কো-প্যারেন্টিং | ডিভোর্সের পর সন্তান লালন পালন

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

বিবাহ বিচ্ছেদ কিংবা ডিভোর্স যে কারো জীবনের জন্য অন্যতম কঠিন একটা পরিস্থিতি। তার ওপর যদি সন্তান লালন-পালন করার দায়িত্ব থাকে তাহলে সেই পরিস্থিতি আরো কয়েকগুণ কঠিন হয়ে যায়। দাম্পত্য সঙ্গীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পরেও যৌথ প্যারেন্টিঙের মাধ্যমে সন্তানকে আদর, ভালবাসা দিয়ে বড় করা নিঃসন্দেহে খুবই কঠিন একটা কাজ, তবে অসম্ভব নয়।

সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের ভাল, স্থিতিশীল সম্পর্ক থাকলে এবং বাবা, মা সন্তানের প্রতি সাপোর্টিভ হলে সেই সন্তান চমৎকারভাবে বেড়ে উঠতে পারে। তবে সেজন্য বাবা, মাকে যে একসাথে এক ছাদের নিচেই থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানের ভালভাবে বেড়ে ওঠার ব্যাপারে বাবা, মায়ের বিয়ে টিকে থাকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বাবা, মা একে অপরের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত না থাকা এবং বাবা, মায়ের সাথে সন্তানের ভালবাসাময় সম্পর্ক থাকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কো-প্যারেন্টিং কী?

বাবা, মা তাদের সন্তানের ব্যাপারে, সন্তানের মঙ্গলের জন্য একসাথে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়াকেই কো-প্যারেন্টিং বা যৌথ-প্যারেন্টিং বলে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, কো-প্যারেন্টিং সন্তানের জন্য একধরনের শান্ত, স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে, যা পরবর্তীতে সন্তানের ইমোশনাল বা আবেগের জায়গায় পজেটিভ বা ইতিবাচক প্রভাব রাখে।

যদি বাবা, মায়ের মাঝে গুরুতর পর্যায়ের ঝগড়া, মারামারি না থাকে তাহলে তারা সন্তানের প্রাত্যহিক জীবনে কো-প্যারেন্টিঙে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। সন্তানের সাথে বাবা, মায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা জরুরি, কো-প্যারেন্টিঙের মাধ্যমে সেটা নিশ্চিত করা সম্ভব। শুধু তা-ই নয় কো-প্যারেন্টিং-এর মাধ্যমে সন্তানের মানসিক উদ্বেগ, ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতাও দূর করা যায়। বাবা, মা যদি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, অতীতের দাম্পত্য তিক্ততার কথা ভুলে গিয়ে সাবেক সঙ্গীর সাথে স্বাভাবিক, সুন্দর একটি সৌজন্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন তাহলে সেটা সন্তানে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে চমৎকার ভূমিকা রাখতে পারে। কাজটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

[ আরও পড়ুন- প্যারালাল প্যারেন্টিং | হাই-কনফ্লিক্ট ডিভোর্সের পর সন্তান লালন পালন ]

কো-প্যারেন্টিং থেকে সন্তান যেসব সুবিধা পায়

বাবা, মায়ের কো-প্যারেন্টিং দেখে সন্তান অনুধাবন করতে পারবে, বাবা-মায়ের কাছে ঝগড়ার চেয়ে তার দাম বেশি। ঝগড়া বা মনমানিল্যের কারণে বাবা, মা একে অন্যের হাত ছেড়ে দিলেও সন্তানের হাত ছাড়েননি- এটা দেখে সন্তান বুঝতে পারে তার বাবা, মা তাকে আসলেই কতটা ভালবাসে। এভাবে কো-প্যারেন্টিং থেকে সন্তান অনেক সুবিধা পেয়ে থাকে। নিচে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো :

নিরাপদ বোধকরা

বাবা, মায়ের কাছ থেকে ভালবাসার পাওয়ার আত্মবিশ্বাসটুকু থাকলে সন্তান অনেক দ্রুত তাদের ডিভোর্স বা বিচ্ছেদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে এবং বাবা, মায়ের বিচ্ছেদ পরবর্তী নতুন জীবন-ব্যবস্থার সাথে নিজেকে নিরাপদে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।

ধারাবাহিকতার সুবিধা

কো-প্যারেন্টিঙের কারণে সন্তান তার বাবা, মায়ের কাছ থেকে প্রায় একই ধরনের নিয়ম-নীতি, শৃঙ্খলা ইত্যাদির মাঝ দিয়ে বেড়ে ওঠে। কখনো বাবার কাছ থেকে বা কখনো মায়ের কাছ থেকে উপহার পায়। সবমিলিয়ে কো-প্যারেন্টিঙের ধারাবাহিকতার কারণে সন্তান বুঝতে পারে সে বাবা, মায়ের কাছ থেকে কী আশা করতে পারে এবং বাবা, মা তার কাছ থেকে কী আশা করছেন।

সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ভাল বোঝাপড়া

বিচ্ছেদের পরেও যদি সন্তান দেখে বাবা, মা কো-প্যারেন্টিং চালিয়ে যাচ্ছেন, তাহলে সেই সন্তান সাধারণত কার্যকরী এবং শান্তিপূর্ণভাবে নিজেই নিজের সমস্যার সমাধান করতে শিখে যায়।

অনুসরণ করার জন্য চমৎকার দৃষ্টান্ত

বাবা, মাকে কো-প্যারেন্টিং করতে দেখে সন্তানের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সে ভবিষ্যৎ জীবনে, নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো বজায় রাখার ক্ষেত্রে কো-প্যারেন্টিং থেকে পজেটিভ দৃষ্টান্তগুলো অনুসরণ করতে পারে।

মানসিক এবং ইমোশনাল সুস্থ্যতা

বাবা, মায়ের ঝগড়া, মারামারি, তর্ক ইত্যাদি দেখা সন্তান বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় ভোগে। যেমন : বিষণ্নতা, উদ্বেগ ইত্যাদি। কিন্তু যে সন্তান কো-প্যারেন্টিঙের আওতায় বেড়ে ওঠে তার মানসিক এবং ইমোশনের জায়গাটি অনেক সুস্থ থাকে। বিষণ্নতা, টেনশন ইত্যাদি সহজে তাকে গ্রাস করতে পারে না।

কো-প্যারেন্টিং টিপস

কষ্ট এবং ক্ষোভকে একপাশে সরিয়ে রাখুন

সফলতার সাথে কো-প্যারেন্টিং বা যৌথ-প্যারেন্টিং করতে হলে সন্তানের কথা ভেবে আপনাকে নিজের রাগ, অনুভূতি, ক্ষোভ ইত্যাদিকে একপাশে সরিয়ে রাখতেই হবে। অবশ্য অতীতের সব তিক্ততা ভুলে সাবেক দম্পতির সাথে কো-প্যারেন্টিং চালিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে খুব জটিল একটা ব্যাপার। কিন্তু কো-প্যারেন্টিঙের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কো-প্যারেন্টিঙের উদ্দেশ্য আপনার সন্তানকে সুখী করা, তাকে সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ দেওয়া, তাকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল রাখা। এখানে আপনার বা আপনার সাবেক সঙ্গীর অনুভূতি, ভাবনা, রাগ, ভাল-লাগা, মন্দ-লাগা ইত্যাদি কিন্তু মুখ্য বিষয় নয়।

  • অনুভূতি থেকে আচরণকে আলাদা করুন

একজন মানুষ হিসেবে আপনি আঘাত পেতে পারেন, কষ্ট পেতে পারেন, আপনার রাগ হতে পারে; সবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেগুলো যে আপনার ব্যবহার কিংবা আচরণের ওপর সবসময় প্রভাব রাখবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনি চাইলেই নিজের আচরণকে অনুভূতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারেন। তাই নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং সন্তানের মঙ্গলের স্বার্থে কো-প্যারেন্টিঙে মনোযোগী হোন, সাবেক সঙ্গীর সাথে মিলেমিশে কাজ করুন।

  • অন্য কোথাও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটান

কখনো নিজের রাগ, ক্ষোভ, যন্ত্রণা ইত্যাদি সন্তানের ওপর ঝাড়বেন না। ঘনিষ্ঠ বন্ধু, থেরাপিস্টের সাথে নিজের যন্ত্রণাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। তারা আপনার কথা শুনবে। এমনকি চাইলে নিজের পোষা প্রাণীটার সাথেও একমনে আলাপ করতে পারেন, বুকে চেপে থাকা কথাগুলো বের করে দিয়ে হালকা হতে পারেন। এছাড়া শারীরিক ব্যায়ামও করতে পারে, ব্যায়াম করলে শরীরের পাশাপাশি মনও ভাল থাকে।

  • সন্তানকে ঝামেলা থেকে দূরে রাখুন

হয়তো বিচ্ছেদের যন্ত্রণা বা অতীত সম্পর্কের তিক্ততা থেকে আপনি কখনোই পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারবেন না। কিন্তু আপনাকে এটাও মনে রাখতে হবে, এই সমস্যাটা আপনার, আপনার সন্তানের নয়। তাই সন্তানকে এসব সমস্যা থেকে দূরে রাখুন। সাবেক সঙ্গীর সাথে কোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে সেটা সন্তানের সামনে করতে যাবেন না। আড়ালে গিয়ে সমাধান করে নিন।

  • সন্তানকে কখনো বার্তাবাহক হিসেবে ব্যবহার করবেন না

যখন সাবেক সঙ্গীর কাছে আপনি নিজের কোনো কথা বা বার্তা দেওয়ার জন্য সন্তানকে পাঠান তখন স্বাভাবিকভাবেই সন্তান আপনাদের দ্বন্দ্বের মাঝে চলে আসে। অথচ কো-প্যারেন্টিঙের মূল্য উদ্দেশ্য সন্তানকে ভাল রাখা, তাকে যাবতীয় ঝামেলা থেকে দূরে রাখা। তাই সন্তানকে ব্যবহার না করে বরং সরাসরি আপনার সাবেক সঙ্গীকে ফোন করুন কিংবা ই-মেইল করুন।

  • বদনাম করবেন না

সন্তানের কাছে কখনো আপনার সাবেক সঙ্গীর বদনাম করবেন না। মনে রাখবেন আপনার সাবেক সঙ্গীটি আপনার সন্তানের বাবা কিংবা মা। কখনো সন্তানকে এমন কোনো পরিস্থিতিতে ফেলবেন না যেখানে তাকে বাবা কিংবা মায়ের মাঝ থেকে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে। সন্তান হিসেবে বাবা এবং মা দুজনের সাথেই তার সম্পর্ক রাখার অধিকার আছে। আপনি সেখানে অন্যায়ভাবে প্রভাব ফেলতে পারেন না।

কো-প্যারেন্টিঙে যোগাযোগ করার পদ্ধতি সমূহ

সন্তানকে কো-প্যারেন্টিঙের মাধ্যমে বড় করতে হলে সাবেক সঙ্গীর সাথে আপনাকে যোগাযোগ করতেই হবে। যথাযথ যোগাযোগে মাধ্যমে কো-প্যারেন্টিং সফল হয়, অন্যদিকে যোগাযোগের ব্যাপারে লেজে-গোবরে করে ফেললে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়। নিচে সাবেক সঙ্গীর সাথে যোগাযোগ করার কিছু কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলো :

  • অফিসিয়াল সুরে কথা বলুন

ধরে নিন, আপনার সাবেক সঙ্গী আপনার ব্যবসায়ের একজন পার্টনার! আর আপনার ব্যবসা হচ্ছে সন্তানকে ভালভাবে মানুষ করা! আপনি সাবেক সঙ্গীর সাথে যখনই কথা বলবেন বা কিছু লিখে মেসেজ করবেন তখন এই বিষয়টা মাথায় রাখবেন। তার যোগাযোগের সময় একধরনের অফিসিয়াল সুর বজায় রাখবেন, যেমনটা আপনি আপনার অফিসের সহকর্মীর সাথে রাখেন। তার সাথে আন্তরিকভাবে কথা বলার পাশাপাশি সম্মানও প্রদর্শন করবেন। যোগাযোগের সময় শান্ত থাকবেন এবং ধীরে সুস্থে কথা বলবেন।

  • অনুরোধ করুন

কোনো বিষয়ে নিজের বক্তব্য কিংবা মতামত ঘোষণা হিসেবে প্রকাশ না করে বরং সেটাকে অনুরোধ আকারে উপস্থাপন করুন। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতি কম সৃষ্টি হবে। “আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি অমুক কাজটা করব।” এভাবে না বলে বলুন, “আচ্ছা, আমি যদি অমুক কাজটা করি, তাহলে কেমন হয়?”

  • কথা শুনুন

আপনার সাবেক সঙ্গীর কথার সাথে একমত না হতে পারলেও তার বক্তব্য পুরোটা শুনুন। অন্যের কথা শোনার মধ্য দিয়েই মানুষ পরিপক্বতা অর্জন করে থাকে। তাই নিজের বক্তব্য পেশ করার আগে অন্যের বক্তব্য শুনে নিন, বুঝে নিন।

  • সংযমী হোন

সাবেক সঙ্গীর কোনো কথা শুনে হুট করে মেজাজ খোয়ানো যাবে না কিংবা চটে যাওয়া চলবে না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চরম প্রতিক্রিয়া বা রিঅ্যাকশন না দেওয়ার চর্চা করুন। এভাবে চর্চা করলে একটা সময় আপনি সব সহ্য করে নিতে পারবেন। যে কথা শুনলে মেজাজ খিচড়ে যেত, সেই কথা শুনলে একসময় আপনার কোনো অনুভূতি কাজ করবে না।

  • নিয়মিত যোগাযোগ

বিচ্ছেদের পরপরই নিয়মিত যোগাযোগ রাখাটা অবশ্যই কঠিন একটা ব্যাপার। কিন্তু সন্তানের মানসিক শান্তির স্বার্থে আপনাকে সাবেক সঙ্গীর সাথে সৌজন্যমূলক যোগাযোগ রাখতে হবে। এতে সন্তান মনে করবে আপনারা আলাদা হয়ে গেল কো-প্যারেন্টিং কিংবা অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এখনো এক হয়ে আছেন।

  • সন্তান হোক আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু

সাবেক সঙ্গীর সাথে আলোচনা করার সময় বারবার খেয়াল রাখবেন আলোচনাটা যেন আপনার সন্তানকে কেন্দ্র করে এগোয়। নিজের বা আপনার সাবেক সঙ্গীর কোনো চাওয়া-পাওয়া যেন সেখানে জায়গা করে না নেয়। আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে সবসময় নিজের সন্তানকে রাখুন।

এক টিম হয়ে কাজ করুন

  • কো-প্যারেন্টিঙে সাদৃশ্য রাখার চেষ্টা করুন

ভিন্ন বাসায়, ভিন্ন পরিবেশে বড় হওয়া অবশ্যই সন্তানকে বাড়তি অনেক কিছু শেখার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু সন্তানকে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন এবং শৃঙ্খলার মাঝে রাখাও জরুরি। তাই নিজের বাসায় এবং আপনার সাবেক সঙ্গীর বাসায় যেন একই ধরনের সাধারণ নিয়ম জারি থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। এতে সন্তানকে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না।

  • নিয়ম-কানুন

দুটো বাসায় হুবহু একই ধরনের নিয়ম থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু দুটো বাসায় কিছু সাধারণ নিয়ম জারি থাকা উচিত। নইলে সন্তান একেবারে ভিন্ন ভিন্ন দুই ধাঁচের নিয়মের যাঁতাকলে পড়ে যাবে! গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় আছে যেগুলো দুটো বাসায় যথাযথভাবে পালন করা উচিত। যেমন : হোমওয়ার্ক, টিভি কিংবা ফোন চালানোর ব্যাপারে সময় বেধে দেওয়া ইত্যাদি।

  • শৃঙ্খলা

শৃঙ্খলা ভঙ্গের ক্ষেত্রে দুটো বাসায় একই ধরনের আইন জারি রাখা উচিত। ধরা যাক, আপনার সন্তান কোনো অন্যায় করেছে যার ফলে সে আগামী ২ দিন টিভি দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই ২ দিনের মাঝে সে যদি আপনার সাবেক সঙ্গীর বাসায় যায় সেখানেও যেন টিভি দেখা বন্ধ থাকে, শৃঙ্খলার স্বার্থে এটা নিশ্চিত করা দরকার। একই নিয়ম সন্তানকে পুরষ্কার দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

  • রুটিন

দুটো বাসায় কাছাকাছি সময়ে খাবার তৈরি, হোমওয়ার্ক করা, ঘুমিয়ে পড়া ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। এতে সন্তান দুটো বাসাতে গিয়ে সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।

কো-প্যারেন্ট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ

বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো আপনি এবং আপনার সাবেক সঙ্গী; দুজনে মিলে গ্রহণ করবেন। খোলা মনে, সৎভাবে এবং কোনো প্রকার জটিলতা সৃষ্টি না করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামাল দেওয়ার বিষয়টার আপনার সাথে আপনার সাবেক সঙ্গীর সম্পর্কের পাশাপাশি আপনার সন্তানের ভালভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও অনেক বড় ভূমিকা রাখবে।

  • চিকিৎসা

সন্তানকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হলে সাথে আপনার সাবেক সঙ্গীকেও নিতে পারেন। সন্তানের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাবা, মায়ের পাশাপাশি থাকা জরুরি। কখনো দুজন একসাথে যাওয়া সম্ভব না হলে একজন যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে আরেকদিন অন্য দিন যাবেন। এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকবে।

  • শিক্ষা

আপনাদের বিচ্ছেদের কারণে সন্তানের জীবনে যে সব পরিবর্তন আসছে সেগুলো স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে রাখুন। আপনার সাবেক সঙ্গীর সাথে স্কুলের ক্লাস রুটিন, এক্সট্রা-কারিকুলার কার্যক্রম এবং প্যারেন্ট-টিচার কনফারেন্স ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করুন। স্কুলের কোনো অনুষ্ঠান বা খেলাধূলা থাকলে সেখানে অবশ্যই আপনার সাবেক সঙ্গীর প্রতি মার্জিত, ভদ্র ব্যবহার করুন।

  • অর্থ

দুটো ভিন্ন বাসার অর্থ যোগান দেওয়া বেশ কঠিন একটা ব্যাপার। এটা আপনাদের কো-প্যারেন্টিঙে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাস্তবধর্মী বাজেট নির্ধারণ করুন। সাবেক সঙ্গীর সাথে যাবতীয় খরচ ভাগ করে নিন এবং সেগুলোর যথাযথ রেকর্ড রাখুন। আপনার সাবেক সঙ্গী যদি আপনার সন্তান বিশেষ কিছু উপহার দেয় কিংবা সুযোগ দেয়, সেটার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন।

কো-প্যারেন্টিঙে সৃষ্ট মতের অমিল এবং সমাধান

যৌথ-প্যারেন্টিং বা কো-প্যারেন্টিং করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই আপনি এবং আপনার সাবেক সঙ্গী কিছু ব্যাপারে একমত হতে পারবেন না। মতের অমিল হলে কীভাবে সেটা সামলে নেবেন নিচে সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

  • সম্মান করা

খুব সাধারণ ভদ্রতা, সভ্যতাই কো-প্যারেন্টিঙের মজবুত ভিত্তি গড়ে দিতে পারে। নিজের সাবেক সঙ্গীর প্রতি সম্মান রেখে কথা বললে, তাকে সম্মানের সাথে বিবেচনা করলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যায়। সন্তানের স্কুলের অনুষ্ঠান, কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা, ছুটির দিন উদযাপন সহ বিভিন্ন বিষয়ে সাবেক সঙ্গীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

  • কথা বলা

গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যাপারে যদি আপনাদের মতের মিল না হয় সেক্ষেত্রে কথা বলার বিকল্প নেই। সাবেক সঙ্গীর সাথে আপনাকে অবশ্যই আলাপ আলোচনা করতে হবে। তবে হ্যাঁ, মনে রাখবেন, কখনো সন্তানের সামনে এসব নিয়ে আলোচনা করবেন না। নিজেরা নিজেরা আলাপ করে সমাধানে পৌঁছুতে না পারলে তৃতীয় পক্ষের (থেরাপিস্ট কিংবা কোনো মধ্যস্থাতাকারী) সাহায্য নিন।

  • ছোটখাটো জিনিস নিয়ে মাথা না ঘামানো

যদি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিংবা বড় কিছু নিয়ে (যেমন : মেডিকেল সার্জারি কিংবা সন্তানকে কোন স্কুলে ভর্তি করাবেন) আপনার এবং আপনার সাবেক সঙ্গীর মাঝে মতের অমিল ঘটে সেক্ষেত্রে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ধরা যাক, আপনি চাচ্ছেন আপনার সন্তান সকাল ৮টায় ঘুম থেকে উঠুক, অন্যদিকে আমার সাবেক সঙ্গী বলছে, সন্তান আরো আধ ঘণ্টা ঘুমোক, ৮:৩০ টায় উঠুক। এধরনের বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা বা তর্কাতর্কি করা বোকামি। নিজের এনার্জি বাঁচান, এই এনার্জি বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে খরচ করবেন।

  • আপোষ করা

হ্যাঁ, কো-প্যারেন্টিং করতে হলে আপোষ করতেই হবে। কখনো আপনি আপোষ করবেন, কখনো আপনার সাবেক সঙ্গী আপোষ করবে। আপোষ ছাড়া কো-প্যারেন্টিঙে সফল হওয়া সম্ভব নয়। আপোষ করলে আপনারা দুজনই “বিজয়ী” হতে পারবেন এবং কো-প্যারেন্টিঙের ক্ষেত্রে আপনারা ভবিষ্যতে নমনীয় আচরণ বজায় রাখতে সক্ষম হবেন।

সন্তানের জন্য দুটো বাসায় আসা যাওয়া সহজ করুন

বাবার কাছ থেকে মায়ের কাছে কিংবা মায়ের কাছ থেকে বাবার কাছে যাওয়ার সময়টা কিন্তু সন্তানের কাছে বেশ কঠিন একটা মুহূর্ত। তারা একজনের সান্নিধ্য পেতে গিয়ে আরেকজনের সান্নিধ্য হারায়, যা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু বিচ্ছেদের ফলে আলাদা হয়ে যাওয়া বাবা, মায়ের কাছ থেকে এরচেয়ে বেশি কিছু পাওয়াও কঠিন। তাই বাবা, মায়ের উচিত সন্তানের এই যাওয়া আসার মুহূর্তটাকে যতটা সম্ভব সহজ করে তোলা।

সন্তান যখন বাসা থেকে বের হয়

সন্তান যখন আপনার বাসা থেকে আপনার সাবেক সঙ্গীর বাসার উদ্দেশে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন আপনাকে অবশ্যই ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে এবং সন্তানকে আপনার সঙ্গীর কাছে যথাযথ সময়ে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

  • সন্তানকে আগে থেকে জানিয়ে রাখুন

আপনার সাবেক সঙ্গীর বাসায় সন্তান যেদিন যাবে তার ২-৩ দিন আগেই বিষয়টা সন্তানকে মনে করিয়ে দিন। এতে সে মানসিকভাবে সেই বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারবে।

  • আগেই গুছিয়ে রাখুন

সন্তান বাসা থেকে বের হওয়ার অনেক আগেই তার ব্যাগ গোছাতে সাহায্য করুন। যেন সে জরুরি কিছু নিতে ভুলে না যায়। সন্তানকে তার পছন্দের খেলা কিংবা ছবি ব্যাগে তোলার কথা মনে করিয়ে দিন।

  • সবসময় নামিয়ে দিন, তুলে নেবেন না

বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কখনো সন্তানকে তার বাবা কিংবা মায়ের কাছ থেকে তুলে নিয়ে আসবেন না। সন্তান হয়তো আপনার সাবেক সঙ্গীর সাথে ভাল সময় কাটাচ্ছে কিংবা গল্প করছে, সেই অবস্থায় আপনি যদি সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এবং সন্তানকে তুলে নিয়ে আসেন সেটা খুবই খারাপ দেখায়। সন্তান হয়তো তার বাবা কিংবা মায়ের সাথে স্পেশাল মুহূর্ত কাটাচ্ছিল, আপনার উপস্থিতির কারণে সেটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সন্তানকে নিজ দায়িত্বে একে অন্যের কাছে পৌঁছে দিন, কখনোই সন্তানকে আনতে যাবেন না।

সন্তান বাসায় ফেরার পর

প্রথম দিকে সন্তান যখন বাসায় ফিরবে তখন কিছুটা বিব্রতকর বা জড়তাযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই সন্তানকে জড়তা কাটাতে, সংকোচ দূর করতে সাহায্য করতে হবে।

  • ধীরে-সুস্থে এগোন

সন্তান প্রথম বাসা ঢোকার পর তার সাথে হালকা গল্প করুন, তাকে কোনো বই পড়তে দিন বা গান শুনুন কিংবা তাকে তার মতো করে নিরবে সময় কাটাতে দিন।

  • প্রয়োজনীয় জিনিস থাকুক দুটো করে

সন্তানের জীবনকে সহজ এবং জড়তামুক্ত করার জন্য সন্তানের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো দুজনেরই (বাবা এবং মা) বাসায় রাখুন। যেমন: টুথব্রাশ, হেয়ারব্রাশ, পায়জামা, স্যান্ডেল, হালকা গেঞ্জি, থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ইত্যাদি।

  • সন্তানকে নিজের মতো থাকতে দিন

এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গেলে নিজেকে মানিয়ে নিতে ছোটদের একটু সময় লাগে। তাই সন্তানকে তার নিজের মতো করে সময় কাটাতে দিন। তাদেরকে কোনোরকম বিরক্ত না করে বরং ধারে কাছে আপনি অন্য কোনো কাজ করুন। কিছুক্ষণ নিজের মতো সময় কাটানোর পর তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

  • বিশেষ রুটিন প্রতিষ্ঠা করুন

আপনার সন্তান যখনই আপনার বাসায় আসবে তখন তার সাথে কোনো নির্দিষ্ট কোনো খেলা খেলুন কিংবা তার জন্য নির্দিষ্ট কিন্তু স্পেশাল কোনো খাবার আইটেম রাখুন। যদি রুটিনের সাথে সন্তান অভ্যস্ত হয়ে যায় তাহলে তার জড়তাও কেটে যাবে। তখন সে আগে থেকেই জানবে বাসায় ঢুকলে সে কী কী পেতে যাচ্ছে।

আইনি কাগজপত্র তৈরি করে রাখুন

আপনার সাবেক দাম্পত্য সঙ্গীর সাথে যদি সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চলতে থাকে তখন আর আইনি বিষয়টাকে সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে না হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেন আগবাড়িয়ে উকিলের কাছে যেতে হবে কিংবা আদালতে যেতে হবে?

কিন্তু এখানে মনে রাখা ভাল, আপনার সাথে আপনার দাম্পত্য সঙ্গীর কিন্তু বিচ্ছেদ কিংবা ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন সম্পর্ক ঠিকঠাক চলছে মানে এই না সামনেও সেভাবেই চলবে! যদি সামনে কোনো মতের মিল না হয়? যদি কোনো ঝামেলা হয়, তখন কী হবে?

তাই আগেভাগে প্রস্তুত থাকা জরুরি। সন্তানকে নিজের কাছে রেখে লালন-পালনের অনুমতি, দেখতে যাওয়ার অনুমতি, চাইল্ড সাপোর্ট, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসা সহ অন্যান্য বিষয়ে নিজের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আইনি জ্ঞান থাকা জরুরি।

কখন আপনার সাবেক সঙ্গীর সাথে মনমালিন্য হয়ে পরিস্থিতি খারাপের দিকে চলে যাবে তা কেউ বলতে পারে না। তাই সব কিছুর ব্যাপারে লিগ্যাল ডকুমেন্ট তৈরি করে নেয়া উচিত।

তবে হ্যাঁ, মতের মিল না হলেই যে আদালতে যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আদালতের বাইরেও বোঝাপড়ার মাধ্যমে আইনি সমস্যা মিটিয়ে নেওয়া যায়। সেক্ষেত্রে যথাযথ পরামর্শের জন্য একজন উকিলকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

শেষ কথা

ডিভোর্সের সময় আপনার সন্তানের বয়স যদি কম থাকে তারপরেও যৌথ-প্যারেন্টিংকে তুচ্ছ ভাবার কোনো কারণ নেই। এধরনের প্যারেন্টিঙে সফল হতে হলে সহযোগিতা, আপোস, বোঝাপড়া এবং নিঃস্বার্থ আচরণ বজায় রাখা জরুরি।

জীবনে চলার পথে কিছুদিন বেশ চমৎকার কাটবে আবার কখনো কখনো এমন দিন আসবে, মনে হবে নিজেই নিজের মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলি! এখানে উল্লেখিত কৌশলগুলো হয়তো শতভাগ নিখুঁত নয় কিংবা কৌশলগুলো আপনাকে সফলতার শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না। কিন্তু যদি আপনি কৌশলগুলো কাজে লাগান তাহলে আপনার জীবনে চমৎকার দিনগুলোর সংখ্যা বাড়বে, মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলার দিনগুলো কমে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই কৌশলগুলো অবলম্বন করলে আপনার সন্তান তার বাবা ও মায়ের কাছ থেকে ভালবাসা পাবে এবং বাবা-মায়ের সাথে তার তুলনামূলক উন্নত সম্পর্ক বজায় থাকবে।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment