বুকের দুধ কিভাবে সংরক্ষণ করবেন

Updated on

মাতৃত্বের ছুটি শেষে আবার অফিসে ফিরে যাওয়া বা অন্য কোন কারণে আপনি হয়তো চাইতে পারেন বাচ্চাকে বোতলে দুধ খাওয়াবেন। এমন পরিস্থিতিতে পাম্প করে বুকের দুধ বের করে বোতলে খাওয়ানোটা একটা অন্যতম উপায়।

তবে আপনি কীভাবে বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন, কোন ধরনের বোতলে রাখবেন, কোথায় রাখবেন এবং কোন তাপমাত্রায় রাখবেন এইসব প্রশ্নের উত্তর জেনে রাখাটা খুবই জরুরী। কেননা এগুলো সবই বুকের দুধ সংরক্ষণ এবং তার গুণগত মান ধরে রাখার ব্যাপারে সম্পর্কিত।

যেহেতু বুকের দুধ একটা প্রাকৃতিক জিনিস আর তাই এটা সংরক্ষণের জন্য এই ব্যাপারে কিছু জ্ঞান থাকা আবশ্যক। তবে চিন্তার কিছু নেই, আমরা আপনার জন্য বিষয়টি খুবই সহজভাবে উপস্থাপন করছি।

এই আর্টিকেলে আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবঃ

  • বুকের দুধ সংরক্ষণের নির্দেশনা
  • কীভাবে বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন?
  • ঠাণ্ডা বরফ করে সংরক্ষণ করা দুধ কীভাবে তরল করবেন?
  • ৪। বুকের দুধ কীভাবে গরম করবেন?
  • কীভাবে বুঝবেন আপনার সংরক্ষিত বুকের দুধ নষ্ট হয়ে গেছে?

এক নজরে বুকের দুধ সংরক্ষণের নির্দেশনা

বুকের দুধ এক প্রকার দামী সম্পদ, আর তাই এর প্রত্যেকটা কণার পরিপূর্ণ ব্যবহার জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে চলেই আসে আমাদের সামনে, আর সেটা হল ‘কতক্ষণ পর্যন্ত বুকের দুধ সংরক্ষণ করে রাখা যায়?’

বুকের দুধ যখন সংরক্ষণের সময় এটাকে ফ্রেশ রাখাটাই একমাত্র লক্ষ্য। সঠিক উপায়ে বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য নিচের তালিকাটি লক্ষ্য করুন। এই তালিকাটিতে লেখা আছে কীভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং কতক্ষণ ও কোন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করবেন।

বুকের দুধ সংরক্ষণ

একটা ব্যাপার জেনে রাখা ভালো, এই তালিকার তথ্যগুলো Centers for Disease Control and Prevention (CDC) থেকে প্রাপ্ত এবং এই নির্দেশনা সম্পূর্ণ সুস্থ নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রেই কেবল প্রযোজ্য। প্রিম্যাচিউর শিশুর জন্য বুকের দুধ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে নিন। কেননা প্রিম্যাচিউর শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক সংবেদনশীল।

বুকের দুধ সংরক্ষণের বিষয়ে কিছু পরামর্শ, যেগুলো জেনে রাখা ভালো

স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ: বুকের দুধ শুষ্ক স্থানে ও সূর্যের সরাসরি আলো থেকে দূরে সংরক্ষণ করুন। কখনোই ৭৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট থেকে বেশি গরম তাপমাত্রায় বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন না কেননা এতে করে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হতে পারে।

বরফের কৌটোর মধ্যে (Cooler Bag): বরফের কৌটার মধ্যে সর্বচ্চ চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কৌটোর মধ্যে সবসময় কিছু বরফের ব্যাগ রেখে দিতে ভুলবেন না এবং কখনই প্রয়োজন ছাড়া কৌটা খুলবেন না।

ফ্রিজের নরমাল অংশেঃ বুকের দুধ ফ্রিজের সাধারণ অংশের একদম শেষ মাথায় রেখে দিবেন, কেননা সেই অংশটা সবচাইতে বেশি ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। ফ্রিজের দরজার সাথে কখনই বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন না, কারণ এই স্থানে তাপমাত্রা সবসময়েই পরিবর্তন হতে থাকে।

ফ্রিজের বরফ অংশেঃ ফ্রিজের বরফ করার অংশের ক্ষেত্রেও বুকের দুধ যতটা সম্ভব একদম শেষ মাথায় রেখে দিবেন। কারণ ফ্রিজের এ অংশের তাপমাত্রা মোটামুটি অপরিবর্তনীয় থাকে।  ফ্রিজের ডালা অর্থাৎ দরজার সাথে কোন অবস্থাতেই বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন না। সীল করা কন্টেইনার বা ব্রেস্ট মিল্ক স্টোরেজ ব্যাগ এ দুধ সংরক্ষণ করুন। সবসময় পুরানো দুধ প্রথমে ব্যাবহার করে ফেলুন।

কিভাবে বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেনঃ বিস্তারিত বর্ণনা

বুকের দুধ সংরক্ষণের বিষয়ে একটা সাধারণ তথ্য সবসময় মাথায় রাখবেন, আর সেটা হলঃ ফ্রিজের সাধারণ অংশে অল্প সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে এবং বরফ করার অংশে বা ফ্রীজারে দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে। যদি বরফ করার অংশে বুকের দুধ সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে মাসের পর মাস এটা ঠিক থাকে। যদিও দুধের গুণগত মান একদম ফ্রেশ দুধের মত থাকেনা। কেননা বরফ করার ফলে বেশ কিছু ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নষ্ট হয়ে যায়।

ফ্রিজের সাধারণ অংশে রাখা বুকের দুধ যদিও খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং বেশিদিন সংরক্ষণ করা যায় না, তবুও ফ্রিজের এই অংশে বরফ করার অংশ থেকে গুণগত মান ভালো থাকে। একদম সরাসরি বুক থেকে দুধ খাওয়া বা পাম্প করে সাথে সাথে খাওয়ানোর কোন তুলনা হয় না, তবুও ফ্রিজের উভয় অংশে সংরক্ষণ করা দুধে কিছু হলেও গুণগত মান থেকে যায়, যার ফলে সংরক্ষণ করেও আপনি পরবর্তীতে আপনার শিশুকে খাওয়াতে পারেন।

কিভাবে বুকের দুধ নরমাল ফ্রিজে  সংরক্ষণ করবেন?

আপনি যদি অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সংরক্ষিত দুধ খাওয়াতে চান, তাহলে ফ্রিজের সাধারণ অংশে এটাকে সংরক্ষণ করুন। এতে করে বরফ হওয়া দুধ পুনরায় তরল করতে হবে না। তবে মনে রাখবেন ফ্রিজের সাধারণ অংশ দুধ সংরক্ষণের একটা সাময়িক উপায়। সংরক্ষিত বুকের দুধ চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনার শিশুকে খাওয়ানো সবচাইতে ভালো। যদিও সঠিক উপায়ে সংরক্ষিত দুধ চারদিন পর্যন্ত খাওয়ানো যায়। কীভাবে ফ্রিজে সঠিক উপায়ে দুধ সংরক্ষণ করবেন, তা নিচে আলোচনা করা হলঃ

সঠিক কৌটো নির্বাচন দিয়ে শুরু করুন:  যখন বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন, একটা পরিষ্কার পাত্র খুঁজে নিন। যেমন ঢাকনা/ক্যাপ সহ বোতল, ঢাকনাওয়ালা শক্ত প্লাস্টিকের কাপ অথবা বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি ব্যাগ (ব্রেস্টমিল্ক স্টোরেজ ব্যাগ)  ব্যাবহার করতে পারেন। এ বিষয়ে নিউইয়র্কের ল্যাক্টেশন কনসাল্টেন্ট তামারা হকিংস বলেন,  আরেকটা ব্যাপার খেয়াল রাখবেন, ব্রেস্টমিল্ক স্টোরেজ ব্যাগে দুধ কখনোই পরিমাপের জন্য যে দাগ থাকে সে দাগ অতিক্রম করে ভর্তি করবেন না। 

ভর্তি করার পরে ব্যাগের মুখ ভালো করে সীল করে বন্ধ করুন এবং ব্যাগগুলো ফুড স্টোরেজ কন্টেইনারে ভরে ফ্রিজে রাখুন যাতে তা কাচা মাংস বা রান্না না করা খাবারের সংস্পর্শে না আসে। এছাড়া সাধারণ প্লাস্টিকের ব্যাগে বা কৌটার মধ্যে বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেন না।

ফ্রিজের ঠিক কোন জায়গায় বুকের দুধ সংরক্ষণ করবেনঃ ফ্রিজের মধ্যে বুকের দুধ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে, ফ্রিজের কোন জায়গায় পাত্রটি রাখবেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাম্প করে বের করা দুধ ফ্রিজের শেষ মাথায় একদম দেয়াল ঘেঁষে রাখুন, কেনন ফ্রিজের এই জায়গাটিই সবচাইতে ঠাণ্ডা স্থান এবং খুব সহজের এখানকার তাপমাত্রা পরিবর্তিত হয় না।

এছাড়া ফ্রিজ খোলা এবং বন্ধ করার সময় ফ্রিজের দরজার কাছের জায়গায় তাপমাত্রা প্রায় সময় পরিবর্তিত হতে পারে, আর ঠিক এজন্যই এই জায়গাটা বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য সবচাইতে অনিরাপদ জায়গা।

কয়েকবার পাম্প করে বের করা দুধ একত্র করে রাখতে পারবেনঃ কখনো এমনটা হয় যে, একবার পাম্প করলে খুব বেশি দুধ পাওয়া যায় না, আর তাই মায়েরা প্রায়শই চিন্তায় পড়ে যান যে মাত্র পাম্প করে বের করা দুধ কি ফ্রিজে সংরক্ষিত পাত্রের দুধের সাথে মিশিয়ে রাখতে পারবেন কি না। আর এর উত্তর হলঃ হ্যাঁ! বেশ কয়েকবারে পাম্প করে বের করা দুধ একত্র করে ফ্রিজে রাখা যাবে অথবা ফ্রিজে সংরক্ষিত দুধের সাথে একত্রিত করা/মিশানো যাবে।

তবে এই ক্ষেত্রে নিয়মটি হল, মাত্র পাম্প করা দুধ প্রথমে একটু ঠাণ্ডা হতে দিন, এরপর সংরক্ষণ করুন পুরানো দুধের সাথে। এ সম্পর্কে স্ট্রাটফোর্ড, সিটি এর অনুমোদিত স্তন্যপান বিশেষজ্ঞ রেজিনা বলেন, “ভিন্ন দুই তাপমাত্রার দুধ যখন একত্র করবেন,

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ফ্রিজে রাখা দুধের সাথে যখন মাত্র পাম্প করে বের করা দুধ একত্র করবেন তখন ঠাণ্ডা দুধ গরম দুধের সাথে মিশে সামান্য গরম হয়ে যায় এবং পুনরায় এটা যখন শিশুকে খাওয়ানো হয় তখন এটা আবার গরম করতে হয়”। আর এতবার ঠাণ্ডা এবং গরম করলে দুধের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

এজন্য সবচাইতে ভালো উপায় হল, গরম দুধ প্রথমে কিছুক্ষণ ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে নিন অতঃপর তা পূর্বের ঠাণ্ডা দুধের সাথে মিশিয়ে নিন। যদি আপনি কিছুক্ষণের মধ্যেই দুধ ব্যাবহার না করেন, সেক্ষেত্রে পুরানো দুধের সাথে মিশানোর সময় পূর্বের দুধের তারিখ ব্যাগ বা কন্টেইনারের গায়ে লিখে রাখুন।

আরেকটা ব্যাপার মনে রাখবেন, কখনই বরফ দুধের সাথে নতুন পাম্প করে বের করা দুধ মিশানো নিরাপদ নয়। এ সম্পর্কে নর্দান ভার্জিনিয়ার স্তন্যপান বিশেষজ্ঞ ফার্মের ডিরেক্টর ন্যানসি ক্লার্ক বলেন, যেহেতু মাত্র পাম্প করা দুধ কিছুটা গরম এবং এটা বরফ দুধের সাথে মিশালে বরফ দুধ কিছুটা গলে যেতে পারে আর এতে করে দুধ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

গরম দুধ কখনই পুনরায় গরম করবেন নাঃ সংরক্ষিত বুকের দুধ শুধুমাত্র একবার গরম করা যাবে কেননা বারবার দুধ গরম করলে এর মধ্যে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তাই বাচ্চার যদি একবারে পুরো দুধ শেষ না করে তবে পরেরবার দুধ গরম করে বাচ্চাকে দেয়ার প্রয়োজন নেই, ঠাণ্ডা দুধই দিন।

কিভাবে দুধ বরফ করে সংরক্ষণ করবেন

পাম্প করা দুধ যদি নরমাল ফ্রিজের মধ্যে রেখে চার দিনের মধ্যে শেষ না করার সম্ভাবনা থাকে তাহলে দুধের গুণগত মান ঠিক রাখার জন্য সবচাইতে ভালো উপায় হল এটাকে ফ্রীজারে রেখে বরফ করে ফেলা। CDC এর নির্দেশনা মতে এভাবে বরফ করা দুধ ১২ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব, যদিও সবচাইতে ভালো হল ছয় মাসের মধ্যে এটা ব্যাবহার করে ফেলা।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিচে আলোচনা করা হলঃ

সঠিক পাত্রে সংরক্ষণ: নরমাল ফ্রিজে দুধ সংরক্ষণ করার মতই বরফ করে দুধ সংরক্ষণ করার সময়েও সঠিক পাত্রটি বেছে নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘসময় ধরে বরফ করে দুধ সংরক্ষণ করার জন্য কাঁচের বা   BPA মুক্ত প্লাস্টিকের পাত্র ব্যাবহার করুন। খেয়াল রাখবেন যাতে করে ঢাকনা খুব ভালোভাবে বন্ধ হয় এবং পাত্রটি বরফ করার ফ্রিজে রাখার জন্য নিরাপদ হয়। প্যাঁচানো ঢাকনা সহ কাঁচের পাত্রে এবং স্ন্যাপ সিস্টেমের মাধ্যমে আটকানো ঢাকনা সহকারে প্লাস্টিকের পাত্রের মধ্যেও এভাবে সংরক্ষণ করা যাবে।

বুকের দুধ সংরক্ষণের জন্য তৈরি বিশেষ ব্যাগের মধ্যেও বরফ করে সংরক্ষণ করা যাবে, তবে তা প্লাস্টিক বা কাঁচের পাত্রের মত বেশিদিন ধরে ব্যাবহার করা যাবেনা। কারণ এসব ব্যাগ ফ্রীজারে লিক করতে পারে এবং তাতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। ফ্রীজারে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে যে, উপরের দিকে কিছুটা যায়গা যেন ফাঁকা থাকে। কেননা দুধ যখন বরফ হয়ে যায় তখন এটার আয়তন বৃদ্ধি পায়।

ছোট ছোট পাত্রে তারিখ লিখে দুধ সংরক্ষণ করুনঃ অন্যান্য অনেক খাবারের মত করেই, বুকের দুধ যখন একবার বরফ থেকে গলিয়ে তরল করা হয় এটা পুনরায় আবার বরফ করা যাবে না। তাই অব্যবহৃত বুকের দুধ নষ্ট যাতে না হয় এজন্য ছোট ছোট পাত্রে দুই থেকে চার আউন্স করে তারিখ সহকারে সংরক্ষণ করুন। 

আপনার শিশু যদি ক্ষুধার্ত হয় তাহলে আপনি চাইলেই আরো দুধ গরম করে নিতে পারেন, অপরদিকে বরফ থেকে তরল করা দুধ আপনি শুধুমাত্র এক বা দু ঘণ্টার জন্য ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে পারবেন। এরপর দুধ নষ্ট হয়ে যাবে, তাছাড়া কখনই একবার গরম করা দুধ ঠাণ্ডা হয়ে গেলে পুনরায় গরম করা যাবে না।

ফ্রিজের যেখানে তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকে, সেখানেই দুধ সংরক্ষণ করুনঃ ফ্রিজের একদম ভিতরের দেয়ালের অংশ সবচাইতে ঠাণ্ডা বেশি থাকে। আর সেখানকার তাপমাত্রাও খুব একটা পরিবর্তিত হয় না। এছাড়াও, দরজার আশেপাশে দুধের পাত্র রাখবেন না, কেননা ফ্রিজ খোলা এবং বন্ধ করার জন্য সেখানকার তাপমাত্রা বারবার পরিবর্তিত হতে পারে।

বরফ করা বুকের দুধ কীভাবে গরম করে তরল করে নিবেন

একবার দুধ বরফ হয়ে গেলে আবার যখন এটা ব্যাবহার করবেন, তখন আপনাকে এটা গরম করে নিতে হবে। অনেকগুলো উপায়েই বরফ করা বুকের দুধ পুনরায় তরল করা যাবে, তবে কোন অবস্থাতেই মাইক্রোওয়েভে দিয়ে তরল করা যাবে না। কেননা মাইক্রোওয়েভে দিলে দুধের গুনগত মান নষ্ট হয়ে যাবে এবং কোন কোন অংশে দুধ অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে। আর এতে করে আপনার শিশুর মুখ পুড়েও যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বরফ করা দুধ তরল করার সবচাইতে ভালো উপায় হল, নরমাল ফ্রিজে সারারাত ধরে সেটা রেখে দিন। দুধ ধীরে ধীরে তরল হয়ে যাবে। তবে আপনার যদি খুব দ্রুত তরল দুধ প্রয়োজন হয় তাহলে একটা কুসুম গরম পানির পাত্রের মধ্যে দুধের পাত্রটি রেখে দিন। এক্ষেত্রে একটু খেয়াল রাখবেন যাতে করে পানির পরিমাণ কখনই যাতে দুধের বোতলের ঢাকনার উপরে না উঠে।

বুঝতেই পারছেন যে বরফ করা দুধ যেভাবেই তরল করুন না কেন, একটু সময় লাগতেই পারে। তাই আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন আর সবসময় কিছু পরিমাণ বুকের দুধ নরমাল ফ্রিজে প্রয়োজনে ব্যাবহারের জন্য রেখে দিন।

এখন যে প্রশ্নটা উঠে আসে সেটা হল, এই তরল করা দুধ কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়? আপনি যদি শিশুকে সাথে সাথেই দুধ না খাওয়ান তাহলে সেই তরল দুধ নরমাল ফ্রিজে রেখে দিন। যদি আপনি সাধারণ তাপমাত্রায় দুধটি তরল করে থাকেন তাহলে এই দুধ সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। যদি আপনি নরমাল ফ্রিজের তাপমাত্রায় এটাকে তরল করে থাকেন তাহলে এই দুধ সর্বোচ্চ চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাবহার করা যাবে।

বুকের দুধ কীভাবে গরম করবেন

আপনার শিশু যখন খাবারের জন্য কান্না করছে, তখন দুধ গরম হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে কারই বা ভালো লাগে? তবে ভয়ের কিছু নেই অতটা সময় ধরে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে না। কুসুম গরম পানির ধারার মধ্যে রেখে দুধের পাত্রটি নাড়াতে থাকুন কয়েক মিনিট ধরে। দেখবেন আপনার দুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে গরম হয়ে গেছে।

এছাড়াও আপনি একটা পাত্রে কিছু গরম পানি নিয়ে সেখানে দুধের পাত্রটি রেখে দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যে পানি যেন শুধু কুসুম গরম হয়, একদম গরম পানিতে কখনই বুকের দুধ গরম করবেন না।

এছাড়াও বোতল গরম করার জন্য এক ধরনের বিশেষ যন্ত্র পাওয়া যায়, আপনি সেটাও ব্যাবহার করতে পারেন দুধ গরম করার জন্য। তবে আবারও বলছি, মাইক্রোওয়েভে কোন অবস্থাতেই বুকের দুধ গরম করবেন না। কেননা এতে সবগুলো দুধ সম পরিমাণে গরম হয় না এবং এভাবে দুধ গরম করলে দুধ এবং বাচ্চা উভয়েরই ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আর আপনি উপরে বর্ণিত উপায়গুলোর মধ্যে যেভাবেই দুধ গরম করেন না কেন, খেয়াল রাখবেন সেই তাপমাত্রা যাতে শিশুর জন্য উপযোগী হয়। তাপমাত্রা পরীক্ষা করার জন্য আপনার হাতের তালুর উপরের অংশে কয়েক ফোঁটা দুধ নিয়ে দেখতে পারেন। এটা অবশ্যই যেন কুসুম গরম হয়, খুব বেশি গরম যেন না হয়।

কিভাবে বুঝবেন সংরক্ষিত বুকের দুধ নষ্ট হয়ে গেছে?

আপনি নিশ্চয়ই চান যে পাম্প করা বুকের দুধ সবটুকুই যেন ব্যবহৃত হয়, এর সাথে আপনাকে এ ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যে দুধ যেন শিশুর জন্য নিরাপদ এবং জীবাণুমুক্ত থাকে।  আর তাই আপনি কীভাবে বুঝতে পারবেন যে দুধ নষ্ট হয়ে গেছে? এটা বুঝার কিছু উপায় আছে।

প্রথমত, এটা দেখতে কেমন সেটা খেয়াল করুন। যখন ঠাণ্ডা হবে তখন আপনার সংরক্ষিত বুকের দুধ দুইটা লেয়ারে ভাগ হয়ে থাকবে, যেখানে দুধের ফ্যাট অংশটুকু উপরে দিকে ভেসে থাকবে। আপনি যখন হালকা নাড়াচাড়া করবেন তখন দুধ খুব সহজেই মিশে যাবে।

যদি আপনি দেখেন যে নাড়াচাড়া করার পরেও দুধ একদম মিশে যাচ্ছে না তখন আপনি বুঝে নিবেন যে বুকের দুধ নষ্ট হয়ে গেছে। স্তন্যপান বিশেষজ্ঞ হকিংস এ ব্যাপারে বলেন, “আপনি বুঝে যাবেন যে দুধ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে, যদি আপনি দেখেন যে দুধের মধ্যে দানা দানা হয়ে গেছে, দুধ ঠিকমত মিশছেনা অথবা দুধ কিছু আঁশ আঁশ হয়ে গেছে।

এছাড়াও গন্ধ শুকেও আপনি বুঝতে পারবেন যে দুধ কি নষ্ট হয়ে গেছে কি ভালো আছে। গরুর দুধের মতই, নষ্ট বুকের দুধের মধ্যে এক ধরনের বাজে গন্ধ থাকে যেটা বুঝতে আপনার কোন প্রকার অসুবিধাই হবে না। তবে সবচাইতে ভালো উপায় হল সামান্য একটু যদি জিহ্বার সাথে লাগিয়ে নেন তাহলেই বুঝতে পারবেন এটা ঠিক আছে কি নষ্ট হয়ে গেছে।

বুকের দুধে Lipase নামক প্রোটিন সম্পর্কে জেনে নিন

কখনো কখনো মায়েরা কিছুক্ষণ আগে ফ্রিজে রাখা বুকের দুধের মধ্যে এক ধরনের সাবানের মত অথবা টক টক গন্ধ পান। তারমানে কিন্তু এই নয় যে দুধগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। বুকের দুধে যদি এই lipase নামক প্রোটিন বেশি পরিমাণে থাকে তাহলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই ধরনের প্রোটিন শিশুর খাবার হজম করতে সাহায্য করে, বিশেষ করে DHA এর মত fatty acid হজমে এই প্রোটিন অনেক উপকারী।

বুকের দুধের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে lipase থাকলেও বেশীরভাগ  শিশুদের ক্ষেত্রেই এতে কোন সমস্যা হয় না। তারা কোন প্রকার আপত্তি জানানো ছাড়াই এই দুধ পান করে নেয়, কেননা দুধ এখনও নষ্ট হয়নি। কিন্তু কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে অতিরিক্ত lipase থাকলে যে টকটক গন্ধ হয়, সে জন্য তারা বুকের দুধ খেতে চায় না। এক্ষেত্রে সমাধান হল, মাত্র পাম্প করা বুকের দুধ সাথে সাথে সাধারণ কুসুম গরম থেকে একটু বেশি গরম করে নিলেই এই টকটক গন্ধটা চলে যায়।

বুকের দুধ যখন গরম করবেন, এটাকে স্টোভের উপর রাখতে পারেন তবে মাইক্রোওভেনে নয়। হকিংস এক্ষেত্রে সাবধান করেছেন, যাতে ভালো করে লক্ষ্য রাখা হয় দুধ গরম করার ক্ষেত্রে। যাতে করে বুকের দুধ পুরোপুরি ফুটানো না হয়। আপনাকে ১৪৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটে বুকের দুধ এক মিনিট ধরে গরম করতে হবে। আপনি খাবারের তাপমাত্রা পরীক্ষা করার থার্মোমিটারও ব্যবহার করতে পারেন এক্ষেত্রে।

এটা না থাকলে লক্ষ্য রাখবেন পাত্রের চারপাশে একদম ছোট ছোট বুদবুদ উঠে আসলেই দুধ নামিয়ে ফেলতে হবে। যখন আপনার বুকের দুধ প্রস্তুত হয়ে যাবে, সাথে সাথেই পাত্রটি একটি বরফের পাত্রের মধ্যে রেখে দিবেন যাতে করে দ্রুত তাপমাত্রা আবার ঠিক হয়ে যায়। তখন আপনি আবার এই দুধ অন্যান্য সাধারণ বুকের দুধের মত করেই সংরক্ষণ করতে পারবেন।  

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment