

খাবার আগে শাক সবজী এবং ফলমূল ভালো করে ধুয়ে নিবেন।

কাঁচা মাংস, ফার্মের মুরগীর মাংস অথবা সামুদ্রিক খাবার নিয়ে কাজ করার পর অবশ্যই কাটিং বোর্ড, পাত্র, সিংক এবং অবশ্যই আপনার হাত ভালো করে কুসুম গরম সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

খাবার তৈরি করার সময় আপনার মুখ, নাক এবং চোখ ধরবেন না এবং অবশ্যই খাবার আগে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। এছাড়া খেয়াল রাখবেন কোথাও কেটে গেলে অথবা ঘা হয়ে গেলে সেই অংশের সাথে যেন টক্সোপ্লাজমোসিস সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ কোন কিছুর স্পর্শ না লাগে। হাতে যদি কোন কাটা অথবা ঘা থাকে তাহলে অবশ্যই গ্লাভস ব্যবহার করবেন এবং একবার ব্যবহারের পর সেই গ্লাভস ফেলে দিন।

মাছি এবং তেলাপোকা থেকে খাবার দূরে রাখুন।

টক্সোপ্লাজমোসিস এর ঝুঁকিপূর্ণ পানি পান করা থেকে বিরত থাকুন। যখন অনুন্নত অথবা উন্নয়নশীল কোন দেশে ঘুরতে যান অথবা জঙ্গলে ক্যাম্পিং করতে যান তখন বোতল-জাত পানি পান করার চেষ্টা করবেন। 

বাগান পরিচর্যা করার পর অবশ্যই ভালো করে হাত ধুয়ে নিন এবং অবশ্যই ধোয়ার আগে হাত দিয়ে নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করবেন না।

কীভাবে বুঝবেন আপনার টক্সোপ্লাজমোসিস সংক্রমণ হয়েছে?

পরীক্ষা না করলে আপনি হয়ত কখনই বুঝতে পারবেন না যে আপনার টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ হয়েছে। কেননা সুস্থ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন বেশীরভাগ মানুষের মধ্যেই এই সংক্রমণ হলে তেমন কোন লক্ষণ দেখা যায় না।

আপনি যদি এই সংক্রমণে আক্রান্ত হন তাহলে Lymph Glands কিছুটা ফুলে গেলেও ব্যথা করবে না। এছাড়া অন্যান্য সাধারণ লক্ষণের মধ্যে পেশীতে হালকা ব্যথা, অবসাদ, মাথা ব্যথা, জ্বর, গলায় চুলকানি অথবা শরীরে র‍্যাশ দেখা যাওয়া অন্যতম।

এই সংক্রমণ হয়েছে কি না অথবা এর প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে কি না—গর্ভাবস্থায় কোন পরীক্ষাটি করা হবে?

আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিসিয়ান্স এন্ড গাইনোকোলোজিস্ট এর মতে, সাধারণত গর্ভবতী নারীদের এই পরীক্ষা করা হয় না। তবে কারো যদি এইচ,আই,ভি পজিটিভ থাকে অথবা এই সংক্রমণের ব্যাপারে সন্দেহ করে হয় সেখেত্রে ভিন্ন কথা।  

এই পরীক্ষার সুবিধা এবং অসুবিধা সম্পর্কে আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন। ডাক্তারের সাথে আলাপ করে সবকিছু বুঝেই তবে দুইজন মিলে এ সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারবেন। এছাড়া আপনার শরীরের কোন গ্রন্থি যদি ফুলে যায় অথবা অন্য কোন কারণে আপনার এই সংক্রমণের ব্যাপারে সন্দেহ হয় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে ভুলবেন না।

যদি এমনটা দেখা যায় যে আপনার টক্সোপ্লাজমোসিস সংক্রমণ হয়েছে তাহলে দুই ধরনের এন্টিবডি আছে কিনা সেটা জানার জন্য আপনার রক্ত পরীক্ষা করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে আপনাকে হয়ত দুই অথবা তিন সপ্তাহ পরে আবারও পরীক্ষা করাতে হতে পারে। তখন টক্সোপ্লাজমোসিস এর জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি ল্যাবে আপনার রক্ত পরীক্ষা করা হবে। আর এই পরীক্ষার মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন যে ঠিক কতদিন আগে আপনার মধ্যে এই পরজীবীর সংক্রমণ হয়েছে।

টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ হলে কি করবেন?

গর্ভকালীন সময়ে যদি পরীক্ষা করে দেখা যায় যে আপনি টক্সোপ্লাজমোসিস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন, তাহলে ডাক্তার আপনাকে একটি বিশেষ ধরনের এন্টিবায়োটিক সেবনের ব্যাপারে পরামর্শ দিবেন। এই এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে গর্ভের শিশুর মধ্যেও এই রোগের সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে আনা হয়ে থাকে।

যেহেতু মায়েদের সকল সংক্রমণই শিশুকে আক্রান্ত করে না, তাই একটি বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হবে যে আপনার গর্ভের শিশুও কি এই রোগে আক্রান্ত কি না। (ডাক্তার আপনার এমনিওটিক ফ্লুয়িড নিয়ে একধরনের বিশেষ ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখবেন যে সেখানে টক্সোপ্লাজমোসিস এর পরজীবী আছে কি নেই)। এছাড়া গর্ভের শিশুর কি আদৌ স্বাভাবিক বৃদ্ধি হচ্ছে কি না সেটা জানার জন্য গর্ভাবস্থায় আপনাকে বেশ কয়েকবার আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করে দেখা হতে পারে।

গর্ভের শিশুর মধ্যে টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ হলে কি করবেন?

গর্ভের শিশুর মধ্যেও টক্সোপ্লাজমোসিস এর সংক্রমণ হলে সেটার ফলাফল খুব সামান্যও হতে পারে আবার এটা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি এই সংক্রমণের কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তানের জন্ম অথবা জন্মের কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশু মারা যেতে পারে।

আপনার এমনিওটিক ফ্লুয়িড পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় যে আপনার শিশুর মধ্যে সংক্রমণ হয়েছে অথবা আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় যদি কোন ধরনের জটিলতা দেখা যায় তাহলে আপনাকে বিশেষ স্বাস্থ্য সেবা বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হবে।

এরসাথে শিশুর ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য একজন জেনেটিক বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হওয়াও আপনার জন্য জরুরী। এমনকি শিশুর গর্ভকালীন সময়ের উপর নির্ভর করে আপনাকে গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট করে ফেলারও পরামর্শ দেয়া হতে পারে।

যদি সংক্রমণ নিয়েও আপনি এই গর্ভাবস্থায় থাকেন তাহলে শিশুর ঝুঁকি এবং জটিলতা কমানোর জন্য চতুর্থ সপ্তাহ থেকে এন্টিবায়োটিক প্রদান করা হতে পারে।

জন্মগত টক্সোপ্লাজমোসিস শিশুর মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে, এমনকি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বুদ্ধিমত্তা বিকাশে দেরী, cerebral palsy এবং epilepsy ধরনের অনেক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া এই সংক্রমণ শিশুর শরীরের অন্যান্য অংশ যেমন চোখেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমনকি এই সংক্রমণ শিশুকে অন্ধও করে দিতে পারে।  

শিশু জন্মের পর সাথে সাথেই কি টক্সোপ্লাজমোসিস এর লক্ষণ দেখা যাবে?

কোন কোন শিশুর মধ্যে জন্মের সাথে সাথেই টক্সোপ্লাজমোসিস এর লক্ষণ দেখা যায়। তন্মধ্যে কিডনি বড় থাকা, জন্ডিস, স্প্লিনের আকার বড় হওয়া, রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ কম থাকা, র‍্যাশ দেখা যাওয়া সহ ফুসফুসের ইনফেকশন অন্যতম।

তবে বেশীরভাগ শিশুর মধ্যেই জন্মের সময় তেমন কোন লক্ষণ দেখা যায় না, বিশেষ করে গর্ভকালীন সময়ের শেষের দিকে কেউ যদি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে জন্মের পরপর একদম স্বাভাবিক দেখা গেলেও পরবর্তী কয়েক মাস পরে এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে বছর খানেক পরেও গুরুতর সমস্যা দেখা যায়।

যদি জন্মের পরপরই পরীক্ষায় দেখা যায় শিশুর মধ্যে সংক্রমণ আছে তাহলে কোন লক্ষণ দেখা না গেলেও শিশুকে প্রায় বছর খানেক ধরে এন্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করানো হবে। বিশেষ ধরনের শ্রবণ শক্তি এবং দৃষ্টি শক্তির পরীক্ষা করানো হবে। এরসাথে প্রয়োজন অনুসারে তার মাথার সিটি স্ক্যানও করানো হতে পারে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে জন্মের পরপর চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুর যাতে কোন নতুন ধরনের সমস্যা না হয় সেটাই মূলত সুনিশ্চিত করা হয়ে থাকে। কেননা, ইতোমধ্যে (গর্ভাবস্থায়) যদি কোন ক্ষতি হয়ে থাকে সেটা চিকিৎসার মাধ্যমে ঠিক করে ফেলা সম্ভব নাও হতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা। 

Related posts

Leave a Comment