শিশুর ডেঙ্গু : কারণ, লক্ষণ ও করণীয়

ডেঙ্গু জ্বর কি?

ডেঙ্গু (DEN-gee) জ্বর গ্রীষ্মকালীন এক ধরণের রোগ, ভাইরাসবাহী মশার কামড়ে এই অসুখ হয় এবং মশার মাধ্যমেই এ রোগ বিস্তার লাভ করে।  এই ভাইরাসের কারণে জ্বর, মাথাব্যথা, ফুসকুড়ি এবং সারা শরীরে প্রচুর ব্যাথা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডেঙ্গুজ্বর তত একটা সিরিয়াস হয় না এবং এক সপ্তাহ পরে আপনা আপনিই চলে যায়।

উন্নত ও শীতপ্রধান দেশগুলোতে ডেঙ্গুজ্বর খুব একটা দেখা যায় না; বরং অনুন্নত, উন্নয়নশীল এবং গ্রীষ্মপ্রধান দেশেই এই রোগের প্রকোপ বেশী দেখা যায়৷

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ লোকের সাধারণ কিংবা ভয়াবহ মাত্রার ডেঙ্গুজ্বর হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। ২০০০ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে প্রায় ৫৩ হাজার ৬৯০ জন ভর্তি হন যার মধ্যে ২৯৯ জন মারা গিয়েছে- এমনটাই জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আকতার। (সূত্র)

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, খড়া, বন্যা, জলোচ্ছাসের কারণে মশার উপদ্রুপ বেড়ে যাওয়াকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেঙ্গু জ্বর কেন হয়?

ডেঙ্গুজ্বর মূলত একই ধরণের চারটি ভাইরাসের কারণে হয়। এডিস জাতের মশা এই ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে। গ্রীষ্মপ্রধান এবং প্রায় গ্রীষ্মপ্রধান জলবায়ুর দেশগুলোতে এই মশা বেশী দেখা যায়।

যখন এডিস মশা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত কোন ব্যাক্তিকে কামড়ায়, সেই মশা তখন ভাইরাসটা শরীরে নিয়ে নেয় এবং ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে। সেই ভাইরাসবাহী মশা যখন কোন সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ায়, সেই ব্যাক্তির ডেঙ্গুজ্বর হওয়ার আশংকা থাকে৷ মশা না কামড়ালে ডেঙ্গুজ্বর একজন মানুষের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে যেতে পারে না।

মাঝে মাঝে ডেঙ্গুজ্বর সাধারণ একটি জ্বর থেকে ভয়াবহ ডেঙ্গু হেমোরাজিক ফিভার (DHF) এ রূপ নিতে পারে। DHF বেশ ভয়াবহ হয় এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে এবং এ রোগীর অবশ্যই সঠিক উপায়ে চিকিৎসা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলি কি কি?

ছোট শিশু এবং বিশেষত যাদের প্রথমবার ডেঙ্গুজ্বর হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই জ্বর কিছুটা হালকাই হয়। তবে বড় শিশু এবং পূর্বে যাদের একবার এ জাতীয় ইনফেকশন হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মাঝারি থেকে ভয়াবহ মাত্রার লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বরের কিছু লক্ষণ হল-

  • প্রচন্ড জ্বর। জ্বরের মাত্রা ১০৫° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) পর্যন্ত হতে পারে।
  • চোখের ভেতরে, হাড়ের জোড়ায় জোড়ায়, মাংসপেশিতে অথবা হাড়ে ব্যাথা।
  • ভয়াবহ মাথাব্যথা
  • শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুসকুড়ি
  • নাক অথবা দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তপাত
  • অল্প আঘাত কিংবা তুচ্ছ কারণে আঘাত লাগলে থেতলানোর মত দাগ হয়ে যাওয়া

শরীরের হাড়ে এবং বিভিন্ন যায়গায় যায়গায় ব্যাথার কারণে ডেঙ্গুজ্বরকে ‘হাড় ভাঙ্গা জ্বর’ও ( (breakbone fever) ডাকা হতো। এই জ্বরের কারণে আসলে হাড় ভেঙে যায় তা না, কিন্তু প্রচন্ড ব্যাথার কারণে অনেকটা তেমনই অনুভূত হয়।

ডেঙ্গু জ্বর কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে?

ভাইরাসবাহী এডিস মশা কামড় দেওয়ার চারদিন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণগুলো দেখা দেওয়া শুরু হতে পারে যা আপনার শরীরে দুই থেকে সাতদিন পর্যন্ত থাকতে পারে।

জ্বর কিছুটা কমে আসার পর রক্তপাতের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং অন্যান্য উপসর্গগুলো খারাপ হওয়া শুরু করতে পারে; গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা যেমন বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, পেটের বিভিন্ন যায়গায় ব্যাথা; শ্বাস প্রশ্বাস জনিত সমস্যা যেমন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বর যদি DHF এ রূপ নেয় এবং ঠিকঠাক চিকিৎসা না হয় সেক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশন, বেশী রক্তপাত এবং হুট করে রক্তচাপ কমে যাওয়া ইত্যাদি হওয়া শুরু করে। এই উপসর্গগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে এবং অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

যে চার ভাইরাসের কারণে ডেঙ্গু হয়, কারো যদি একবার সেগুলোর কোন একটির কারণে ডেঙ্গুজ্বর হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে সে আর এই ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হবে না। তবে অন্য তিন ভাইরাসের যে কোনটির দ্বারা ডেঙ্গুজ্বর হওয়ার ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যায়।

কিভাবে ডেঙ্গুজ্বরের রোগনির্ণয় করা হয়?

 আপনার যদি মনে হয় যে আপনার শিশুর ডেঙ্গু হয়েছে, সেক্ষেত্রে সাথে সাথেই ডাক্তারকে তা জানান। এছাড়া শিশু যদি ডেঙ্গুপ্রবণ কোন এলাকায় সম্প্রতি ঘুরতে যায় এবং তার মধ্যে মাথা ব্যাথা, জ্বর প্রভৃতি দেখা যায়, তাহলেও ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।

রোগ নির্ণয়ের জন্যে ডাক্তার শিশুকে ভালোমতো পরীক্ষা করবেন এবং উপসর্গগুলো খেয়াল করবেন। শিশুর মেডিকেল হিস্টোরি দেখবেন এবং রক্ত পরীক্ষা করতে বলবেন। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই মূলত জানা যায় ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে কি না।

ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা কি?

ডেঙ্গুজ্বরের আসলে নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। হালকা ধরণের ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে বেশী বেশী পানি খাওয়ার মাধ্যমে ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ করা এবং অনেক বেশী বিশ্রাম নেওয়াই এর চিকিৎসা।

ব্যাথানাশক ঔষধ যেমন এইসটামিনোফেন খাওয়ার মাধ্যমে মাথা ব্যাথা সহ ডেঙ্গুর কারণে পুরো শরীরে যে ব্যাথাগুলো হয়, সেগুলো অনেকটা লাঘব করা সম্ভব। তবে ব্যাথানাশক হিসেবে অবশ্যই এসপিরিন কিংবা ইবোপ্রোফেন জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা যাবে না কারণ এর প্রভাবে রক্তপাত ঝুঁকি বেড়ে যায়।  

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুজ্বর এক থেকে দুই সপ্তাহ স্থায়ী থাকে এবং তেমন কোন সমস্যা ছাড়াই চলে যায়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে উপসর্গগুলো ভয়াবহ রূপ ধারণ করলে কিংবা অবস্থার অবনতি হতে থাকলে অবশ্যই দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। এটা খুব সম্ভবত DHF এর লক্ষণ, যার দ্রুত এবং ভালো চিকিৎসা প্রয়োজন।

ভয়াবহ মাত্রার ডেঙ্গু হলে, বমি বা পায়খানার মাধ্যমে শরীর থেকে যে পানি বেড়িয়ে গেছে তা পূরণ করতে হাসপাতালের ডাক্তার ধমনীর মাধ্যমে আইভি স্যালাইন এবং ইলেক্ট্রোলাইট জাতীয় পানীয় দিতে পারেন।

যত তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় করা হয়, তত ভালোভাবে চিকিৎসা করা যায়। রোগীর অবস্থা যদি বেশীই খারাপ হয়, কোন কোন ক্ষেত্রে রক্ত পরিসঞ্চালন অর্থাৎ নতুন রক্তের প্রয়োজন হতে পারে।

ডেঙ্গু যে মাত্রারই হোক না কেন, অবশ্যই তাকে মশার কামড় থেকে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করতে হবে। এর মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

ডেঙ্গু জ্বর কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?

ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে মূলত কোন ভ্যাক্সিন পূর্বে ছিল না। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশে সিওয়াইডি-টেট্রাভ্যালেন্ট নামে ডেঙ্গুপ্রতিরোধী একটি ভ্যাক্সিন এনেছে স্যানোফি-অ্যাভেন্টিস। যাদের আগে একবার ডেঙ্গু হয়েছে, এমন ৯ থেকে ৪৫ বছর বয়সী মানুষদের যদি এই টিকা দেওয়া হয় তাহলে ৯৪ শতাংশ মানুষের পরবর্তীতে মারাত্মক মাত্রার ডেঙ্গুজ্বর হবে না বলেই দাবি করে তারা (সূত্র) । তবে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ ব্যাবস্থা হলো- ডেঙ্গু আক্রান্ত এডিস মশার কামড় থেকে দূরে থাকা।

নিচের ব্যাপারগুলো নিশ্চিত হোন:

* দরজা ও জানালায় স্ক্রীন ডোর (পাতলা জালের দরজা) ব্যাবহার করুন। স্ক্রীন ডোরের কোন যায়গা ছিড়ে গেলে দ্রুত সাড়িয়ে ফেলুন এবং যেসব দরজা জানালায় স্ক্রীন ডোর নেই, সেগুলো বন্ধ রাখুন।

* ডেঙ্গুপ্রবণ সময়ে শিশু বাইরে গেলে ফুল হাতা জামা, ফুল প্যান্ট, মুজা জুতা পড়িয়ে বের হতে দিন এবং রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন।

* মশা নিরোধক স্প্রে ব্যাবহার করুন (অবশ্যই শিশুদের জন্যে উপযোগী এমন)। DEET অথবা লেবু ইউক্যালিপটাস তেল রয়েছে এমন স্প্রেই পছন্দ করুন।

* শিশুর বাইরে খেলাধুলার সময় কমিয়ে দিন। বিশেষত যখন মশারা বেশী সক্রিয় থাকে অর্থাৎ ভোর কিংবা সন্ধ্যায় শিশুদেরকে একটু নিরাপদে রাখুন।

* মশা জন্মানোর জায়গাগুলো নষ্ট করে দিন৷ মূলত জমে থাকা পানিতেই মশা ডিম পাড়ে। তাই বাসার আশেপাশের কন্টেইনার কিংবা নষ্ট টায়ারে জমে থাকা পানিই হয় এর ডিম পাড়ার স্থান। আর তাইতো টবের পানি, পাখির খাওয়ার পানি, কুকুরের খাবারের বাটি এগুলো অন্তত সপ্তাহে একবার উলটে পাল্টে দেওয়া উচিত।

সর্বোপরি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে, ঘরে শিশুকে মশারির ভেতরে রেখে সর্বোপরি ডেঙ্গুপ্রবণ সময়ে একটু সতর্কতা অবলম্বন করলেই শিশুকে অনাকাঙ্ক্ষিত এই জ্বর থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts