গর্ভাবস্থায় অবসাদগ্রস্থ বা ক্লান্ত লাগা কি স্বাভাবিক?

Last Updated on

গর্ভকালীন সময়ে ক্লান্ত থাকা কি একদমই সাধারণ একটা ঘটনা?

হ্যাঁ! গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে অবসাদ বা ক্লান্তি আপনাকে পুরোপুরি ঘিরে ধরবে এবং শেষের দিকে এই অবসাদ ও ক্লান্তি আবার ফিরে আসবে। গর্ভকালীন সময়ের প্রাথমিক দিকে অবসাদ কেন হয় সে ব্যাপারে সুনিশ্চিত তথ্য এখন পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি, তবে হরমোনের পরিবর্তন বিশেষ করে প্রজেস্টরন বৃদ্ধি পাওয়া এর অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

অনেক নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণের একদম প্রথম লক্ষণ হল এই অবসাদ, এমনকি গর্ভধারণের কোন প্রকার বাহ্যিক লক্ষণ দেখা না গেলেও তারা প্রতিনিয়তই প্রচুর পরিমাণে ক্লান্ত অনুভব করেন। আবার অনেক নারীদের মধ্যে গর্ভকালীন সময়ে কোন প্রকার অবসাদই দেখা যায় না। 

গর্ভকালীন সময়ে এই অবসাদ বা ক্লান্তির কারণ কি?

যদিও হরমোনের পরিবর্তনের কারণেই মূলত গর্ভকালীন সময়ে অবসাদ ও ক্লান্তি আসে তবু এর অন্যান্য আরো বেশ কিছু কারণও রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, কোমরে এবং মেরুদণ্ডে হালকা ব্যথা অনুভূত হওয়ার কারণে অথবা বারবার প্রস্রাব করতে উঠতে হওয়ার কারণে আপনার হয়ত তেমন একটা ভালো ঘুম হবে না। আর রাতের বেলায় ভালো ঘুম না হলে অবসাদ আপনাকে অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে এটা খুবই স্বাভাবিক।

এছাড়া মাথা ব্যথা এবং বমিবমি ভাব আপনার শরীরে নিয়ে আসতে পারে ক্লান্তি। আর গর্ভকালীন অবস্থায় অনেকেই মানসিক চাপের মধ্যে থাকে, আর এটাও অবসাদের অন্যতম একটা কারণ। আর এই সব কিছু যখন আপনার ক্ষেত্রে একইসাথে হতে থাকবে তখন বেলা শেষে এতটাই ক্লান্তি আসতে পারে যে আপনার মনে হতে পারে আপনি কোন ম্যারাথন দৌড় দিয়ে এসেছেন।

এছাড়া আয়রনের অভাবের কারণেও আপনাকে ক্লান্তি এবং অবসাদ ঘিরে ধরতে পারে আর গর্ভকালীন সময়ে আয়রনের অভাব খুবই সাধারণ একটা ঘটনা। গর্ভধারণের পর প্রথম দিকে এবং ৬ষ্ঠ মাসের শেষের দিকে যখন আপনি রুটিন চেকআপে যাবেন তখন আপনার মধ্যে আয়রনের কোন প্রকার ঘাটতি আছে কি না তা জানার জন্য ডাক্তার আপনাকে রক্ত পরীক্ষা দিতে পারে। (রক্ত পরীক্ষা করতে দেয়ার কারণ হল, আপনার মধ্যে যদি অল্প পরিমাণ আয়রনের ঘাটতি থাকে তাহলে আপনার মধ্যে কোন প্রকার লক্ষণ দেখা যেতে নাও পারে।)

হতাশাও কিন্তু ক্লান্তি, অবসাদ এবং ঘুম না আসার অন্যতম একটা কারণ। আর তাই গর্ভকালীন সময়ে মুড সুইং এর কারণে আপনার যদি মন খারাপ থাকে, প্রাত্যহিক কাজগুলো শেষ করতে না পারেন অথবা নিজের কোন প্রকার ক্ষতি করার চিন্তা ভাবনা আপনার মনের মধ্যে আসে তাহলে তাৎক্ষণিক ভাবে আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করুন এই ব্যাপারগুলো নিয়ে।   

গর্ভকালীন সময়ের এই ক্লান্তি এবং অবসাদ কতটা সময় ধরে দীর্ঘ হয়?

এই ধরনের লক্ষণগুলো অর্থাৎ ক্লান্তি ও অবসাদ প্রত্যেকটা মানুষের ক্ষেত্রেই একদম আলাদা হয় এবং একেকজনের মধ্যে একেক সময় ধরে এই ক্লান্তি ও অবসাদ থাকে। তবে সাধারণত আপনি চতুর্থ সপ্তাহ থেকেই আপনার মধ্যে আবার শক্তি ফিরে আসবে এবং পুনরায় ৭ম মাসের দিকে আবার আপনার মধ্যে অবসাদ আসবে।

৭ম মাসের দিকে আপনার জরায়ু অনেক বড় হয়ে যাবে এবং আপনি আরো অনেক বেশি ওজন বহন করবেন, এছাড়া বিভিন্ন কারণে আপনার ঘুম হবে না, তারমধ্যে অন্যতম কারণগুলো হল কোমরে ব্যথা, বুক জ্বালাপোড়া করা, পায়ে ব্যথা করা। এছাড়া এই সময়ে গর্ভের মধ্যে আপনার শিশু নড়াচড়া করবে এবং আপনার প্রচুর পরিমাণে প্রস্রাব পাবে। তাই আপনার মধ্যে ক্লান্তি এবং অবসাদগুলো আবার ফিরে আসতে শুরু করবে।

গর্ভকালীন সময়ে অবসাদ ও ক্লান্তির সাথে কীভাবে মানিয়ে চলবেন?

প্রচুর পরিমাণে বিশ্রাম নিন। আপনার শরীরের সাথে মানিয়ে চলুন এবং প্রয়োজনে একটু বেশি করে ঘুমিয়ে নিন। রাতের বেলায় দ্রুত শুয়ে পড়ুন এবং দিনের বেলায় যখনই সুযোগ পাবেন ঘুমিয়ে নিন। এমনকি ১৫ মিনিটের জন্য হলেও ঘুমিয়ে নিলে আপনি নিজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখতে পাবেন। তাই, আপনি যদি বাসার বাইরে কাজ করে থাকেন তাহলে দুপুরের খাবারের সময় একটুখানি বিশ্রাম নেয়ার জন্য সুযোগ তৈরি করে নিন।

কাজ কমিয়ে নিন। অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো থেকে দূরে থাকুন এমনকি ঘরের বাড়তি কাজ এই সময়ে বন্ধ করে দিন। এভাবে চেষ্টা করে দেখুন যে দৈনন্দিন কাজগুলো থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পান কি না। প্রয়োজনে একদিনের জন্য অফিস থেকে ছুটি নিয়ে নিন অথবা খুব বেশি ক্লান্তি লাগলে অসুস্থতা জনিত ছুটির আবেদন করুন। আপনার বাসায় যদি ইতোমধ্যেই ছোট শিশু থেকে থাকে তাহলে আপনি যখন বিশ্রাম নিবেন অন্য কাউকে বলুন আপনার ছোট শিশুকে দেখে রাখতে। 

সুষম খাবার খান। গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে বেশিরভাগ নারীরই অতিরিক্ত ক্যালরির প্রয়োজন হয় না, তবে দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার থেকে আপনার প্রতিদিন অতিরিক্ত ৩৪০ ক্যালরি এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টার থেকে অতিরিক্ত ৪৫০ ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। (তবে আপনার ওজন যদি স্বাভাবিকের তুলনায় কম বেশি হয়ে থাকে তাহলে আপনার ক্যালরি এর পরিমাণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তারের সাথে আলাপ করে নিন।)

আপনার খাবারের মধ্যে শাক সবজী, ফল, হোল গ্রেইন, স্কিম মিল্ক এবং মাংস এর সুষম বণ্টন আপনার শরীরকে তরতাজা রাখতে সাহায্য করে। অপরদিকে জাংক ফুড আপনার শরীরকে ক্লান্ত করে দেয়। আর তাই নাস্তা হিসেবেও ফল অথবা দই এর মত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন।

পানিশূন্যতা যাতে না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। ক্যাফেইন জাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকুন এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। তবে অতিরিক্ত প্রস্রাবের কারণে আপনার যদি রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয় তাহলে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পানি একটু কম পরিমাণে খেতে পারেন তবে সেটা আপনাকে আবার দিনের বেলায় পুষিয়ে দিতে হবে।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন। আপনার এতটাই ক্লান্তি লাগতে পারে যে পুরো দিন কীভাবে পার করবেন তা ভেবেই আপনি উদ্বিগ্ন, ব্যায়ামের কথা তো বাদই দিলেন। তারপরও ডাক্তারের যদি অনুমতি থাকে তবে নিয়মিত কিছু ব্যায়ামের চেষ্টা করা উচিত। প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিটের জন্য হাঁটার মত স্বাভাবিক ব্যায়াম আপনার শরীরকে তরতাজা রাখতে সাহায্য করবে। এছাড়া কাজ থেকে প্রায়শই একটু সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে নিতে পারেন এবং এর সাথে লম্বা নিঃশ্বাস নিতে পারেন।

একটু ধৈর্যশীল হন। গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস আপনাকে প্রচুর পরিমাণ ক্লান্তি ও অবসাদ ঘিরে ধরতে পারে, তবে একটু ধৈর্য ধরুন কারণ চতুর্থ মাস থেকেই আপনার নিজেকে আগের থেকে বেশি তরতাজা মনে হতে শুরু হবে। গর্ভকালীন সময় যখন ফুরিয়ে আসবে, তখন ভাবুন যে আর কদিন পরেই আপনি নতুন মা হতে যাচ্ছেন! আর তাই এই সময়ে আপনার যদি একটু বেশি ক্লান্ত লাগে, তাহলে একটু ধৈর্য ধরুন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts