যেভাবে খাবারের প্রতি খুঁতখুঁতে বাচ্চাকে (Picky Eater) সামলাবেন

Updated on

কেনো আমার বাচ্চা খাবারের প্রতি এতো খুঁতখুঁতে?

শক্ত/ ভারি খাবার খাওয়া আপনার বাচ্চার জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন স্বাদ, রং ও আকৃতির খাবার খাওয়ার অভ্যাস করার জন্য তার একটু সময় প্রয়োজন। যদিও বাচ্চারা অনেক কিছু ধারাবাহিকভাবে করতে পারে ( খেলা থেকে ঘুমানো পর্যন্ত ) কিন্তু খাবারের সময় তারা খুব অনীহা প্রকাশ করে ; এমনকি পরিচিত খাবার খাওয়ার সময়েও !

বাচ্চাদের খাবারের অভ্যাস প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হওয়া খুব সাধারণ বিষয় এবং আপনি যতক্ষণ না তাদের নতুন খাবার খাওয়ানোর বার বার চেষ্টা করবেন ততক্ষণ তারা খাবে না । এটা আপনার বাচ্চার দেহে পুষ্টি প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তনের কারণেও হতে পারে। বাচ্চারা প্রথম বছরে যে পরিমাণ বড় হয় ,পরের বছর থেকে তার তুলনায় গ্রোথ কম হতে থাকে। এজন্যই তারা খাবারের প্রতি আগ্রহী হয় না এবং খেতে চায় না।

এছাড়া বড় হবার সাথে সাথে সে স্বাধীন হতে শেখে এবং নিজের ইচ্ছে মতো পছন্দ করতে শেখে। এসময়ে তাদের সব বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত- বিশেষ করে খাবারের বিষয়ে।

বাচ্চাদের খাবারের প্রতি নিজেদের পছন্দ গড়ে ওঠার আগে এবং নতুন খাবারে অনীহা তৈরি হবার আগেই তাদের সবধরণের খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করানো উচিত।বিশেষ করে তাদের দুই বছর বয়স হলে তখন থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত। এজন্য আপনার বাচ্চাকে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার দেবেন যাতে সে সবধরণের খাবারে অভ্যস্ত হতে পারে ( দুপুরের খাবার সময়ে না দিতে পারলে বিকেলের নাস্তা হিসেবে দিতে পারেন।)

দেখা যায়, একটি শিশু ছোটবেলা থেকে পূর্বধারণাপ্রসূত বিশ্বাস থেকে কোনো মাছ না খেয়েই বড় হচ্ছে। এতে সে বিচিত্র সব খাবারের স্বাদ তো পেলই না, পুষ্টিগুণ থেকেও বঞ্চিত হলো। কোনো শিশু হয়তো প্রতি বেলায় মুরগি খেতে চায় বলে অন্যান্য খাবার আর গ্রহণই করে না। এভাবে নির্দিষ্ট খাবার গ্রহণের প্রবণতা অনেক শিশুরই থাকে।

সব সময় যে এটা কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য হয়, তা নয়, বেশির ভাগ সময় শিশু তার অপছন্দের খাদ্যটি সম্পর্কে নেতিবাচক কথা শোনে, নেতিবাচক আচরণ দেখে এবং বাবা-মায়েরা নিজেদের অজান্তেই শিশুটির মনে বিশেষ খাদ্যটি সম্পর্কে বিতৃষ্ণা তৈরি করে। এতে শিশুটি অভ্যস্ত হয়ে যায়। তার বিশ্বাস দৃঢ় হয়। এরপর হাজার সাধাসাধির পরও শিশু আর সেই খাবার খেতে চায় না। পরিণত বয়সেও তার স্বাদগ্রন্থি ওই বিশেষ খাদ্যের উপযোগী হয় না বলে নির্দিষ্ট খাবারগুলো আর খেতেই পারে না।

[ আরও পড়ুনঃ শিশুর সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরির ৭ টি টিপস (ছয় মাস থেকে ১৮ মাস বয়সী বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ]

খাবারের প্রতি খুঁতখুঁতে বাচ্চাকে (পিকি ইটার) সবধরণের খাবার খাওয়ানোর উপায়

আপনার বাচ্চার সুস্থ থাকার জন্য কি পরিমাণ খাদ্য পুষ্টি প্রয়োজন তা তারা প্রাকৃতিক ভাবেই বুঝতে পারে এবং তারা কতটুকু খাবে তা নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়। আপনি যা করতে পারেন তা হলো সুন্দর গোছানো পরিবেশে পরিবারের সবাইকে পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে পারেন, যাতে সবাই খাবার উপভোগ করতে পারে। এখানে আপনার খাবারে উদাসীন বাচ্চাকে সামলানোর কিছু টিপস দেওয়া হলোঃ

আপনার বাচ্চার খাবারের একটা খাদ্য কাঠামো তৈরি করুন যাতে সে তিনবেলা নিয়মিত খায় এবং দুইবেলা পুষ্টিকর নাস্তা খায়। অধিকাংশ শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন সাধারণত বাচ্চারা একবারে খুব কম খাবার খায়। এজন্য আপনার বাচ্চার তিনবেলা খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করুন যাতে সে শুধুমাত্র ক্ষুধার্ত হলে খায়, অকারনে স্ন্যাকিং না করে।

তিনবেলা খাবারের সময়ে বাচ্চাদের ভিন্ন ভিন্ন খাবার পরিবেশন করুন। আপনি নতুন খাবার তৈরি করে তাকে জোড়াজুড়ি না করে তার সামনে রাখুন। খাবারটি তার বয়সের অনুযায়ী ঠিক আছে কিনা সেটা আগে নিশ্চিত হবেন।

নতুন খাবার দিনে একবার অল্প পরিমাণে পরিবেশন করবেন।সব নতুন খাবার একসাথে তৈরি করার পরিবর্তে তার পছন্দের খাবারের সাথে একটা নতুন খাবার যোগ করুন। এছাড়া সবসময় সব ধরণের খাবারের সাথে বাচ্চার পছন্দের যেকোনো একটি খাবার রাখার চেষ্টা করবেন।

খাবারের একটা শিডিউল তৈরি করবেন যাতে আপনার বাচ্চা ক্ষুধার্ত হলে তাকে কোন নতুন খাবার দিতে পারেন। যেমনঃ বিকেলে তার হাতে এক টুকরো পাকা আম দিতে পারেন।

বাচ্চার খাবার অল্প পরিমাণে তৈরি করবেন। বাচ্চাদের খাবারের পরিমাণ বড়দের ১/৪ ভাগ হওয়া উচিত। একটা এক বছরের বাচ্চার জন্য মাংসের পিস তার হাতের তালুর সাইজের হওয়া উচিত এবং সবজি মাত্র এক থেকে দুই টেবিল চামচ হওয়া উচিত।

বাচ্চারা অন্যদের তুলনায় খাবারের প্রতি বেশি স্পর্শকাতর। অনেক বাচ্চা খাবারের স্বাদ , রঙ অথবা আকৃতি পছন্দ করে না ।এজন্য যে খাবার আগে কখনো খায়নি সে খাবার মুখে দিতেও তারা অনীহা প্রকাশ করে। আবার অনেক বাচ্চা কিছু খাবার খেতে অনীহা প্রকাশ করে বিশেষ করে যেগুলো তাদের কোন খারাপ মুহুর্ত মনে করিয়ে দেয় ,যেমনঃ অসুস্থ থাকার সময় যে খাবার খেয়েছিলো সে খাবার খেতে অনীহা প্রকাশ করে , এগুলো তাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাচ্চারা পুষ্টিকর কোনো একটা খাবার খেতে না চাইলেই মায়েরা নতুন কিছুতে চলে যান। এমনটা না করে রেসিপিতে পরিবর্তন এনে ওই খাবারটিই বারবার পাতে দিন। পুষ্টিকর যেকোনো খাবার বহু চেষ্টায় খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।

আপনার বাচ্চার পছন্দের খাবারে বেশি নিউট্রিশন যোগ করুন। যেমনঃ ম্যাকারোনি, ক্যাশেরলের সাথে একটু শস্য জাতীয় খাবার অথবা মুরগী যোগ করতে পারেন।পাস্তা সসে গাজর বা অন্যান্য শাকসবজি যোগ করতে পারেন। এছাড়া তাদের পছন্দের সিরিয়ালে ফলের টুকরো যোগ করাটাও ওর জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে।

আপনার বাচ্চাকে বেশি খাওয়ানোর জন্য কখনোই তাকে চিনি সমৃদ্ধ খাবার দেবেন।না আপনি আপনার বাচ্চাকে বেশি খাওয়াতে চান কিন্তু নিশ্চয় তাকে মিষ্টিজাতীয় খাবার খাইয়ে দাতের ক্ষতি করতে চান না! অনেক মা-ই লোভনীয় প্রস্তাব ছুড়ে দেন। যেমন : সবজি খেলে চকোলেট দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শিশুর কাছে চকোলেটের প্রাধান্যই বজায় থাকে। কাজেই বাচ্চাকে ভালো ও মন্দ খাবারের পার্থক্য বুঝিয়ে দিন।

খাবার টেবিলে বাচ্চার মনোযোগ যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। যদি খাবার টেবিলের আশেপাশে কোন ছোট বাচ্চা দৌড়াদৌড়ি করে অথবা টিভিতে কার্টুন চলতে থাকে , আপনার বাচ্চার খাবার খাওয়ার মনোযোগ নষ্ট হবে। খাবার খাওয়ার স্থানকে সুন্দর ও শান্ত রাখার চেষ্টা করুন।

আমি কিভাবে আমার বাচ্চাকে বিভিন্ন ধরণের খাবার খাওয়াতে পারি?

আপনার বাচ্চা একবারে অনেকটা পরিমাণে খাবে এই আশা করাটা বাস্তবসম্মত নয়।নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস আপনার সন্তানকে ভালো রাখতে পারে। কিন্তু এই বয়সে আপনার বাচ্চা নিজের পছন্দ অনুযায়ী  মাত্র কয়েকটি খাবার খেতে চাইবে এবং তাই তাকে নিজের খাবারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া শেখানোটা জরুরি।

ক্যালিফোর্নিয়ার বারক্লে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রথিতযশা ডায়েটিশিয়ান ন্যান্সি হাডসনের মতে, “ একটা বাচ্চা যা খায় তা তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার।“ কারণ সে যা খেতে পছন্দ করে না অথবা তার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার জোর করে খাওয়ালে তার শারীরিক সমস্যা হতে পারে। যেসব বাচ্চা তাদের নিজেদের খাবার খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না (যেমনঃ তাদের পেট ভরে গেলেও জোর করে খেতে হয়) ,তারা বড় হয়ে স্থুল /মোটা হবার ঝুকিতে ভোগে। নতুন খাবার খাওয়ার জন্য বাচ্চাকে খুব জোর করলে তারা জেদী হয়ে ওঠে এবং নতুন খাবার খাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

যদি আপনার বাচ্চা চিজ এবং ক্রাকার ছাড়া কিছুই না খেতে চায়,আপনি চিন্তা করবেন না। সে কি কি খায় তার একটা তালিকা রাখুন এবং আপনি তালিকাটা খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে এক সপ্তাহের মধ্যে সে তার প্রয়োজনীয় পুষ্টী গ্রহণ করছে কিনা। আমেরিকার একটি বিখ্যাত ডায়েটিক এসোশিয়েশনের তথ্যমতে বাচ্চারা যারা খুব খুঁতখুঁতে তারাও তাদের পুষ্টি পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ঠিকই খায়।

তবুও যদি আপনার মনে হয় ,আপনার বাচ্চা খাচ্ছে না ,তাহলে ডাক্টারের পরামর্শ নিয়ে তাকে মাল্টিভিটামিন খাওয়াতে পারেন।

যদি আমার বাচ্চার গ্রোথ না হয়, কীভাবে বলবো যে সে যথেষ্ট খাবার পাচ্ছে?

আপনার বাচ্চা দ্রুত বড় না হলে ভয় পাবেন না। সব বাচ্চা একই গতিতে বড় হয় না। আপনার বাচ্চার গ্রোথ তার প্রথম বছরের মত দ্রুত হবেনা।

শিশুদের খাওয়ানো নিয়ে মোটেও মানসিক চাপে থাকবেন না। এর জন্য প্রচুর ঘাম ঝরানোর প্রয়োজন নেই। বাচ্চাদের নিয়ে রান্না করুন। বিভিন্ন খাবার সম্পর্কে ধারণা দিন। এদের ভালো-খারাপ দিক তুলে ধরুন।

যদি আপনার আপনার মনে হয় বাচ্চা সঠিক ভাবে বেড়ে উঠছে না তাহলে ডাক্টারের পরামর্শ নিন, কিন্তু আপনার উদ্বেগ আপনার সন্তানের কাছে প্রকাশ করবেন না। আপনি যদি ক্রমাগত খাওয়ার সময় ঘোরাঘুরি করেন ,খাওয়ার জন্য জোর করেন অথবা ক্যালোরির হিসেব করেন তাহলে আপনার বাচ্চা খাওয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। যেটা অবশ্যই আপনার কাম্য নয়, তাই না ?

[ আরও পড়ুনঃ যেভাবে আপনার বাচ্চাকে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে আগ্রহী করে তুলবেন ]

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts