একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সিজারিয়ান সেকশন

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

লিখেছেনঃ রাবেয়া সুলতানা

আমাকে অক্সিজেন মাস্ক দেয়া হয়েছে, ইনায়া নাকি ঠিকমত অক্সিজেন পাচ্ছে না! একটু আগে ডাক্তার এসে বলল ওর হার্ট রিদম নাকি ভালো যাচ্ছে না। একটা লম্বা লাইন যেটা উপরে নিচে ওঠা নামা করার কথা সেটা সোজা হয়ে যাচ্ছে।

১০২ ডিগ্রী জ্বর আর মুখে অক্সিজেন মাস্ক নেয়া আমি যেন আরো অনেকটা নিথর হয়ে গেলাম! জামির দিকে তাকিয়ে দেখি মুখটা কেমন ফ্যকাসে। নার্স আমাকে একবার ডান কাত একবার বাম কাত করে দেখছিল হার্ট রিদম ঠিক হয় কিনা।

আমি জামিকে বললাম, আমার মা আর শাশুড়িকে ফোন দিয়ে বল ১১ বার সুরা আর-রহমান পড়তে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন দিল। আমি ওকে কাছে আসতে বললাম।’ বাবুর কাছে একটু জোরে জোরে আর-রহমান পড়বা? ও মোবাইলে সুরা বের করে পড়া শুরু করল।

জামির কুরাআন তিলাওয়াত মাশাআল্লাহ্‌ অসাধারণ। ১৮ সপ্তাহ থেকেই গর্ভে থাকা সন্তান আপনার আওয়াজ শুনতে শুরু করে, এটা জানার পর থেকেই প্রায় প্রতিদিন সে বিভিন্ন সুরা পাঠ করে শুনিয়েছে।কিন্তু আজ কেন জানি ওর তিলাওয়াত ভালো শুনাচ্ছে না।একটা চেপে রাখা গরম বাস্পোচ্ছাস বার বার ঠেলে বের হচ্ছে নাকে মুখে। চোখে ছলছল করা পানি গাল বয়ে পড়তে লাগলো। আমি ওর হাতে হাত রেখে ভাবতে শুরু করলাম কি অনিয়ম করেছিলাম আমি? আমার নাকি কোনো কম্পলিকেশন্স ছিল না! তাহলে কি সবাই যা বলত সেটাই ঠিক?

যখন কনসিভ করি তখন আমার শরীরের ওজন ছিল মাত্র 98 পাউন্ড(44 kg)।আজীবন শুনে এসেছি আমি নাকি শুকনা কাঠি।

মা বলত- ‘এক্টু এনা খা, নালে কেউ তোক পছন্দ করবেনা’

বন্ধুরা বলত- ‘কিরে বুল্টি এনা জোরে বাতাস হলেই তো উড়ে যাবু’

প্রতিবেশীরা বলত- ‘বাপ মা কি ভাল মন্দ খাওয়ায় না? গলাটা তো দিন দিন জিরাফের মত হচ্ছে’

ওই দিন আমি আয়নার সামনে যে কত বার গিয়েছি হিসেব নেই।

আমেরিকায় এসে আমি নতুন করে নিজেকে চিনলাম। আমার মত শারিরীক গঠন পেতে অসংখ্য মেয়ে ডেইলি ট্রেইল দিয়ে দৌড়ায়।

সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র। প্রথম ডাক্তার ভিজিট এ গাইনোকলোজিস্ট ডাক্তার বলল আমার Iron deficiency anemia আছে।নিউট্রিশনিস্ট আমার ডায়েট প্ল্যান করে দিল আর বলল অল্প অল্প করে দিনে 7/8 টা মিল খেতে আর আয়রন যুক্ত খাবার খেতে যেমন: Beans, whole grain cereal, whole grain bread 🍞 গরুর কলিজা, lean meat, green leafy vegetables আরো বেশ কিছু খাবার। সাথে দুধ আর Vit-C যুক্ত ফল/জুস। একবারও বলেনি বেশী পরিমানে খেয়ে বডি ওয়েট বাড়াতে।

চিরকালের অনিয়মিত আমি নিজেকে একটা কড়া নিয়মের মধ্যে আনলাম। দুধ আমি সহ্য করতে পারিনা অথচ গ্যালন গ্যালন দুধ  খেয়ে ফেলেছি অনায়াসে। ডেইলি অন্তত একটা ফল, এটা ছিল আর একটা টার্গেট। কিছুদিন পর Iron লেভেল কিছুটা বেড়ে গেল।

First trimester (প্রথম তিন মাসের) একটা ধকল শেষ হলে আমি নিজেকে কিভাবে ফিট রাখতে হয় সেই প্ল্যান রপ্ত করলাম। বাসার সব কাজ নিজে করা, প্রায় প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে হাঁটা এবং Prenatal Yoga এগুলো ছিল বডি ফিট রাখার প্রজেক্ট। Second Trimester (৪-৬ মাস) ছিল সোনালি সময়। প্রচুর ঘুরে বেরিয়েছি তখন। তবে পরে সেটা থেমে গিয়েছিল এমনটা নয়।

ব্যলান্স ডায়েট আর এক্সারসাইজ এর কারনে আমি মাত্রাধিক মোটা হয়ে যাইনি কিন্তু গর্ভে থাকা Fetus(বাচ্চা) এর ওয়েট ছিল মাশাআল্লাহ্ ঠিক পরিমান মত। গড়ে প্রতি সপ্তাহে বাড়ত দেড় পাউন্ড করে। ডাক্তার আমার ব্যপারে  খুব রিল্যাক্স থাকলেও বাংলাদেশে আমার পরিবার, আত্বীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব আর এখানকার কিছু বাঙ্গালী প্রতিবেশী কিছুটা উদ্বীগ্ন ছিল।

‘এখন তো অনেক বেশী করে খাওয়া লাগবে, দুইজনের খাবার একসাথে। নাইলে তোর ছল(সন্তান) ইন্দুরের বাচ্চার সমান হবে’

‘এখন যদি তুই মোটা না হোস তাইলে আর এই জীবনে পসিবল না।’

‘ ভাবী, আপনাকে দেখে একটুও বুঝা যায় না যে আপনার ৬ মাস চলে! বাচ্চার ওয়েট ঠিক আছে তো??’

আমি কেন জানি তখন কারো কথায় কান দেইনি। এক আল্লাহ্‌ র প্রতি ভরসা আর ডাক্তারের অভয়বানীকে শক্তি হিসেবে নিয়েছি। আর একজন মানুষ এর কথা না বললে অপুর্নতা থেকে যাবে। বহু নেগেটিভিটির ভীড়ে Tasfia Tabassum ভাবী অনেকটা আশার আলো দেখিয়েছিলেন। একটা কথা উনি প্রায় বলতেন- ‘ভাবী আল্লাহ্‌ সব সহজ করে দিবেন ইনশাআল্লাহ।’ অথচ আমরা কেন জানি অন্যকে ভয় দেখিয়ে একটা পৈশাচিক আনন্দ পাই।

অতঃপর সেই কান্খিত সময় ঘনিয়ে আসলো । বান্ধবী আর জানাশুনা যাদের সন্তান আছে তাদের কাছে খোঁজ নিলাম, প্রায় সবাই বলল তাদের ২/৩ সপ্তাহ আগেই C-Section করেছে। আমিও Hospital Bag ১ মাস আগে থেকে রেডি করলাম। বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় যা কিছু লাগে তাও কিনলাম।দেশ থেকে শখ করে মা, বোন, ভাবী, শাশুড়ি আর জা রা ২৫ পাউন্ড জিনিস পাঠিয়েছিল।

সবমিলিয়ে তখন আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। কবে আসবে আমাদের ছোট্ট পুতুল সোনা টা!!! গুনে গুনে ৪১ সপ্তাহ হয়ে গেল যেখানে Due date ছিল ৪০ সপ্তাহে। ডাক্তার বলল ৪২ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায় কিন্তু আমি কিছুটা অস্থির আর চিন্তায় ছিলাম বলে উনারা Induction করতে পরামর্শ দিলেন।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে এই Induction আবার কি?

সহজ কথায় এটা কৃত্রিম উপায়ে প্রসব ব্যথা(contraction) উঠানোর একটি মাধ্যম। সবমিলিয়ে ৪ টি প্রসিডিউর অ্যপ্লাই করা হয় তাও আবার স্টেপ বাই স্টেপ। আবার কারোর ক্ষেত্রে একটি প্রসিডিউর ই যথেস্ট।

প্রথমত,অক্সিটোসিন নামের একটি হরমোন ভেইন দিয়ে স্যলাইন এর মত ফোটায় ফোটায় প্রবেশ করানো হয়। এই হরমোন লেবার পেইন/contraction শুরু করতে সাহায্য করে। কিন্তু তফাৎ হল এটা ন্যচারাল লেবার পেইন এর চেয়ে বেশি শক্তিশালী, ঘনঘন এবং কস্টকর। আবার এটা কিছুক্ষেত্রে Fetus (বাচ্চার) স্বাভাবিক হার্ট বিট এ প্রভাব ফেলে।

দ্বিতীয় প্রসিডিউর এ প্রোস্টাগ্লান্ডিন নামের আর একটি হরমোন প্রবেশ করানো হয়। এটা অনেকটা জনপ্রিয় মাধ্যম কারন এতে তুলনামূলক ভাবে কম ব্যথা অনুভূত হয় যেটা  অনেকটা Natural labor pain এর মত।

তৃতীয়ত, ARM(Artificial Rupture of Membranes) যেটাতে কৃত্তিম ভাবে amniotic sac (বাচ্চা যেই থলের ভিতর অবস্থান করে) এর আবরনটা ছিড়ে দেয়া হয়। এতে করে amniotic fluid গুলো বের হয়ে আসে। সহজ কথায়  যাকে water break (পানি ভাংগা) বলে। এক্ষেত্রে ব্যথার পরিমান থাকে অনেক বেশী আর সাথে মা ও সন্তান দুজনের ই ইনফেকশন এর ঝুঁকি থাকে।

সবশেষে, Cervical ripening balloon catheter যেখানে একটি ছোট্ট টিউব এর সাথে স্যলাইন ভর্তি বেলুন যুক্ত করা থাকে এবং সেটা Cervix এ ইন্সার্ট করানো হয়। এরপর ১৫ ঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের জন্য। কিন্তু এটা খুব বেশী মাত্রার ব্যথা/contractions তৈরি করে যা কিনা fetus এর abnormal heart rhythm এর কারন হতে পারে।

সবগুলো প্রসিডিউর এর প্রধান লক্ষ্য হল ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত cervix open করা। যাতে নরমাল ডেলিভারি successfully হয়।

৩০ জানুয়ারি Howard University Hospital এ ছিল আমার Induction এর তারিখ। COVID-19 😷 পরিস্থিতির কারনে হাসপাতালের রেগুলার নিয়মে বেশ কিছু চেন্জ এসেছে। যেকোন একজন ভিজিটর থাকতে পারবে তবে সর্বক্ষনের জন্য। অর্থাৎ একবার হাসপাতালে admit হলে discharge এর আগে আর বের হতে পারবেনা।

দুপুর ৩:৩০ থেকে Induction প্রসিডিউর শুরু করল। অক্সিটোসিন শরীরে পুশ করতেই টের পেলাম একটা শক্ত ব্যথা একটু পরপর  আসছে আবার চলে যাচ্ছে। বেশ কয়েক ঘন্টার অবজারভেশনের পর কান্খিত ফলাফল না পেয়ে তারা পরের ধাপ apply করল।যখন শেষ ধাপে,  তখন একটা বিশ্রী টাইপের ব্যথা আমাকে ছেয়ে গেল। এক কথায় ভয়াবহ একটা অনুভুতি, কিন্তু মন বলছিল ইনায়াকে আর একটু পরেই দেখব। কিন্তু ওর অসুস্থতা আমার শরীর ও মনকে বার বার ভেঙ্গে ফেলছিল। জামি সূরা পড়া শেষ করার আগেই হার্ট রিদম কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করল।

পরদিন সকাল ১১ টায় OB-GYN টিম এসে বলল, ‘your baby doesn’t want to come out! She’s not giving any pressure which we needed to deliver. As we created artificial pressure to the baby, she isn’t doing well. In fact, is in stress’ we’re suggesting to have a C-section.

আমরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে তখন একটা কথায় ভাবছি, শেষ পর্যন্ত সিজার করাইতে হবে!! এত নিয়ম কানুন মেনে আসলাম ৯টা মাস যাতে নরমাল ডেলিভারি হয় অথচ আজ কেন জানি কোনো কিছুই নিজেদের হাতে থাকছেনা।ওদিকে ডাক্তারদের যার পর নাই চেস্টাকে ও  ফেলে দিতে পারছিনা।

আমরা সম্মতি দিলে ওরা তারাতারি আমাকে OT তে নিয়ে গেল। ১২:৪০ মিনিটে ইনায়া পৃথিবীতে আসলো। আলহামদুলিল্লাহ্‌ !

ওর ওজন হয়েছিল- ৭.২ পাউন্ড

উচ্চতা- ২০.৫ ইঞ্চি

আমাকে নিয়ে করা পুর্বের সকল মানুষের মন্তব্য তখন মুল্যহীন মনে হয়েছে, কারন আমিই ঠিক ছিলাম। আমার ও আমার সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে পুরো OB-GYN টিম খুব হ্যপী ছিল।

আমি দেশে অনেকের সাথে এই ঘটনা শেয়ার করেছি তাদের কেউ কেউ  বলেছে ‘পাগল নাকি? এত কস্ট দিয়েছে কেন তোমাকে? সিজার করে ফেললেই হত’

আমি অবাক হই নি। কারন দেশে C-section এর অপব্যবহার চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে। সেটা কখনও ডাক্তার এর ইচ্ছায় আবার কখনও রোগীর ইচ্ছায়।

অথচ  Medical science বলছে ‘pregnancy is a natural process. Your body will change dramatically throughout this time to make a perfect room for baby and it also knows how to give birth.

CDC এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট এ আমেরিকা তে C-section এর হার মাত্র ৩১% যেটা কমিয়ে ২৫% এ আনার টার্গেট রয়েছে এখানকার health department এর। অবাক লাগছে তাই না??

আর একটু অবাক করার বিষয় হল এখানকার ধনী শ্রেনীর মহিলারা ইদানীং Doula(ধাত্রী)এনে  বাসায় ডেলিভারি করান more natural way ফলো করার জন্য।

আমার প্রতিটি অভিজ্ঞতা সামাজিক কিছু চিরাচরিত নিয়মকে একটু খানি ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবতে শেখাবে বলে বিশ্বাস করি। বাঁকিটা নির্ভর করবে আপনাদের গ্রহন করার স্বদিচ্ছার উপরে। উপকারে আসলে মন্তব্যে জানাতে ভুলবেন না প্লিজ।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment