নবজাতক শিশুর ৬টি রিফ্লেক্স বা সহজাত প্রতিক্রিয়া এবং এগুলোর প্রয়োজনীয়তা

Spread the love

সময়ের সাথে মানবজাতির যে বিবর্তন হয়ে আসছে, পুরো বিষয়টি নবজাতক শিশুর রিফ্লেক্স বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলোর দিকে এক নজর তাকালেই বোঝা যায়। বিভিন্ন নড়াচড়ার দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে নবজাতক শিশুরা আশেপাশের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করেই বেশ কিছু সহজাত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকে।

এই প্রতিক্রিয়াগুলো কিন্তু শিশু তার বুদ্ধি খাটিয়ে করেনা বরং বলা যেতে পারে এগুলো সম্পূর্ণ সহজাত অভ্যাস যা কি না শিশু জন্ম থেকেই নিজের মধ্যে ধারণ করে থাকে।

বিজ্ঞাপণ

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আপনি যদি নবজাতক শিশুর ঠোঁটের নিচে আঙুল বুলান তাহলে আপনি দেখতে পাবেন শিশু নিজে থেকেই মুখ খুলে ফেলেছে এবং যে পাশে আপনি হাত বুলিয়েছেন সেদিকেই নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে।

এছাড়া আপনি তাদের ঠোঁটের উপরের অংশে হালকা আঙুল বুলিয়ে দেখুন তারা নিজে থেকে চোষা শুরু করবে। আর এই সহজাত প্রতিক্রিয়াগুলো শিশুর মধ্যে জন্মগত ভাবেই আসে।

নবজাতকের রিফ্লেক্সগুলো দেখতে অনেক আদুরে বা সুন্দর লাগলেও এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলোর বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। শিশুর ডিএনএ এর মধ্যেই এগুলো প্রোথিত থাকে কারণ এগুলো নবজাতকেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

একটু চিন্তা করে দেখুন তো ব্যাপারটা কেমন হবে, যদি আপনাকে নবজাতক শিশুকে দুধ খাওয়া অথবা মলত্যাগ করা শিখিয়ে দিতে হত? শুনতে রীতিমত অসম্ভব মনে হলেও, আশার কথা হল আপনাকে এই ধরনের কোন কিছু শিশুকে শিখিয়ে নিতে হচ্ছে না। কেননা শিশুরা জন্মগত ভাবেই এই ধরনের প্রতিক্রিয়াগুলো ধারণ করে থাকে। যেমন বলা চলে চোখের পাতা ফেলা অথবা কাশি দেয়া, এগুলো শিশুকে শিখে নিতে হয় না অথবা প্র্যাকটিস করে আয়ত্ত করতে হয় না।

নবজাতক শিশুর বেশীরভাগ সহজাত প্রতিক্রিয়াগুলো বেশ জরুরি এবং এগুলো তার জন্মের প্রথম দিন থেকেই বা জন্মের আগে থেকেই উপস্থিত থাকে।

নবজাতক শিশুর এই ধরনের প্রতিক্রিয়াগুলো সম্পূর্ণ অনৈচ্ছিক এবং সহজাত। এরমধ্যে কিছু নড়াচড়া আবার শিশুর প্রাত্যহিক এবং স্বাভাবিক কার্যকলাপ আর বাকিগুলো কোন না কোন কারণের প্রতিক্রিয়ারুপে হয়ে থাকে।  

এই ধরনের প্রতিক্রিয়া নবজাতক শিশুর মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুর বিভিন্ন কাজগুলোকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এছাড়া কিছু প্রতিক্রিয়া শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির নির্দিষ্ট একটি পর্যায়েই কেবল মাত্র দেখা যায়।

নিম্নে নবজাতক শিশুর মধ্যে দেখা যাওয়া সাধারণ ৫টি রিফ্লেক্স বা সহজাত প্রবৃত্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

রুট রিফ্লেক্স বা উৎসের প্রতি প্রতিক্রিয়া (Root Reflex)

এই ধরনের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াগুলো সাধারণত শিশুর ঠোঁটের আশেপাশে আঙুল বুলালে দেখা যায়। এই সময়ে শিশু যেদিকে আঙুল বুলানো হয়েছে অর্থাৎ উৎসের প্রতি তার প্রতিক্রিয়া দেখায়।

আপনি যদি একটু খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন আপনি যেদিকে আঙুল বুলাচ্ছেন শিশু সেদিকেই মুখ ঘুরিয়ে হা করছে। এই সহজাত প্রবৃত্তি শিশুকে মায়ের বুক থেকে অথবা ফিডার থেকে দুধ খেতে সাহায্য করে থাকে।

এই ধরনের উৎসের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানো সাধারণত চার মাস ধরেই হয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে এগুলো আর অনৈচ্ছিক থাকে না। কেননা ততদিনে শিশু মস্তিষ্ক নিজ থেকেই বুদ্ধি খাটিয়ে এগুলো করার মত পরিপক্বতা পায়। পরবর্তীতে দেখা যায়, প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য নয় বরং শিশু নিজের ইচ্ছেতেই তার মাথা ঘোরাচ্ছে।

রুট রিফ্লেক্স বা উৎসের প্রতি প্রতিক্রিয়া
রুট রিফ্লেক্স বা উৎসের প্রতি প্রতিক্রিয়া

উল্লেখ্য যে উৎসের প্রতি এই ধরনের প্রতিক্রিয়ার কারণে শিশু মায়ের বুকের নিপল কোথায় এবং এর আকৃতি সম্পর্কে ধারনা পায়। এমনকি অন্ধকারেও তার মায়ের বুকের দুধ খেতে কোন ধরনের সমস্যাই হয় না।

তবে শিশুর ঠোঁটের কাছে আঙুল বুলানোর পর শিশু কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কেননা সাধারণত নবজাতক শিশু যখন ক্ষুধার্ত  থাকে তখনই কেবলমাত্র তাকে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে দেখা যায়। আর তাই আপনি তার ঠোঁটের আশেপাশে হাত বুলানোর পরেও যদি শিশু কোন প্রতিক্রিয়া না দেখায়, তারমানে এই যে আপনার শিশু এই মুহূর্তে ক্ষুধার্ত নয়।

কোন কিছু চুষতে থাকা এবং ঢোক গেলার সহজাত প্রতিক্রিয়া (Sucking and Swallowing Reflex)  

রুট রিফ্লেক্সের মতই যে কোন কিছু চুষতে থাকা হল নবজাতক শিশুর বেঁচে থাকার জন্য একটি সহজাত প্রবৃত্তি। উৎসের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমেই শিশু যে কোন কিছু চুষতে থাকার জন্য তৈরি হয়ে নেয়।

কোন কিছু যখন নবজাতক শিশুর উপরের ঠোঁট স্পর্শ করবে তখন শিশু নিজ থেকেই সেটা চুষতে শুরু করবে। এই অভ্যাসটি গর্ভধারণের ৩২ সপ্তাহ পর থেকেই শিশুর মধ্যে চলে আসে এবং এই প্রতিক্রিয়া পরিপক্বতা লাভ করতে করতে ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যায়। আর ঠিক একারণেই প্রিম্যাচিউর শিশু অর্থাৎ সঠিক সময়ের আগেই জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে মায়ের বুকের দুধ ঠিকমত চুষতে পারার ক্ষমতা বেশ কম দেখা যায়।

এছাড়াও শিশুর হাত মুখে ঢুকিয়ে চুষতে দেখা যায়। এমনকি শিশুদের গর্ভের মধ্যেও হাত অথবা আঙুল চুষতে দেখা যায়। তবে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই শিশুর যে কোন কিছু চুষতে থাকার প্রবণতা আর সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে ধরা হয় না। কেননা শিশু ততদিনের নিজের ইচ্ছেতেই এসব কাজ করতে পারে।

বিজ্ঞাপণ

আঁতকে উঠার প্রতিক্রিয়া (Moro or Startle Reflex)

শিশুর আশেপাশে কোন উচ্চ শব্দ অথবা দ্রুত নড়াচড়া হলে শিশুকে আঁতকে উঠতে দেখা যায়। উচ্চ কোন শব্দ হলে শিশু সাধারণত তার মাথা পিছনের দিকে হেলিয়ে দেয় এবং হাত পা ছুড়ে কান্না করতে থাকে এবং এরপর আবার হাত এবং পা শরীরের দিকে ভাঁজ করে কুঁকড়ে যায়। শিশুর নিজের কান্নার শব্দেও এই প্রতিক্রিয়া বা রিফ্লেক্স দেখাতে পারে।

কখনও বাবা মায়েরা এই আঁতকে উঠাকে “seizure” অর্থাৎ খিঁচুনির সাথে তুলনা করে ফেলেন। তবে এই দুইটির মধ্যে সহজ পার্থক্য হল আঁতকে উঠাটা কেবলমাত্র অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয়ে থাকে। অপরদিকে, খিঁচুনি দীর্ঘ সময়ে ধরেও হতে পারে।

আঁতকে উঠার প্রতিক্রিয়া
আঁতকে উঠার প্রতিক্রিয়া

শিশু বিশেষজ্ঞরা সাধারণত জন্মের পরপরই শিশুর মধ্যে মোরো বা স্টার্টল রিফ্লেক্স আছে কিনা সেটা চেক করে থাকেন। আর সাধারণত দুই থেকে চার মাসের মধ্যেই শিশুর এই ধরনের আঁতকে উঠার প্রবণতা কমে আসতে শুরু করে।

হাঁটার মত করে পা ফেলার প্রতিক্রিয়া (Stepping Reflex)

সাধারণত নবজাতক শিশুর পায়ের সাথে যখন শক্ত কোন কিছুর স্পর্শ পায় অথবা আপনি তাকে ধরে পায়ের সাথে মেঝে স্পর্শ করান তাহলে দেখবেন শিশুটি পা ছুঁড়ে দিচ্ছে অথবা হাঁটার মত করে পা নাড়াচ্ছে। সাধারণত জন্মের দুই মাসের মধ্যেই শিশুর মধ্যে এই ধরনের প্রবণতা কমে আসতে থাকে। স্টেপিং রিফ্লেক্স শিশুকে হাঁটতে শেখার জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

আপনি যদি শিশুর এই প্রতিক্রিয়া দেখার চেষ্টা করেন তাহলে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যাতে শিশুকে শক্ত করে ধরে রাখেন। এছাড়াও তার মাথাতেও সাপোর্ট দিতে ভুলবেন না কারণ এসময় শিশুর ঘাড় শক্ত থাকেনা। পরবর্তীতে শিশুর যখন হাঁটার বয়স হয়ে যায় তখন শিশুর মধ্যে এই হাঁটতে চাওয়ার প্রবণতা নিজের ইচ্ছেতেই হতে থাকে।

হাঁটার মত করে পা ফেলার প্রতিক্রিয়া
হাঁটার মত করে পা ফেলার প্রতিক্রিয়া

চিৎ করে শোয়ালে হাত পা ছড়িয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া (Tonic Neck or Fencing Reflex)

টনিক নেক রিফ্লেক্স দেখা যায় যখন আপনি শিশুকে পিঠের উপর ভর দিয়ে শুইয়ে দেন এবং শিশুর মাথা আলতো করে যে কোন একদিকে কাত করে দেন। তখন দেখবেন শিশু এক হাত আর পাও যেদিকে কাত করছেন সেদিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে। এবং তার অন্য হাত এবং পা ভাঁজ হয়ে থাকে এবং হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাখে।

চিৎ করে শোয়ালে হাত পা ছড়িয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া
চিৎ করে শোয়ালে হাত পা ছড়িয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়া

এভাবে থাকার ফলে বাচ্চা ঘুমানোর সময় উল্টে যেতে পারেনা । এটিও আপনার শিশুকে চিৎ করে শোয়ানোর আরেকটি কারণ।শিশুর এই ধরনের প্রবণতা ছয় মাস বয়স হওয়া পর্যন্ত দেখা যায়।

আঙুল মুঠো করে কোন কিছু ধরার প্রতিক্রিয়া

সাধারণত শিশুর হাতের মধ্যে আপনার আঙুল অথবা যাই দেন না কেন, দেখবেন যে শিশু সেটা মুঠ করে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এমনটা হয়ে থাকে শিশুর হাতের তালুর সাথে কোন কিছুর স্পর্শ পেলেই। এমনকি প্রিম্যাচিওর অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেয়া শিশুর মধ্যেও যে কোন কিছু মুঠো করে ধরে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়।

এমন অবস্থায় আপনি যদি শিশুর হাত থেকে আপনার আঙুল সরিয়ে নিতে চান তাহলে দেখবেন শিশু আপনার আঙুল তো ছেড়ে দিচ্ছেই না বরং আরো শক্ত করে সেটা ধরে রাখছে। সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় মাসের সময় যখন শিশু নিজের ইচ্ছেতে যে কোন কিছু মুঠো করে ধরে রাখতে পারে তখন এই ধরনের প্রতিক্রিয়া আর দেখায় না।

বিজ্ঞাপণ

এই রিফ্লেক্স শিশুকে কোন কিছু ধরতে শিখতে সাহায্য করে।

যে বিষয়গুলোর প্রতি একটু মনযোগী হবেন

নবজাতক শিশুর সাধারণ চেকআপের সময়েই আপনার শিশু বিশেষজ্ঞ শিশুর মধ্যে সব ধরনের প্রতিক্রিয়া এবং সহজাত প্রবৃত্তি আছে কি না সেটা বেশ ভালোভাবে চেক করে দেখবেন। এছাড়া বাবা মায়েদেরও এসবের দিকে একটু খেয়াল রাখা উচিৎ। তবে শিশুর কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আপনি যদি না বুঝে থাকেন তাহলে সেগুলো একটা কাগজে লিখে রাখুন। লিখে রাখলে পরবর্তীতে যখন শিশু বিশেষজ্ঞর শরণাপন্ন হবেন তখন খুব সহজেই সেগুলো সম্পর্কে ডাক্তারকে জানাতে পারবেন।

শিশুর প্রতিক্রিয়াগুলো খুব ভালোভাবে লক্ষ রাখুন। কোন প্রতিক্রিয়া যদি হুট করেই বন্ধ হয়ে আবার কিছুদিন পর আবার ফিরে আসে তবে তা কোন সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।

এছাড়াও শিশু যদি তার এই প্রতিক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের আগেই দেখানো বন্ধ করে দেয় তাহলে সেটা ডাক্তারকে জানাবেন। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে নবজাতক শিশুর এই রিফ্লেক্স বা প্রতিক্রিয়াগুলো অনেকদিন রয়ে যায় যা শিশুর মস্তিষ্ক বা স্নায়ুগত কোন সমস্যার নির্দেশ করতে পারে।

উপরোল্লিখিত প্রতিক্রিয়াগুলো শিশুর জন্মের সাথে সাথেই দেখা যাওয়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। এক্ষেত্রে আপনার আদতে কোন কিছুই করনীয় নেই। অর্থাৎ শিশুর মধ্যে এই প্রতিক্রিয়াগুলো আসার এবং যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার কিছুই করার থাকে না।

আপনার যেটা করনীয় সেটা হল, প্রাত্যহিক শিশুর প্রতি নজর রাখা এবং কোন ধরনের অস্বাভাবিক কিছু দেখলে সাথে সাথে সেটা ডাক্তারকে জানিয়ে দেয়া।     

সবার জন্য শুভকামনা।


Spread the love

Related posts

Leave a Comment