সাইটোমেগালোভাইরাস (Cytomegalovirus) । গর্ভাবস্থায় কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ

সাইটোমেগালোভাইরাস (Cytomegalovirus) কি?

সাইটোমেগালোভাইরাস হার্পিস ভাইরাস প্রজাতির এক ধরণের ভাইরাস। গর্ভাবস্থায় এ জাতীয় ভাইরাস শিশুকে আক্রমণ করা ঘটনা খুব বেশি ঘটে। আমেরিকান একাডেমি অফ পিডিয়াট্রিক্স এর মতে, শতকরা ১% শিশু এই ভাইরাসের ইনফেকশন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে। এ অবস্থাকে জন্মগত সিএমভি (Congenital CMV) বলা হয়।

জন্মগত সিএমভি থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশুর খুব বেশি একটা সমস্যা হয় না তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্মের পরপর শিশু বেশ অসুস্থ হয়ে যেতে পারে যা পরবর্তীতে দীর্ঘ মেয়াদি বিবিধ সমস্যা তৈরি করতে পারে।

অন্যদের ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে শিশুকে সুস্থ মনে হলেও পরবর্তীতে শিশুর কানে কম কিংবা না শোনা এবং কয়েক মাস কিংবা বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে।

দ্য সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) এর এক হিসেব অনুযায়ী, ৭৫০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু জন্মগত সিএমভির কারণে বিভিন্ন অক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে অথবা পরবর্তীতে বিভিন্ন সমস্যার শিকার হয়।

আমি যদি সিএমভি ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হই, তাহলে আমার শিশুর মধ্যেও ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কতটুকু?

এটা নির্ভর করে আপনি প্রথম কখন এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন সেটার উপর। গর্ভধারণের পূর্বেই প্রায় ৫০ শতাংশ নারীদের শরীরে এই ভাইরাসের এন্টিবডি থাকে; অর্থাৎ তারা গর্ভধারণের অনেক আগেই এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। (এই ভাইরাস সংক্রমিত হলে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই তা তেমন কোন প্রত্যক্ষ লক্ষণ দেখায় না, যার ফলে আপনি এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হলেও আপনি ঠিক নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না বা বুঝতে পারবেন না৷)

অন্যান্য হার্পিস ভাইরাসের মতো, সিএমভি ভাইরাসও প্রাথমিক ইনফেকশনের পর সুপ্ত বা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। কিন্তু আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি দুর্বল থাকে, তাহলে এই ভাইরাস কিছু সময় পরে আবারো জেগে উঠতে পারে এবং ক্ষতিকর রিকারেন্ট সিএমভি ইনফেকশন ঘটাতে পারে।

সৌভাগ্যবশত, রিকারেন্ট সিএমভি ইনফেকশন শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম (দ্য সেন্টারস ফর ডিজিন কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন এর হিসেব অনুযায়ী, ১%) এবং বড় ধরণের জটিলতার সম্ভাবনা আরো তো কম। তাহলে বলা যায়, যদি আপনি গর্ভবতী হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগে সিএমভি ইনফেকশনের শিকার হন, তাহলে আপনার শিশুর শরীরে এই ভাইরাস যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

কিন্তু, আপনি গর্ভধারণের পর যদি প্রথম বারের মতো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাহলে শিশুর শরীরেও এই ভাইরাসের ইনকফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

পূর্বে কখনো এই ভাইরাসের শিকার হননি এমন নারীদের মধ্যে শতকরা ১ থেকে ৪ শতাংশ নারীরা গর্ভধারণের সময় প্রথমবারের মতো এতে আক্রান্ত হন। গর্ভধারণের সময় এই ভাইরাসের ইনফেকশন হলে গর্ভের শিশুর মাঝেও তা ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা  প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ।  এবং যদি তা-ই হয়, তাহলে এই ভাইরাসের আক্রমণে শিশুর স্বাস্থ্যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলার সম্ভাবনাও বেশি।

এই ভাইরাসের ইনফেকশন নিয়ে জন্মগ্রহণ করলে শিশুর স্বাস্থ্যে কেমন প্রভাব ফেলবে?

প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ নবজাতকদের ক্ষেত্রে, জন্মগত সিএমভি ভাইরাস ‘নীরব’ ইনফেকশন সৃষ্টি করে, অর্থাৎ জন্মের সময় তেমন কোন প্রত্যক্ষ উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা যায় না। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিশুই কোনরূপ সিএমভি জনিত জটিলতা ছাড়াই এই ভাইরাস থেকে পার পেয়ে যায়। (এদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক – প্রায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ শিশুর পরবর্তীতে কিছু কিছু সমস্যা হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কানে কম কিংবা না শোনার ঘটনা ঘটে থাকে)

বাকি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সিএমভি আক্রান্ত শিশুরা জন্মের সময় বিবিধ জটিল সমস্যা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকে, যেমন – কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অস্বাভাবিকতা, বৃদ্ধি কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক রকমের ছোট মাথা, জন্ডিস, প্লিহা ও যকৃত বড় হয়ে যাওয়া এবং ত্বকের অভ্যন্তরে রক্তপাতের ফলে শরীরের বিভিন্ন যায়গায় ফুসকুড়ি হওয়া প্রভৃতি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বেঁচে ফিরতে পারলেও ৯০ শতাংশ শিশুরা পরবর্তীতে  বিভিন্ন মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে যার মধ্যে কানে না শোনা, চোখে না দেখা, বুদ্ধিবৃত্তিক সঠিক বিকাশ না হওয়া এবং বিবিধ স্নায়বিক সমস্যা অন্যতম।

কিভাবে সিএমভি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারি?

সিএমভি ভাইরাসে আক্রান্ত এমন কোন মানুষের শারিরীক বিভিন্ন তরল যেমন – মুখের লালা, প্রস্রাব, মল, রক্ত, যোনিস্রাব, বুকের দুধ এমনকি চোখের পানি প্রভৃতি কোন সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে এলে, এগুলোর মাধ্যমে সিএমভি ছড়িয়ে পড়ে।

সিএমভি আক্রান্ত মানুষের সাথে একই প্লেটে খাবার ভাগ করে খেলে, ঠোঁটে ঠোঁটে চুমো খেলে অথবা যৌনমিলনে আবদ্ধ হলে এ ভাইরাস সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করে ফেলতে পারে। এছাড়াও আক্রান্ত মানুষের শারিরীক কোন তরল হাতে স্পর্শ হওয়ার পর সে হাত নাকে কিংবা মুখে দিলেও এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মায়ের শরীর থেকে কিভাবে এই ভাইরাস শিশুর শরীরে যায়?

গর্ভাবস্থায়, মূলত প্লেসেন্টার মাধ্যমেই এই ভাইরাস মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে যায়৷ এছাড়াও ডেলিভারির সময় সিএমভি ভাইরাস সংক্রমিত রক্ত বা স্রাব শিশুর শরীরের সংস্পর্শে আসলে অথবা জন্মের পর বুকের দুধ পানের মাধ্যমে এই ভাইরাস শিশুর মাঝে যেতে পারে।

তবে সাধারণত ডেলিভারির সময় কিংবা বুকের দুধ পান করানোর সময় যদি ভাইরাস শিশুকে আক্রমণ করে তাহলে ইনফেকশনের তেমন কোন লক্ষণ বা পরবর্তীতে শিশুর তেমন কোন বড়সড় ক্ষতি হয় না। তাই সিএমভি ভাইরাসে আক্রান্ত মায়েরা চাইলে ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি করাতেই পারেন এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুকে বুকের দুধও পান করাতে পারেন।

আমি সিএমভি ভাইরাস সংক্রমিত হলে কিভাবে বুঝবো?

টেস্ট না করালে আপনার এটা বোঝার তেমন কোন উপায় নেই। যদি কারো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব একটা দুর্বল না থাকে, তাহলে এই ভাইরাসের কোন লক্ষণ প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় না। যার ফলে তিনি সিএমভি ভাইরাস সংক্রমিত কিনা বা পূর্বে আদৌ কখনো সংক্রমিত হয়েছিল কিনা তা নিজ থেকে বলতে পারেন না।

তবে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম, তাদের মধ্যে কিছু কিছু উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়। উপসর্গগুলো অনেকটা মনোনিউক্লিওসিস এর লক্ষণগুলোর মতোই – জ্বর, গ্রন্থি ফোলা, গলা ব্যাথা প্রভৃতি। এছাড়াও আপনি অবসাদগ্রস্ত বা ক্লান্ত অনুভব করতে পারেন।

সিএমভি ভাইরাস ইনফেকশন নিশ্চিত করার জন্যে কিছু টেস্ট আছে তবে বেশিরভাগ গর্ভবতী নারীরাই এই টেস্টটা করান না (এমনকি অনেক রুটিন ব্লাড চেক আপেও এই টেস্টটা থাকে না)। তবে কিছু কিছু সময়ে ডাক্তার এ টেস্টটা করাতে বলেন। যেমন – যখন আল্ট্রাসাউন্ড টেস্টে সিএমভি ভাইরাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত কোন আলামত পাওয়া যায় বা আপনার মধ্যে সিএমভি ইনফেকশনের কোন লক্ষণ ধরা পড়ে অথবা আপনার সন্দেহ হয় যে আপনি সম্প্রতি এমন কারো সাথে দেখা করেছেন যার ফলে আপনার মনে হচ্ছে আপনার হয়তো টেস্টটা করানো দরকার।

আপনি যদি ছোট বাচ্চাদের সাথে অনেক বেশি সময় কাটান – বিশেষ করে আপনি যদি কোন ডে কেয়ার সেন্টারে কাজ করেন অথবা আপনার বর্তমান শিশুর দেখভাল করার জন্যে আপনাকে নিয়মিত ডে কেয়ার সেন্টারে অনেক বাচ্চাদের সাথে মিশতে হচ্ছে – তাহলে আপনি সিএমভি টেস্ট করানোর ব্যাপারে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে পারেন। কারণ অনেক ছোট শিশুদের মধ্যেই এই ভাইরাসটি থাকতে পারে এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ট মেলামেশার ফলে তা বেশ ছড়িয়েও পড়তে পারে।

আপনার যদি সন্দেহ হয় যে আপনি সিএমভি ইনফেকশনে সংক্রমিত, তাহলে ঝুকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা সামলাতে দক্ষ, এমন কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।

গর্ভাবস্থায় সিএমভি ভাইরাস সংক্রমিত হলে কি হবে?

যদি রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায় যে আপনার সাম্প্রতিক কোন কোন ইনফেকশন ছিল, সেক্ষেত্রে আলত্রাসাউন্ডের মাধ্যমে দেখা হবে যে গর্ভের শিশুর মধ্যে সিএমভি ভাইরাসজনিত কোন অস্বাভাবিকতা আছে কিনা। গর্ভের বাচ্চারও সিএমভি আছে কিনা তা জানার জন্য অ্যামনিওসিন্টেসিস করা হতে পারে। তবে তা আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারবেনা যে এই ভাইরাসের কারণে বাচ্চার কোন স্বাস্থ্যগত জটিলতা সৃষ্টি হবে কিনা।

গর্ভাবস্থায় সিএমভি ভাইরাস থেকে নিরাপদে থাকতে কি কি পদক্ষেপ নিতে পারি?

সিএমভি ভাইরাসের কোন নির্ভুল প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। তবে এই ভাইরাসসহ আরো অনেক ভাইরাস থেকে নিরাপদে থাকতে নিম্নোক্ত পন্থাগুলো অবলম্বন করতে পারেন:

নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশেষত- শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করে দেওয়ার পর অথবা শিশুর মুখের লালা হাতে লাগার পর তো অবশ্যই। সাবান ও পানি দিয়ে ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ড ধরে ভালোমতো ঘষে হাত ধুতে হবে।

ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের মুখে ও গালে চুমু খাবেন না। (আদর করতে মাথায় চুমো দিতে পারেন কিংবা জড়িয়ে ধরতে পারেন)।

এক প্লেটে একাধিক ব্যাক্তি খাবেন না। বিশেষত শিশুদের চুমুক দেওয়া গ্লাসের পানি খাবেন না।

আপনি যদি ডে-কেয়ার সেন্টারে কাজ করেন, তাহলে যদি সম্ভব হয়, দায়িত্বে কিছুটা পরিবর্তন আনুন- এক থেকে দেড় বছর বয়সী শিশুদের সাথে সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হয়, এমন দায়িত্ব এড়িয়ে চলুন। যদি তা ব্যাবস্থা করা সম্ভব না হয়, তাহলে নিজের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে একটু বেশি সচেতন হোন। এক বার ব্যাবহারযোগ্য ল্যাটেক্সের গ্লাভস পরিধান করে ডায়াপার পরিবর্তন করুন এবং এ কাজ সাড়ার পরপরই সাবান পানি দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে নিন।

এ বিষয়ে আরো তথ্য কোথায় পাবো?

দ্য সেন্টারস ফর ডিজিন কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশন (CDC) ওয়েবসাইটের CMV অংশে এই ভাইরাস নিয়ে সহজ এবং বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের সিএমভি নিয়েও বিশেষায়িত আলোচনা রয়েছে।

সবার জন্য শুভকামনা। 

Related posts