যোনি স্রাব | গর্ভাবস্থায় কখন স্বাভাবিক কখন নয়

গর্ভাবস্থায় যোনি স্রাব কি বেশ স্বাভাবিক একটি বিষয়?

গর্ভধারণের পূর্ব থেকে শুরু করে ডেলিভারি পর্যন্ত এই পুরো সময়েই যোনি স্রাব হওয়া খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়৷ এই সময়ে আপনি যা খেয়াল করছেন, খুব সম্ভবত এটা লিউকোরিয়া। লিউকোরিয়া হলো দুধের মতো সাদা গন্ধহীন কিংবা অল্প গন্ধযুক্ত এক ধরণের স্রাব।

এই ধরণের স্রাব হয়তো গর্ভধারণের আগেও আপনার হয়ে থাকতে পারে কিন্তু এই সময়ে এসে এই স্রাবের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এর কারণ হলো গর্ভাবস্থায় শরীর অনেক বেশি এস্ট্রোজেন উৎপাদন করে এবং যোনির আশেপাশের অংশে রক্ত চলাচল অনেক বেড়ে যায়।

সারভিক্স এবং যোনির সেক্রেশন, পুরনো কোষ এবং স্বাভাবিক যোনির ব্যাকটেরিয়ার সমন্বয়েই তৈরি হয় এই স্রাব। সুস্থ যোনি স্রাবের বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো:

  • রঙ দুধের মতো সাদা বা বর্ণহীন
  • পাতলা থেকে ঘন হতে পারে; অনেকটা শ্লেষার মতোও হতে পারে
  • গন্ধহীন কিংবা অল্প গন্ধযুক্ত

প্রসব যত এগিয়ে আসবে, যোনি স্রাবের পরিমাণ অনেকটুকু বেড়ে যেতে পারে। এমনকি স্রাবের রঙও পালটে যেতে পারে, আপনি সবসময় যেমন দেখে অভ্যস্ত – তেমন নাও হতে পারে।

যোনি স্রাবে কি লক্ষণ দেখা গেলে বিপদের আশংকা করতে হবে?

স্রাবের রঙ যদি সবুজাভ ও কটু গন্ধযুক্ত হয়, ব্যাথা হয়- তাহলে এটা খুব সম্ভবত ইনফেকশনের লক্ষণ। এগুলো সহ অন্য যে কোন কারণে যদি আপনার স্রাব অস্বাভাবিক মনে হয় অথবা নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলো লক্ষ্য করেন, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

গর্ভাবস্থার বয়স যদি ৩৭ সপ্তাহের কম হয় কিন্তু আপনার যোনি স্রাব অনেক বেশি বেড়ে যায় অথবা স্রাবে বড় ধরণের কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। উদাহরণস্বরূপ, স্রাব অনেক বেশি পাতলা- প্রায় পানির মতো পাতলা ও স্বচ্ছ হলে অথবা জেলেটিনের মতো অনেক বেশি ঘন হয়ে গেলে। এটি preterm premature rupture of membranes বা প্রিটার্ম লেবারের লক্ষণ হতে পারে।

যোনিমুখ চুলকানি বা জ্বালাপোড়া করলে অথবা কোন প্রকার গন্ধহীন ব্যাথাযুক্ত সাদা স্রাব হলে, প্রস্রাব অথবা যৌনমিলনের সময় ব্যাথা হলে, চুলকানি অথবা জ্বালাপোড়া থাকলে – এসবই ইস্ট ইনফেকশনের লক্ষণ।

আশটে গন্ধযুক্ত পাতলা সাদা অথবা ধূসর রঙের স্রাব হলে (যৌনমিলনের সময় যখন স্রাবের সাথে বীর্য বিশ্রিত হয় তখন আশটে গন্ধটা বেশি বোঝা যায়)। এটা ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস নামক যোনির এক ধরণের ইনফেকশনের লক্ষণ

স্রাব হলুদ অথবা সবুজাভ, অনেকটা ফেনার মতো এবং তীব্র গন্ধযুক্ত হলে। এটা খুব সম্ভবত ট্রীকোমোনাইয়োসিস (trichomoniasis) নামক এক ধরণের ইনফেকশন যা যৌন মিলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। ট্রীকোমোনাইয়োসিসের অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে যোনিমুখ লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি অথবা জ্বালা করা, প্রস্রাব কিংবা যৌনমিলনের সময় খুব অস্বস্তি হওয়া প্রভৃতিও রয়েছে।

স্রাব তীব্র কিংবা কটু গন্ধযুক্ত হলে, স্বাভাবিক স্রাবের তুলনায় রঙ, পরিমাণ অথবা ধারাবাহিকতায় হঠাৎ বড় পরিবর্তন আসলে।

স্রাবের ক্ষেত্রে আসলে লক্ষণ দেখে বিপদের সম্ভাবনা পরিমাপ করা দূরহ একটি ব্যাপার। এমনকি সাধারণ কিছু লক্ষণ যেমন অস্বস্তি হওয়া, চুলকানি হওয়া, জ্বালাপোড়া করা প্রভৃতি যদি আপনার মাঝে নাও দেখা যায়, তবুও আপনার ভ্যাজাইনাল ইনফেকশন কিংবা যৌনমিলন ঘটিত ইনফেকশন থাকতে পারে।

আপনার যদি মনে হয় যে আপনার ইনফেকশন হয়েছে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই নিজে নিজে চিকিৎসা করতে যাবেন না অথবা প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঔষধ গ্রহণ করবেন না। ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন যিনি সঠিক সমস্যা খুঁজে বের করে আপনাকে সঠিক চিকিৎসা প্রদান করবেন।

স্রাবে কোন ধরণের পরিবর্তন কি গর্ভধারণের লক্ষণ নির্দেশ করে?

সাধারণত, না! গর্ভধারণের সময় অনেক নারীদেরই যোনি স্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায় এটা সত্যি, কিন্তু গর্ভধারণের দু’এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনার সাথে এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।

এছাড়া গর্ভধারণের প্রথম কয়েক সপ্তাহে সচরাচর নারীরা যে সকল পূর্বলক্ষণ গুলোর কথা উল্লেখ করে থাকেন, সেখানেও এ ধরণের কিছু নেই। আপনি গর্ভবতী কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্যে সর্বোত্তম পন্থা হলো আপনার পিরিয়ডের আশেপাশের সময়ে ‘প্রেগন্যান্সি কিট’ এর মাধ্যমে পরীক্ষা করানো।

আমি কিভাবে বুঝবো যে এটা যোনি স্রাব নাকি মিউকাস প্লাগ?

মিউকাস প্লাগ এবং যোনিস্রাবের মধ্যে পার্থক্য বোঝা কঠিন একটি কাজই বটে, তাই আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করাই ভালো হবে।

মিউকাস প্লাগ কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো ঘন এবং স্বচ্ছ পদার্থ। এটি এক প্রকার সেক্রেশন যা গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে সার্ভিকাল ক্যানেলে জমাট হয়ে থাকে এবং এক ধরণের প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করে। কিন্তু ডেলিভারির সময় যখন এগিয়ে আসতে থাকে, তখন সারভিক্স প্রসারিত হতে শুরু করে এবং মিউকাস প্লাগ বেড়িয়ে যায়। তাইতো, মিউকাস প্লাগ বেড়িয়ে যাওয়াকে ডেলিভারি বা প্রসবের পূর্বলক্ষণ বলা যেতে পারে।

মিউকাস প্লাগ বেড়িয়ে যাওয়াটা সবাই ঠিকঠাক খেয়াল করতে পারেন না। মিউকাস প্লাগ বের হওয়ার সময়, আপনি হয়তো হঠাৎ খেয়াল করে থাকবেন যে, দুই একদিন ধরে আপনার অনেক বেশি পরিমাণ স্রাব বের হচ্ছে যা দেখতে বেশ থকথকে দলার মতো অথবা অনেকটা নাকের সর্দির মতো। মিউকাস প্লাগের রঙ স্বচ্ছ, গোলাপী, বাদামি হতে পারে, আবার কিছু রক্তের ফোঁটাও থাকতে পারে।

আমি কিভাবে বুঝবো যে এটা যোনি স্রাব নাকি এমনিওটিক ফ্লুইড?

সাধারণ স্রাব মূলত বেশ অল্প পরিমাণে এবং বিক্ষিপ্তভাবে বের হয়, কিন্তু পানি ভাঙার ফলে যখন এমনিওটিক ফ্লুইড নিঃসৃত হয়, তখন তা অনবরত পড়তেই থাকে। এমনিওটিক ফ্লুইড সাধারণত স্বচ্ছ অথবা হালকা হলুদাভ, পানির মতো পাতলা হয়ে থাকে। এর সাধারণত কোন গন্ধ থাকে না, তবে হালকা মিষ্টি গন্ধ আসা অসম্ভব কিছু না। পানি ভাঙা হলে, অল্প অল্প করে প্রতিনিয়ত পড়তে পারে, আবার কখনো কখনো অনেকটা ফিনকি দিয়েও পড়তে পারে।

আপনার যদি মনে হয় যে আপনার এমনিওটিক ফ্লুইড নিঃসরণ হচ্ছে, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার প্রসবের সময় হয়তো খুবই এগিয়ে এসেছে।

কিন্তু আপনার গর্ভাবস্থার বয়স যদি ৩৪ সপ্তাহের কম হয় এবং আপনার পানি ভেঙে যায়, তাহলে ডাক্তার প্রসব আরো দেরিতে করানোর জন্যে এবং শিশুর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর (যেমন ফুসফুস) দ্রুত বিকাশের জন্যে ঔষধ প্রদান করবেন।

গর্ভাবস্থায় যোনিস্রাব নিয়ে আমি কি করতে পারি?

কোন প্রকার ইনফেকশন যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে যোনি স্রাব বন্ধে আপনার তেমন কিছু করার প্রয়োজন নেই। এটা স্বাভাবিক, হবেই। স্রাব শুষে নেওয়ার জন্যে প্যান্টি লাইনার ব্যাবহার করা যায়, তবে গর্ভাবস্থায় কোনভাবেই ট্যাম্পুন ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

গর্ভাবস্থায় আপনার যৌনাঙ্গ পরিষ্কার ও সুস্থ রাখতে নিম্নোক্ত পন্থাগুলো অবলম্বন করতে পারেন:

  • সবসময় পুরো যৌনাঙ্গ সামনে থেকে পেছনে মুছে রাখুন। এতে পায়ুপথের ব্যাকটেরিয়া যোনির সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা কম থাকবে।
  • কটনের অন্তর্বাস পরিধান করুন,
  • আঁটসাট প্যান্ট বা পাজামা পরিধান করবেন না; নাইলনের প্যান্টিহোজও এড়িয়ে চলুন,
  • বাবল বাথ, সুগন্ধি প্যাড, সুগন্ধি টয়লেট টিস্যু, হাইজিন স্প্রে, সুগন্ধি সাবান প্রভৃতি পণ্য গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করবেন না।

গর্ভাবস্থায় ‘ড্যুশ’ ব্যবহার করবেন না, এর ব্যবহারের ফলে যোনিতে ব্যাকটেরিয়ার সাধারণ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং ইনফেকশনের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এমনকি ডাক্তারেরাও ড্যুশ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, কারণ (কিছু দুর্লভ কেসে দেখা গেছে) এর ফলে বাতাস যোনির মাধ্যমে রক্ত সংবহনতন্ত্রের সাথে মিলিত হতে পারে যা বেশ ভয়াবহ কোন বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment