কিভাবে আপনার শিশুকে সুখী হতে শেখাবেন (১২ থেকে ২৪ মাস)

Updated on

একটি শিশু ঠিক কেন খুশি হয়, এটা জানলে আপনি বেশ অবাকই হবেন! শিশুর পরিপূর্ণ বৃদ্ধি ও খুশি থাকার উপর গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন, “আদতে একটি শিশুর খুশি কিন্তু এমন কিছু নয় যেটা আপনি তাকে দিচ্ছেন বরং এটা এমন কিছু যেটা আপনি তাকে শেখাচ্ছেন”

মানসিক বিশেষজ্ঞ ও The Childhood Roots of Adult Happiness বইয়ের লেখক এডওয়ার্ড হ্যালোওয়েল শিশুর সব ইচ্ছে পূরণ করা সম্পর্কে বলেন, একটি শিশুকে যদি তার ইচ্ছেমত সকল খেলনা কিনে দেয়া হয় এবং তার মন খারাপের যাবতীয় বিষয়গুলো থেকে তাকে আগলে রাখা হয়, তাহলে এই ধরনের শিশুরা সাধারণত উদাস, শঙ্কিত এবং আনন্দহীন হয়ে কৈশোরে পদার্পণ করে।

শিশুকে এমন কিছু শেখানো   উচিত যার উপর সে সারাজীবন নির্ভর করতে পারবে অর্থাৎ তাকে মানসিক ভাবে পরিপক্ব করে তুলবে। হ্যালোওয়েল আরো বলেন, “মূলত একটি শিশুর খুশি বাহ্যিক কোন কিছু দিয়ে নির্ধারণ করার বিষয় নয় এবং এটা সম্পূর্ণ তার মানসিক ব্যাপার।” 

আপনি হয়ত একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন এই ভেবে যে আপনি শিশুর মানসিক বিষয়গুলোর প্রতি সঠিকভাবে খেয়াল রাখতে পারবেন কি না! আপনার জন্য খুশির সংবাদটি হল, না! শিশুর মানসিক পরিপক্বতা এবং তার জ্ঞানের বিকাশের জন্য আপনাকে কোন মানসিক বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। ধৈর্য এবং নমনীয়তার মাধ্যমে যে কোন পিতামাতা শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে হাসিখুশি থাকা নিশ্চিত করতে পারবেন।

[ আরও পড়ুনঃ কিভাবে আপনার শিশুকে সুখী হতে শেখাবেন (জন্ম থেকে ১২ মাস) ]

শিশুর আবেগগুলো বুঝতে শিখুন

শিশু যখন কোন কারণে খুশি হচ্ছে অথবা তার মন খারাপ হচ্ছে এটা সে হয়ত খুব সহজেই আপনাকে বোঝাতে সক্ষম হয়। আপনি যখন অফিস থেকে বাসায় ফিরে আসেন তখন তার মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছে অথবা সে যখন তার প্রিয় কোন কিছু খুঁজে পাচ্ছে না দেখবেন তার মুখটা একদম মলিন হয়ে গেছে। তবুও আপনি হয়ত ভাবছেন, আসলেই কি আপনার শিশু সার্বিকভাবে হাসিখুশি আছে কি না?

হাসিখুশি শিশুর লক্ষণগুলো খুব সহজেই বোঝা যায়ঃ একটি হাসিখুশি থাকা শিশুর মুখে সবসময় হাসি থাকে, সে খেলাধুলা করে, সে সবকিছুতেই কৌতূহল দেখায়, অন্যান্য শিশুদের সাথে সহজে মিশতে পারে এবং সবসময়ে তাকে হাসিখুশি রাখার জন্য বাবা মা’কে চেষ্টাও করে যেতে হয় না।

হ্যালোওয়েল বলেন, একইভাবে এটাও খুব সহজেই বুঝা যায় যদি শিশুটি হাসিখুশি না থাকে। যেমন শিশুটি সবকিছুতেই একটু লুকিয়ে থাকছে, চুপচাপ থাকছে, ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করছে না, খেলছেনা, অনেক প্রশ্ন করছেনা এবং অন্যান্য শিশুদের সাথেও ভালোভাবে মিশছেও না আবার খুব কম কথা বলছে এবং মুখ মলিন হয়ে থাকছে।

আপনার শিশুটি যদি স্বাভাবিকভাবেই একটু লাজুক হয় অথবা ইন্ট্রোভার্ট অর্থাৎ অন্তর্মুখী হয় তাহলে সেই শিশু সবসময় হাসবে না এবং সবার সাথে মিশবেও না ঠিকমত। তবে এর মানে কিন্তু এই নয় যে আপনার শিশু সুখী নয়।

লাজুক থাকা আর মন খারাপ থাকা দুটো বিষয় একদমই আলাদা আর তাই শিশুর হাসিখুশি না থাকার লক্ষণগুলো বুঝতে আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে এবং শিশুর প্রতি মনযোগী হতে হবে।

এ সম্পর্কে হ্যালোওয়েল বলেন, শিশুর আচার আচরণের মধ্যে যদি খুব বেশি কোন পরিবর্তন আসে তাহলে সতর্ক হন। আপনার শিশু যদি বেশীরভাগ সময়েই একা একা থাকে এবং তার মধ্যে সর্বদা একটা ভীতি কাজ করতে থাকে তার মানে হল, শিশুর এমন কোন সমস্যায় ভুগছে যার প্রতি আপনার সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

শিকাগোতে অবস্থিত সেইন্ট লুক্স মেডিক্যাল সেন্টারের সাইকোলজি প্রফেসর, শিশুদের অনুভূতি প্রকাশের কিছু লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন। আপনিও আপনার শিশুর মধ্যে এই লক্ষণগুলো চিহ্নিত করতে পারবেন। ‘আগ্রহ’ এবং ‘আনন্দ’ এই দুটি হল শিশুদের মধ্যে খুশি থাকার চিহ্ন আর অপরদিকে খুশি না থাকার চিহ্নগুলো হল কষ্ট, রাগ, ভয় ইত্যাদি। 

বেশিরভাগ বাবা মা’রা মনে করে থাকেন যে একটু ভীত সন্ত্রস্ত শিশু অথবা অল্পতেই বিপর্যস্ত হয়ে যায় এমন শিশুরাই আদতে সুখী শিশু নয়। তবে হলিঙ্গার এর মতে, বাবা মা’রা আসলে এটা বুঝতে পারেন না যে রেগে যাওয়াটা কিন্তু শিশুর এক ধরনের আবেগের বহিঃপ্রকাশ। এই রেগে যাওয়ার মাধ্যমে শিশু বুঝাতে চায় যে, সে আসলে খুশি নয়।

হলিঙ্গার এ সম্পর্কে আরো বলেন, “যে কোন বয়সেই, রেগে যাওয়াটা আসলে অতিরিক্ত মন খারাপের বহিঃপ্রকাশ”। যখন আপনার শিশু তার ভাইকে আঘাত করছে অথবা তার খেলনা ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে তখন আপনাকে বুঝতে হবে, আপনার শিশুর খুবই মন খারাপ এবং তার আবেগ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা।

আপনার শিশু হয়ত তার নিজস্ব কিছু উপায়ে আপনাকে বোঝাতে চাচ্ছে যে সে একটু খারাপ সময় পার করছে। কোন শিশু হয়ত চুপচাপ থাকে, কেউ রেগে যায়, কেউ হয়ত অতিরিক্ত রেগে যায় অথবা সে আপনাকে খুবই বিরক্ত করা শুরু করে। আপনার শিশুর রেগে যাওয়ার ধরন সম্পর্কে পুরোপুরি যদি আপনি বুঝতে পারেন, তাহলে তার মন খারাপের লক্ষণগুলো আপনি আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।

আপনার শিশুর সাথে হাসিখুশি থাকুন ও মজা করুন

যদিও সবসময় আনন্দের মধ্যে থাকা এবং শুধু আইসক্রিম খাওয়া হয়ত প্রতিটা শিশুর একমাত্র লক্ষ্য মনে হতে পারে, তবু আপনার শিশুকে ঠিক কি দিলে সে খুশি হবে সেটা আসলে অনেক সহজ। যে জিনিসটা দিলে সে সবচাইতে খুশি হবে সেটা হল—আপনি নিজে, অর্থাৎ আপনি শিশুর সাথে যত বেশি সময় দিবেন সে তত বেশি খুশি থাকবে।

হ্যালোওয়েল এই সম্পর্কে বলেন, “আপনি নিজেই শিশুকে খুশি রাখার প্রথম ধাপ। আর তাই শিশুর সাথে বেশি সময় অতিবাহিত করুন, আর সাথে খেলুন” এ সম্পর্কে তিনি আরো উপদেশ দেন, “শিশুর সাথে সময় কাটাতে আপনার যদি ভালো লাগে, তার মানে শিশুরও ভালো লাগছে। আর এই ধরনের সুন্দর সম্পর্ক যদি আপনি শিশুর সাথে তৈরি করে ফেলতে পারেন তাহলে আপনার এই পদক্ষেপটিই শিশুর হাসিখুশি ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করবে”   

শিশুর খেলাধুলা তার আনন্দের অন্যতম একটি উৎস। এছাড়াও খেলাধুলার মাধ্যমেই শিশু তার ভবিষ্যৎ জীবনে হাসিখুশি থাকার দক্ষতা অর্জন করে থাকে। কোন নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নয় এমন খেলা শিশুকে এটা বুঝতে সাহায্য করে যে, তার নিজের কাছে আসলে কি ভালো লাগে—ব্লক দিয়ে টাওয়ার বানানো, খেলনা জন্তু দিয়ে ডাক্তার ডাক্তার খেলা ইত্যাদি তার ভবিষ্যৎ আগ্রহ নির্ধারণ করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।  

আপনার শিশুকে তার নতুন দক্ষতাগুলো আয়ত্তে আনার ব্যাপারে সহযোগিতা করুন

শিশুকে হাসিখুশি ভাবে বেড়ে ওঠানোর ব্যাপারে হলওয়েল একটা আশ্চর্যজনক বিষয় সম্পর্কে ধারনা দিয়েছেন, আর সেটা হল—শিশু যখন কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে অর্থাৎ নতুন কিছু শিখে নেয় তখন সে খুবই খুশি হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, শিশু যখন আপনার দিকে ঠিকমত বল ছুঁড়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে ভালোভাবে ব্যাপারটা আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারে তখন সে নিজের এই সফলতায় খুবই খুশি হয়।

এছাড়াও শিশু তখন তার এই সফলতার বিষয়ে অন্যদের উৎসাহ এবং পুরস্কার নিতে খুবই পছন্দ করে। সবচাইতে জরুরী বিষয়টি হল, তখন তার মধ্যে উপলব্ধি হয় যে তার জীবনের ছোট্ট গণ্ডিটিতে তার নিয়ন্ত্রণ আছে। আর সে এটাও বুঝতে শিখে, বারবার চেষ্টার মাধ্যমে সে যে কোন কিছুই করে ফেলতে পারবে। বিভিন্ন গবেষণায় এটা উঠে এসেছে যে, এই শিক্ষাই তার আবেগ নিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে তার ভবিষ্যৎ সময়ে হাসিখুশি থাকার দিগন্ত উন্মোচিত করে।

হলওয়েল আরো একটা ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলেছেন, ঠিক বড়দের মত করে ছোটদের ক্ষেত্রেও শিশুর নিজের আগ্রহের বিষয় নিয়ে তাকে চেষ্টা করতে দেয়া উচিৎ। তা না হলে, কোন কাজে সফলতা আসলেও শিশু তেমন একটা খুশি হবে না। 

ওহাইও শহরের দুই সন্তানের জননী রেবেকা মার্কস তার ছেলে জ্যাচারি’র কন্সট্রাকশনে আগ্রহের বিষয়ে বলেন, “সে সবসময় নতুন কিছু তৈরি করতে খুবই পছন্দ করে এবং সে তার বাবার সাথে এই ধরনের অনেক কাজ করে থাকে। এগুলো করার মাধ্যমে নিজের প্রতি তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে ওঠে। আর আমরা সবসময়েই তাকে তার ইচ্ছে অনুযায়ী এইসব কাজে আরো মনযোগী হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করি। কেননা এই প্রতিভা তার মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবেই আছে এবং এই জন্যই এসব কাজ করে সে খুবই আনন্দ পায়।”

শিশুর স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলোতে উৎসাহ দিন

পরিমিত ঘুম, ব্যায়াম এবং সমৃদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার আমাদের ভালো থাকার জন্য জরুরী, বিশেষ করে শিশুদের জন্য তো আবশ্যিক একটা বিষয়। শিশুরা কিন্তু এমনিতেই প্রচুর ব্যায়ামের মধ্যে থাকে। আর তাই আপনি যদি আপনার শিশুকে প্রচুর পরিমাণে দৌড়ানোর জন্য সুযোগ করে দেন তাহলে এটা তার মনকে প্রফুল্ল রাখবে।

এছাড়াও আপনার শিশুর দৈনন্দিন রুটিন সম্পর্কে একটু মনযোগী হতে হবে। কেননা কিছু শিশুর আছে যে কোন ধরনের নতুন কিছুর সাথেই মানিয়ে নেয়। অপরদিকে, কিছু শিশু আছে যারা খুবই সজীব তবে তারা নির্দিষ্ট একটা রুটিন অনুসরণ করতেই বেশি খুশি থাকে। কারণ এতে করে তারা বুঝতে পারে, কোনটার পর কোনটা করতে হবে।  

এছাড়াও কোন বিশেষ খাবারের সাথে শিশুর মানসিক অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে কি না, এ ব্যাপারেও আপনাকে একটু সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা কিছু বাবা মা’রা এটা দেখেছেন যে সুগার তাদের শিশুর শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হলেও এটার কারণে অনেক সময় শিশু একটু আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে। আর খাবারের যে কোন প্রকার এল্যার্জিও শিশুর আচার আচরণের উপর বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। 

শিশুকেই তার নিজের কিছু সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করতে দিন

কখনো বাবা মা’রা এটা মনে করেন যে, শিশু যে কোন ধরনের সমস্যায় পড়লে বাবা মা’রা যদি নিজ থেকেই এগিয়ে গিয়ে সমাধান করে দেন তাহলে নিশ্চয়ই শিশু খুব হাসিখুশি থাকবে। কিন্তু নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ মেডিসিনের লেকচারার মনস্তত্ববিদ ক্যারি মাসিয়া-ওয়ার্নারের মতে শিশুর প্রতি অনেক খেয়াল রাখা বাবা মা’দের একটা অন্যতম ভুল।   

মাসিয়া ওয়ার্নার এ ব্যাপারে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, “বাবা মা’রা সবসময়েই শিশুর জন্য সবকিছু সহজ করে দিয়ে তাকে হাসি খুশি রাখার ব্যাপারে খুব বেশি সচেষ্ট হন। কিন্তু আপনি কখনই নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে গিয়ে শিশুর কাজগুলো করে দিতে যাবেন না।”

মাসিয়া ওয়ার্নার আরো বলেন, “শিশুকে অবশ্যই যে কোন উদ্বেগে ও কিছুটা মন খারাপের সাথে মানিয়ে নেয়াটা শিখতে হবে। তাকে নিজ থেকেই তার সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে দিন, কেননা এর মাধ্যমে শিশু যে কোন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া শিখে নিবে।”

শিশুকে এই ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে দেয়ার ব্যাপারে হলওয়েলও মাসিয়া ওয়ার্নারের সাথে একমত পোষণ করেন। এমনকি যে কোন ধরনের কঠিন ও হতাশাজনক অভিজ্ঞতা শিশুকে মানসিক ভাবে পরিপক্ব করে তুলে। আর ফলাফল স্বরূপ বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে খুশি থাকার ব্যাপারটা শিশু শিখে যেতে থাকে।

শিশুর বয়স সাত মাস হোক অথবা সাত বছর, হলওয়েল বাবা মা’দের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনার শিশু এই প্রতিকূলতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া শিখে যাবে এবং সে ধীরে ধীরে সফল হয়ে উঠবে।

জীবনের অনিবার্য হতাশা এবং প্রতিকূলতার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে চলতে শেখা শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে হাসিখুশি থাকার দ্বার উন্মোচন করে দেয়। তবে তার মানে কিন্তু এই না যে আপনার শিশু আপনার থেকে কোন সাহায্যই চাইতে পারবে না। এক্ষেত্রে আপনার করনীয় হল, আপনি সবসময় শিশুকে তার সমস্যার সমাধানের উপায় দেখিয়ে দিবেন। নিজ থেকে সেই সমস্যা সমাধান করে দিবেন না, আপনার শিশুকেই সমস্যার সমাধান করতে দিন।

শিশুর মধ্যে যদি স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে তাহলে তার নিজের আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি পাবে এবং সে হাসিখুশি থাকবে। আর এই গুণাবলি শিশুর মধ্যে গড়ে তোলার জন্য প্রতিদিন শিশুকে নুন্যতম দশ থেকে পনের মিনিট একা একা খেলতে দিন। 

আপনার শিশুকে মন খারাপ করতে দিন এমনকি রেগেও যেতে দিন

যখন আপনার শিশু কোন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মন খারাপ করে ঘরের এক কোনায় বসে থাকে, স্বভাবতই আপনি তাকে জোর করে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বলবেন। কিন্তু শিশুকে নির্দিষ্ট কোন কারণে মন খারাপ করতে দেয়াটাও কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

হলওয়েল এই ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “কিছু বাবা মা সবসময়েই শিশুর সামান্য কোন বিষয়ে মন খারাপ নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন। যেমন তার প্রিয় খেলনাটি কিনে না দেয়ার জন্য সে যদি কান্না করে। ”

শিশুকে এটা বুঝতে দিতে হবে যে, কোন কোন কারণে মন খারাপ করতে হয়—এটা প্রাত্যহিক জীবনেরই একটা অংশ। আপনি যদি শিশুর প্রত্যেকটা মন খারাপের বিষয় নিয়েই হস্তক্ষেপ করে থাকেন, তাহলে আপনার শিশু হয়ত শিখছে যে মন খারাপ করা খুবই ভুল একটা কাজ। এজন্য শিশুকে তার অনুভূতিগুলোর অভিজ্ঞতা নিতে দিন, যদি সেটা মন খারাপ করা হয় তবুও তাকে সেটা করতে দিন। 

আপনার শিশুকে তার অনুভূতি মুখে প্রকাশ করার ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করুন। ছোট শিশুরা রাগ অথবা খুশি এই শব্দগুলো খুব সহজেই শিখে নেয়, এতে আপনার খুব একটা বেগ পেতে হবে না। যখন শিশু তার অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে তখন কিন্তু একই সাথে সে তার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও অর্জন করে নিচ্ছে। 

ছোট শিশুরা যখন রেগে যায় এবং বুঝতে না পারে যে এই রাগ কোথা থেকে আসছে, তখন এটা তার জন্য এটা খুবই ভীতিকর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এ সম্পর্কে ওহাইও শহরের দুই সন্তানের জননী রেবেকা বলেন, “আমার চোদ্দ মাস বয়সের সন্তান ম্যাডেলিন যখন রেগে যায় অথবা কাউকে আঘাত করে, তখন আমি তাকে বলি, তুমি যে রেগে আছ এবং খুবই হতাশ এটা আমি ঠিক বুঝতে পারছি।”

এ সম্পর্কে রেবেকা আরো বলেন, “এভাবেই আমরা শিশুদের অনুভূতি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে পারি। এরপর আমরা তাকে এটাও শেখাতে পারব যে, কীভাবে কাউকে আঘাত না করে, মুখের ভাষায় সেই অনুভূতি প্রকাশ করা যায়।” 

শিশুকে শেয়ার করা এবং অন্যদের প্রতি যত্নবান হতে শিক্ষা দিন

শিশু যখন বড় হতে থাকবে, তখন তাকে এটা বুঝতে দিন যে অন্যকে সাহায্য করেও আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়। একটা গবেষণায় এটা উঠে এসেছে যে, যাদের জীবনের নির্দিষ্ট অর্থ আছে তারাই কম হতাশ হয়। এ সম্পর্কে গবেষক কন বলেন, সেচ্ছাসেবী কাজ এবং অপরকে সাহায্য করা মানুষের পারিবারিক জীবনেরই একটা বিরাট অংশ। এমনকি শিশুরাও এর থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।

ঘরে বিভিন্ন ছোটখাটো সাহায্য করা যেমন, ময়লা কাপড় ঝুড়ির মধ্যে নিয়ে রাখা আপনার শিশুকে এটা অনুভব করতে সাহায্য করবে যে সেও ঘরের কাজে একটা অবদান রাখছে। 

শিশুর জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তি হওয়ার চেষ্টা করুন

নিউ মেক্সিকোর ইউনিভার্সিটি অফ মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক, মনস্তাত্ত্বিক ডোরা ওয়াং এর মতে, আপনি নিজের মেজাজ মর্জি শিশুর মধ্যেও প্রবেশ করাতে পারবেন। এটা শুধুমাত্র জীনগতই হতে হবে তা কিন্তু নয়, বরং আপনি আপনার আচার আচরণের মাধ্যমেও শিশুর উপর বিশেষ প্রভাব রাখতে পারেন।

ভালো হোক অথবা খারাপ, শিশুরা সবসময় তাদের মা বাবাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। এমনকি একদম ছোট শিশুও তার বাবা মা’র আচার আচরণ অনুসরণ করে। খেয়াল করে দেখবেন, আপনি যখন হাসবেন তখন আপনার ছোট্ট শিশুটিও কিন্তু হাসছে। এভাবেই তার মস্তিষ্ক আপনাকেই অনুসরণ করবে।

আপনি যদি ছোটখাটো বিষয়গুলোতেও আনন্দ পান এবং নিজের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাহলে আপনার শিশুর মধ্যেও এর একটা প্রভাব আসবে। শিশুকে এটা বুঝতে সাহায্য করুন যে একটা গ্লাস অর্ধেক ভর্তি আছে, সে যেন এটা না শিখে যে গ্লাসটি অর্ধেক খালি।

যখন দেখবেন বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে আর শিশু খেলতে যেতে পারছে না, তখন তাকে বলুন তাহলে দুজনে মিলে বাসায় বসে রং করতে পারবেন । নিউ জার্সির শারন কন বলেন, সবসময় আপনার শিশুকে যেটা নেই সেটা নিয়ে মন খারাপ না করে বরং যেটা আছে সেটা নিয়ে খুশি থাকতে শেখান। 

ক্যালিফোর্নিয়ার পেগি ও’লেরি বলেন, সবসময় একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি আমি, যখনই কোন কারণে আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন থাকি, আমার দুই শিশুও সাথে সাথে রিয়েক্ট করে। তারা একদম চুপচাপ হয়ে থাকে তখন।”

তবে আপনার অন্য আবেগগুলোও লুকানোর চেষ্টা করবেন না। আপনি যখন আপনার কোন একটা প্রিয় ফুলদানী ভেঙ্গে ফেলেন তখন তাকে এটা দেখান যে আপনার এই কারণে মন খারাপ হয়েছে। তবে এর সাথে সাথে আপনি যদি শিশুকে বুঝাতে পারেন যে এখন আপনি আরো বড় একটা ফুলদানী কিনতে পারবেন। এতে করে শিশু বুঝতে পারবে যে মন খারাপ করা জীবনেরই একটা অংশ এবং এর মধ্য থেকেও কীভাবে খুশি থাকতে হয় এটা সে শিখে নিবে। 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts