২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর সেক্স এডুকেশন কেমন হওয়া উচিত

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

এই বয়সে শিশুরা সমলিঙ্গের অন্য শিশুদের চিহ্নিত করতে পারে। অর্থাৎ, ছেলে শিশুরা অন্য ছেলে শিশুদেরকে এবং মেয়ে শিশুরা অন্য মেয়ে শিশুদেরকে লিঙ্গের ভিত্তিতে চিহ্নিত করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এই বয়সে তারা নিজের এবং বিপরীত লিঙ্গের শিশুদের শরীরের মাঝে থাকা সাধারণ পার্থক্য সমূহ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তারপরেও তাদের মনে অনেক প্রশ্ন থাকে যেগুলোর উত্তর তারা জানতে আগ্রহী। যেমন : বাচ্চা কীভাবে পেটে আসে? পেট থেকে কীভাবে বাচ্চা বের হয়? ইত্যাদি।

সাধারণত ৫ বছর বয়সে শিশুরা স্কুলে যেতে শুরু করে। স্কুলে যাওয়ার কারণে তারা স্কুলে আসা সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের বিভিন্ন মতামত থেকে তাদের ভেতরে হরেক রকম চিন্তা-ভাবনার জন্ম হয়, পাশাপাশি কিছু ভ্রান্ত ধারণাও সৃষ্টি হয়। শিশুরা তাদের সমবয়সী বাচ্চাদেরকে বেশ গুরুত্ব দিতে শুরু করে, তাদের কথা অকপটে বিশ্বাস করে। সমবয়সী কোনো শিশুর কাছ থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্যকে তারা রীতিমতো “ফ্যাক্ট” হিসেবে ধরে নেয়। সেই তথ্য যতই হাস্যকর কিংবা অবাস্তব হোক না কেন, শিশুরা তা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

বিজ্ঞাপণ

তবে এই বয়সের শিশুদেরকে বুঝিয়ে বললে তারা তুলনামূলক যৌক্তিক উত্তরগুলো অনুধাবন করার সামর্থ্য রাখে। তারা যৌনতা সংক্রান্ত প্রশ্ন করতে এসময় কোনো লজ্জাবোধ করে না। বরং দেখা যায় তাদের বাবা, মা প্রশ্ন শুনে লজ্জাবোধ করছে বা প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চাইছে।

শিশুদেরকে লিঙ্গ সম্পর্কিত সাধারণ জ্ঞান প্রদান করার জন্য এই বয়সটা চমৎকার। তবে এখনই তাদেরকে সেক্স সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর দরকার নেই। যৌনতার মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভালবাসা বহিঃপ্রকাশ করার ব্যাপারটা তারা ধরতে পারবে না। উল্টো তারা ইরেকশন, ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড, প্রসব বেদনা ইত্যাদি জটিল বিষয়বস্তু হজম করতে না পারে ভয় পেতে পারে।

এই বয়সী শিশুদের যেকোনো কিছু শেখানো সহজ। তারা অনেকটা শুকনো স্পঞ্জের মতো। তাদেরকে যেসব জ্ঞান বা তথ্য দেওয়া হয়, সব শুষে নেয়। তবে তারা কোনো কৌতূহল বা জিজ্ঞাসার যথাযথ ব্যাখ্যা না পেলে নিজেরাই কল্পনার জোরে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। তাই বাবা, মায়ের উচিত তাদেরকে সঠিক তথ্যটা দিয়ে ভ্রান্ত ধারণা থেকে দূরে রাখা। শিশুরা অনেক সময় প্রথমবার শুনেই অনেক কিছু বুঝে উঠতে পারে না কিংবা পুরো বিষয়বস্তুর কিছু অংশ বোঝে বাকিটা বোঝে না। তাই বাবা, মাকে ধৈর্য ধরতে হবে এবং তাদেরকে বারবার একই জিনিস বুঝিয়ে বলতে হবে।

আরেকটা ব্যাপার হলো, শিশুরা অনেক সময় এমনভাবে প্রশ্ন করে বসে, মনে হয় তারা অনেক গভীর কিছু জানার জন্য সিরিয়াসলি প্রশ্নটা করেছে। বাবা, মা প্রশ্নটার উত্তর সিরিয়াসলি দেওয়ার পর দেখা যায় শিশু প্রশ্নটা করেছিল অন্য একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে! যার জন্য হয়তো কোনো গুরুগম্ভীর জবাবের প্রয়োজনই ছিল না। সাধারণ একটা জবাব দিলেই হয়ে যেত। তাই শিশু কোনো প্রশ্ন করলে বাবা, মায়ের উচিত তাকে জিজ্ঞেস করা- প্রশ্নটি করে তুমি আসলে ঠিক কী জানতে চাইছো বা বলতে চাচ্ছো? উত্তরটা জানার পর বাবা, মা এবার নিশ্চিতভাবে নিজেদের মতো করে সঠিক জবাব দেওয়ার মাধ্যমে শিশুর কৌতূহল মেটাতে পারেন।

বাচ্চার কাছে নিজেকে তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন। তার যাবতীয় জিজ্ঞাসা যেন সে আপনার কাছে অকপটে প্রকাশ করতে পারে, তা নিশ্চিত করুন। বাচ্চার প্রশ্নগুলোর বিপরীতে সততার সাথে, সহজ ভাষায় জবাব দিন।

আপনি ধীরে ধীরে যত তার কৌতূহল মেটাতে থাকবেন, জবাব দিতে থাকবেন সে আপনাকে তত ভরসা করতে থাকবে এবং তথ্য পাওয়ার জন্য আপনাকে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করবে। এই বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বয়সে তারা অন্যান্য শিশুদের সংস্পর্শে আসতে শুরু করে। তাদের মাধ্যমে যেন বাচ্চা কোনো ভুল তথ্য না পায় বা কোনো ভ্রান্ত ধারণা মনে লালন না করে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অভিভাবকের।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুদের জন্য সেক্স এডুকেশন কেন জরুরি? কখন এবং কীভাবে তা শুরু করবেন? ]

২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদেরকে যেসব বিষয় শেখানো প্রয়োজন

দেহের গোপনাঙ্গের যথাযথ নাম

শিশু যদি আপনার কাছে তার গোপনাঙ্গের নাম জানতে চায় তাহলে তাকে সেই অঙ্গের সঠিক নাম বলুন। লজ্জা পেয়ে বা বিব্রত হয়ে মনগড়া কোনো নাম শেখাবেন না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উল্টাপাল্টা বা সাংকেতিক নাম না শিখিয়ে শরীরবৃত্তীয় পরিভাষায় থাকা নাম শেখানো উত্তম। এতে শিশু কখনো সমস্যায় পড়লে বা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে কিংবা কোনো মেডিক্যাল সমস্যার মুখোমুখি হলে সরাসরি সঠিক শব্দ ব্যবহার করে সাহায্য চাইতে পারবে এবং নিজের সমস্যার কথা বাবা, মাকে বা প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে জানাতে পারবে।

জেন্ডার/লিঙ্গ

এই বয়সে সাধারণত শিশুদের মাঝে নগ্ন হওয়ার লজ্জা বা শালীনতা বোধ জন্মায় না। তবে শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাচ্চারা ১৮-২৪ মাস বয়সে লিঙ্গ সংক্রান্ত বিষয়টা অল্প অল্প করে বুঝতে শুরু করে। এই বয়সী শিশুরা একে অন্যের শরীরের প্রতি অনেক কৌতূহলী হয়ে ওঠে। বাচ্চাদের এই কৌতূহলকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে এ-বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান ও তথ্য দেওয়া যেতে পারে।

বাবা, মাকে আরেকটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, তাদের সন্তান যেন লিঙ্গের ভিত্তিতে কাউকে ভিন্ন চোখে না দেখে। ছেলে শিশু হোক বা মেয়ে শিশু, সে যেন সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখে, কোনো ভেদাভেদ যেন না করে। এই শিক্ষা বাচ্চাকে দিতে হলে প্রথমে বাবা, মাকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। যেমন : “কেমন আছো ছেলেমেয়েরা?” এটা না বলে বলতে হবে, “কেমন আছো বাচ্চারা?” ইত্যাদি।

সম্মতি

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাচ্চাদেরকে যত দ্রুত কনসেন্ট বা সম্মতি ব্যাপারটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে ততই মঙ্গল। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদেরকে ভাল অনুভূতি এবং বাজে অনুভূতি সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, খেলার মাঠে বা খেলার সময় কোনো বন্ধু তার সাথে বাজে আচরণ বা রুঢ় ব্যবহার করে কিনা, জোরে ধাক্কা দেয় কিনা, শারীরিকভাবে আঘাত করে কিনা। বন্ধুর কোন কোন আচরণ তাকে কষ্ট দেয়? খারাপ লাগে? কোন ধরনের স্পর্শ সে অপছন্দ করে ইত্যাদি। তথ্যগুলো জানার পর বাচ্চাকে “না” বলা শেখাতে হবে। শিশুকে বুঝিয়ে বলতে হবে কোনো স্পর্শ বা আচরণে নিজের সমস্যা হলে, অপছন্দ হলে বন্ধুকেও “না” বলতে হবে। তার সম্মতি ছাড়া বন্ধু তার গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার রাখে না। এটাই কনসেন্ট। শিশুকে শেখানোর জন্য বাবা, মায়েরও উচিত শিশুর “না” সমূহকে সম্মান করা এবং সেগুলোকে যতদূর সম্ভব আমলে নেওয়া।

এই বয়সী শিশুদেরকে কনসেন্ট তথা সম্মতি সম্পর্কিত জ্ঞান দেওয়া খুবই জরুরি। এ-ব্যাপারে জ্ঞান থাকলে তারা স্পর্শ সংক্রান্ত সীমারেখা সম্পর্কে জানতে পারবে, বুঝতে পারবে। অন্য কেউ ঠিক কতদূর পর্যন্ত তাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে সে-ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাবে। নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার থাকার বিষয়টি তারা অনুধাবন করতে পারবে। এসব জ্ঞান থাকার ফলে শিশু নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারবে, তার সাথে কেউ অগ্রহণযোগ্য আচরণ করলে সে বিষয়টা বাবা, মায়ের কাছে নিঃসংকোচে খুলে বলতে পারবে।

বাবা, মা তার বাচ্চাকে শিখিয়ে দেবেন, “অন্য কেউ তোমার গোপনাঙ্গ স্পর্শ করার অধিকার রাখে না। এটা একান্ত তোমার ব্যক্তিগত অঙ্গ। কেউ এধরনের কাজ করার চেষ্টা করলে দ্রুত আমাদেরকে জানাবে।” এভাবে শিশুকে আশ্বস্ত করতে হবে এবং তার নির্ভরতার জায়গা হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা

এই বয়সী বাচ্চাদেরকে “ব্যক্তিগত সময়” ব্যাপারটা বোঝাতে হবে। মানুষের কিছু সময় একদম একান্তে নিজের মতো করে কাটাতে চায়, কাটানোর প্রয়োজন পড়ে; এটা তাদেরকে বুঝিয়ে বলতে হবে, শেখাতে হবে। চাইলে কারো রুমে হুট করে ঢুকে পড়া যায় না, দরজা নক্ করে অনুমতি নিতে হয়; এসব প্রাইভেসি বজায় রাখার একটি অংশ। বাচ্চাকে এগুলো শেখানোর জন্য বাবা, মাকে এসব নিয়ম-কানুন মেনে চলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। শিশু যদি দরজা চাপিয়ে দিয়ে আপন মনে খেলতে থাকে তাহলে বাবা, মায়ের উচিত হবে দরজা টোকা দিয়ে শিশুর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া, তারপর ভেতরে প্রবেশ করা। এভাবে শিশু নিজেও অন্যের প্রাইভেসিকে গুরুত্ব দিতে শিখবে।

কীভাবে কথা বলবেন

শান্ত থাকুন

বাচ্চারা যখন এসব বিষয় (সেক্স বিষয়ক) নিয়ে প্রশ্ন করে তখন কিন্তু তারা বুঝতে পারে না বিষয়টা কতটা স্পর্শকাতর কিংবা বিব্রতকর। তারা সরল মনে, স্রেফ জানার আগ্রহ থেকে প্রশ্ন করে। তাই বাবা, মায়ের উচিত উত্তেজিত না হয়ে তাকে সহজ ভাষায় প্রশ্নের জবাব দেওয়া।

অনেক বাবা, মা তাদের বাচ্চার সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে একদম স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তারা আশঙ্কা করেন, কথা বলতে গিয়ে তারা হয়তো অনেক বেশি কিছু বলে ফেলবেন যা তার শিশুর জন্য বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে! এত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। শান্ত হয়ে ধীরে, সুস্থে তাদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে আগে থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর গুছিয়ে বলার অনুশীলন করে রাখুন। এক্ষেত্রে চাইলে আপনার দাম্পত্য সঙ্গীর সহায়তা নিতে পারেন।

বাচ্চার সাথে প্রশ্ন-উত্তর পর্বটা এমন পরিস্থিতিতে সারুন যখন আপনারা একটু আয়েশী সময় কাটাচ্ছেন। সেটা হতে পারে টিভি দেখার সময়, গোসল করার সময় কিংবা বিছানা গোছানোর সময় ইত্যাদি। যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে তারা চাইলে গাড়িতে বসেও ধীরে ধীরে বাচ্চার সাথে এসব নিয়ে আলাপ করতে পারেন। এসব পরিস্থিতিতে কথা বলার সুবিধা হলো- আপনাকে সরাসরি বাচ্চার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে হবে না। অন্য দিকে চোখ রেখে, অন্য কোনো কাজ করতে করতে আপনি বাচ্চার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন। বাচ্চার চোখে চোখ না রাখার ফলে আপনার নিজেকে শান্ত রাখতে বেশ সুবিধা হবে।

সহজভাবে উত্তর দিন

বিজ্ঞাপণ

এই বয়সী বাচ্চাকে জটিল জবাব দেওয়া একদমই বোকামি। বাচ্চারা কঠিন প্রশ্ন করলেও তাকে সহজ ভাষায় জবাব দিতে হবে। ধরা যাক, সে জানতে চাইলো- “কীভাবে বাচ্চা হয়?” তাকে সহজ ভাষায় এভাবে জবাব দেওয়া যেতে পারে- “বাবার একটা বীজ আর মায়ের একটা ডিম মিলে মায়ের পেটে বাচ্চার সৃষ্টি হয়। মায়ের পেটের ভেতরেই বাচ্চা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তারপর উপযুক্ত সময় এলে বাচ্চাকে মায়ের পেট থেকে বের করা হয়।”

কিছু বাচ্চা এতটুকু জবাব পেয়েই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কিছু বাচ্চা আছে যারা আরো প্রশ্ন করে বসে। যেমন :

# ডিম মানে? ফ্রিজে যে ডিম রাখা হয়, ওরকম?
# বাবা তার বীজ কোথায় রাখে? বীজে কি পানি ঢালতে হয়?
# বাচ্চা যখন মায়ের পেটের ভেতরে থাকে তখন কি তারা দেখতে পায়? আওয়াজ শুনতে পারে?

ধৈর্য ধরে বাচ্চার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে থাকুন। যতক্ষণ পর্যন্ত তার আগ্রহ থাকবে, আপনাকে তার কৌতূহল মিটিয়ে যেতে হবে। তবে তাকে অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে বিরক্ত করে ফেলবেন না যেন! বাচ্চার আগ্রহ শেষ হলে বাচ্চা নিজেই অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিবে বা খেলনা নিয়ে খেলতে চলে যাবে। আপনাকে নিজে থেকে কোনো কৌশল অবলম্বন করতে হবে না।

শিশুর আগ্রহকে দমিয়ে দেবেন না

বাচ্চার প্রশ্নটা যেমনই হোক না কেন, কখনো সেই প্রশ্নটাকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না বা তাকে উল্টো প্রশ্ন করে বসবেন না, “এই ধারণা তুমি কোত্থেকে পেলে?” বা “এটা তোমার মাথায় এলো কীভাবে?”। আলাপটাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। যদি করেন তাহলে শিশু বুঝে নেবে এসব নিয়ে আপনার সাথে কথা বলা যাবে না, এসব নিয়ে কথা বলা নিষেধ। নিজের মাথায় এসব চিন্তা আসার জন্য সে নিজেকে “খারাপ” ভাবতে শুরু করবে।

বাচ্চার কাছে নিজেকে পজেটিভ হিসেবে উপস্থাপন করুন। তাকে বোঝান, আপনাকে সে চাইলে যেকোনো ব্যাপারে প্রশ্ন করতে পারে। আপনি তার সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে মোটেও বিরক্তবোধ করেন না।

শিশু কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে তাকে প্রশ্ন করার জন্য প্রথমে বাহবা দিন। তাকে বলুন, “দারুণ একটা প্রশ্ন করেছো! সামনে আরো প্রশ্ন কোরো কিন্তু। আমি তোমাকে জবাব দেব।” যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা না থাকে তাহলে মনগড়া জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বাচ্চার কাছে সৎ থাকুন। তাকে বলুন, “আমি আসলে এটার উত্তর জানি না। চলো আমরা দুজন মিলে উত্তরটা জানার চেষ্টা করি।”

বাচ্চারা কোথায় কখন কোন প্রশ্ন করে বসে তার কোনো ঠিক নেই। হয়তো রাস্তায় বা বাসে থাকা অবস্থায় সে সেক্স সম্পর্কিত কোনো বিব্রতকর প্রশ্ন করে বসলো! তখনও আপনার বিরক্ত হওয়া চলবে না বা তার প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। বরং শান্তভাবে তাকে প্রশ্নের উত্তর দিন। আশেপাশে থাকা লোকজন শুনলে শুনুক। তাদের চেয়ে আপনার সন্তান নিশ্চয়ই আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? তাই সন্তানের দিকে মনোযোগ দিন। কে কী বলল বা ভাবল তাতে কিছু যায় আসে না।

এভাবে আপনি সন্তানের পাশে থাকলে ধীরে ধীরে আপনি তার খুবই বিশ্বস্ত একজন বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবেন। এই বিশ্বাসের জোরে সে আপনাকে তার ভবিষ্যৎ জীবনের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানাবে, আপনার কাছে সমাধান খুঁজতে আসবে, পরামর্শ চাইতে আসবে। এভাবে আপনি আপনার সন্তানের শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত এবং তার পরের জীবনেও একজন বিশ্বস্ত পরামর্শক হিসেবে জায়গা করে নিতে পারবেন।

প্রতিদিনের সুযোগকে কাজে লাগান

বাচ্চা প্রশ্ন করবে তারপর আপনি তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান দেবেন, যদি প্রশ্ন না করে তাহলে দেবেন না; তা তো হতে পারে না। প্রাত্যহিক জীবনের ঘটনাকে সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ করে আপনি তাকে বিভিন্ন তথ্য দিতে পারেন। বাচ্চাদের জন্য লেখা বই বা তাদের জন্য নির্মিত সিনেমা দেখতে দেখতেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। বাচ্চাদের অনেক বইতে গল্পের ছলে কীভাবে বাচ্চা হয়, কীভাবে বাচ্চা মায়ের পেটে আসে, কীভাবে তারা ভূমিষ্ঠ হয় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকে। আপনি চাইলে বইয়ের সাহায্য নিয়ে নিজের বাচ্চাকে বিষয়গুলো সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে পারেন।

শিশুকে যদি সেক্স প্লে বা “ডাক্তার ডাক্তার” খেলতে দেখেন তাহলে কী করণীয়?

প্রথমত, ভড়কে যাবেন না। অনেক শিশু আছে যারা নিজেদের যৌনাঙ্গ অন্য শিশুকে দেখায় বা অন্য শিশুর যৌনাঙ্গ কৌতূহল নিয়ে পরীক্ষা করে। তাদের কেউ কেউ এটাকে বলে “ডাক্তার ডাক্তার খেলা”, এভাবে তারা নিজেদের শরীরের বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে জানে এবং অন্য শিশুকে জানায়। তাই বাচ্চাকে এধরনের খেলায় অংশ নিতে দেখলে মাথা গরম করবেন না। বাচ্চাকে লজ্জা দেবেন না বা তাকে অপরাধবোধে ভোগাবেন না। আপাতত স্বাভাবিকভাবে, ধীরে সুস্থে বাচ্চার গায়ে পোশাক পরিয়ে দিন এবং তাকে অন্য কোনো খেলা খেলতে উৎসাহিত করুন।

পরে অন্য কোনো সময় বাচ্চার সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ করুন। তাকে বোঝান- নিজের গোপনাঙ্গ, গোপন রাখাই উত্তম। তাকে এসব নিয়ে প্রশ্ন করার জন্য উৎসাহিত করুন। আপনি যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দেবেন বলে তাকে নিশ্চিত করুন। তাহলে সে মন খুলে আপনার কাছে নিজের কৌতূহল মেটাতে আসবে। তবে বাচ্চাকে ভয় দেখাবেন না। তাকে বলুন, নিজের শরীরের বা অন্যের অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিয়ে আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক, এতে দোষের কিছু নেই।

এখানে আরেকটা বিষয় বলে রাখা জরুরি, শিশুরা এই বয়সে মাঝে মাঝে বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরতে আগ্রহী হতে পারে; এটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। ছেলে শিশু মেয়েদের পোশাক আর মেয়ে শিশুরা ছেলেদের পোশাক পরতে চাইতে পারে। তারমানে এই নয় যে, আপনার শিশু নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় ভুগছে।

বিজ্ঞাপণ

শিশুর মধ্যে যদি এসবের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ঝোঁক দেখেন তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন। তবে এ-ব্যাপারে যদি তার আগ্রহ কদাচিৎ দেখা যায় তাহলে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। সেক্ষেত্রে শিশুর সাথে বিষয়টা নিয়ে সহজ ভাষায় আলাপ করলেই চলবে।

শিশু যদি বাবা মাকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে তখন কী করণীয়?

এটা নিঃসন্দেহে বিব্রতকর একটা ব্যাপার। তবে মজার বিষয় হলো, এই বয়সের বাচ্চারা আসলে বুঝতে পারে না সে আপনাকে ঠিক কী করতে দেখেছে। তাই ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। বাচ্চা আপনাকে অপ্রীতিকর অবস্থায় দেখে ফেললে তাকে সুন্দর করে বলুন, “আমরা একটু ব্যস্ত আছি। তুমি দরজাটা বন্ধ করে নিজের রুমে গিয়ে খেলো। আমরা একটু পরে আসছি।”

মনে রাখবেন, এরকম অবস্থায় ভুলেও বাচ্চাকে ধমকাতে যাবেন না বা চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না। এতে বাচ্চা মানসিকভাবে চাপ অনুভব করবে এবং তার মনটা খারাপ হয়ে যাবে।

সময়টা পার হওয়ার পর বাচ্চার সাথে ঘটনাটা নিয়ে আলাপ করতে পারেন। তাকে জিজ্ঞাস করতে পারেন সে আসলে কী দেখেছে এবং সে-ব্যাপারে তার কোনো প্রশ্ন আছে কিনা, কৌতূহল আছে কিনা। তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি তাকে এটাও শিখিয়ে দিন- বাবা, মা বা অন্য কারো রুমে ঢুকতে হলে অবশ্যই আগে নক্ করে, অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হয়; এটা সাধারণ ভদ্রতা।

মূল কথা হলো- আপনি বাচ্চার সাথে সম্পূর্ণ সৎ থেকে এবং সেক্স সম্পর্কিত বিস্তারিত প্রাপ্তবয়স্ক আলাপ না করেও তাকে যৌন সংক্রান্ত সাধারণ জ্ঞান ও তথ্য দিতে পারেন। আপনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে দেখে ফেললে তাকে পরবর্তীতে এভাবে বুঝিয়ে বলতে পারেন, “মা বাবা একে-অন্যের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করার জন্য মাঝে মাঝে একান্তে কিছু মুহূর্ত কাটায়। তখন তাদেরকে বিরক্ত করা উচিত নয়।”

হ্যাঁ, বাচ্চার সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে আপনার লজ্জা লাগতেই পারে, আপনি জড়তাবোধ করতে পারেন কিন্তু মনে রাখবেন আপনি এভাবে চমৎকার রাস্তা খোলা রাখছেন, যার ফলে আপনার বাচ্চা ভবিষ্যৎ জীবনেও আপনার সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামনে আলোচনা করতে পারবে। ফলে আপনি তাকে সঠিক তথ্যটি দিয়ে সাহায্য করতে পারবেন এবং তাকে ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন।

[আরও পড়ুনঃ ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুর সেক্স এডুকেশন কেমন হওয়া উচিত ]

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment