গর্ভাবস্থায় বুক ধড়ফড় করলে বা পালপিটেশন হলে সেটা নিয়ে কি আপনার উদ্বিগ্ন হওয়া উচিৎ?

Updated on

গর্ভাবস্থায় পেটের আকৃতি বড় হয়ে যাওয়া ছাড়াও আরো বেশ কিছু শারীরিক পরিবর্তন হয় যেগুলো বাহ্যত চোখে অর্থাৎ খালি চোখে তেমন একটা দেখা যায় না। তারমধ্যে একটা অন্যতম উদাহরণ হল শরীরে রক্তের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।

আর এই বৃদ্ধি পাওয়া রক্তের পরিমাণের জন্যই হৃৎস্পন্দনের গতি সাধারণ অবস্থার থেকে শতকরা ২৫ ভাগ বেড়ে যায়। এই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার কারণেই মাঝে মধ্যে মনে হতে পারে যে আপনার বুক কেমন জানি ধড়ফড় করছে অথবা হার্ট-বিট খুব জোরে জোরে হচ্ছে।

যদিও এই ধরনের বুক ধড়ফড় (Palpitation)  করাটা গর্ভাবস্থায় খুবই স্বাভাবিক এবং এতে কোন ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয় না। তবে অন্য বড় রোগের কারণেও এই বুক ধড়ফড়  হতেও পারে, তাই ঝুঁকি কিছুটা থেকেই যায়।

গর্ভাবস্থায় বুক ধড়ফড়  করা সম্পর্কে আরো যেগুলো জানা উচিৎ, তা জানতে হলে এই আর্টিকেলটি পড়তে থাকুন……

 গর্ভকালীন সময়ে হৃদপিণ্ডের উপর প্রভাব সমূহ

গর্ভাবস্থায় আপনার শিশু যখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তখন আপনার হৃদপিণ্ডের কাজও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। গর্ভকালীন শিশুর শরীরে পরিমাণ মত রক্তের প্রবাহ এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য আপনার শরীরের রক্তের পরিমাণও একই সাথে বৃদ্ধি করতে হয়।

গর্ভকালীন অবস্থার তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে পা দেয়ার সাথে সাথে আপনার শরীরের প্রায় বিশ ভাগ রক্ত আপনার জরায়ুর দিকে পৌঁছাতে থাকে। আর আপনার শরীরে যেহেতু রক্তের পরিমাণ একটু বেশি থাকে তখন, তাই এই বৃদ্ধি পাওয়া রক্ত আপনার শরীরের সবখানে পৌঁছে দেয়ার জন্য আপনার হৃদপিণ্ডকেও আরো দ্রুত পাম্প করতে হয়। এসময় প্রতি মিনিটে আপনার শরীরের হৃদ কম্পনও স্বাভাবিক সময়ের চাইতে ১০ থেকে ২০ বার বেড়ে যেতে পারে।

এছাড়া দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারের সময় আপনার শরীরের রক্তনালীগুলো  বিস্তৃত হয় অর্থাৎ সেগুলো অপেক্ষাকৃত একটু বড় হতে থাকে। তাই এই সময়ে আপনার শরীরের রক্তচাপ একটু কমে আসে।

আর আপনার হৃদপিণ্ডকে যখন একটু বেশি কাজ করে যেতে হয় তখন ফলাফলস্বরূপ কিছু অস্বাভাবিকতাও চলে আসে। এরমধ্যে অন্যতম হল অস্বাভাবিক হৃদকম্পন বা বুক ধড়ফড়  করা।

বুক ধড়ফড়  করার কারণ এবং লক্ষণসমূহ

এই বুক ধড়ফড়  করাটা একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। কেউ কেউ অনুভব করতে পারে যে তাদের মাথা একদম হালকা হয়ে আসছে এবং তাদের এমন অস্বস্তি হচ্ছে যেন তাদের হৃদকম্পন একটু জোরে জোরেই হচ্ছে। আবার এমনকি কারও কারও কাছে মনে হয় তাদের হৃদপিণ্ড বুকের মধ্যে নড়াচড়া করছে।

তবে লক্ষণগুলো যেমনই হোক না কেন, আপনি যখন গর্ভাবস্থায় থাকেন তখন আপনার বুক ধড়ফড়  করার কারণগুলো মোটামুটি একই রকম হয়ে থাকে। এরমধ্যে অন্যতম হলঃ

  • উদ্বেগ অথবা মানসিক চাপ
  • শরীরে রক্ত বেড়ে যাওয়ার প্রভাব
  • আপনার খাদ্য এবং পানীয় এর মধ্যে যদি ক্যাফেইন থাকে
  • ঠাণ্ডা অথবা এলার্জি জনিত ওষুধ খেলে, যেগুলোর মধ্যে pseudoephedrine (Nexafed, Sudafed congestion) থাকে
  • Pulmonary hepertension অথবা coronary artery disease এর মত হৃদপিণ্ডে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকলে।
  • পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার কারণে হৃদপিণ্ড যদি ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে
  • থাইরয়েডের মত কোন ধরনের শারীরিক অসুস্থতা থাকলে।

কখনো কখনো গর্ভকালীন সময়ে হৃদপিণ্ডের কোন ধরনের অসুস্থতা খুঁজে বের করাটা একটু মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। কেননা হৃদপিণ্ডের কোন ধরনের অস্বাভাবিকতার যে লক্ষণ সেগুলো গর্ভকালীন অবস্থার লক্ষণের সাথে একদমই মিলে যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে ক্লান্ত লাগা, শ্বাস প্রশ্বাস কমে আসে এবং শরীর ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।

কখন আপনার ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে?

গর্ভকালীন সময়ে, আপনাকে প্রতিনিয়তই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসলে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একবার সাধারণ চেক-আপের জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। তবে এরমধ্যেই যদি আপনার মনে হয় বুক ধড়ফড়  একটু বেশিই করছে অথবা বেশি সময় ধরে হচ্ছে সাথে সাথে আপনার ডাক্তারকে একটা ফোন করুন।

কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো দেখা গেলে আপনাকে তাৎক্ষনিক ভাবে জরুরী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। বুক ধড়ফড়  করার সাথে সাথে আরো যে লক্ষণগুলো থাকলে আপনাকে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে সেগুলো নিম্নরূপঃ

  • শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হলে
  • বুকে ব্যথা হলে
  • কাশির সাথে রক্ত বের হয়ে আসলে
  • নাড়ী স্পন্দনে যদি কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকে
  • হৃদকম্পন যদি অনেক বেড়ে যায়
  • শ্বাসকষ্ট হলে (কষ্ট হোক অথবা না হোক)

বুক ধড়ফড়  করা এবং রোগ নির্ণয়

ডাক্তার প্রথমেই আপনার পূর্ববর্তী শারীরিক অসুস্থতাগুলো সম্পর্কে জেনে নিবেন, কেননা এর মাধ্যমে আপনার বুক ধড়ফড়  করা থেকে রোগ নির্ণয় ডাক্তারের জন্য একটু সহজ হবে। আপনার যদি ইতোপূর্বেও বুক ধড়ফড়  করত, আপনার পূর্বে কোন ধরনের হৃদপিণ্ড জনিত অসুস্থতা ছিল অথবা আপনার পরিবারের কারও যদি হৃদপিণ্ডে কোন ধরনের সমস্যা থেকে থাকে তাহলে সেগুলোও ডাক্তারকে জানিয়ে দেয়াটা খুবই জরুরী।

এছাড়া ডাক্তার আরো কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন, তারমধ্যে নিম্নবর্তী পরীক্ষাগুলোও থাকবেঃ

  • EKG, এর মাধ্যমে আপনার হৃদপিণ্ডের তাড়িত কার্যকলাপগুলো মাপা হয়
  • Holer Monitor পরিধান করতে হবে। যেটা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত আপনার হৃদকম্পন পরীক্ষা করবে।
  • Electrolyte imbalance অথবা impaired thyroid function এর মত কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা আছে কি না সেটা জানার জন্য ডাক্তার আপনাকে রক্ত পরীক্ষাও করতে দিতে পারেন।

এগুলোর ফলাফল জানার পর এর উপর ভিত্তি করে ডাক্তার আপনাকে পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা দিতে পারেন।

বুক ধড়ফড়  করা এবং তার চিকিৎসা

আপনার বুক ধড়ফড়  করার কারণে যদি আরো বড় ধরনের কোন লক্ষণ না দেখা যায় এবং বুঝা যায় যে আপনার শরীরে বড় ধরনের কোন রোগের কারণে এমনটা হচ্ছে না তাহলে ডাক্তার আপনাকে এই বুক ধড়ফড়  করার জন্য চিকিৎসা গ্রহণের কোন উপদেশ দিবেন না। সাধারণত বেশীরভাগ সময়ে সন্তান জন্ম নেয়ার পর আপনার শরীর যখন তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে তখন এই ধরনের সমস্যা চলে যায়।

এছাড়া আপনার হৃদকম্পনকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। তবে এই ওষুধ খাওয়ার জন্য আপনার অথবা আপনার শিশুর কোন ধরনের ক্ষতি হবে কি না সেটা ভালো করে বুঝেই ডাক্তার আপনাকে সেই ওষুধ খাওয়ার জন্য পরামর্শ দিবেন।

যাই হোক, সাধারণত গর্ভকালীন প্রথম তিন মাস সকল ধরনের ওষুধ থেকে বিরত থাকা হয়, কেননা এই সময়ে আপনার গর্ভের শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে।

তবে আপনার বুক ধড়ফড়  যদি arrhythmia অথবা out-of-rhythm এর কারণে হয়ে থাকে, তাহলে ডাক্তার আপনাকে কার্ডিওভার্শন নামক প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়ার জন্য উপদেশ দিবেন।

হৃদপিণ্ডে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহের মাধ্যমে হৃদকম্পনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনাও এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। ডাক্তাররা গর্ভকালীন অবস্থায় এই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়াকে সাধারণত নিরাপদ বলে মনে করেন।

 পরিশেষে

যদিও গর্ভকালীন অবস্থায় বুক ধড়ফড়  করা আদতে কোন আনন্দের কিছু নয় তবে এটা সাধারণত নিরাপদ এবং এর কারণের কোন ধরনের ক্ষতি হয় না। কিন্তু এই ধরনের লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা ঠিক নয়, তাই এই সম্পর্কে আপনার ডাক্তারকে অতিবাহিত করুন। আপনার বড় ধরনের কোন সমস্যা হয়নি এটা জানার জন্য ডাক্তার হয়ত কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারেন।

গর্ভকালীন সময়ে বুক ধড়ফড়  করলে উদ্বিগ্ন হবেন না, কেননা আপনাকে এবং আপনার শিশুকে নিরাপদ রাখার জন্য এই ধরনের সমস্যার সার্বিক চিকিৎসা রয়েছে।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts