গর্ভাবস্থায় লুপাস (Lupus) : লক্ষণ, প্রভাব ও করণীয়

Updated on

লুপাস (Lupus) ঠিক কী ধরনের রোগ?

লুপাস হল এমন এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী এবং গুরুতর রোগ যেটা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণত আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শরীরকে সংক্রমণ এবং বিভিন্ন রোগ জীবাণু থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। কিন্তু আপনার যদি লুপাস নামক এই রোগটা হয়ে থাকে তাহলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জীবাণুকে আক্রমণ না করে শরীরের সুস্থ কোষগুলোকে আক্রমণ করা শুরু করে, এইজন্য লুপাসকে এক ধরনের অটো ইমিউন ডিজিজও (autoimmune disease) বলা হয়ে থাকে।

লুপাস রোগটি বেশ কয়েক ধরনের হয়ে থাকে, তবে সবচেয়ে বেশি যে ধরনটা পরিলক্ষিত করা যায় সেটা হল Systemic lupus erythematosus (SLE).  এই SLE হালকা থেকে গুরুতর হতে পারে এবং হৃদপিণ্ড, হাড়, ত্বক, ফুসফুস, রক্ত কণিকা, কিডনি এবং নার্ভাস সিস্টেম সহ শরীরের অনেক অংশেই এই ধরনের লুপাস আক্রমণ করতে পারে।

রোগের অবস্থার সাথে সাথে এই রোগের লক্ষণগুলোও হালকা থেকে গুরুতর পর্যায়ের হতে পারে এবং লক্ষণগুলো বারবার শরীরে আসা যাওয়া করতে পারে। লুপাস রোগে আক্রান্ত রোগীর শরীরে যখন লক্ষণগুলো দেখা যায় তখন সেই অবস্থাকে ডাক্তারি ভাষায় “flare” এবং যখন দেখা যায় না সেই অবস্থাকে “remission” বলা হয়।

বিশেষজ্ঞরা এখনো সঠিক ভাবে এই রোগের কারণ বের করতে পারেন নি তবে ধারনা করা হয় জেনেটিক, হরমোন এবং পরিবেশগত সমস্যার কারণেও এই ধরনের রোগ হতে পারে।

লুপাস রোগের সঠিক চিকিৎসা প্রদান করাটাও কিছুটা জটিল, কেননা এই রোগের প্রকৃতি অনেকটাই অনিশ্চিত এবং এটা একেক জনের শরীরে একেক ভাবে কাজ করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই পর্যন্ত কতজন এই রোগে আক্রান্ত সে সম্পর্কেও কোন ধরনের সুনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় নি, কিন্তু ধারনা করা হয় প্রায় দেড় মিলিয়ন অর্থাৎ পনের লাখেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।

আপনি কি লুপাস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন?

সাধারণত লুপাস রোগটি নারীদেরকেই বেশি প্রভাবিত করে থাকে—প্রতি দশজনের মধ্যে আক্রান্ত নয় জনই নারী। ন্যাটিভ আমেরিকান, আফ্রিকান আমেরিকান অথবা আলাসকার অধিবাসীদের সাধারণত এই রোগে বেশি আক্রান্ত হতে দেখা যায়।

এছাড়া আপনার শরীরে যদি অন্য কোন অটো ইমিউন রোগ থেকে থাকে অথবা নিকট আত্মীয়র মধ্যে কেউ যদি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে আপনিও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন।

লুপাস রোগের লক্ষণগুলো কি কি?

লুপাস রোগের অন্যতম লক্ষণ হল শরীরের ত্বকে বেশ কিছু পরিবর্তন আসা, যেমনঃ

  • Butterfly rash, নাক থেকে গালে দুই পাশে প্রজাপতির পাখার মতো র‌্যাশ
  • Discoid rash, যেটা স্তরের মত হয়ে থাকে এবং কিছুটা ফেটে ফেটে যায়। সাধারণত এটা মাথার খুলিতে অথবা কানে হয়ে থাকে এবং যার কারণে চুল পড়ে যেতে পারে।
  • Photosensitive rash, এই ধরনের র‍্যাশ সূর্যের রোদের মধ্যে গেলে বেশি পরিলক্ষিত করা যায়।
  • মুখে এবং নাকের মধ্যে আলসার, তবে এই ধরনের লক্ষণ বেশীরভাগ সময় ব্যথামুক্ত হয়ে থাকে।

লুপাস রোগের অন্যান্য আরো কিছু লক্ষনঃ

  • হাড় এবং জয়েন্টে ব্যথা ও ফুলে যাওয়া
  • রক্ত সঞ্চালন কম হওয়া, যার ফলে আঙুল সাদা অথবা নীল বর্ণ ধারণ করতে পারে।
  • জ্বর
  • চরম মাত্রায় অবসাদগ্রস্ত হওয়া
  • বুকে ব্যথা
  • শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা
  • বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাওয়া
  • হৃদরোগের আক্রমণ অথবা স্ট্রোক করা অথবা খিঁচুনি (যদি এই ধরনের লক্ষণ খুবই বিরল)

আপনার লক্ষণগুলোর প্রকারভেদে এবং মাত্রা অনুযায়ী ডাক্তার আপনার কিডনি, হৃদযন্ত্র অথবা ফুসফুসের সমস্যা নির্ধারণের জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারেন। এছাড়া লুপাসের কারণে আপনার রক্তেও এনেমিয়া এবং রক্ত জমাট বাঁধা (Blood Clots) জাতীয় সমস্যা দেখা যেতে পারে।

গর্ভকালীন সময়ে লুপাস কি ধরনের প্রভাব বিস্তার করে?

লুপাস রোগে আক্রান্ত অনেক গর্ভবতী নারীরাই খুব চমৎকার একটি স্বাস্থ্যকর গর্ভকালীন সময় কাটান এবং তাদের গর্ভের সন্তানও বেশ সুস্থ থাকে, তবে তার মানে এই নয় যে গর্ভাবস্থায় লুপাস রোগে কোন ধরনের ঝুঁকি নেই। এমনকি যখন লুপাস রোগের লক্ষণগুলোও বেশ হালকা থাকে তখনও লুপাস একটা গুরুতর রোগ এবং এই রোগে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীদের সবসময় অভিজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে তীক্ষ্ণ নজরদারীতে রাখতে হয়।

গর্ভকালীন সময়ে লুপাস রোগের কারণে যে সমস্যাগুলো হতে পারেঃ

  • Preeclampsia, লুপাস রোগে আক্রান্ত প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজনকে প্রি-এক্লাম্পশিয়াতে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
  • নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শিশুর জন্ম হয়ে যাওয়া। লুপাসে আক্রান্ত শতকরা চল্লিশ শতাংশ নারীদের নির্ধারিত সময়ের আগেই গর্ভের শিশু জন্ম গ্রহণ করে।
  • Intrauterine growth restriction (IUGR), আপনি যদি লুপাস রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে সম্ভাবনা আছে যে আপনার গর্ভের শিশু তুলনামূলক ভাবে কম বৃদ্ধি হবে এবং জন্মের সময় স্বাভাবিকের চেয়ে একটু ছোট থাকবে।
  • গর্ভপাত। লুপাসে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে প্রায় সময়েই গর্ভপাত হতে দেখা যায়, তবে পূর্ব পরিকল্পনা, ওষুধ এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সন্তান হারানোর ঝুঁকি অনেক খানিই কমিয়ে নিয়ে আসা যায়। আর তাই বর্তমান সময়ে লুপাসে আক্রান্ত নারী এবং সুস্থ নারীরা মোটামুটি একই রকম গর্ভপাতের ঝুঁকিতে থাকেন বলে বিশেষজ্ঞরা দাবী করেন।

তবে সে যাই হোক, লুপাসে আক্রান্ত হলে গর্ভকালীন অনেক ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে, যদিও লুপাসে আক্রান্ত সব নারীদের মধ্যেই এই ধরনের জটিলতা দেখা যায় না। তবে গর্ভধারণ করার আগে যদি লুপাসের লক্ষণ remission পর্যায়ে থাকে অর্থাৎ তেমন একটা লক্ষণ দেখা যায় না তাহলে গর্ভকালীন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও বেশ কম থাকে (সাধারণত গর্ভধারণ করার অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই যদি লুপাসের তেমন কোন লক্ষণ দেখা না যায়)।

এছাড়া যখন আপনি গর্ভধারণ করবেন তখন সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গর্ভকালীন সময়ের জটিলতা অনেকটাই কমিয়ে নিয়ে আসা যায়।

সাধারণত লুপাসে আক্রান্ত হলে গর্ভকালীন সময়ে আপনার সাধারণ রুটিন চেকআপের ডাক্তারের সাথে সাথে আপনাকে বাতরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ধাত্রী বিদ্যাবিশারদের কাছেও পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। তবে আপনি যদি খুব বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাহলে আপনাকে লুপাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।

গর্ভাবস্থা কিভাবে আপনার লুপাসের উপর প্রভাব ফেলে?

লুপাস এবং গর্ভাবস্থার সমন্বয়টা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম দেখা যায়। কোন কোন নারীদের মধ্যে লুপাসের যাবতীয় লক্ষণগুলো দেখা যায় আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় গর্ভকালীন সময়ে বরং লুপাসের লক্ষণগুলো বেশ কমে আসছে। এছাড়া কোন কোন নারীদের মধ্যে গর্ভকালীন সময়ে লুপাসের কোন ধরনের লক্ষণই দেখা যায় না।

সাধারণত গর্ভধারণ করার অন্তত ছয় মাস থেকেই যদি লুপাস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে তাহলে গর্ভকালীন অবস্থাতেও লুপাস রোগের লক্ষণগুলো তেমন একটা প্রকট আকার ধারণ করবে না।

তবে মাঝেমধ্যে গর্ভকালীন অবস্থায় সাধারণ ব্যথা এবং ত্বক ফেটে যাওয়ার সাথে লুপাস রোগের লক্ষণগুলো আলাদা করা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে। কেননা অবসাদ, ব্যাক-পেইন, শ্বাস প্রশ্বাস কমে আসা এবং ত্বকে পরিবর্তন আসা এগুলোর সবগুলোই লুপাস রোগের লক্ষণ আবার একই সাথে গর্ভাবস্থায় খুব স্বাভাবিক ভাবেই এগুলো হতে পারে।

এক্ষেত্রে কোনটা গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক লক্ষণ আর কোনটা লুপাস রোগের লক্ষণ সে সম্পর্কে সঠিক ভাবে বুঝতে আপনার ডাক্তার সাহায্য করবে। আর তাই গর্ভকালীন সময়ে কোন রুটিন চেকআপই বাদ দিবেন না, যাতে করে লুপাস রোগের কোন প্রকার লক্ষণ আপনার মধ্যে দেখা গেলেই সাথে সাথে সেটার সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

গর্ভকালীন সময়ে লুপাস রোগের লক্ষণগুলো বেশ হালকা এবং মাঝারী আকারের হয়ে থাকে যেগুলো সাধারণত গর্ভকালীন অবস্থার জন্য নিরাপদ এমন ওষুধের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

লুপাস আপনার গর্ভের শিশুর উপর কতটা প্রভাব বিস্তার করবে?

লুপাস সাধারণত জেনেটিক হয়ে থাকে আর তাই আপনার মধ্যে লুপাস থাকলে আপনার শিশুর মধ্যেই লুপাস থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এছাড়া যদি যমজ শিশুর একজনের মধ্যেও লুপাস দেখা যায় তাহলে এই সম্ভাবনাও বেশ তীব্র যে কিছুদিনের মধ্যেই ওপর শিশুও লুপাসে আক্রান্ত হয়ে পড়বে।

মায়ের যদি লুপাস থাকে তাহলে শিশুও neonatal lupus নামক এক প্রকার লুপাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এই ঝুঁকি শরীরের রক্তের মধ্যে দুটি অ্যান্টিবডির সাথে সম্পৃক্ত, অ্যান্টিবডিগুলো হোল  anti-sjogren’s-syndrome-related antigen A (anti-SSA) এবং anti-sjogren’s-syndrome-related antigen B (anti-SSB)। গর্ভধারণের প্রাথমিক অবস্থায় রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় যে আপনার রক্তে এই দুটি অ্যান্টিবডি আছে কি নেই।

Neonatal lupus এর লক্ষণগুলো সাধারণত খুব বেশি গুরুতর কিছু হয় না এবং সময়ের সাথে শিশু ৮ মাস অতিক্রম করতে না করতেই এগুলো চলে যায়। তবে কিছু শিশুর মধ্যে হার্ট ব্লকের মত জীবনের ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা তৈরি হয়ে যায়, এই সমস্যা অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনের অন্যতম একটি প্রকার।

গর্ভকালীন সময়ে কীভাবে নিজের যত্ন নিবেন?

সকল নারীরাই যদি গর্ভকালীন সময়ে নিজের যত্ন নেন তাহলে এটার বেশ উপকারী ফল পাওয়া যায়, বিশেষ করে তারা যদি লুপাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। নিজের যত্ন নেয়ার জন্য আপনি কি কি করতে পারেন সে সম্পর্কে নিম্নে একটু ধারনা দেয়া হলঃ

প্রচুর পরিমাণে বিশ্রাম নিন। গর্ভাবস্থায় সকল নারীদেরই প্রচুর পরিমাণ ঘুমের প্রয়োজন পড়ে, তবে আপনি যদি লুপাসে আক্রান্ত হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে আপনাকে একটু বেশিই বিশ্রাম নিতে হবে।

ব্যায়াম। বিশ্রাম এবং ব্যায়ামের মধ্যে সামঞ্জস্যতা তৈরি করুন। তবে নতুন যে কোন ধরনের ব্যায়াম শুরু করার আগেই আপনার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিবেন।

রুটিন চেকআপের সবগুলো তারিখেই ডাক্তারের কাছে যান। রুটিন চেকআপের কোন তারিখ বাদ দিবেন না এবং পরামর্শ অনুসারে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করুন। ডাক্তার আপনার মধ্যে লুপাস জনিত কোন সমস্যা আছে কি না সেটা নিয়মিত চেক করে যাবেন এবং প্রয়োজন অনুসারে আপনার ওষুধ পরিবর্তন করে দিবেন।

পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাবার আহার করুন। গর্ভকালীন সময়ে স্বাস্থ্যকর খাবার আপনি এবং শিশু উভয়ের জন্যই বেশ উপকারী। গর্ভকালীন সময়ে লুপাসে আক্রান্ত এবং অন্য নারীদের খাবারের পরামর্শ একই রকম। প্রচুর পরিমাণ শাক সবজী, পূর্ণ শস্যদানা এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে।

ধূমপান করা যাবে না। গর্ভকালীন সময়ে ধূমপান আপনার হৃদযন্ত্র এবং রক্তের উপর লুপাসের প্রভাবকে আরো প্রকট করে তুলতে পারে।

প্রয়োজন অনুসারে সাহায্য গ্রহণ করুন। গর্ভকালীন সময়ে পরিবার, বন্ধু এবং ডাক্তারের কাছ থেকে সঠিক সাহায্য আপনার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। কেননা আপনার যদি লুপাস থাকে তাহলে সন্তান প্রসব পরবর্তী সমস্যা থেকে থেকে সেরে উঠতে এবং মাতৃত্বের অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে আপনার একটু বেশি সময় লেগে যেতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts