সপ্তাহ ৪০ । গর্ভধারনের প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ৪০ সপ্তাহে আপনার বাচ্চা

আপনি প্রসবের দ্বারপ্রান্তে বলে কিন্তু আপনার বাচ্চার বৃদ্ধি থেমে নেই। বাচ্চা জন্ম নেয়ার আগ পর্যন্ত তার বৃদ্ধি চলতেই থাকে। তার চুল এবং নখও কিন্তু সমান তালে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সপ্তাহ নাগাদ শিশুটির আকার মোটামুটি একটা বড় কাঁঠালের সমান হয়ে যাবে। বের হয়ে আসার এখন সে একেবারেই প্রস্তুত থাকবে। তার চুল আরো বড় হয়ে যাবে এবং আঙ্গুলের প্রান্তে নখও গজাতে শুরু করবে।

হাসপাতালের ব্যাগে বাচ্চার জন্য এক জোড়া হাত মোজা নিতে পারেন। বাচ্চা বেশ বড় নখ নিয়ে জন্ম নিতে পারে। জন্মের পরই বাচ্চার ছোট্ট হাতের নখ কাটা ঠিক নয়। নখ দিয়ে বাচ্চা যাতে নিজের শরীরে আঁচড় দিতে না পারে এজন্য বাচ্চার হাতে হাত মোজা পরিয়ে দিতে পারেন।এটা বলা সম্ভব নয় যে আপনার বাচ্চা কতটা বড় বা কত ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহন করবে। তবে সাধারনতঃ সুস্থ সবল বাচ্চার জন্মের সময় ওজন থাকে ৩.৩ কেজি বা ৭.৩ পাউন্ড।

শিশুটি এখন আর খুব বেশি নড়বে না, এবং ডাক্তার আপনাকে বলবে শিশুটি দিনে কতবার নড়লো তা গুনে রাখতে। শিশুটির হৃদযন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে কি না এবং তার পেশীসমূহের সবলতা কতটুকু তা পরীক্ষা করার জন্য কার্ডিওটোকোগ্রাফি (CTG, Cardiotocography) করানো যেতে পারে ।

আপনার বাচ্চার মাথার হাঁড় এখনো পুরোপুরি শক্ত নয়। তার মাথার হাঁড় শক্ত হয়না যাতে সে সহজে জরায়ু দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। প্রসবের সময় এগুলো একটা আরেকটার ওপর উঠে বা এদিক- ওদিক সরে গিয়ে মায়ের যোনিপথ দিয়ে বাচ্চার মাথা বের হতে সহায়তা করবে।এটাকে বলা হয় মোল্ডিং(moulding)। এজন্য বাচ্চার মাথার আকৃতি কিছুটা আঁকা-বাঁকা থাকে বিশেষ করে যদি আপনি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে শিশুর জন্ম দেন। এটা স্বাভাবিক এবং অল্প সময়ের ব্যাপার। কিছুদিনের মধ্যেই মাথার আকৃতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। কিন্তু মাথার হাঁড় এক বছর পর্যন্ত নরম থাকে।

গর্ভাবস্থার ৪০ সপ্তাহে আপনি

এটা আপনার গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহ এবং আপনার শিশু এখন ভূমিষ্ঠ হবার জন্য প্রস্তুত। বিভিন্নরকম নাটকীয় মুহুর্তের জন্য প্রস্তুত থাকুন, সেটা পানি ভাঙ্গার সময়ই হোক, আর প্রসব যন্ত্রণার শুরুই হোক। এসব কখন শুরু হবে তা নিয়ে আপনি হয়তো প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে থাকবেন। সেটা না করে বরং একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত রাখুন। শেষবারের মতো সব ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিন। ব্যাগ গোছানো হয়ে যেতে হবে এর মধ্যেই। গুরুত্বপূর্ণ ফোন নাম্বারগুলো হাতের কাছে আছে কিনা, ফোনে চার্জ দেয়া আছে কি না এগুলোও দেখে নিন।

এ সপ্তাহে একটু বেশি বেশি Braxton Hicks Contraction অনুভব করবেন, তবে আপনাকে এটাও বুঝতে পারতে হবে যে কখন আসল সঙ্কোচনের শুরু। আপনার শ্রোণীচক্র(pelvis) এখন প্রচণ্ডরকম বদ্ধ আর ভারী লাগবে, যেহেতু বিস্তৃত হয়ে ওঠা জরায়ুকে জায়গা দেয়ার জন্য শ্রোণীচক্র এখন অতিরিক্ত কাজ করবে। একটু পর পর বিশ্রাম নিন এবং যখনি সম্ভব হয় বসুন। ঘুমানো হয়তো একদমই সম্ভব হবে না, তবে যতটুকু সম্ভব বিশ্রাম নিন। যখনি সম্ভব অল্প সময়ের জন্য হলেও ঘুমিয়ে নিন, কারণ বাচ্চা একবার ভূমিষ্ঠ হয়ে গেলে ঘুম বলে কিছুই একটা লম্বা সময়ের জন্য আপনার অভিধানে থাকবে না!

আপনার হয়তো মনে হতে পারে যে সঠিক সময়ে আপনি কেন বাচ্চা প্রসব করছেন না। আসলে যে তারিখটা দেয়া হয় সেটা একটা অনুমান। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এর কিছুদিন আগে পিছে হয়। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। ৪০ সপ্তাহে ডাক্তাররা মনে করেন না যে আপনার সন্তান প্রসবের অনুমিত সময় থেকে দেরী হয়ে গেছে। অনেক মহিলারই ৪২ সপ্তাহে গিয়ে স্বাভাবিক প্রসব হয়। আপনার ডাক্তার এসময় আপনার ও আপনার বাচ্চার দিকে খেয়াল রাখে। ৪০ সপ্তাহের পর থেকে প্রতি সপ্তাহে একবার করে ডাক্তারের কাছে পরীক্ষার জন্য যেতে হয়। যদি আপনার গর্ভাবস্থা স্বাভাবিক থাকে তবে ৪১ সপ্তাহে ডাক্তার আপনাকে প্রাকৃতিক ভাবে কোন পদ্ধতিতে চেষ্টা করতে বলতে পারে। যদি নির্দিষ্ট সম্ভাব্য তারিখ পার হয়ে যাবার পরও বাচ্চা ভূমিষ্ঠ না হয় তাহলে কি করতে পারেন সে সম্পর্কে ধারনা আছে? এখানে আরো পড়ুন

এ সপ্তাহের করণীয় কিছু বিষয়

এসময় আপনার ঘুমের সমস্যা হতে পারে। রাতে যদি ঘুম না আসে তো দিনে ঘুমাতে চেষ্টা করুন। বিছানায় ঘুমাতে সমস্যা হলে সোফায় বা ইজিচেয়ারে ঘুমাতে পারেন। প্রচুর বিশ্রাম নিন এবং শক্তি জমা করে রাখুন কারন প্রসবের সময় প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হবে। আপনার চোখ কিছুটা ঝাপসা হয়ে আসতে পারে। ঘুম কম হওয়ার জন্য এটা হয়। চিন্তার কিছু নেই, এটা আপনার শিশুর কোন ক্ষতি করবে না।

এ সপ্তাহে বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি নড়াচড়া কম মনে হয় দেরী না করে আপনার ডাক্তারকে জানান। জন্মের আগ পর্যন্ত বাচ্চার নড়াচড়া করে এবং এই নড়াচড়া কমে যাওয়া কোন বিপদের লক্ষন হতে পারে।

আপনাকে কি আপনার বন্ধু-বান্ধব বা আত্বীয়-স্বজন বার বার ফোন করে বিরক্ত করছে? যদি তাই হয় তবে মনস্তাত্বিক চাপ না নিয়ে তাদের বলুন সন্তান জন্মের পর আপনি তাদের ফোন করে জানাবেন। শেষ বারের মতো চেক করে নিন মোবাইলে পুরা চার্জ আছে কি না, গাড়ীতে তেল আছে কিনা বা হাসপাতালের ব্যাগ পুরো প্রস্তুত কি না। হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনার সঙ্গীর কাছে যাওয়ার এটাই শেষ সুযোগ। এসময় একান্তে দু’জন কিছু সময় কাটাতে পারেন।

অনেক নারীর প্রসবের সময় পানি ভাঙ্গে, তবে প্রসবের পূর্বেও অনেকের পানি ভাঙতে পারে। মায়ের জরায়ুর ভেতর ‘এ্যামনিওটিক স্যাক’ নামে একটি থলেতে বাচ্চা বড় হতে থাকে। বাচ্চা প্রসবের পূর্ব মুহুর্তে এই থলেটি ভেঙ্গে যায় আর এর মধ্যের এ্যমনিওটিক পানি বের হয়ে আসে। একেই সোজা বাংলায় ‘পানিভাঙ্গা’ বলে।পানি ভাঙলে তা চুইয়েও পড়তে পারে বা হঠাৎ অনেক পানি বের হতে পারে।যেটাই হোক তখন সাথে সাথে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।অধিকাংশ মায়েদের পানি ভাঙ্গার আগেই প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রসব ব্যথার আগেই পানি ভেঙ্গে যেতে পারে। তবে পানি আগে ভেঙ্গে গেলেও তার একটু পরেই মায়ের ব্যথা উঠে যায়। তবে পানি ভাঙ্গার পর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যথা না উঠলে, তাহলে ডাক্তার কৃত্রিম উপায়ে লেবার পেইন তুলে দিবেন(Induced Labor)। এটার কারণ থলিটার সুরক্ষা ছাড়া শিশু খুব অল্প সময়ের মধ্যে জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

প্রসব সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানুন-

বাচ্চার নাম ঠিক করা না হয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি ঠিক করে নিন।প্রথম দিন থেকেই শিশুর নাভী পরিষ্কার রাখতে হবে। কিভাবে শিশুর নাভী পরিষ্কার রাখতে হয় শিখে নিন।শিশুর সাথে সাথে আপনার শরীরেরও খেয়াল রাখতে হবে। জেনে নিন শিশু জন্মের পর কিভাবে নিজের শরীরের খেয়াল রাখা যায়।যদি মনে হয় আপনার প্রসব ব্যথা শুরু হয়েছে কিন্তু আপনি নিশ্চিত না, তবে ডাক্তারকে ফোন করে লক্ষন গুলো বলুন।

বাথরুমে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যে ধরনের স্যান্ডেলগুলোতে পা স্লিপ করার সামান্যতম আশঙ্কাও থাকে, সেগুলো দ্রুত বাতিল করে ‘নিরাপদ’ প্যাটার্নের স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হবে। আপনার বাথরুম যেন ব্যবহারের সময় শুকনো থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।ভয়ের কিছু নেই। অল্প সময়ের মাঝেই আপনি আপনার সোনামনির গালে চুমু খেতে পারবেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৯

 

Related posts

Leave a Comment