শিশুর সঠিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষণীয় বিষয়সমুহ

বিভিন্ন বয়সে শিশুর বিকাশে তারতম্য হতে পারে। এই তারতম্য শরীরের ভিতরের কারণে বা বাইরের কারণেও হতে পারে। শিশুর বিকাশ একটি নির্দিষ্ট নকশা তথা পথ মেনে চলে এবং যা অ্যানথ্রোপোমেট্রিক্স পরিমাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিচে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও পুষ্ট শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি তার জীবনের প্রথম বছরেই হয়ে থাকে। শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও কর্ম দক্ষতা সাধারণত নিচের বিষয় গুলোর উপর নির্ভর করে-

 

শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও কর্মদক্ষতা নিম্নোক্ত কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  • জীনগত কারন: লম্বা বাবা মায়ের সন্তান সাধারণত দ্রুত লম্বা হয় আর খাটো বাবা মায়ের সন্তানের বৃদ্ধি ধীর হয়। এটা জীনগত কারণেই হয়ে থাকে।
  • পুষ্টিগত কারণ: পুষ্টির অভাবে যেমন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, তেমনি অতিরিক্ত পুষ্টি শিশুকে মেদবহুল করে। শরীরের কম ওজনের মত বেশি ওজনকেও এক ধরনের অপুষ্টি বলে।
  • আর্থ-সামাজিক কারণ: সাধারনভাবে দারিদ্রতা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি ও কর্মদক্ষতা দুটোকেই ব্যাহত করে। যে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো সেই পরিবারের শিশুদের শারিরিক বৃদ্ধি, বিকাশ ও কর্মদক্ষতা স্বাভাবিকভাবেই ভালো থাকবে।
  • পারিপার্শ্বিকতা: উন্নত সামাজিক, মানসিক ও পারিপার্শ্বিকতা শিশুদের কর্মদক্ষতা ও দৈহিক বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।
  • অসুস্থতা: দীর্ঘদিন কোন শিশু অসুস্থতায় ভুগলে সেই শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশ দুটোই বিলম্বিত হয়। ওজন কমে যায়, খাবারের রুচিও কমে আসে।
  • মানসিক আঘাত: পরিবার, সমাজ ও পরিবেশ থেকে যে কোনভাবে মানসিক আঘাত পেলে বা চাপে থাকলে সেই শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির ব্যাঘাত ঘটে।
  • গর্ভাবস্থায়: মায়ের পেটে শিশুর স্বাভাবিক ও যথাযথ বৃদ্ধি না হলে, জন্মের পর সেই শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি খুব ধীর গতিতে হয় এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব নিয়ে সেই শিশু জন্ম গ্রহন করে।

শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি পরিমাপের উপায় সমূহ:

ওজন

জন্মের তিন-চার দিনে প্রায় সব শিশুরই ওজন বেশ খানিকটা কমে যায় এবং ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ওজন খানিকটা ফিরে পায়। প্রথম তিন মাসে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম প্রতি দিন বাড়ে। তার পরে বৃদ্ধির এই গতি খানিকটা কমে যায়। সাধারণত পাঁচ মাসের শিশুর ওজন প্রায় দ্বিগুণ হয় এবং তা তিন গুণ হয় এক বছরের মধ্যে। তবে কম ওজনের শিশুর ক্ষেত্রে ওজন এই হারে বাড়ে না।

শিশুর বৃদ্ধির ধরন
ছেলেদের ওজন বৃদ্ধির চার্ট

কম  ওজনের শিশুর ক্ষেত্রে পাঁচ মাসের আগেই ওজন দ্বিগুণ হয় এবং এক বছরে তাদের ওজন বাড়ে চার গুণ। তবে এক বছর পর এই হারে ওজন বাড়ে না।

জন্মের পর প্রথম পাঁচ থেকে ছয় মাস ওজনের রেখাচিত্র খুব ভালো থাকে। এই সময়ের মধ্যে শিশুর ওজন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে থাকে। এই বয়সের পর ওজনের রেখাচিত্রটি ক্রমশ নিম্নমুখী হয়। এর কারণ হল, এই সময়ে শুধু বুকের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট নয়। বুকের দুধের পাশাপাশি অতিরিক্ত খাদ্য দেওয়া দরকার।

শিশুর বৃদ্ধির ধরন
মেয়েদের ওজন বৃদ্ধির চার্ট

শিশুর ওজন নির্ভর করে তার উচ্চতার উপর। তাই শিশুটির ওজন স্বাভাবিক কিনা তা নির্ণয় করা জরুরি। উচ্চতা অনুযায়ী শিশুর ওজন কম বা বেশি হতে পারে। কম ওজন হলে বুঝতে হবে অপুষ্টি বা শীর্ণতাই এর কারণ।

উচ্চতা

উচ্চতা হল শিশুর বৃদ্ধির আরও একটি পরিমাপ। সদ্যোজাত শিশুর উচ্চতা সাধারণ ভাবে ৫০ সেমি (২০”) হয়। প্রথম বছরে তার উচ্চতা বাড়ে ২৫ সেমি। দ্বিতীয় বছরে ১২ সেমি। তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম বছরে যথাক্রমে ৯ সেমি, ৭ সেমি এবং ৬ সেমি করে উচ্চতা বাড়ে। যদি বয়স অনুযায়ী উচ্চতা কম হয় তবে তা কম বৃদ্ধির দিকে নির্দেশ করছে । তবে ওজনের মতো কম উচ্চতার জন্য অপুষ্টি সরাসরি দায়ী নয়। অতীতে ধারাবাহিক অপুষ্টির ফলে শিশুর উচ্চতার উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই নিয়মিত উচ্চতা রের্কড করা জরুরী।

শিশুর বৃদ্ধির ধরন
ছেলেদের উচ্চতা বৃদ্ধির চার্ট

 

 

শিশুর বৃদ্ধির ধরন
মেয়েদের উচ্চতা বৃদ্ধির চার্ট

 

মাথার পরিধি এবং বুকের পরিধি

এগুলোও শিশুর বৃদ্ধির সূচক। জন্মের পর থেকে মাথার পরিধি বৃদ্ধির পরিমাপও জরুরি। সাধারণত এই সময় মাথার পরিধি হয় ৩৪ সেমি (১৪”)। এটি বুকের পরিধির চেয়ে ২ সেমি বেশি হয়। তবে পরবর্তী কালে বুকের পরিধি বাড়ে এবং তা মাথার পরিধিকে ছাড়িয়ে যায়। যদি শিশুটি অপুষ্টিতে ভোগে তবে তার বুকের পরিধি মাথার পরিধিকে ছাড়িয়ে যেতে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লেগে যায়।

 

মধ্য-বাহুর পরিধি

এটা খুব সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ। যখন শিশুটি দু’ হাত শরীরের দু’ পাশে রেখে বিশ্রাম নেয় তখন এর মাপ নেওয়া যায়। হাতের মাঝখানে মাপের ফিতেটি হালকা অথচ দঢ় ভাবে ধরে বাহুর নীচ দিয়ে গোল করে ঘুরিয়ে মধ্য-বাহুর পরিধি পরিমাপ করা যায়। জন্ম থেকে এক বছরের মধ্যে মধ্য-বাহুর পরিধির দ্রুত বৃদ্ধি হয়। এই সময় প্রায় ১১ থেকে ১২ সেমি পর্যন্ত বাড়ে। তার পর পাঁচ বছর পর্যন্ত মোটামুটি একই রকম থাকে এবং পাঁচ বছর বয়সী  একটি পুষ্ট শিশুর মধ্য-বাহুর পরিধি ১৬-১৭ সেমিতে গিয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে সদ্যোজাতের চর্বির পরিবর্তে পেশি জন্মায়। মধ্য-বাহুর পরিধির মাপ যদি স্বাভাবিকের চেয়ে ৮০ শতাংশ কম হয় অর্থাৎ ১২.৮ সেমি মতো হয়, তা হলে বুঝতে হবে শিশু মাঝারি থেকে গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছে।

 

শিশুর বিকাশ পরিমাপের জন্য  শুধুমাত্র শিশুর দৈহিক বৃদ্ধির দিকে খেয়াল রাখলেই চলবে না। খেয়াল রাখতে হবে শিশুটির কর্মদক্ষতা ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে কিনা। শিশুর কর্মদক্ষতা ও মানসিক বৃদ্ধির মাপকাঠিগুলো লক্ষ্য করুনঃ

  • স্নায়ুবিক বৃদ্ধিঃ ৩ মাস বয়সে শিশু ঘাড় সোজা করতে, ৬ মাস বয়সে বসতে আর ১ বৎসর বয়সে হাঁটতে পারে।
  • দৃষ্টিশক্তির বিকাশঃ ৩ মাস বয়স হলে শিশু উজ্জ্বল কিছু দেখলে তার দিকে খেয়াল করে, ৬ মাস বয়সে ছোট বস্তুও দেখতে পারে। ৬ মাস বয়সে শিশুর হাতের তালুতে কোন কিছু ধরলে তা চেপে ধরে আর ১০ মাস বয়সে শিশু ভালভাবে কোন কিছু ধরতে পারে।
  • স্বৃতিশক্তির বিকাশঃ শিশুর বয়স যখন ৬ মাস হয় তখন তার কাছে কোন শব্দ করলে মাথা ঘুরায় আর ৯ মাস বয়সে কোথায় শব্দ হচ্ছে সেটা বুঝতে পারে।
  • কথা বলার ক্ষমতাঃ শিশুর বয়স ৬ মাস হলে ব্যা-ব্যা, চ্যা-চ্যা, ম্যা-ম্যা ইত্যাদি কিছু অর্থহীন শব্দ করে আর বয়স এক বৎসর পূর্ণ হলে প্রথম অর্থপূর্ণ শব্দ যেমন মা, বাবা, দাদু ইত্যাদি বলতে শেখে।

 

শিশুর বিকাশ কয়েক পর্যায়ে ঘটে-

  • প্রথম পর্যায়: জন্মের পর সে পর্যায়ক্রমে উপুড় হয়। হামাগুড়ি দেয়, বসে, দাঁড়ায়, হাঁটে ও দৌঁড়ায়।
  • দ্বিতীয় পর্যায়: প্রথম দিকে শিশু শুধু মা-বাবাকে চিনতে শেখে, তারপর ধীরে ধীরে পরিবারের অন্যদের চেনে, জানে, সবার সঙ্গে মেশে।
  • তৃতীয় পর্যায়: শুরুতে কান্নাই হলো শিশুর ভাষা। আস্তে আস্তে সে বাবা, দাদা, মামা-এ ধরনের ছোট ছোট শব্দ বলে। এক সময় গুছিয়ে কথা বলতে শিখে ।

 

সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয় মাতৃগর্ভে-যা প্রায় শতকরা আশি ভাগ। আর অবশিষ্ট কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি হয়-জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত।উপরের সবগুলো বিষয় মিলিয়ে দেখুন তাহলে নিজেই বুঝতে পারবেন আপনার শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক হচ্ছে কিনা। তবে মনে রাখতে হবে দৈহিক ও মানসিক বিকাশের এই মাপকাঠি স্থির নয়। তাই শিশুকে নিয়ে দু:চিন্তা না করে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সময় দিন এবং তাদের প্রতি খেয়াল রাখুন।

Related posts

Leave a Comment