কখনো কখনো শিশুকে “না” বলা কেন জরুরী

শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

গতানুগতিক “শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন” কথাটির বিপরীতে “না” বলুন শুনে হয়ত একটু অবাক হচ্ছেন, আবার অনেকেই উদ্বিগ্ন হচ্ছেন এই ভেবে যে, তাহলে সঠিক কোনটি? আদতে শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলা অর্থাৎ ইতিবাচক থাকা ঠিক যতটা জরুরী, সঠিক সময়ে “না” বলাও ঠিক ততটাই জরুরী।

কিন্তু কোন কোন বাবা মা শিশুর রাগ ও জেদের সামনে তাকে কোন বিষয়ে বারণ করতে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। শিশুর লালন পালনের ক্ষেত্রে এই “হ্যাঁ” এবং “না”এর দ্বৈরথ কাটিয়ে উঠে একটি ভারসাম্য যুক্ত শৈশব উপহার দেয়া প্রত্যেক বাবা মায়ের জন্য কিছুটা কঠিনই বটে। তবুও সুন্দর আগামীর জন্য এই কঠিন বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে শিশুর সঠিক লালন পালন নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপণ
Loading...

বাবা মায়েরা কেন শিশুদের কোন বিষয়ে “না” করতে চান না?

বাবা মায়েরা সাধারণত সন্তানদের হাসিখুশি দেখতেই পছন্দ করেন। আর তাই শিশুর সব ধরণের চাহিদা পূরণে তারা বরাবরই ব্যস্ত থাকেন। হয়ত শিশু কোন একটি খেলনা কেনার জন্য বায়না করল, আর সেটা যত দামিই হোক না কেন, বাবা মায়ের সামর্থ্য থাকলে সেটা কিনে দেন।

এখন একটু ভেবে দেখার সময় হয়েছে যে, শিশু কি আদৌ এই খেলনার কারণে হাসিখুশি থাকে? কেননা খেলনা তো একটু পরেই পুরানো হয়ে যাবে, আর নিত্য নতুন সব খেলনার বায়না তো প্রতিনিয়ত চলতেই থাকবে। হ্যাঁ! শিশু হয়ত নতুন কোন খেলনা পেলে সাময়িক ভাবে কিছুটা খুশি থাকে তবে এই খুশি কিছুদিন পরেই নতুন আরেকটি খেলনা ক্রয়ের বায়নার সাথে সাথেই মিলিয়ে যায়। শিশু যেহেতু চাইলেই নতুন সব খেলনা পাচ্ছে, তাই এই জেদ এবং বায়নাও একটি চলমান প্রক্রিয়ার মত চলতেই থাকে।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে আদতে শিশুর হাসিখুশি থাকার সাথে নিত্য নতুন খেলনা কিনে দেয়া অথবা বায়না পূরণ করার সম্পর্ক নেই। নিজের যা আছে সেগুলো নিয়েই কীভাবে হাসিখুশি থাকা যায় সেই চেষ্টা করাই আসল বিষয়। বাবা মায়েরা শিশুদেরকে এই সকল বায়না এবং জেদের ব্যাপারে নিষেধ করতে চান না, তার কারণ হলঃ 

  • অভিভাবকরা শিশুদের রাগ এবং জেদের কারণ হতে চান না
  • পূর্বে যদি কোন কারণে শিশুর সাথে রাগ করা হয়ে থাকে, তবে তার অপরাধ বোধের কারণে
  • সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাওয়ার কারণে
  • অনেকেই মনে করে থাকেন, শিশুরা যা চায় তার সবই তাদের পাওয়া উচিৎ
  • শৈশবে নিজেদের ইচ্ছেগুলো অপূর্ণ থাকার কারণে, নিজেদের সন্তানদের ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে চান

এই সম্পর্কে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অন মিডিয়া এন্ড দ্য ফ্যামিলি এর ফাউন্ডার ও গবেষক, পিএইচডি অধিকারী ডঃ ওয়ালশ বলেন, বর্তমানে বাবা মা অনেক ব্যস্ত থাকেন এবং শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। আর এই কারণে তারা এক ধরণের অপরাধ বোধে ভুগতে থাকেন। এমন সময় শিশুর বায়নাগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে মূলত শিশুকে খুশি রাখতে চান তারা।

কখন শিশুকে “না” বলতে হবে এবং কেন এটি জরুরী

সন্তানকে “না” বলুন যখন তাদের কাজ দ্বারা কাউকে আঘাত করতে পারে বা কোনো কিছু নষ্ট হতে পারে

না বলার প্রধান কারণ ক্ষয়-ক্ষতি এড়ানো। বাচ্চারা তাদের কাজের পরিণতির ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নাও রাখতে পারে। তাই অভিভাবকদের উচিত বাচ্চাদেরকে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে দিক-নির্দেশনা দেওয়া। এই ধরণের “না” শিশুকে কোন কিছু পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে সাহায্য করে।

এই “না” বলার সাথে সাথে যদি তাদের নিরাপদ কোন বিকল্প বাতলে দেয়া যায় তবে তা শিশুর জন্য আরও ভালো। যেমন : “বাবু, সোফায় ওভাবে লাফিয়ো না! পড়ে গিয়ে কোথাও ব্যথা পেতে পারো কিংবা তোমার লাফের চাপে সোফাটা ভেঙ্গে যাবে! যদি লাফালাফি করতে চাও বাইরে গিয়ে খোলা জায়গায় লাফাও।” 

কাজটা যদি সন্তান নিজেই করতে পারে তাহলে সেখানে আপনি “না” বলুন

প্রায়ই সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে সাহায্য চায়। এতে দোষের কিছু নেই। যে কাজটা সন্তান এক একা সম্পন্ন করতে পারবে না সেখানে বাবা-মায়ের অবশ্যই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু সবক্ষেত্রে বাবা-মায়ের এগিয়ে আসা উচিত নয়।

সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে ধীরে ধীরে স্বয়ং-সম্পূর্ণ হতে শেখানো। যে কাজটা সন্তান আগে একা করতে পারতো না, বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই কাজটা সন্তানকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব। এই ধরণের “না” শিশুকে কোন বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে।

এছাড়াও বেশ কিছু অন্যায় আবদারের ক্ষেত্রেও একই ভাবে নিষেধ করে দিতে হবে। যেমন ধরুন আপনার সন্তান তার স্কুলের হোম-ওয়ার্ক আপনাকে করতে বললে আপনাকে অবশ্যই তাকে মানা করে দিতে হবে। ঠিক একই ভাবে শিশু যদি নিজে পানি ঢেলে খেতে পারে অথবা নিজের ঘর গুছিয়ে রাখতে পারে তাহলে এগুলো তাকেই করতে দিতে হবে। মাঝেমধ্যে এসব কাজে শিশুকে সাহায্য করা ভিন্ন কথা, তবে খেয়াল রাখতে হবে সেটা যেন শিশুর অভ্যাসে পরিণত না হয়ে যায়।

যদি ব্যাপারটা “প্রয়োজন” না হয়ে “চাহিদা” হয় তাহলে “না” বলুন

আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত হাজারো পণ্যের বিজ্ঞাপন হাজির হয়। বিজ্ঞাপনগুলো আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার ব্যাপারে প্রলুব্ধ করে। সেই পণ্যগুলো আদৌ আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় কিনা, পণ্যটি আমাদের জন্য ভাল হবে কিনা, স্বাস্থ্যকর হবে কিনা আমরা সেসব না ভেবেই পণ্যগুলো কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠি।

বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপন থেকে আপনার সন্তানও এটা-সেটা কিনতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে, আবদার করে বসতে পারে। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আপনি সন্তানের সকল আবদার পূরণ করতে মোটেও বাধ্য নন। জরুরি, দরকারি পণ্য আপনি কিনে দেবেন ঠিকই কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ব্যাপারে অবশ্যই সন্তানকে “না” বলবেন।

বিভিন্ন অদরকারি পণ্যের বিপরীতে “না” শুনে সন্তান হতাশাকে সহ্য করতে শিখবে। সন্তান এটাও অনুধাবন করবে যে, যা যা পছন্দ হয় তার সবই পাওয়া যায় না। কিছু পছন্দের জিনিস থাকে যেগুলো হাতে নাও আসতে পারে। তবে হ্যাঁ, সন্তানকে “না” বলার সময় একটু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। যেমন : “না, আমরা ওটা কিনব না। তবে তোমার পছন্দ বেশ দারুণ। ওটা দেখতে আসলেই সুন্দর!”

পরিকল্পনা বদলে গেলে “না” বলুন

জীবনে অনেক কিছু ঘটে। মাঝে মাঝে জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি আসে যখন বাবা-মা তাদের বাচ্চাকে খুশি করতে গিয়েও পারেন না। এধরনের পরিস্থিতি সন্তানকে ধৈর্য এবং মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি শেখাতে সহায়তা করে।

কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে বা কোনো কারণবশতঃ দেরি হয়ে গেলে সন্তান সেখান থেকে সহনীয় হওয়ার শিক্ষা পায়। বাবা-মা পরিস্থিতি বুঝে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনবেন এবং সন্তানকে বিষয়টা সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবেন। যেমন : “আজ রাতে আমাদের স্পেশাল রেসিপি রান্না করা হবে না, বাবু। তোমার খালামণি বেড়াতে এসেছেন। তার সাথে গল্প করতে গিয়ে অনেক সময় চলে গেছে। তাছাড়া এখন রান্না করা সম্ভব না, অনেক রাত হয়ে গেছে, ঘুমোতে হবে। আমি তোমাকে কালকে স্পেশাল রেসিপিটা রান্না করে খাওয়াবো, ঠিক আছে? এবার বলো, তুমি খাবারটা কাল সকালে খাবে নাকি বিকেলে খাবে?”

অন্য কারো প্রয়োজনটা বেশি জরুরি হলে সেক্ষেত্রে “না” বলুন

বাচ্চারা সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। তাই তাদেরকে ধীরে ধীরে উদারতার শিক্ষা দিতে হয়। অন্যের কথা ভাবা, অন্যের প্রয়োজন বিবেচনা করা ইত্যাদি বিষয়গুলোর সাথে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া বাবা-মায়ের দায়িত্ব। তাই এসব ক্ষেত্রে বাবা-মা “না” বললে সেটা সন্তানকে উদারতা শিখতে সহায়তা করে।

অন্য মানুষটির কেমন লাগছে, সেই অনুভূতির কথা সন্তানের মানসপটে এঁকে দিতে পারলে কাজটা সহজ হয়ে যায়। সন্তান তখন “না”কে সাদরে গ্রহণ করতে শেখে। তবে সন্তানের কাছে কথা পাড়তে বাবা-মাকে কৌশল অবলম্বন করতে হবে। যেমন : “সোনা, শনিবারে আমরা বেড়াতে যেতে পারবোনা। জানি, বেড়াতে সাথে গেলে অনেক মজা করতে পারবে কিন্তু সেদিন তোমার দাদুর জন্মদিন! দাদু বয়স্ক মানুষ। তার জন্মদিনে আমাদের সবার থাকা উচিত। তাকে সময় দেওয়া উচিত, তাই না? নইলে দাদুর তো একা-একা লাগবে, দাদুর মন খারাপ থাকবে। জন্মদিনে কারো মন খারাপ থাকা ঠিক, বলো? তাই আমরা সবাই দাদুর সাথে শনিবারে সময় কাটাবো। তুমিও দাদুর সাথে থাকবে, দাদুকে সঙ্গ দেবে। দাদু তোমাকে কত আদর করে! দাদুর জন্মদিনে তুমি থাকলে দাদু অনেক অনেক খুশি হবে! কিন্তু তুমি যদি না থাকো দাদু খুব কষ্ট পাবে।”

যে কাজ করলে বিরক্ত হবেন সে-কাজে “না” বলুন। 

বলা হয়ে থাকে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরক্তি বিষের মতো কাজ করে। বিরক্তি যেকোনো সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলতে পারে। তাই বিরক্তি বা রাগ মনে পুষে কোনো কাজ না করাই মঙ্গল। সন্তান যদি এমন কিছু আবদার করে যা করতে গেলে আপনি প্রচণ্ড বিরক্ত হবেন, আপনার রাগ হবে তাহলে সেক্ষেত্রে “না” বলুন। এধরনের “না” সন্তানকে মানিয়ে নেওয়া শেখাতে সহায়তা করে থাকে।

যেমন : “না, আমি তোমাকে দূরের ক্রিকেট টিমের হয়ে খেলার অনুমতি দেব না। কারণ ছুটির দিনে আমার পক্ষে তোমার সাথে অতদূরে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া একা একা দূরে যাওয়ার মতো বয়সও তোমার হয়নি। তুমি বরং আশেপাশের কোনো ক্রিকেট টিমের হয়ে খেলো। এখানে তুমি একাই যেতে পারবে। ছুটির দিনটায় আমি আর তোমার মা, তোমার ছোট ভাইবোনদের নিয়ে ফ্যামিলি টাইম কাটাবো। পরিবারের সাথে সময় কাটানো খুবই জরুরি। আশা করি, তুমি বিষয়টা বুঝতে পেরেছো।”

আপনার মূল্যবোধের বিরুদ্ধে গেলে “না” বলুন

মূলত সন্তানকে অগ্রাধিকার এবং সম্মানের ব্যাপারে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এক্ষেত্রে বাবা-মায়ের “না” বলা উচিত। “না” বলার পাশাপাশি বাবা-মা সন্তানকে তাদের মূল্যবোধ এবং বিশ্বাসের ব্যাপারটিও বুঝিয়ে বলবেন। তাহলে সন্তান বাবা-মায়ের “না” বলার পেছনে থাকা কারণের যৌক্তিকতা বুঝতে পারবে।

তবে আবার বাবা-মা এক্ষেত্রে নিজেকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লাগবেন না কিন্তু। বাবা-মাও মানুষ, তারাও ভুল করতে পারেন। তাই সন্তানকে বুঝিয়ে বলার উদ্দেশ্য হলো বাবা-মায়ের “না” বলার পেছনে থাকা যুক্তিটাকে উপস্থাপন করা। যেমন : “এত অল্পবয়সে আমি তোমাকে মোবাইল কিনে দেব না। এত কম বয়সে তোমার হাতে মোবাইল তুলে দিলে সেটা তোমার উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করবে। তোমার হোমওয়ার্ক করার মনোযোগ কমে যাবে, তুমি পরিবারকে সময় কম দিতে শুরু করবে, মোবাইল তোমার অনেক সময় নষ্ট করে দেবে; যা তোমার জন্য ক্ষতিকর। সময় হলে আমি নিজেই তোমাকে মোবাইল কিনে দেব। এখন মোবাইল ছাড়াই অন্যান্য কাজকর্মের মধ্য দিয়ে নিজের সময়টাকে উপভোগ করো।”

এভাবেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আপনাকে শিশুর অনেক আবদার এবং জেদের মুখোমুখি হতে হবে। আর সেগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে বরং শিশুর সুন্দর ও স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠাকেই প্রাধান্য দেয়টা জরুরী।

“না” এবং অর্থ সম্পর্কে ধারণা

বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে এই পৃথিবীর আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারটি বুঝিয়ে দেওয়া। সন্তান কিছু একটা চেয়ে বসল বা আবদার করলো আর সেটা তার সামনে বাবা-মা হাজির করে দিলো, এভাবে তো চলতে পারে না। সন্তানকে অন্তত এতটুকু বোঝাতে হবে টাকা হাওয়া থেকে আসে না, টাকা গাছের পাতা নয়। টাকা একটি সীমিত সম্পদ। টাকা উপাজর্ন করতে হয়। টাকা উপাজর্ন করতে পরিশ্রম করতে হয়। তাই কিছু একটা কিনতে মন চাইলেই সেটা টাকা দিয়ে চটজলদি কিনে আনা যায় না। তাই উপযুক্ত পরিস্থিতিতে, কেনাকাটার ব্যাপারে বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে “না” বলা।

ধরা যাক, স্কুলের বন্ধুদের দেখাদেখি আপনার সন্তান একটা দামি ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট বা ডিভাইস কিনতে চাচ্ছে এবং আপনার কাছে আবদার করছে তাকে সেটা কিনে দিতে হবে। এখানে আপনি সন্তানকে “না” বলতে পারেন। তাকে অর্থের মূল্যের ব্যাপারে জানাতে পারেন। তাকে পরামর্শ দিতে পারেন কীভাবে সে নিজের হাতখরচের টাকা থেকে টাকা জমিয়ে নিজের কাঙ্খিত গ্যাজেটের অর্থ যোগাড় করতে পারে। কীভাবে ফাস্টফুড খাওয়া কমিয়ে দিয়ে সেই টাকা জমিয়ে রাখতে পারে। আপনি সন্তানকে বলতে পারেন, “তুমি ধীরে ধীরে ৫ হাজার টাকা জমিয়ে দেখাও। তাহলে আমি তোমাকে বাকি ১০ হাজার টাকা দেব। তখন ১৫ হাজার টাকা দিয়ে তুমি নিজের পছন্দের গ্যাজেটটা কিনতে পারবে।”

সন্তানকে না বলার ক্ষেত্রে কীভাবে কৌশল অবলম্বন করবেন?

বিরিয়ানি খুব লোভনীয় খাবার তাই না? কিন্তু প্রতিদিন যদি বিরিয়ানি খেতে দেওয়া হয় তাহলে কি লোভটা আগের মতো থাকবে? নাকি উল্টো বিরিয়ানির প্রতি বিরক্তি চলে আসবে? বিরিয়ানির মূল্য কি আগের মতো থাকবে? অবশ্যই না। বিরিয়ানির প্রতি বিরক্তি চলে আসবে।

এবার বলুন, বিরিয়ানির মতো সুস্বাদু খাবার যদি ঘন ঘন খেতে বিরক্ত লাগে তাহলে “না” এর মতো অপছন্দের শব্দটি যদি আপনার সন্তান উঠতে বসতে শুনতে শুরু করে তাহলে তার কেমন লাগবে?

দেখা যাবে, বারবার “না” শুনতে শুনতে সন্তানের কাছে “না” শব্দটা মূল্যহীন হয়ে গেছে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে “না” শোনার পরেও সন্তান সেটাকে অগ্রাহ্য করছে। এটা কোনো ভাল লক্ষণ নয়। তাই বাবা-মাকে এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।

পজিটিভ থাকার চেষ্টা করুন

“না” শব্দটি তখনই উচ্চারণ করতে হবে যখন আর কোনো বিকল্প উপায় নেই। অর্থাৎ, বিকল্প পথে কথা পরিচালিত করা গেলে “না” বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। সন্তান কোন কাজটি করতে পারবে না, সেটা না বলে বরং কোনটা করতে পারবে সেটা নিয়ে আলোচনা করা উচিত।

ধরা যাক, আপনার সন্তান বেডরুমে বল দিয়ে খেলছে। বলটাকে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে, দেয়ালে বাড়ি খেয়ে বলটা আবার তার কাছে ফেরত আসছে বা কখনো ছুটে যাচ্ছে ঘরের অন্য কোনো কোণে। বলের আঘাতে ঘরে থাকা ভঙ্গুর শোপিস, কাঁচের জিনিস ইত্যাদি ভেঙ্গে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে সন্তানকে “এই তুমি ড্রয়িং রুমে গিয়ে খেলো বা বাইরে গিয়ে খেলো! বেডরুমে খেলা চলবে না।” এভাবে না বলে সন্তানকে পজেটিভভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। যেমন : “বাবু, তুমি বলটা নিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে খেললে আরো বেশি মজা পাবে। ওখানে বেশি জায়গা আছে। তোমার বলটা খুঁজে পেতেও সুবিধা হবে। কিংবা তুমি চাইলে বাইরে খোলা জায়গায় গিয়েও খেলতে পারো।”

ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন

প্রয়োজনে তো সন্তানকে “না” বলতেই হবে। কিন্তু একটু সাবধানী হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে “না” বলা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। বিষয়টা অনেকটা “রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম” এর মতো।

ছোট বাচ্চাদেরকে নিয়ে প্রায়ই বাবা-মা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। বাচ্চারা এটা ওটা দেখে আবদার করে বসে। তখন বাবা-মা বারবার সন্তানকে “না” বলতে বাধ্য হন। কিন্তু বারবার “না” বলার কারণে একদিকে যেমন বাবা-মা অস্বস্তিবোধ করেন তেমনি সন্তানও বারবার “না শুনে বিরক্ত হয়ে যায়।

এই সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য বাবা মায়ের উচিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো এড়িয়ে চলা। যেসব স্থানে গেলে সন্তানের মনের লাগাম ছুটে যেতে পারে, সন্তান আকাশ-কুসুম আবদার করে বসতে পারে কিংবা যেসব স্থান সন্তানের শরীর, স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর; সেসব স্থান এড়িয়ে চলা উচিত। এতে বাবা-মা বারবার সন্তানকে “না” বলার মতো অপ্রিয় কাজটি করা থেকে রেহাই পাবেন।

খুঁজে দেখুন “না” বলা ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিনা

বাচ্চারা অল্পবয়সে অনেক অদ্ভুত কাণ্ডকারখানায় মেতে ওঠে। বাবা-মা যদি তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে “না” বলতে শুরু করে তাহলে হিতে-বিপরীত হতে পারে। তাই বাবা-মায়ের উচিত হুটহাট “না” বলার চর্চা বন্ধ করা। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ক্ষতি না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বাচ্চাদের তাদেরকে ছেলেমানুষি কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেওয়া উচিত। বাচ্চারা নিশ্চয়ই বড়দের মতো গম্ভীর হবে না? তারা তো দুষ্টুমি, ছুটোছুটি, অদ্ভুত কাজ কারবার করবেই!

ধরা যাক, আপনার মেয়ে এক রাতে বায়না করলো আজকে সে তার সবচেয়ে পছন্দের পোশাকটা পরে ঘুমোবে! খুবই অদ্ভুত আবদার, তাই না? সুন্দর, দামি একটা পোশাক পরে ঘুমোতে গেলে পোশাক কুঁছকে যেতে পারে, পোশাকটাকে পুনরায় ধুয়ে, ইস্ত্রি করতে হতে পারে। তাই স্বভাবতই আপনি  চট করে আপনার মেয়েকে বলতে পারেন, “না! পাগল হয়েছে? ওমন পোশাক পরে কেউ ঘুমোতে যায়? যাও, ঢিলেঢালা কোনো পোশাক পরে ঘুমিয়ে পড়ো!”

কিন্তু ভেবে দেখুন, এভাবে “না” না বলে বরং তাকে যদি তার পছন্দের পোশাক পরে ঘুমোতে দিতেন তাহলে কি খুব বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেত? পছন্দের পোশাক পরতে না দেওয়ায় মন খারাপ করিয়ে ঘুমোতে বলার চেয়ে বরং তাকে পোশাকটা পরার সুযোগ দেওয়া যেত। সে পোশাকটা পরে খুশি মনে ঘুমাতো। পরে সকালে উঠে নিজেই বুঝতে পারতো তার পোশাকটা তখন কেমন দেখাচ্ছে। নিজেই সিদ্ধান্ত নিত সামনেও সে ভাল পোশাক পরে ঘুমোতে চায় কিনা। কিন্তু বাবা-মা যখন তাকে আগেই থামিয়ে দিচ্ছে তখন তার মনে অতৃপ্তি থেকে যাচ্ছে, মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এখানে যেহেতু বড় কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না তাই বাবা-মায়ের উচিত ছিল “না” না বলে মেয়েটিকে তার পছন্দের পোশাক পরে ঘুমানোর শখটা পূরণ করতে দেওয়া। 

কঠোর “না”

কিছু কিছু পরিস্থিতিতে বাবা-মাকে কঠোর হতেই হয়। না হয়ে উপায় থাকে না। কঠোর না হলে বরং সন্তানের বড় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেসব ক্ষেত্রে বাবা-মাকে দৃঢ়কণ্ঠে “না” বলতেই হবে। এমনভাবে “না” বলতে হবে যেন সন্তান সেই “না”-এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। সন্তান যেন ভেবে না বসে এই “না” অমান্য করলেও চলবে!

ধরা যাক, আপনার সন্তান বাসার পোষা বিড়ালের লেজ ধরে বিপদজনকভাবে টানাটানি করছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বিড়ালটি বেশ বিরক্ত হচ্ছে। টানাটানির মাত্রা বেড়ে গেলে বিড়ালটি নিজেকে রক্ষা করার জন্য আপনার সন্তানকে খামচি দিয়ে বসতে পারে! যার ফলাফল মোটেও ভাল হবে না। এক্ষেত্রে বাবা-মা কঠোরভাবে সন্তানকে “না” করবেন। এখানে কোনো নমনীয়তা দেখানো চলবে না। “বাবু, থাক না। বিড়ালকে বিরক্ত করো না!” এভাবে বললে কাজ হবে না। এরকম নমনীয় ভাষা সন্তানে মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেওয়ার পাশাপাশি তাকে দ্বিধায় ফেলে দিতে পারে। দৃঢ়কণ্ঠে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে, “না! থামো! বিড়ালের লেজ ধরে টানবেনা!”

এখানে এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন, সন্তান যদি আপনার “না” শুনে নিজেকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখে তাহলে তাকে হাসি উপহার দিন কিংবা তাকে জড়িয়ে ধরুন, একটু প্রশংসা করে দিন। তাকে বলতে পারেন, “গুড বয়! আমার কথা শোনার জন্য তোমাকে এত্তগুলো আদর!”   

শেষকথা

সন্তানকে মানুষ করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। বাবা-মা শুধু নিজেদের দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন। জান, প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করলেই যে সন্তান মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে এই নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয় না। তারপরেও বাবা-মা চেষ্টা চালিয়ে যান।

বাবা-মাকে একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, সন্তানকে “না” বললে সে কিন্তু বাবা-মাকে “ধন্যবাদ” জানাবে না। স্বাভাবিকভাবেই “না” শোনার পর সন্তানের মন খারাপ হবে। সন্তানকে মন খারাপ করতে দেখে বাবা-মায়ের মন খারাপ হবে, তারা কষ্টও পেতে পারেন। কিন্তু এই “না” গুলো সন্তানের অনাগত ভবিষ্যতের মঙ্গলের কথা ভেবে বাবা-মাকে বলতে হবে।

সন্তানকে পৃথিবীর মতো কঠিন জায়গায় টিকে থাকার মতো করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পরিস্থিতিতে “না” বলতে হবে। আবার বাবা-মাকেই তাদের সন্তানকে পরম মমতায়, স্নেহে বুকে জড়িয়ে নিতে হবে, বিপদ-আপদে তাকে আগলে রাখতে হবে। কারণ সন্তানের চোখে বাবা-মাই তার শেষ আশ্রয়স্থল, সবচেয়ে নিরাপদতম স্থান।

সবার জন্য শুভকামনা।


শেয়ার করে অন্যদের জানাতে সাহায্য করুন

Related posts

Leave a Comment