গর্ভাবস্থায় নাক বন্ধ থাকা বা রাইনাইটিস

Last Updated on

গর্ভাবস্থায় নাক বন্ধ থাকা বা রাইনাইটিস আসলে কি?

গর্ভকালীন অবস্থায় নাক বন্ধ থাকাকে ডাক্তারি ভাষায় গর্ভকালীন রাইনাইটিস (Pregnancy rhinitis)  বলা হয়। ঠাণ্ডা লাগার কারণে যখন আমাদের নাক বন্ধ থাকে, এই ব্যাপারটা কিছুটা ঠিক তেমনই। তবে এমন অবস্থা গর্ভকালীন সময়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, গর্ভকালীন সময়ে স্ত্রী হরমোন (ইস্ট্রোজেন) এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে নাসারন্ধ্র-নালী কিছুটা ফুলে উঠে এবং অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি করে। এছাড়া গর্ভকালীন সময়ে শরীরে সাধারণ অবস্থার তুলনায় একটু বেশি রক্ত চলাচল করে এবং যার ফলে নাকের ভেতরের ক্ষুদ্র রক্তকণিকা ফুলে উঠে এবং ফলাফল স্বরূপ নাক বন্ধ হয়ে যায়।

শতকরা ত্রিশ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে এই নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া সমস্যাটি দেখা যায় এবং এই সমস্যা গর্ভধারণের দ্বিতীয় মাস থেকে শুরু হলেও এটা প্রায় সময়েই পরবর্তীতে আরো তীব্র আকার ধারণ করে। সন্তান প্রসবের পরপরই এই সমস্যা কিছুটা প্রশমিত হয় এবং প্রসবের পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যেই একেবারে ঠিক হয়ে যায়।

কীভাবে বুঝবেন গর্ভকালীন অবস্থায় নাক বন্ধ কি গর্ভকালীন রাইনাইটিস এর জন্য নাকি অন্য কোন কারণে হচ্ছে? 

যদি নাক বন্ধ থাকা এবং নাক থেকে পানি পরাটাই আপনার একমাত্র লক্ষণ থাকে তাহলে সম্ভবত এটা গর্ভকালীন রাইনাইটিস এর জন্য হয়েছে। তবে এর সাথে সাথে যদি আপনার সর্দী, কাশি, গলা ব্যথা, হালকা ব্যথা অথবা জ্বর থাকে তাহলে আপনার ঠাণ্ডা লাগার কারণে অথবা অন্য কোন ইনফেকশনের কারণে এমনটা হয়েছে।

তবে মনে রাখবেন যে সাইনাস ইনফেকশন গর্ভকালীন অবস্থায় খুবই সাধারণ একটা সমস্যা। আর তাই যদি আপনার মধ্যে সাইনাস ইনফেকশনের লক্ষণ দেখা যায় অর্থাৎ জ্বর, মাথা ব্যথা, সবুজ অথবা হলুদ শ্লেষ্মা, মুখে ব্যথা অথবা প্রেশার অনুভব করা (এবং এটা আপনি সামনের দিকে ঝুঁকে গেলে যদি আরো বেড়ে যায়), উপরের চোয়ালে ব্যথা অথবা ঘ্রাণ ক্ষমতা কমে যায় তাহলে আপনি দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

অপরদিকে নাক বন্ধ অয়ে যাওয়ার সাথে সাথে যদি আপনার নাক দিয়ে পানির মত শ্লেষ্মা পরে, সাথে সাথে হাঁচি হয়, চোখ চুলকায়, নাক চুলকায়, গলা অথবা কান চুলকায় তাহলে সম্ভবত এলার্জির কারণে আপনার এমনটা হয়েছে।

গর্ভকালীন সময়ে এলার্জি সম্পর্কে পূর্ব থেকেই তেমন ধারণা করা যায় না। কেননা গর্ভাবস্থায় অ্যালার্জির সমস্যা কমে যেতে পারে আবার বেড়েও যেতে পারে। আবার এমনটাও দেখা যেতে পারে যে, এলার্জি জনিত কারণে আপনি যথেষ্ট সংবেদনশীল হয়ে উঠছেন যেটা আপনার মধ্যে ইতোপূর্বে ছিল না।

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কখনই আপনি একদম নিশ্চিত হয়ে বলতে পারবেন না আপনার নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার সঠিক কারণটি আসলে কী। এছাড়া একাধিক কারণেও আপনার নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, আপনার একই সাথে গর্ভকালীন রাইনাইটিস এবং এলার্জিও হতে পারে।

রাইনাইটিস অর্থাৎ গর্ভকালীন অবস্থায় নাক বন্ধ থাকার সঠিক চিকিৎসা কি?

নিম্ন বর্ণীত পন্থা অবলম্বন করলে গর্ভকালীন রাইনাইটিস এবং এজাতীয় অন্যান্য লক্ষণ কিছুটা প্রশমিত হয়ঃ

  • প্রচুর পরিমাণে পানি এবং পানি জাতীয় তরল পান করুন।
  • আপনি যখন শুয়ে পড়বেন তখন আপনার মাথার নিচে একটা অতিরিক্ত বালিশ দিন যাতে করে আপনার মাথা কিছুটা উঁচু থাকে।
  • গরম পানি দিয়ে গোসল করুন অথবা ষ্টীম-বাথ করুন। কেননা বাষ্প নাক বন্ধ হয়ে থাকাকে কিছুটা প্রশমিত করে এবং সাময়িক ভাবে আপনাকে কিছুটা আরাম দেয়। এছাড়া আপনি গরম পানিতে কোন কাপড় ভিজিয়ে এরপর সেটা আপনার মুখের উপর রেখে নিঃশ্বাস নিতে পারেন।
  • নাকে স্যালাইন ড্রপ অথবা স্যালাইন স্প্রে করতে পারেন এবং এগুলো আপনি পাশের ওষুধের দোকানেই পাবেন। প্রতিবার ড্রপ দেয়ার পাঁচ থেকে দশ মিনিট পর আপনি সহজে নাক ঝেড়ে নিতে পারবেন।
  • রাতের বেলায় আপনার রুমের বাতাসে আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য আপনি চাইলে হিউমিডিফাইয়ার অথবা ভ্যাপোরাইজার ব্যাবহার করতে পারেন। (এই ধরনের যন্ত্র পরিষ্কার রাখার জন্য এর সাথে আসা নির্দেশিকা দেখে নিন এবং নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। কেননা এই ধরনের যন্ত্রের কারণে বাতাসে প্রচুর পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে।)
  • হালকা ধরনের কিছু ব্যায়ামের মাধ্যমেও কিছুটা সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া নাক কিছুটা প্রশমিত করা যায়। (তবে ঘরের বাইরে বায়ু দূষণ যুক্ত স্থানে এই ধরনের ব্যায়াম করতে যাবেন না। কেননা বায়ু দূষণ আপনার নাসারন্ধ্র-নালীকে আরো অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিবে এবং এতে করে নাক বন্ধ হওয়া অবস্থাটা আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।)
  • সিগারেটের ধোঁয়া, এলকোহল, রঙ এবং অন্যান্য কেমিক্যালের গন্ধ ইত্যাদি যেগুলো আপনাকে আরো অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিতে পারে সেগুলো থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন।

রাইনাইটিস অর্থাৎ গর্ভকালীন অবস্থায় নাক বন্ধ হয়ে গেলে কি ওষুধ খাওয়া যেতে পারে?

সাধারণত গর্ভধারণ করার প্রথম তিন মাস যখন আপনার শিশুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গঠিত হয় তখন যে কোন ধরনের ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকা ভালো। তবে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়াটা যদি আপনার দৈনন্দিন জীবনকে একদম অতিষ্ঠ করে তোলে তাহলে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন যে এমতাবস্থায় কোন ধরনের ওষুধ আপনার জন্য নিরাপদ। উদাহরণ স্বরূপ, আপনার ডাক্তার যদি বলে decongestant আপনার জন্য নিরাপদ তাহলে আপনি সেটা গ্রহণ করতে পারে।

তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, কখনই নাকে decongestant স্প্রে খুব বেশি ব্যবহার করবেন না। কেননা এটা খুব বেশি ব্যাবহার করলে আপনার নাক বন্ধ থাকা অবস্থা আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts