শিশুর শৃঙ্খলা শিক্ষার কিছু কৌশল

Last Updated on

১-২ বছরের শিশুর কিছু আচরণগত সমস্যা এবং তা প্রতিকারের কিছু টিপস

দুই বছর বয়সী শিশুদেরকে নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর মতো কঠিন কাজ খুব কমই আছে। হয়ত এই কারণেই “দুর্ধর্ষ দুই” “terrible twos” কথাটা দেশে-বিদেশে মা-বাবাদের জন্য একটা আতংকের নাম! এই বয়সী বাচ্চারা দেখতে যতই মিষ্টি হোক না কেন এদের জেদ দেখে মাঝে মাঝে অবাকই হতে হয়।  

যদিও এখনো তারা তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করার উপযোগী হয়নি তারপরও তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য এখন থেকেই চেষ্টা শুরু করাটা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদেরকে নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর এটাই সেরা সময়। অন্তত শিশু মনবিদ-দের এমনটাই ধারণা।

দুই বছর বয়সী শিশুদের কিছু সাধারণ ব্যবহার  

এই বয়সী বাচ্চারা এক একটা ছোট্ট পাওয়ার হাউস। অতটুকু একটা মানুষ দিনভর দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি, চিৎকার করে একাই পুরো বাড়ি মাথায় করে রাখে। যতক্ষণ না শরীর পুরোপুরি ক্লান্ত হয় এই উদ্যমের কোন শেষ নেই।

এই অতি এনার্জির কারনে কিন্তু এই বয়সী শিশুরা অল্পতেই অনেক বেশি এক্সসাইটেড হয়ে পরে। তখন ওরা না পারে কোন কাজে মন দিতে না পারে কাজটা ঠিক মতো করতে। খাওয়া, ঘুম, খেলা কোন কাজই ঠিকমতো হয় না। এই সময় ওদের ঐ জায়গা থেকে দূরে সরিয়ে আনলে মাঝে মাঝে দারুন কাজ দেয়।

এই বয়সী শিশুরা ওদের সব ইন্দ্রিয় দিয়ে পৃথিবীটাকে বোঝার চেষ্টা করে।বিশেষ করে ওদের স্পর্শ-ইন্দ্রিয় এই সময় সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। কিন্ত যেহেতু ওদের শারীরিক দিকটা তখনো পুরোপুরি ঠিক ভাবে বেড়ে ওঠেনি এবং তারা খুবই চঞ্চল, ফলে মাঝে মাঝেই হাতে ধরা জিনিসটা পরে যায় অথবা কখনো কখনো ঠিক ভাবে ধরতেই পারে না। তাই কোন জিনিসটা কেমন করে ধরতে হবে সেটা ওদেরকে শেখানো এ সময় খুবই জরুরী।

জোর গলায় “না” বলাটা ওদের এসময় সবচে প্রিয়। ভাববেন না ওরা এটা জেদ থেকে বলছে। বরং এটা ওদের নতুন বুঝতে শেখা স্বাধীনতার একটা বহিঃপ্রকাশ মাত্র। “না” বলে আপনার সামনে থেকে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়াটাও এসময় খুব দেখবেন। ওদের এই হইচই করে স্বাধীন ভাবে বেড়ে ওঠা দেখতে পারাটাও অনেক আনন্দের।

ওদের নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোটা ওদের বেড়ে ওঠার সাথে মানানসই হয়াটা খুবই জরুরী। এমন কিছু কৌশলে ওদের শেখাতে হবে যাতে সেটা ওদের স্বাধীন কিন্ত সামাজিক ভাবে বেড়ে ওঠার পরিপূরক হয়।

নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর সময় আপনাকে যে সব ব্যাপারগুলো সামলাতে হবে  

এই বয়সী বাচ্চাদের নিয়ে মা-বাবার একটা অভিযোগ খুব শোনা যায়। “আমার বাচ্চাটা টুকটাক মিথ্যা বলতেই থাকে”। শুনতে খারাপ লাগলেও ওরা কিন্তু আসলে মিথ্যা মনে করে কিছু বলে না। যেমনটা একটু আগেই বলছিলাম, নতুন শেখা স্বাধীন মনোভাবটা জাহির করতে গিয়ে ওরা সত্য মিথ্যার পার্থক্যটা বুঝে উঠতে পারেনা। আবার কখনো আপনার কণ্ঠে যদি ভয় জাগানো স্বর থাকে তাহলেও কিন্তু ওরা ভয়ে যা করছে তার উলটোটা বলে ফেলে। এটা শুধু মাত্র নিজেকে নিরাপদ রাখার ওদের একটা কৌশল মাত্র।

উদাহরণসরূপ, আপনি যদি তাকে জিজ্ঞেস করেন “তুমি কি বিস্কুট টি খেয়েছ?” সে হয়তো সাথে সাথে বলবে “না”। তার এই উত্তরের কারণ হতে পারে আপনার গলার স্বর বা আপনার শারীরিক ভঙ্গি যেটা দেখে সে মনে করতে পারে সে হয়তো কিছু ভুল করেছে। 

যেহেতু দুই বছর বয়সে ওদের মানসিক গঠন পুরোপুরি হয়ে ওঠেনা, তাই এসময়টাতে ওদের শব্দ ভাণ্ডারও থাকে খুব সীমাবদ্ধ। চাইলেও মনের কথাগুলো ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারে না। তখন ওরা চেষ্টা করে শরীরী ভাষা দিয়ে নিজেদের মনের কথাটা প্রকাশ করতে। আর সেটা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ওরা একটু হলেও কান্নাকাটি, হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে রাগ প্রকাশ করে ফেলে।

এ সময় শিশুরা একটু বিরূপ পরিস্থিতিতে পরলে অল্পতেই রেগে ওঠে। যেহেতু ওরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেনা তাই রাগ প্রকাশটাকেই একমাত্র উপায় মনে করে। কিন্ত এই রাগারাগি অন্যের ওপর কি প্রভাব ফেলবে সেটা ওরা বুঝতে পারে না। তাই মাঝে মাঝে দেখবেন রেগে গিয়ে জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ি, অন্যকে আঘাত করা বা কামড়ে দেয়ার মতো ব্যাপার গুলো করে ফেলে।

এই সব ছোট ছোট সমস্যা খুব সহজেই আপনি সামলাতে পারবেন যদি আপনার বাড়িতে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম সঠিক ভাবে মেনে চলা হয়। ওদেরকে ভাল আর খারাপ ব্যাবহারের পার্থক্য স্পষ্ট করে বার বার দেখিয়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা বোঝানোর সময় মুখের ও শরীরী ভাষা যেন কমবেশি একই থাকে।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর অতিরিক্ত রাগ ও বদমেজাজ (Temper Tantrum) কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন ]

শিশুদেরকে নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখানোর কৌশল গুলো

শিশুরা একজন অন্যজন থেকে আলাদা। তাই তাদের শেখানোর কৌশল গুলো এক নয়। কিন্ত কিছু কৌশল আছে যা মোটামুটি এবয়সী সব শিশুর জন্যই উপযোগী।

ওকে হাতে ধরে শেখান

সব বাচ্চারাই দূর থেকে বলার চেয়ে হাতে ধরে কিছু শেখালে তাতে বেশি গুরুত্ব দেয়। “ওটা এভাবে নয় ওভাবে ধরো” অথবা “এটা এইভাবে ধরে খেতে হয়”, এই কথা গুলো শুধু মুখে না বলে আপনি যদি ওকে হাতে হাতে দেখিয়ে দেন দেখবেন এটা ও অনেক বেশি মনে রেখেছে।

কখনো কখনো দেখবেন ও হয়ত কাউকে আঘাত করছে, সেটা চেনা মানুষ বা আপনার বাড়ির সামনের কুকুরটাও হতে পারে। বকাঝকা না করে ওকে বরং হাত ধরে দেখান কি করে চেনা মানুষের সাথে হাত মেলাতে হয়। দেখান কোন প্রাণীকে না মেরে বরং তাকে খাবার দিতে হয়। এই সব শিক্ষা ওর সবসময় মনে থাকবে।

ওর ব্যাবহারে বাড়াবাড়ি দেখলে ওকে সরিয়ে আনুন

কখনো কখনো কোন কিছু দিয়েই আপনার শিশুকে শান্ত করতে পারবেন না। যত যাই বলুন না কেন, ওর জেদ যেন কিছুতেই কমছে না। এটা দোকানে, শপিং মলে যে কোন স্থানেই হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল পন্থা হচ্ছে তাড়াতাড়ি কেনাকাটা শেষ করে ওকে ওই যায়গা থেকে সরিয়ে আনা।

এই চলে আসাটা ওকে এটা বুঝিয়ে দেবে যে কোথাও বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে সেখান থেকে নিয়ে আসা হবে। এটা ওকে ভবিষ্যতে নিয়ম মানতে সাহায্য করবে।

যে কোন ভাল কিছুর মন খুলে প্রসংশা করুন

ছোটরা প্রশংসা শুনলে অনেক বেশি উৎসাহিত হয়। ওদের খারাপ কোন কাজে একটু শাসন করলেও ভাল কাজের প্রসংশাটা হবে তার থেকে অনেক বেশি।

খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখা, ঠিক মত খাবার শেষ করা, অথবা কাপড়টা ঠিক মত পরা, এসব কাজের জন্য ওর সামনেই ওকে বলুন কাজটা কত ভাল হয়েছে। এতে তারা এসব কাজে আরও বেশি উৎসাহিত হবে কারণ তারা বুঝতে পারবে এসবে সে আপনার মনোযোগ পাচ্ছে।

মাঝে মাঝে একটু না দেখার ভান করাও কাজে দেয়

একটু বেশি মনোযোগ, একটু বেশি আদর পাবার জন্য অকারনে কান্না, রাগারাগি করাটা এই বয়সী বাচ্চাদের জন্য অদ্ভুত  কিছু নয়। সব কিছু ঠিকঠাক, তবু দেখবেন একটু নাকি কান্না, একটু অতিরক্ত আহ্লাদ করছে আপনার শিশুটি।

এসব ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ওদের এই ব্যাবহারগুলো পুরপুরি উপেক্ষা করুন। শুনতে একটু কঠোর মনে হলেও এটা ওদের ভবিষ্যতের জন্য ভাল একটা পদক্ষেপ। বাচ্চাদের এইসব ব্যাবহারে যদি আপনি ওদের মনোযোগ দেন তাহলে এই ব্যাবহার আর বাড়তি মনোযোগ আদায়ের জন্য এর পরেও করবে।

একটা সময় যখন ওরা এসব করে চুপ হয়ে যাবে তখন ওকে নিয়ে খেলতে পারেন বা বাইরে যেতে  পারেন। ম্যাসেজটা খুব পরিষ্কার, হইচই কান্নাকাটি করে বাড়তি মনোযোগ পাওয়া যাবে না।

কিছু সময়ের জন্য করুন “সময় বন্দী”

এই ব্যাপারটা বহুযুগ ধরেই শিশুদের শাসন করতে ব্যাবহার হচ্ছে। শুধু স্থান, কাল ভেদে নামটা ভিন্ন। পশ্চিমা দেশগুলোতে এটা “টাইম-আউট” নামে খুবই পরিচিত। কোন রকম বকাঝকা না করে বাচ্চাদের শাসনে এটা মায়েদের এক মস্ত হাতিয়ার।

আপনিও এটা করতে পারেন। ছোটোখাটো দুষ্টুমির জন্য ওকে বাড়িরই কোন ঘরে কিছু সময়ের জন্য আটকে রাখতে পারেন। কিন্ত একটা ব্যাপারে খুব সাবধান। ওই ঘরটা যেন ওর জন্য একদম নিরাপদ হয়। আঘাত পেতে পারে বা ওর ক্ষতি হতে পারে এমন কিছুই ওই ঘরে রাখা যাবে না।

সাধারানত বাচ্চাদের যত বয়স তত মিনিট আটকে রাখাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।তারমানে, আপনার বাচ্চার বয়স দুই বছর হলে ওকে খুব বেশি হলে দুই মিনিট আটকে রাখুন।

ভবিষ্যতের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে হলে

দুই বছর বয়সী বাচ্চারা সামনে যাই পাবে সেটাই নেড়েচেড়ে দেখবে। খেলার ছলে ওরা নিজেরাও বোঝেনা যে যেটা ধরছে সেটা ওদের জন্য নিরাপদ না বিপদজনক।

আপনি চাইলেই শিশুদের এই অতি কৌতূহলকে নিরাপদ করতে পারেন। ঘরের যে প্লাগপয়েন্ট গুলো আপনার শিশুর নাগালে সেগুলোকে সেফটি-ক্যাপ দিয়ে ঢেকে দিন। ওদের নাগালে কোন ছোট জিনিস থাকলে সেগুলো সরিয়ে রাখুন। এমন কিছু যেটা ওদের শরীরের অপর পড়ে ওদের ক্ষতি হতে পারে, সেইসব জিনিসপত্র সরিয়ে রাখুন। বাড়ির ভেতর ও আশপাশ আপানর শিশুর জন্য নিরাপদ রাখতে পারলে ওর কৌতূহলী বেড়েওঠা মানসিক বিকাশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে।

শিশুর সারদিনের কাজগুলোকে সময় অনুযায়ী ভাগ করে ফেললে ছোটবেলা থেকেই ওরা একটা নিয়মে বড় হবে। ঘুম, খাওয়া, খেলা এসব একটা নির্দিষ্ট সময়ে করার অভ্যাস করলে আপনার শিশুটি জেনে যাবে দিনের কখন কোন কাজটা করতে হবে।

একটা কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়ার ব্যাপারটা আপনার শিশুকে স্পষ্ট করে বলে দিন। মাঝের সময়টাতে আপনার শিশুকে আগাম জানিয়ে দিন যে আর কিছুক্ষণের মধ্যে ওকে হাতের কাজ শেষ করে পরের কাজটা শুরু করতে হবে। “আর পাচ মিনিট পরে খেলা শেষ করে গোসলে যেতে হবে” এইধরনের সতর্কবাণী ওকে একটা কাজ ঠিক মত শেষ করে পরের কাজ শুরু করার একটা আগাম বার্তা দেবে।

চেষ্টা করুন আপনার শিশুকে তখনি বাইরে কোথাও নিয়ে যেতে যখন ওর মন ও শরীর সবচেয়ে ভাল আছে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল সময়টা হল যখন ওর পেট ভরা থাকবে আরে যখন ওর পরিপূর্ণ বিশ্রাম হবে। ক্ষুধার্ত অথবা ক্লান্ত শিশু নিয়ে বাইরে কোথাও যাওয়াটা মা-বাবা ও অন্যসবার জন্য একটা বিভীষিকাময় সময়!

শিশুরা দেখে দেখে সব কিছু শেখে। তাই ওদের সামনে এমন কিছু করবেন না যেটা ওর মনের ওপর প্রভাব ফেলে। আপনি কাওকে সম্মান করলে আপনার বাচ্চাও তাই করবে। ঠিক একিভাবে আপনি কাওকে অসম্মান করলে সেটা সেও আপনার কাছ থেকে শিখবে। তাই ওকে ছোট থেকেই শেখান “প্লিজ”, “সরি”, আর “ধন্যবাদ” দেয়া। আর এ কাজগুলো আপনি নিজে করেই তাকে শেখানোর চেষ্টা করুন।

[ আরও পড়ুনঃহামাগুড়ি দেয়া ও সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর নিরাপত্তা ]

শিশুর সাথে কথা বলা

ছোটদের খুব বেশি কথা শোনার ধৈর্য একদমই থাকে না। তাই ওদের যাই বলুন না কেন, খুব সংক্ষেপে বলুন। “মেরো না, লাগছে” অথবা “এভাবে ছুড়ো না, ভাঙবে” এসব কথাগুলো ছোট হলেও ওদের কাছে মূলভাবটা ঠিকই পৌঁছে যাবে।

মাঝে মাঝে একি কথা এত বার বলতে হয়ে যে নিজেরই মেজাজ সামলানো কঠিন হয়ে পরে। কিন্ত এমন সময়ে ধৈর্য হারাবেন না। যদি খুব বেশি মনে হয়ে তাহলে নিজেই একটু ব্রেক নিন। আস্তে আস্তে দম নিন আর দম ছাড়ুন। এক থেকে দশ গুনুন। যে ভাবেই হোক আগে নিজেকে শান্ত করুন। এর পর না হয় শিশুর দিকে নজর দেবেন।

একটা শিশুর যত্ন ও তাকে ঠিক ভাবে লালন-পালন করা মোটেও সহজ কাজ নয়। মা-বাবা হিসেবে আপনার এমনিতেই এই কঠিন কাজটা দারুন ভাবে করছেন। কিন্ত তারপরও মাঝে মাঝে না চাইতেও শিশুর দুরন্তপনা সামলাতে গিয়ে নিজেরও মেজাজ ঠিক থাকেনা। আপানার শিশুর এই দুরন্তপনা যাতে ওর বিকাশে কোন বাধা না দেয় সেটা নিশ্চিত করতেই আমাদের এই টিপস গুলো।  

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts