শিশুর মাথার আকৃতি: কোনটি স্বাভাবিক এবং কোনটি নয়।

Last Updated on

নবজাতকের মাথার অস্বাভাবিক আকার খুব বেশি অপরিচিত নয়। যদিও এটা জীবনমরন কোন সমস্যা নয়, তবু বাবা-মায়েরা অনেক সময় চিন্তিত থাকেন এবং প্রথম থেকেই ব্যাস্ত হয়ে পড়েন সঠিক ভাবে মাথার গঠনকে সুগঠিত করতে। সৌভাগ্যবশত, একটু ধৈর্য ও কিছু সুপরামর্শ আপনার বাচ্চার মাথার আকৃতিকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করতে পারে।

কেন একটি শিশুর মাথার আকৃতি অস্বাভাবিক হয়

নবজাতক শিশুর মাথার হাড় খুবই নরম থাকে যার কারনে নর্মাল ডেলিভারি হলে জরায়ু পথ বা জন্মনালী দিয়ে শিশুর মাথা সহজে বেড়িয়ে আসতে পারে। এভাবে প্রসবের সময় বাচ্চার মাথায় চাপ পড়তে পারে। একারণে তার মাথা একটু লম্বাটে বা কোণাকৃতির হয়ে যেতে পারে। ধীরে ধীরে সময়ের সাথেসাথে  হাড়গুলি একসাথে মিশতে থাকলে মাথার ছোট গর্তটি চলে যায়।

বাচ্চাদের মাথার অস্বাভাবিক গঠনের আরো একটি কারন হল নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম নেয়া বা বাচ্চা প্রি ম্যাচিওর হওয়া।  এ ধরণের বাচ্চার মাথার হাড় অনেক নরম থাকে এবং হাড়গুলি ঠিক মতো গড়ে উঠেনা।তাই  জরায়ু পথ দিয়ে বের হওয়ার সময় মাথার গঠন কিছুটা বিকৃত হয়ে যেতে পারে।

মায়ের গর্ভে তরল পদার্থ (Amniotic fluid) বা পানির পরিমাণ কম থাকলেও বাচ্চার মাথায় চাপ পরতে পারে। কারণ এই তরল পদার্থে বাচ্চা ভেসে থাকে এবং তা তাকে সব ধরণের আঘাত থেকে মুক্ত রাখে।

আর কোনো মা যদি যমজ বা তিনজন বাচ্চা একসঙ্গে গর্ভে ধারন করেন তাহলে কম জায়গার কারনেও বাচ্চাদের মাথার আকৃতি অস্বাভাবিক বা মাথার কোন অংশ সমান হয়ে যেতে পারে।

নবজাতকের জন্মের পরপর তার মাথার বেশ কিছু অংশ ফুলে যাওয়া অথবা ক্ষত দেখা যেতে পারে। এগুলো সাধারণত শিশুর মাথার পেছনের অংশে বেশি হয়ে থাকে। এছাড়াও আপনি ‘cephalohematoma’ অর্থাৎ প্রসবের সময় তৈরি হওয়া নরম ক্ষতও দেখতে পারেন। এগুলো নিয়ে খুব একটা চিন্তার কিছু নেই কারণ এগুলো খুব দ্রুত নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর মাথার কোন অংশ সমান হয়ে যাওয়া বা ফ্ল্যাট হেড সিনড্রোম (Flat head syndrome) ]

শিশুর মাথার আকৃতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগতে পারে?

 আপনার বাচ্চার মাথার দুই জায়গায় দুটি নরম গর্ত আছে, একটি  উপরে এবং একটি পিছনে ।

ফনটানেল বা নরম অংশ যেটি মাথার পিছনে থাকে তা মিশে যেতে ছয় সপ্তাহ সময় লাগে।মাথার উপরের বা সামনের নরম অংশ বা গর্তটি যা স্পর্শ করা যায়  এবং খুব ই সূক্ষ্ম ভাবে ত্বকের নীচে দেখা যায়,  এই গর্তটি আঠারো মাসের মধ্যে মিশে যায় ।

নবজাতকের মাথার এই অংশগুলো যদি খুব দ্রুতই ঠিক হয়ে যায় তাহলে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এই দ্রুত ঠিক হয়ে যাওয়াটাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘craniosynostosis’ বলা হয় এবং এর কারণে মস্তিষ্কের অপরিপক্বতা, মানসিক সমস্যা, অন্ধত্ব, হৃদরোগ এবং অস্বাভাবিক আকৃতির মাথা হতে পারে।

তাই প্রথম আঠারো মাসের মধ্যে আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এই নরম ও গর্তের মত অংশগুলো নিয়মিত চেক করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষ ধরনের তৈরি মাথার হেলমেট অথবা অপারেশন করে এই অংশগুলো পুনরায় আগের মত করে দেয়ার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন।

মাথার এই অস্বাভাবিক আকৃতি কি দুশ্চিন্তার কারন হতে পারে?

আপনার বাচ্চার মাথার অস্বাভাবিক আকৃতি নিয়ে বাচ্চার বড় হওয়ার সাথে সাথে তার সৌন্দর্যের বিষয় ছাড়া আর কোনও ভয়ের কারন না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।যখন বাচ্চাকে পাশ থেকে বা উপর থেকে খেয়াল করা যায় তখন তার এই জায়গার আকার বোঝা যায় । সৌভাগ্যবশত ফ্ল্যাট হেড সিনড্রোম বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের এবং ব্রেইনের কোনও ক্ষতির কারন হয়না।

একজন বাবা-মা হিসেবে আপনি সাবধান হতে পারেন কিন্তু অকারন দুশ্চিন্তা করে বাবা-মা হওয়ার আনন্দটাকে মাটি করবেন না। মনে রাখবেন শিশু যত বড় হতে থাকবে তার ঘাড় শক্ত হবে এবং মাথা নিজে থেকে নাড়তে শিখলে তার মাথার খুলির কোন নির্দিষ্ট অংশে বেশি চাপ পরবেনা ফলে এ সমস্যা ধীরে ধীরে ঠিক হতে শুরু করবে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে নবজাতক শিশুর মাথার নরম অংশগুলোর আকার এবং অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে। সাধারণত এগুলো ধরার সময় খুলিতে হালকা গর্তের মত অনুভব হবে। নিচের এই লক্ষণগুলো যদি দেখেন তাহলে অতি শীঘ্রই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হনঃ

যদি গর্তটি খুব বেশি গভীর হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার শিশু পানিশূন্যতায় ভুগছে। তখন আপনি লক্ষ্য করবেন যে আপনার শিশু কিছুটা অসুস্থ। তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে উনারা পরীক্ষা করে দেখবেন যে সেই অংশগুলো কি ফুলে আছে নাকি বেশি গর্ত হয়ে আছে।

সামনের এই নরম অংশ বেশ ফুলে থাকলে। আপনার নবজাতক শিশু মাথায় আঘাত পেলে এমনটা হয়ে থাকে। তাই এই অংশগুলো ফুলে থাকলে এবং সাথে সাথে জ্বর ও নির্জীব হয়ে থাকলে সেটা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতই একটা বিষয়। তবে সামনের নরম অংশটি শিশুর কান্না, কাশি, বমি অথবা মলত্যাগের সময়েও কিছুটা ফুলে উঠতে পারে এবং শিশু তার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে এই অংশগুলোর ফুলাও ঠিক হয়ে যায়। তবে ফুলা যদি ঠিক না হয় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন সাথে সাথে।

আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞই ভালো বুঝতে পারবেন যে এই সমস্ত নরম অংশুগুলোতে কোন সমস্যা হয়েছে কি না। তবে আপনি যদি হাসপাতালে ফোন দিয়ে অসুবিধার কথা জানান, তবে তারা আপনাকেই পরীক্ষা করে দেখতে বলবে যে স্বাভাবিক এর তুলনায় এটা কি গর্ত হয়ে আছে অথবা ফুলে আছে কি না।

শিশুর অস্বাভাবিক মাথার আকৃতি ঠিক করার কিছু উপায়

আতংকিত বাবা-মা এটি ভেবে কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারেন যে কিছু সহজ উপায় মেনে চললে আপনার বাচ্চার এই অস্বাভাবিক মাথার গঠন সারাজীবনের জন্য থাকবে না। কিছু খুব সহজ উপায় মেনে চললে আপনার শিশুর মাথার অস্বাভাবিক গঠন সুগঠিত করতে পারবেন।

আপনার বাচ্চা যদি ক্রিবে/দোলনা অথবা বাসকেটে ঘুমায় তাহলে খেয়াল রাখতে হবে যেন সে দীর্ঘ সময় ধরে একই দিকে ফিরে না শুয়ে থাকে। নিয়মিত তার বিছানার অবস্থান পাল্টে দিন। এতে যদি সে রুমের কোন একটা নির্দিষ্ট দিকে ফিরে ঘুমাতে অভ্যস্ত থাকে তবে সে তার মাথার অবস্থান পরিবর্তন করবে।

যদি দেখেন যে আপনার বাচ্চা একিদিকে বারবার ঘুরে যাচ্ছে তাহলে তার বিপরীতে একটি খেলনা অথবা ঝুনঝুনি রেখে দিন।যদি সে লাইট অথবা ফ্যান দেখতে পছন্দ করে তাহলে তার দোলনা/ক্রিব অথবা বাসকেট বিপরীত দিকে ঘুড়িয়ে দিন যাতে সে মাথা নড়াচড়া করে দেখতে পারে এবং এবং তার মাথার সমান অংশের দিকে চাপ দিয়ে বেশিক্ষণ শুয়ে না থাকে।

দিনের বেলায় ঘুমানোর সময় যখন সে আপনার চোখের সামনে থাকবে তখন তাকে পাশ ফিরিয়ে কাত হয়ে শুতে সাহায্য করবেন। এসময় তার দিকে নজর রাখতে হবে কারণ পাশ ফিরিয়ে শোয়ানোর ফলে সে উল্টে যেতে পারে যাতে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

যখন তার ঘাড় শক্ত হয়ে যাবে তখন তাকে তার মতো পেটের উপর ভর দিয়ে থাকতে দিবেন অল্প কিছুসময়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সময়টাও বাড়িয়ে দিবেন এবং পেটের উপর ভর হয়ে থাকার সময় আপনিও তার সাথে কথা বলবেন,খেলবেন।অবশ্যই আপনি খেয়াল রাখবেন।এভাবে প্রতিদিন কিছু কিছু সময় বাড়িয়ে প্রতিদিন অন্তত ৩০মিনিট তাকে উপুড় হয়ে পেটের উপর ভর দিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন।

যখন আপনি বুকের দুধ  অথবা ফিডার এর দুধ খাওয়াবেন তখন খাওয়ার মাঝে মাঝে তার মাথার দিক পরিবর্তন করে দিবেন যাতে তার মাথার সমান জায়গায় খুব বেশি সময় ধরে চাপ না পরে।

অনেক মায়েরাই তাদের নবজাতকের মাথায় ঘোড়ার পায়ের আকারের মত বালিশ দিয়ে থাকেন যাতে তার বাচ্চার মাথার আকৃতি ঠিক হয়।যাইহোক বার মাসের কম শিশুদের এই বালিশ ব্যবহার করলে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ছোট্ট সোনামনির বিছানা থেকে বালিশ, নরম খেলনা, অতিরিক্ত নরম বিছানা দুরেই রাখা উচিত ।

কখন আপনার শিশুর মাথায় হেলমেটের প্রয়োজন

এতকিছু নিয়ম মেনে চলার পরেও যদি আপনার বাচ্চার মাথার অস্বাভাবিক আকৃতি ঠিক না হয় তাহলে আপনার শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করুন। তিনি আপনার বাচ্চাকে বিশেষভাবে তৈরি হেলমেট পড়ানোর পরামর্শ দিতে পারেন বিশেষ করে আপনার বাচ্চার বয়স যদি ৬-৮মাসের বেশি বয়স হয়ে থাকে।

হেলমেট টি এমন ভাবে তৈরি করা হয় যাতে বাচ্চার মাথার যে দিকের অংশ সমান সেদিকটা বাড়ার সুযোগ পায় এবং যে দিকের আকৃতি স্বাভাবিক সেদিকটা বেশি না বাড়ে। হেলমেট সারাদিন পড়ে থাকতে হবে শুধু গোসলের সময় খুলে রাখতে হবে। বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে হেলমেটেও পরিবর্তন করতে হতে পারে। তাই নিয়মিত চেকআপ করাতে হবে। বাচ্চার  কতটুকু উন্নতি হয়েছে তার উপর নির্ভর করে ডাক্তার ৯০দিন পর্যন্ত হেলমেট ব্যবহার করার পরামর্শ দিতে পারেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হেলমেট এবং ডাক্তারের ফি মিলিয়ে আপনার বেশ খরচ হতে পারে।

মাথার অস্বাভাবিক আকৃতি প্রতিরোধে কি করা যেতে পারে?

প্রথমেই নিশ্চিত করতে হবে যাতে শুয়ে থাকার সময় বাচ্চার মাথা একই অবস্থানে খুব বেশি সময় ধরে না থাকে। যদি ডাক্তারের কোন বিশেষ পরামর্শ না থাকে তবে বাচ্চাকে ঘুমানোর সময় সবসময় চিৎ করে শোয়াবেন। ঘুমানোর সময় শিশুকে তার বিছানায় রাখার সময় একদিন পর পর দিক পরিবর্তন করে দিন। যেমন একরাতে শোয়ানর সময় তার পা যেদিকে থাকে পরের রাতে সেদিকে তার মাথা দিয়ে শোয়ান। কারণ শিশুরা সাধারণত রুমের দরজা বা জানালার দিকে ফিরে ঘুমাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই এভাবে দিক পরিবর্তন করে দিলে সে সে নিজ থেকেই তার মাথা ঘুরিয়ে আবার একই দিকে মুখ করে ঘুমাবে।

যদিও বাচ্চার মাথার অস্বাভাবিক আকৃতি বাবা-মাকে চিন্তিত করতে পারে কিন্তু এই ব্যাপারে বেশি দুশ্চিন্তার কোনও কারন নেই ।আপনার শিশুর মাথা খুব তাড়াতাড়ি গোলাকার হয়ে যাবে।কিছুটা সমস্যা থাকলেও তার মাথার চুল বড় হয়ে গেলে তাও ঢেকে যাবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts