প্রসব পরবর্তী পিঠ ব্যথা বা ব্যাক পেইন : কিভাবে স্বস্তি পাবেন

প্রসব পরবর্তী ব্যাক পেইন বা পিঠ ব্যথার কারণ কি?

গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন শারিরীক পরিবর্তনের ফলে হওয়া ব্যাক পেইন বা পিঠের ব্যাথার কারণে প্রসব পরবর্তী সময়েও কিছু ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক।

উদাহরণস্বরূপ, গর্ভকালীন সময়ে আপনার ক্রমবর্ধমান জরায়ু পেটের পেশীকে টানতে থাকে, কিছুটা দুর্বল করে ফেলে এবং পিঠে ক্রমাগত টান লাগার ফলে পিঠের গঠনই বদলে যায়। গর্ভকালীন সময়ের বর্ধিত ওজন শুধু যে আপনার মাংসপেশিতেই প্রভাব ফেলে তা না, হাড়ের জোড়ায় জোড়ায়ও বেশ চাপ ফেলে।

এছাড়াও, গর্ভকালীন হরমোনের পরিবর্তন হাড়ের জোড়া এবং লিগামেন্ট কিছুটা শিথিল করে ফেলে। এবং আপনার জন্য দুঃসংবাদ হলো, শিশু জন্ম দেওয়ার পরও এই সমস্যাগুলো সাথে সাথে চলে যাবে না বরং বেশ কিছুদিন আপনাকে ভোগাবে।

একটা জিনিস খেয়াল করে দেখুন, শিশু জন্ম দেওয়ার সময় আপনার শরীরের এমন কিছু মাংসপেশির উপর দিয়ে ধকল গিয়েছে যেগুলো সাধারণত খুব একটা ব্যবহৃত হয় না। স্বাভাবিকভাবেই এর কিছু প্রভাব তো আপনি অনুভব করবেনই। বিশেষত, শিশু জন্মকালীন সময়টা (Labor) যদি একটু দীর্ঘসময়ের এবং কঠিন হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

প্রসবোত্তর বিভিন্ন কারণেও ব্যথা থাকার ব্যাপারটি হতে পারে। বিভিন্ন মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় অসাবধানতাবশত ভুলভাবে বসার কারণেও পিঠে ব্যথা হতে পারে।

আপনি প্রথম প্রথম শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর সময় শিশু ঠিকভাবে খেতে পারছে কিনা সেটা ভালোমত পরীক্ষা করতে এতই মনযোগী হয়ে পড়েন যে আপনি ঝুঁকে থাকায় ঘাড় এবং নিতম্বের উপরিভাগের মাংসপেশীতে যে টান লাগছে সেটা হয়তো আপনি আর খেয়াল করেন না।

এছাড়া শিশু জন্ম দেওয়ার ধকল কাটানোর আগেই দিন-রাত ২৪ ঘন্টা শিশুর যত্ন নেওয়া নিয়ে আপনাকে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে যেতে হয়। এই অত্যন্ত ব্যস্ত সময়ের প্রচন্ড ক্লান্তি আপনাকে পিঠের ব্যাথাসহ শরীরের বিভিন্ন যন্ত্রনা থেকে সুস্থ হতে দেয় না।

পিঠের ব্যথা কতদিন স্থায়ী হতে পারে?

সাধারণত ডেলিভারির কয়েক মাস পরই আপনি পিঠের ব্যথা থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে পারবেন। তবে কিছু কিছু মায়েদের পিঠের ব্যথা এর চেয়ে অনেক বেশী সময় ধরে ভুগিয়ে থাকে৷

গর্ভধারণের পূর্বে কিংবা গর্ভাবস্থায় যদি পিঠে ব্যথা থাকে তাহলে সেটা ডেলিভারির পরেও স্থায়ী থাকার সম্ভাবনা রয়ে যায়, বিশেষত গর্ভাবস্থার প্রথমদিকেই যদি ব্যথা থাকে এবং ব্যাথার মাত্রাটা খুব বেশীই হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ওজনধারী মায়েদের দীর্ঘমেয়াদী পিঠের ব্যথা হওয়ার ঝুঁকি বেশিই থাকে।

পিঠের ব্যথা প্রশমনে আমি কি করতে পারি?

প্রথমে পিঠের ব্যথা সম্বন্ধে আপনার ডাক্তারকে জানান। ডাক্তার আপনার ব্যথা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আপনার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করবেন এবং কোন ঔষধ লাগবে কিনা বুঝবেন। এছাড়া কিভাবে দৈনন্দিন কাজে সাবধানতা অবলম্বন করে পিঠের ব্যাথাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় সে বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেবেন। পিঠের ব্যথা নিয়ন্ত্রনে রাখতে নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন।

মৃদু ব্যায়াম

আপনার যখন পিঠে ব্যথা করবে, হাটাচলা করা স্বাভাবিকভাবেই আপনার সবচেয়ে অপছন্দের কাজ হয়ে দাঁড়াবে৷ কিন্তু ঠিক এই জিনিসটাই এই সময়ে আপনার শরীরের সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন।

ব্যায়ামের শুরুটা হালকা পাতলা হাঁটা দিয়েই শুরু করা যায়। ভ্যাজাইনাল বার্থ কিংবা সিজারিয়ান যেভাবেই আপনি শিশু জন্মদান করেন না কেন, ডেলিভারের ক’দিন পর থেকে হাটার ব্যায়াম শুরু করে দিতে পারবেন। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই ধীরে ধীরে এবং অল্প দূরত্ব হাঁটা নিরাপদ।

ডাক্তারের অনুমতি পেলে, তারপর ‘পেলভিক টিল্টস’ নামক হালকা ব্যায়ামটি আপনার ডেইলি রুটিনে যোগ করে দিতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে পিঠ এবং পেটের মাংসপেশীকে শক্তিশালী করার জন্যে হালকা ব্যায়ামও শুরু করতে পারেন।

হালকা ধরনের স্ট্রেচিং কিংবা ইয়োগাও করতে পারা যায় তবে খেয়াল রাখবেন অবশ্যই যাতে অতিরিক্ত স্ট্রেচিং কিংবা কঠিন কোন আসন না হয়ে যায়। আর সবসময় চেষ্টা করবেন শরীরের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। যদি দেখেন যে ইয়োগার কোন আসন কিংবা যে কোন ব্যায়ামে আপনি অস্বচ্ছন্দ্য বোধ করছেন, সাথে সাথে তা বন্ধ করে দিন।

সঠিক শরীর বিদ্যা

সারাদিনের চলাফেরায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন।

যখন দাঁড়াবেন, সোজা হয়ে দাঁড়াবেন। যখন বসবেন, সোজা হয়েই বসবেন।

শিশুকে বুকের দুধ কিংবা ফীডার যা-ই খাওয়ান না কেন, আপনার বসার ভঙ্গির দিকে নজর দিন। হাতলওয়ালা আরামদায়ক কোন চেয়ারে বসতে পারেন এবং বসার সময় পিঠের নিচে বালিশ রেখে বসুন যাতে আপনার পিঠ এবং হাত পর্যাপ্ত সাপোর্ট পায়।

এছাড়া, শিশুকে বুকের দুধ পান করিয়ে থাকলে বিশেষ ব্রেস্টফিডিং বালিশ কিনতে পারেন যা আপনার চারপাশে ঘেরা থাকবে এবং শিশুকে কোলে তুলে রাখতে আপনার শক্তিও কম খরচ হবে। এছাড়া বুকের দুধ পান করানোর সময় ছোট পা রাখার টুলের উপর পা দুটো রাখতে পারেন। এটাও বেশ উপকারী।

শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর সময় কিভাবে বসতে হবে তা ঠিক ঠাক জেনে নিন এবং অবশ্যই আপনার স্তনকে শিশুর কাছে না নিয়ে শিশুকে আপনার স্তনের কাছে আনুন।

সবসময় একই পজিশনে শিশুকে না খাইয়ে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতেই পারেন। আপনার যদি ঘাড় থেকে পেছনের মাংসপেশিতে এবং আপার ব্যাক পেইন থাকে সেক্ষেত্রে শুয়ে এক পাশ ফিরে (Side-Laying Position) শিশুকে দুধ পান করানো আপনার জন্যে আরামদায়ক হবে।

মেঝে থেকে শিশু কিংবা যে কোন কিছু তোলার সময় অবশ্যই হাটু ভেঙে বসে তারপর তুলুন। এতে করে পিঠে অনেক কম চাপ পড়ে।

নিত্যদিনের কাজে ভারী কোন কিছু তোলার কাজটা অন্য কাওকেই করতে দিন। বিশেষত আপনি যদি সিজারিয়ান হয়ে থাকেন, তাহলে তো অবশ্যই।

কিছু সাধারণ যত্ন

সকল দুশ্চিন্তা-যন্ত্রনা থেকে নিজেকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া কিংবা নিজের ছোট-খাটো কিছু যত্ন নেওয়াও কিন্তু আপনাকে পিঠের ব্যথা মোকাবেলা করতে সহায়তা করতে পারে। আর কিছু না হোক কিছুক্ষণ তো আপনাকে ভালোলাগা উপহার দেবে। সেটাই বা কম কি?

বাথটাবে গরম পানিতে শরীর ডুবিয়ে দিন

আইসব্যাগে গরম কিংবা ঠান্ডা কিছু দিয়ে আপনার পিঠে যেখানে ব্যথা সেখানে রেখে দিন। ( ব্যাগটি অবশ্যই পাতলা কাপড় বা অন্য কিছু দিয়ে মুড়িয়ে নেবেন। )

মাংসপেশিকে কিছুটা আরাম দিতে আলতো আলতো করে ম্যাসাজ করে দিতে বলুন।

নিজেকে নির্ভার রাখার পদ্ধতিগুলো শিখে যান। এগুলো যে কোন অস্বস্তিকর অবস্থা মোকাবেলায় সাহায্য করবে  এবং রাতে ঘুমানোর সময়ও বেশ উপকারী হবে।

ট্যান্সকিউট্যানিয়াস ইলেক্ট্রিক্যাল নার্ভ সিমুলেশন (Transcutaneous Electrical Nerve Stimulation) নামক যন্ত্রটি ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এই ছোট, সাশ্রয়ী যন্ত্রটি ব্যাবহার করে অনেকেই পিঠের ব্যথা থেকে সাময়িকভাবে পরিত্রাণ পেয়েছেন বলে জানান।

আর কি করতে পারি?

আপনি চাইলে নিম্নোক্ত কাজগুলোও করতে পারেন:

ইবোপ্রোফেন অথবা এসিটামিনোফেন জাতীয় ঔষধ খেতে পারেন। তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে, পরিমাপ জেনে তবেই গ্রহন করুন। আপনার যদি মনে হয় যে আরো ঔষধ প্রয়োজন কিংবা এই ঔষধগুলো কাজ করছে না, তাহলেও তা ডাক্তারকে জানান।

ফিজিক্যাল থেরাপি। একজন ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট আপনাকে পিঠের ব্যথা প্রতিকার ও প্রতিরোধে বিভিন্ন ব্যায়াম শেখাতে পারেন।

বিভিন্ন বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন আকুপাংচার কিংবা চিরোপ্র‍্যাকটিক কেয়ার (chiropractic)। এগুলোর মাধ্যমেও পিঠের ব্যথা থেকে মুক্তির অনেক নজির রয়েছে।

কোন উপসর্গগুলো দেখলে সাথে সাথে ডাক্তারকে জানাবো?

নিম্নোক্ত ব্যাপারগুলো ঘটলে তা সাথে সাথে ডাক্তারকে জানানো জরুরি:

  • পিঠের ব্যথা একটানা, অনেক বেশী এবং অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যাচ্ছে এমন হলে।
  • শরীরের কোন আঘাতের কারণে ব্যথা উঠলে কিংবা ব্যাথার সাথে জ্বর থাকলে।
  • এক পা কিংবা উভয় পায়ের অনুভূতি হারিয়ে ফেললে অথবা হঠাৎ করে শরীর অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা বেশ দুর্বল লাগলে।
  • নিতম্ব, উরুর মাংসপেশিসহ যৌনাঙ্গের আশেপাশের অংশে সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেললে। এতে করে মলত্যাগ কিংবা মুত্রত্যাগ করা কষ্টকর হয়ে যেতে পারে অথবা এগুলো নিয়ন্ত্রণহীনও হয়ে যেতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts