প্রচণ্ড এই তাপদাহে কিছু করণীয়

গত কবছর ধরেই গ্রীষ্মে তাপদাহ অনেকটা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে । ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে সামনের বছরগুলোতে তাপদাহ আরও বাড়তে পারে। তাই কিছু ব্যাপারে আমাদের এখন থেকেই সতর্ক হতে হবে।

গ্রীষ্মকালীন ফলঃ  

যেকোনো কিছুর মোকাবেলা করতে গেলে প্রথমেই হতে হবে উদ্যমী – গ্রীষ্মের সব প্রতিকূল ব্যাপারের মধ্যে থেকেও কিছু পসিটিভ বিষয় খুঁজে বের করতে হবে। সৃষ্টিকর্তা  প্রকৃতিতে প্রতিকুলতা রেখেছেন, আবার সেইসাথে এমন কিছুও দিয়ে দিয়েছেন, যা ঠিকমত প্রয়োগ করলে আমরা সেই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারি। এই গ্রীষ্মের খুব ভালো একটি দিকঃ বিভিন্ন ফলের সমারোহ। তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকরী এবং সস্তা যে ফল তা হলো লেবুঃ বছরের এই সময়টিতে লেবুর দাম অনেক কমে যায়, এবং প্রচুর সরবরাহ থাকে। ক্যামিক্যালের ভয়ও থাকে না সাধারনত । প্রতিদিন শুধু  একটি করে লেবু দিয়ে লেবু পানি খান , বাচ্চাদের দেয়ার সময় মধু কিংবা চিনি মিশিয়ে দিতে পারেন। মিষ্টি সরবতে প্রচুর চিনি লাগে, যেটি পরিহার করলেই ভালো। আমাদের অনেকেরই খুব বড় ধরনের  বদ-অভ্যাস হচ্ছে প্যাকেটজাত জুস এবং যেসব বিভিন্ন প্যাকেটজাত ইন্সট্যন্ট ড্রিঙ্ক রয়েছে সেগুলো  পানির সাথে মিশিয়ে খেয়ে ফেলা , অনেকে বাচ্চাদেরও দিচ্ছেন এগুলো নিয়মিত। তাই শুনতে ভালো না লাগলেও এটা সত্য যে , প্রকৃতিতে সমাধান থাকা স্বত্বেও আমরা কিন্তু নিজেরাই সেসবের পরিবরর্তে বেছে নিচ্ছি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বিনষ্টকারী অপশনগুলোকে।

ফলের কথা বলতে গেলে লেবুর পরই আসে আনারসের কথা, অত্যন্ত পুষ্টিকর এই ফলটি এই সময়ে খুব সহজলভ্য থাকে । প্রতিদিন না পারলেও সপ্তাহে একদুইদিন আনারস খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বাড়ে।

আম, কাঠাল, আমড়া , কৎবেল , বেল, আতা, আরও অনেক ফলের সমাহার নিয়ে আসে এই ঋতু – আইসক্রিম, বাজারের কেনা জুস কিংবা কোমল পানীয় থেকে হাজারগুন পুষ্টিকর এবং উপাদেয় এসব ফলের কথা বিবেচনা করলে গ্রীষ্মের অপরাধ অনেকাংশেই ক্ষমা করা যায় ।

প্রচুর, প্রচুর এবং প্রচুর পানি পান করুনঃ

যে বিষয়টির আর কোনই বিকল্প নেই তা হলো প্রচুর পানি পান করাঃ সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস, ব্রেকফাস্ট করার আগে/ পরে এক গ্লাস, অফিসে/ বাড়িতে প্রতি ঘণ্টায় এক গ্লাস করে পানি খান , গোসলে যাওার আগে পানি খান, বাসায় ফিরে পানি খান, রাস্তায় বেরুলে সাথে অবশ্যই পানি রাখবেন। আর বাচ্চাদের যে কোন ভাবেই হকঃ দুধ, জুস, স্যুপ, ডাল , প্লেইন পানি – প্রচুর খাওয়ান । শুধু মায়েদের গ্রুপে ‘বাচ্চা অসুস্থ, কি করব’ -পোস্ট দিলেই কিন্তু হবে না, যতটা সম্ভব প্রাকৃতিকভাবে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে ।

তুলসি এবং আদা পানি/ চা

অনেকেই মনে করেন , এই মিশ্রণটি শুধু সর্দি হলে কিংবা শীতকালে কাজ দেয়। না, শীত-গ্রীষ্ম নির্বিশেষে এই মিশ্রণ কাজ করে, সাথে মধু থাকলে আরও ভালো। পানিয়ে সামান্য আদা আর তুলশি পাতা সেদ্ধ করে পানিটি ঠাণ্ডা করে রেখে দিন । বাচ্চার প্লেইন পানি কিংবা লেবুর সরবতের সাথে মিশয়ে খাওয়ান । আলাদা কোন স্বাদ গন্ধ হবে না, তাই বাচ্চা খেতে আপত্তি করবে না। রঙ বানিয়েও দিতে পারেন।

গোসলঃ

বাচ্চাদের দিনে কয়েকবার গোসল করালেও কোন সমস্যা নেই । তবে নবজাতক হলে হাল্কা গরম পানি মিশিয়ে নিলে নিরাপদ । অনেকের গোসল – ভীতি রয়েছে, বাচ্চাদের গোসল দিতে ভয় পান, কিন্তু কাড়ি কাড়ি পাউডার ঢালেন ঘামাচি হলে কিংবা ঘাম বন্ধ করার জন্য – খুবই ভ্রান্ত একটি ধারণা । গ্রীষ্মে ঘাম হবে এটি স্বাভাবিক। ঘাম মুছে দিতে হবে দ্রুত। খুব গরমে দিনে ২ থেকে ৩ বার গোসল করাতে হবে , এবং ঘন ঘন কাপড় বদলে দিতে হবে। বাচ্চাকে আগলে রাখতে হবে যেন ঘাম থেকে ঠাণ্ডা লেগে না যায় । কয়েকবার গোসলের মধ্যে একবার মূল গোসল , এবং বাকি সময় শুধু সম্পূর্ণ শরীর একবার পানি দিয়ে চট করে ধুয়ে দেয়া – এটী স্পঞ্জ করানোর চেয়ে বেশী কার্যকর ।

নিমঃ

প্রকৃতির আরেক অন্যন্য অবদান নিম। তবে যে হারে গাছ –পালা কেটে ফেলা হচ্ছে , আজকাল নিম গাছের সংখ্যাও কমে গেছে। তবে আমরা যা করতে পারি, তা হোল একটা ড্রাম কিংবা বড় বালতিতে নিজেদের ছাদেই লাগিয়ে ফেলতে পারি একটি নিম গাছ। বৃক্ষে পরিণত না হলেও প্রয়োজনে কিছু পাতা  সংগ্রহ করা যাবে। নিম পাতা সেদ্ধ করে পানি দিয়ে গোসল কিংবা নিম-পাতা ব্লেন্ড করে তার রস ঘামাচি কিংবা গরমের কারণে হওয়া র‍্যাশের জন্য সবচে কার্যকরী সমাধান।  যেকোনো বয়সী মানুষের ত্বকের পরিচর্যার জন্য নিম খুব ভালো একটু উপাদান, বিশেষ করে এই গরমে।

পরিশিষ্টঃ

গ্রীষ্মে গরমকে ভয় না পেয়ে বরং মোকাবেলা করার ব্যাবস্থা করতে হবে, আর প্রকৃতির দান দিয়েই প্রকৃতির সমস্ত প্রতিকুলতা জয় করতে হয় । সাবধানে থাকুন, পরিচ্ছন্ন থাকুন , বাইরের খাবার- তেলে ভাজা সম্পুর্নভাবে এড়িয়ে চলুন – যথাসম্ভব ‘অরগ্যানিক’ থাকুন।

যেখানে যখন পারেন, এক দুইটি গাছ লাগান । কোণ উপায় না থাকলে বারান্দায় না ছাদে গাছ লাগান । রান্না ঘরে যারা কাজ করেন , তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিন, কাজ ভাগ করে নিন।

বাইরে গেলে যথাসম্ভব রোদ পরিহার করুন। দরকারে ছাতা বগলদাবা করে কাজে যান।

শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সহানুহুতিশীল হোন। কুরিয়ার, দুধ-ওয়ালা কিংবা ছুটা বুয়া –সবাইকে আসা মাত্র পানি কিংবা মাঝে মাঝে সরবত খেতে দিন। ইন শা আল্লাহ আর কয়েক-দিনের মধ্যেই এক পশলা বৃষ্টি কিংবা ঝড়ো হাওয়া কিছু সময়ের জন্য হলেও শান্তির পরশ বুলিয়ে যাবে। প্রার্থনা করছি, এই অসহ্য গরম কমে যাক- সবাই সুস্থ হয়ে উঠুক –সবার জন্য শুভ কামনা ।

Related posts

Leave a Comment