কেন আপনার সন্তানকে সিদ্ধান্ত নিতে (Decision making) শেখাবেন এবং কীভাবে?

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা যা আপনার শিশুর স্বাস্থ্যকর উপায়ে এবং পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠার জন্য খুবই জরুরি। সিদ্ধান্ত নিতে পারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কারণ আপনার শিশু যা সিদ্ধান্ত নিবে সেগুলোই তার ভবিষ্যতের পাথেয় নির্দেশ করবে।

সন্তানকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া শিখানোর বেশ কিছু উপকারী দিক আছে। যখন তারা একটি ভালো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা অনেক বেশি পরিতৃপ্তি ও পূর্ণতা অর্জন করে, কারণ এটি তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। যখন তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিবে, তারা হয়তো সেটার জন্য কষ্ট পাবে, কিন্তু তারা এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ করবে এবং ভবিষ্যতে আরো ভালো ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

বিজ্ঞাপণ

কীভাবে একটি শিশুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা গড়ে উঠে?

শিশুরা ধীরে ধীরে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে শিখে এবং তারা তাদের আশে পাশের মানুষের চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা এবং মূল্যবোধ দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। এটি হয় মূলত বাকিদের (বিশেষ করে মা-বাবা এবং যারা তাদের দেখভাল করে) ভালো করে লক্ষ্য করে, মূল্যবোধের ব্যাপারে শুনে এবং আলোচনা করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলে ও তার ফলাফলের অভিজ্ঞতা থেকে।

২ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে

২ থেকে ৭ বছর বয়সে, সাধারণত শিশুর যুক্তিযুক্ত চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা জন্মায় না, যার কারণে শিশুরা বিচারবুদ্ধি দিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারেনা বা জটিল বিষয় গুলো বুঝতে পারেনা : শিশুর বেড়ে উঠার এই সময়টাকে “প্রিঅপারেশনাল স্টেইজ” বলা হয়। তারা অনেক বেশি আত্নকেন্দ্রিক হয়, অর্থাৎ তারা শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবে এবং আচমকা নেওয়া কোনো পদক্ষেপ নিজেদের উপর কেমন প্রভাব ফেলবে সেসব নিয়েই বেশি চিন্তা করে।

“এই বয়সী শিশুরা মনে করে সবাই তাদের মতো করেই সবকিছু দেখে, বিবেচনা করে এবং অনুভব করে; এই কারণে, তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো মূলত তাদের নিজেদের চাহিদা পূরণে তৃপ্ত হওয়ার চিন্তাতেই নেওয়া হয় (থিওরিজ অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট,লিউম্যানক্যান্ডেলা)।” ২ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুরা সর্বোচ্চ দুটি বিকল্পের মধ্যে থেকে বেছে নিতে পারে, যেমন- এই দুটি বইয়ের মধ্যে কোনটি তুমি পড়তে চাও? তুমি কি পানি পান করতে চাও নাকি দুধ? তুমি কি পাজামাটা এখন পড়বে নাকি পাঁচ মিনিট বাদে পরবে? তোমার কি সবুজ শার্টটা পড়তে ইচ্ছা করছে নাকি নীলটা?

আবার ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুরা “প্রিঅপারেশনাল স্টেইজ” এর আরেকটু পরিণত ধাপে থাকে, এই সময় বেশী সংখ্যক বিকল্প যাচাই-বাছাই করতে পারে, এর সাথে বড়দের সাহায্য তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতার উন্নয়ন ঘটাতে সহায়তা করে। শুরু থেকেই, নিজ বাসা ও বিদ্যালয় উভয় জায়গাতেই, সন্তানকে বুঝতে দেওয়া খুবই জরুরি যে তাদের জীবনের এই সমস্ত প্রক্রিয়া তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণের ভিতরেই আছে।

৭ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে

৭ থেকে ১১ বছর বয়সে, সিদ্ধান্ত নিতে পারার কিছু বাড়তি ক্ষমতা জন্ম নেয়। যদিও শিশুরা তখনও আত্মকেন্দ্রিক থাকে, তবে তারা বুঝতে পারে যে সবাই তাদের মতো চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস বা অনুভব করে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, তারা কেবল বস্তুগত বিষয়সমূহের উপর যুক্তি দাড় করায়।

একটি শিশু যত বড় হতে থাকে, ততই তার ভিতর ভুল এবং সঠিকের পার্থক্য করার ক্ষমতা নতুন মোড় নিতে থাকে, সাথে সাথে তাদের নিজেদের আচরণের পরিণাম বুঝতে পারার দক্ষতা ও জন্মায়। তবে, অনেক সময় তারা যখন উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে শিখে, তখনও তারা হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে এবং কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।

১১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে

১১ থেকে ১৪ বছর বয়সকালে, “ফরমাল অপারেশনাল স্টেইজ” এর প্রারম্ভে, শিশুরা যুক্তি দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে, তারা দেখে যে মানুষের আরো বিভিন্নরকম মত আছে, দৃষ্টিভঙ্গি আছে এবং তাদের মধ্যে ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তাভাবনা করার সামর্থ্য থাকে। যদিও, কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে সবকিছুই তাদের মা-বাবার সাথে আলোচনা করতে হয়, কিন্তু এখন তাদেরকে সমস্যা সমাধানের জন্য নিজেদের যুক্তিজ্ঞানের উপরই তারা নির্ভর করে।

শিশুদের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়ার গুরুত্ব

বদমেজাজ বা খিটখিটে আচরণ এড়ানো যায়

বদমেজাজ বা দূর্বার ক্রোধ সাধারণত সাধারণত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার কারণে দেখা যায়। সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। আমরা বড়রা অনেক সময় বুঝতে পারিনা শিশুদের মধ্যেও এমন বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে।

শিশুদের মধ্যে বদমেজাজ বা ক্রোধ কোনো সামান্য কারণে আসে না যেমন স্যান্ডউইচটা তিন কোণা না করে কেন চার কোণা করা হলো, বরং নিজেকে ক্ষমতাহীন বা প্রভাবহীন অনুভব করার কারণে এটি জন্ম নেয়। বদমেজাজ বা ক্রোধ সৃষ্টি না হওয়ার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে যখনই সম্ভব হয় তখনই যেন শিশুকে স্বনিয়ন্ত্রিত অনুভব করতে দেওয়া হয়। যদি তাদেরকে ক্ষমতাবান অনুভব করানোর জন্য নিজ সিদ্ধান্ত এবং বিকল্প তাদেরকেই যাচাই-বাছাই করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তাদেরকে সেটি আর ধ্বংসাত্মকভাবে প্রকাশ করতে হয়না।

আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়

আত্মবিশ্বাস তৈরি হওয়ার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিদ্ধান্ত নিতে পারা। যখন আপনার ছোট শিশু কোনো একটি সিদ্ধান্ত নেয় এবং সেটি যদি ভালো হয়, তাহলে তারা সেটি নিয়ে গর্ববোধ করবে এবং এটি তাদের আত্নবিশ্বাসী করে তুলতে সাহায্য করবে যা তাদের পরিণত বয়সে ভালো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

মর্যাদাবোধ তৈরি করা

প্যারেন্টিংয়ের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ (এবং প্রায়ই উপেক্ষিত) দিক হলো আপনার সন্তানকে অনুভব করানো যে সে কতোটা মূল্যবান। প্রায় ক্ষেত্রেই শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি সৃজনশীল হয়ে থাকে। একজন শিশুর পছন্দ অপছন্দের ঠিক ততোটাই মূল্য আছে যতটা বড়দের থাকে, এবং আমাদের নিশ্চিত করা উচিত যে আমাদের শিশুরা যেন জানতে পারে আমরা তাদের মূল্য উপলব্ধি করি এবং সেটা স্বীকার করি। এতে শিশুদের নিজেদের সম্পর্কে মর্যাদাবোধ তৈরি হয় এবং আত্মসম্মান বৃদ্ধি পায়।

দায়িত্ববোধ শেখানো

আমাদের জীবন নির্ধারিত হয় আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের উপর এবং এটি খুবই জরুরি যে আমরা আমাদের শিশুদেরও অল্প বয়স থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখিয়ে এসবের জন্য প্রস্তুত করে তুলি। দৈনন্দিন জীবনের ছোটো খাটো ব্যাপারের বিকল্পসমূহের মধ্যে থেকে তাদের নির্বাচন করতে দেওয়ার মাধ্যমে আপনি থাকে শেখাতে পারেন কীভাবে তারা সিদ্ধান্ত নিতে ও তার পরিণাম মোকাবিলা করতে পারে (ফলাফল আশানুরূপ হোক বা না হোক) । এতে তার মধ্যে দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পায়।

সৃজনশীলতার জন্য উৎসাহিত করা

যখন আমরা আমাদের সন্তানের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেই, তখন আমরা আসলে তাদেরকে নিজের সৃজনশীলতা ও বিমূর্ত চিন্তাভাবনা গড়ে উঠার সুযোগ দিচ্ছিনা। আমাদের উচিত কর্তৃত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে তাদের সৃজনশীলতার পথ বন্ধ করে না দিয়ে বরং তাদের সৃজনশীল চিন্তাভাবনার জন্য উৎসাহ দেওয়া।

সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে উঠা

আপনার শিশু যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার সবই যে ভালো ফলাফল আনবে তা না। যখনই কোনো একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল আশানুরূপ হবেনা, তখনই সে ওই সিদ্ধান্তের দ্বারা সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা শিখবে এবং পরবর্তীতে আরো ভালো সিদ্ধান্ত নিবে। যদি সে কোনো কর্দমাক্ত পার্কে তার প্রিয় জামা জুতো পরে যায় এবং যদি সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তারা পরেরবার এটি মাথায় রাখবে এবং ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত নিবে।

মনে রাখতে হবে, মা-বাবা হিসেবে, এটি আমাদের দায়িত্ব যে আমাদের শিশু যেন একজন সহানুভূতিশীল, দৃঢ় মনোভাবসম্পন্ন ও একজন দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠে। এটি করার সর্বাপেক্ষা উত্তম পন্থা হলো খুব ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে ওইটুক অবকাশ দেওয়া যেইটুক তাদের সৃজনশীল হতে, আত্মবিশ্বাসী হতে এবং তারা নিজেদেরকে নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করছে এমনটা যাতে অনুভব করাতে পারে।

যেসব শিশুরা এসব দক্ষতায় পারদর্শী নয়, তারা সাধারণত:

  • তাদের দেখভালকারী এবং অন্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে, এমনকি বড় হওয়ার পরেও।
  • বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়।
  • ঐ শিশুরা তাদের দেখভালকারী এবং বড়দের উপর সবসময় ক্ষুদ্ধ থাকে যারা তাদের নিজে পছন্দ অপছন্দ করার স্বাধীনতা পুরোপুরি দেয় না।
  • নিজের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান থাকে।
  • ঐ সমস্ত ঝুঁকি নিতে সমস্যায় পড়ে বা ভয় পায় যেগুলো থেকে আরো অনেক কিছু শেখা যায়।
  • অসাধারণ কিছু অর্জনের জন্য নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না এবং নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় পোঁছাতে পারে না।

সন্তানের ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গড়ে তুলতে সহযোগিতা করবে এমন কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ

ছোট থেকেই শুরু করুন – বাচ্চারাও সিদ্ধান্ত নিতে পারে

গ্রেস বার্মান,এলসিএসডব্লিউ, চাইল্ড মাইন্ড ইন্সটিটিউটের একজন ক্লিনিক্যাল সামাজিক কর্মী,তিনি বলেন,”আপনার শিশুকে অল্প বয়স থেকেই দুটি বিকল্প দিয়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেটি শিক্ষা দিন, এমন দুটি বিকল্প যার কোনটি নিয়েই আপনার কোন সমস্যা হবেনা”। “উদাহরণস্বরূপ, তাদেরকে ঠিক করতে দিন তারা কি আজকে লাল জুতো পরতে চায় নাকি নীল জুতো, অথবা সে ব্রকলি খাবে নাকি ফুলকপি”।

এর মানে এই নয় যে শিশুরা লাগামহীনভাবে সব সিদ্ধান্ত নিবে – সবকিছুতে বিকল্পের প্রয়োজন হয় না। আপনি গন্ডি ও সীমানা ঠিক করে দিতে থাকুন, কিন্তু ওই পরিমাপের মধ্যেই তাদেরকে বিকল্প এবং সুযোগ সুবিধা দিন। যেমন ধরুন, তারা নাস্তা হিসেবে কোন ফল খেতে পছন্দ করবে এটা তারা ঠিক করতে পারবে, কিন্তু তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেনা যে তারা সারাদিন ক্যান্ডি খাবে৷

বার্মান পরামর্শ দেন,”তারা যখন বড় হবে, নিত্যদিনের কাজকর্মের একটি খসড়া করে ফেলুন, যেগুলোর দায়িত্ব আপনি আপনার সন্তানকে দিতে চান। একটি তালিকা তৈরি করুন এবং দায়িত্বগুলো আপনার থেকে আপনার সন্তানের কাছে স্থানান্তরের জন্য তার সাথে কাজ করুন। তারা যত বেশি সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, ততো বেশি তাদের চর্চা হবে”।

আপনার শিশুকে বাস্তব জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন

সকল ভুল সিদ্ধান্তেরই ফলাফল রয়েছে, তার মধ্যে কিছু আবার অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকারক। আপনি যদি চান আপনার শিশু ক্ষতিকর কিছু করে বসার আগে ভালো মতো চিন্তা করুক, তাহলে তাকে সেসব কাজের বাস্তব জগতের পরিণাম সম্পর্কে অবহিত করুন।

বিজ্ঞাপণ

উদাহরণস্বরূপ, তাদেরকে ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপানের জীবন-হানিকারক প্রভাব সম্পর্কে ব্যাখ্যা করুন, এবং কীভাবে এসব আপনাদের বয়স্ক আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিত মানুষদের ক্ষতি করেছে, সেগুলো বর্ণনা করুন।

তবে, মা-বাবাদের এসব কাজের ফলাফলকে ভয় লাগানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সর্তক থাকতে হব, যেমন, আপনার সন্তানকে এটা বলা উচিত হবেনা যে,”তুমি যদি মাদক সেবন করো, তাহলে তোমাকে অবশ্যই জেলে যেতে হবে”। মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ সবসময় ভয়ের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয় না।

ভয়ভীতি দেখানোর কৌশল অনুসরণ না করে, আপনার সন্তানকে নিজের মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করুন। যদি তারা দায়িত্ববোধকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, তাহলে তারা বেশিরভাগই ভালো সিদ্ধান্ত নিবে, যেমন সিগারেটকে না বলা কারণ এক্ষেত্রে তারা নিজেদের স্বাস্থ্য ও নিজেদের কল্যাণের ব্যাপারে লক্ষ্য রাখবে।

আপনার সন্তানকে ভুল করতে দিন

সচরাচর, আপনি ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কারণ আপনি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শিখেছেন।

এই বিষয়টি উল্লেখ্য, কারণ অনেক পিতা-মাতায় প্রায় সময়ই যখন তারা মনে করেন যে তাদের সন্তান কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে তখনই তারা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেন। কিন্তু যদি মা-বাবারা সবসময়ই হস্তক্ষেপ করতে থাকেন, তখন দেখা যাবে তাদের সন্তান বরাবরই নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে মা-বাবার উপরই নির্ভর করে আছে।

সুতরাং, আপনি যদি চান যে আপনার সন্তান নিজ থেকেই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে জানবে, তাহলে তার জন্য সম্পূর্ণ পথপ্রদর্শক না হয়ে বরঞ্চ আপনি তাকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করুন। আপনি তাকে সাবধান করে দিতে পারেন যে কী হতে পারে যদি তারা কোনো একটি কাজ কোনো সুনির্দিষ্ট উপায়ে করবে চিন্তা করে, কিন্তু তাদেরকে অপরাধবোধে ভুগতে দিবেন না বা প্রতিবারই যখন কোনো ভুল করে তখন বলতে যাবেন না, “আমি বলেছিলাম তোমাকে, এমনটা হবে”।

তাদেরকে বুঝতে দিন যে আপনি তাদের বিশ্বাস করেন

বিশ্বাসের শক্তি অনেক অনেক বেশি। যদি আপনার সন্তান বুঝতে পারে যে আপনি তাকে বিশ্বাস করেন, সে চিন্তা করবে যে আপনি নিশ্চয়ই তার মধ্যে যথেষ্ট প্রামাণাদি দেখেছেন, যার কারণে এই বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। এটি তাকে আরো অনুপ্রাণিত করে যেন আপনাকে সন্তুষ্ট করতে পারে। যখন আমরা আমাদের সন্তানদের থেকে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করি না এবং ধরেই নি যে তারা কোনো না কোনো গন্ডগোল করবেই, তখন আসলে আমরা তাদের ভালো দিক গুলো এড়িয়ে যাই এবং তারা নিজেরা নিজেদের অকর্মণ্য ভাবতে শুরু করে।

মূল্যায়ন, পুনঃনিশ্চিত ও পুনঃমূল্যায়ন করা

যখনই আপনার শিশু তার সিদ্ধান্তকে বাস্তবতায় রূপ দেয়, তখন সেটিকে স্বাগত জানান। যদি তার সিদ্ধান্তটি ভালো কাজ করে থাকে, তাহলে তাকে এবং তার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করুন। আর যদি তার সিদ্ধান্তটি ভালো নাও হয়ে থাকে, তাহলে সেটি তার সাথে পুনঃমূল্যায়ন করুন – কোনো দোষ বা অভিযোগ দেওয়ার জন্য নয়, বরং এই অভিজ্ঞতা থেকে শিখে পরের বার সেটি কাজে লাগানোর জন্য। তাকে বোঝান যে সবাই এসব বাঁধা বিপত্তির সম্মুখীন হয় এবং যখনই তার আপনাকে প্রয়োজন হয়, আপনি সবসময়ই তার পাশে আছেন, এভাবেই শুরু করুন।

এর সাথে, এটাও মনে রাখতে হবে যে, আমাদের শিশুদের জন্য এটি বুঝতে পারা খুবই কঠিন যে কীভাবে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কারণ তাদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রোন্টাল কর্টেক্স এখনো বিকাশ লাভ করছে, পুরোপুরি গড়ে উঠেনি।

অবশ্যই, কোনো না কোনো সময় আমাদের শিশুদেরকে নিজেদের মতো করেই সবকিছু করতে দিতে হবে। কারণ আমরা পাশে থাকা অবস্থায় সে যদি এসব চর্চা করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে তবে আমরা পাশে না থাকা অবস্থায় কোন অপরিচিত পরিবেশে সে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

আপনার সন্তানকে বুঝতে দিন যে কোনো সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সঠিক না হলেও সমস্যা নেই

কিছু মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই তীক্ষ্ম বিচারক্ষমতাসম্পন্ন, যেখানে অনেকে আবার একদম সহজ সিদ্ধান্ত নিতেই চিন্তিত হয়ে পড়ে। যদি আপনার শিশু উপরে উল্লেখিত দ্বিতীয় শ্রেণীর হয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য জানা খুবই জরুরি যে কোনো সিদ্ধান্তই পুরোপুরি সঠিক নয়। ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভয় হয়তো আপনাকে নিস্ফল করে দিতে পারে, কিন্তু একদমই কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া আরেকটি ভুল সিদ্ধান্ত।

যখনই আপনার শিশু কোনো একটি সিদ্ধান্তের উপকারী ও অপকারী দিক সম্পর্কে বাছবিচার করতে শেখে, তখন তাকে বুঝিয়ে দিন সব সিদ্ধান্তেরই ভালো-মন্দ উভয় দিকই থাকে। সে হয়তো একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিলো এবং হতে পারে সে সিদ্ধান্তের ফলাফলের কিছু অংশ তার আশানুরূপ হলো না। কিন্তু এর মানে এই না যে তার নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো।

প্রশংসা করুন

শিশুর নেয়া যে কোন ভালো সিদ্ধান্তের প্রশংসা করুন। এতে সে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা পাবে। প্রশংসা করার সময় ঠিক কি কারণে প্রশংসা করছেন সেটা বলে দিন এবং একই সাথে তার করা কাজটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ভাবে প্রশংসা করুন। কারণ, প্রশংসা তখনই সবচাইতে ভালো কাজ করে যখন শিশু নির্দিষ্টভাবে বুঝতে পারে কি কারণে প্রশংসা করা হয়েছে। যেমন ধরুন সে একটি ছবি এঁকেছে, এখন তাকে, “তোমার আঁকা ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছে” এই বলে প্রশংসা না করে বরং আপনি বলতে পারেন, “তোমার ছবিতে সবুজ রঙের ব্যবহার আমার খুব ভালো লেগেছে।”

এছাড়া সন্তান যদি কোন একটি ভালো কাজ করে তাহলে তাকে শুধুমাত্র, “তুমি খুব ভালো একটি কাজ করেছ” না বলে বরং তাকে বুঝিয়ে বলুন যে এই কাজটি কেন ভালো কাজ। সেই সাথে অন্যান্য আরো কিছু ভালো কাজের উদাহরণ দিতে পারেন। যাতে করে আপনার সন্তান ভবিষ্যতে সেই কাজগুলোর প্রতিও বেশ উৎসাহী হয়ে উঠে।

নির্দিষ্ট করে না বললে শিশু বুঝতে পারেনা ঠিক কি কারণে আপনি খুশি হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে কোন আচরণটি পুনরাবৃত্তি করতে হবে সে সম্পর্কেও শিশু কোন ধারণা পায়না।এভাবে নির্দিষ্ট করে প্রশংসা করার আরেকটি উপকারিতা হচ্ছে এতে শিশু বুঝতে পারে আপনি তার প্রতি এবং তার কাজের প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন এবং আপনি কেয়ার করেন। আপনার এই আচরণ শিশুর আচরণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকরী।

আপনার সন্তানকে পারিবারিক বিষয়গুলোতে অন্তর্ভুক্ত করুন

আপনার সন্তানকে পরিবারের ছোট খাটো ব্যাপারে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই ভালো একটি ব্যাপার। প্রথমে ছোট থেকেই শুরু করুন, যেমন সপ্তাহের ছুটির দিনগুলি কীভাবে কাটাতে চায় তারা, এবং এভাবে কয়েকমাস চর্চার পর, পরবর্তী অবকাশের ব্যাপারে তারা কী ভাবছে সে সম্পর্কে তাদের মতামত নিন।

বিজ্ঞাপণ

একটি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর, আপনার শিশু আপনাদের ভ্রমণপথ ও ভ্রমণের জায়গার পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। তাদেরকে কয়েকটি বিকল্পের মধ্যে থেকে পছন্দ করতে দিন এবং একসাথে কথা বলে ঠিক করুন কোনটি আপনাদের পরিবারের জন্য সবচেয়ে ভালো হয়। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুবিধার্থে আপনারা একসাথে ফ্যামিলি ব্লগ বা ট্র্যাভেল ওয়েবসাইটগুলোও ঘুরে দেখতে পারেন।

তাদেরকে এমন প্রশ্ন করুন যেগুলো চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে

আপনি যদি আপনার শিশুকে এমন প্রশ্ন করেন যেগুলো সরাসরি হ্যা বা না তে উত্তর দেওয়া যাবেনা বরঞ্চ চিন্তা করে উত্তর দিতে হবে, তাহলে তারা এর উত্তর দেওয়ার জন্য ঐ সিদ্ধান্তটি বিশ্লেষণ করবে, এতে করে তারা বিকল্পসমূহের মূল্যায়ন করতে শিখবে এবং এর ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করতে শিখবে। কিছু ভালো প্রশ্ন হতে পারে, “এটার কোন বিষয়টা তোমার পছন্দ হয়েছে?”, “এটি কেন সবগুলোর থেকে ভালো?” ইত্যাদি।

কীভাবে টাকা সামলে রাখতে হয় সে ব্যাপারে আপনার শিশুকে শিক্ষা দিন

আপনি আপনার সন্তানকে যে কয়টি সেরা উপহার দিতে পারেন তার ভিতর একটি হচ্ছে তাকে ঠিক মতো টাকা সামলে রাখার শিক্ষা দেওয়া বা money management। আপনি যদি তাকে শেখাতে পারেন কীভাবে দায়িত্বশীলতার সাথে টাকা সামলে রাখতে হয়, তাহলে এই শিক্ষা তারা তাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অনুসরণ করবে। একটা পুরাতন প্রবাদ রয়েছে,”বোকার হাতে টাকা থেকে কী লাভ, যেহেতু তার জ্ঞানলাভের কোনো ইচ্ছায় নেই?

উদাহরণ দিয়ে পরিচালিত করুন

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে – “The best lessons in life are caught, not taught, by a child’s parents.”

আপনি নিজেই যদি এসব নীতিগুলো অনুসরণ না করেন, তাহলে আপনি কীভাবে আশা করতে পারেন যে আপনার সন্তান সেটা করবে? “আমি যা বলি তা কর, আমি যেমন করি তেমন করতে যেয়ো না”, এটি কখনোই শিশুর সাথে একটি ভালো কথোপকথনের শুরু হতে পারে না। প্রয়োজনে আপনার নিজের ভুলগুলো উদাহরণ হিসেবে দেখান যে এগুলো এরকম হওয়া উচিত ছিলো না এবং সামনে আরো ভালো কিছু করবেন কথা দিন তাকে। নিজেকে আপনার শিশুর সামনে অবনমিত করা এবং নিজের ভুলগুলো স্বীকার করা আসলে আপনাকে তার আরো কাছের অনুভব করাবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে শিশুর জীবনে সক্রিয়তার সাথে স্বাধীনতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে কিভাবে কোন কাজটি করতে চায়, শিখতে চায়- সেখানে বাধা দিলে তার বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাকে নিজের মতো করে কাজ করতে দেওয়া এবং সিধান্ত নিতে দেয়া তার যে কোন ধরণের গ্রোথ এবং ডেভেলপমেন্টের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment